• ই-পেপার

আল-আজহারের ১০৮৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

কারো বদনজর লাগছে কিভাবে বুঝবেন? করণীয় কী?

অনলাইন ডেস্ক
কারো বদনজর লাগছে কিভাবে বুঝবেন? করণীয় কী?
সংগৃহীত ছবি

দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবন মুমিনের জন্য পরীক্ষার হলের মতো। চিরসত্য মৃত্যুর মধ্যদিয়ে প্রত্যেককেই অনন্তকালের জীবনে প্রবেশ করতে হবে। তবে পরকালে সফল হতে অবশ্যই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তবেই আখিরাতে মিলবে কাঙ্ক্ষিত জান্নাত।

পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, ‘জমিনের ওপর যা কিছু আছে আমি সেগুলোর শোভাবর্ধন করেছি, যাতে আমি মানুষকে পরীক্ষা করতে পারি যে, আমলের ক্ষেত্রে কারা উত্তম।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ৭)

এ জন্য অনেক সময় দুনিয়াতে নানা ধরনের বিপদ-আপদের মাধ্যমেও মহান রাব্বুল আলামিন বান্দার পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। কখনো এটি হতে পারে শারীরিক কোনো রোগ-ব্যাধি দিয়ে, আবার কখনো জীবন বা সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে বদনজর লাগাও আল্লাহর পক্ষ থেকে মুমিনের জন্য একটি পরীক্ষা। কারণ, বদনজর যেমন সত্য, তেমনি এর খারাপ প্রভাবও রয়েছে।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বদনজর লাগা সত্য (সুনান আবু দাউদ, হাদিস : ৩৮৭৯)। এ ছাড়া আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন- তোমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা বদনজর সত্য বা বাস্তব ব্যাপার। (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস : ৩৫০৮)

এমনকি পবিত্র কোরআনেও বদনজরের বিষয়টি এসেছে, ইরশাদ হয়েছে- ‘কাফিররা যখন কোরআন শুনে তখন তারা যেন তাদের দৃষ্টি দিয়ে তোমাকে আছড়ে ফেলবে। আর তারা বলে, সে তো অবশ্যই পাগল।’ (সুরা কলম, আয়াত : ৫১)।

মূলত বদনজর হলো কারো হিংসাত্মক দৃষ্টির কুফল। এ ক্ষেত্রে কারো হিংসাত্মক দৃষ্টির ফলে কোনো ব্যক্তির বা বিষয়ের ভালো অবস্থা থেকে ব্যত্যয় ঘটলে এমনটা বদনজরের কারণে হয়ে থাকতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এমনটা বেশি দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভালোমতো খাওয়া-দাওয়া করা কোনো শিশুকে কেউ যদি হিংসাত্মক দৃষ্টিতে দেখে, সে ক্ষেত্রে প্রায়ই ওই শিশুর খাবার খেতে অনীহার মতো বিষয় দেখা যায়।

এ ক্ষেত্রে কারো মধ্যে বেশ কিছু লক্ষণ প্রকাশ পেলে তার ওপর কারো বদনজর লেগেছে কি না, সেটি বোঝা যায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি হলো চেহারায় কালিমা পড়া (চেহারার স্বাভাবিক নূর বা উজ্জ্বলতা নষ্ট হয়ে যাওয়া)। উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুল (সা.) তার ঘরে এমন একটি মেয়েকে দেখলেন যে, তার চেহারায় কালিমা রয়েছে। তখন নবীজি (সা.) বললেন তাকে ঝাড়-ফুঁক করাও, কেননা তার ওপর (বদ) নজর লেগেছে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৫৩৭; সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩২৮)

এ ছাড়া বিনা কারণেই শরীর অতিরিক্ত দুর্বল ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়াও বজনজরের কারণে হতে পারে। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাযম পরিবারকে সাপের ছোবলে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীকে ঝাড়-ফুঁক করার অনুমতি দেন এবং আসমা বিনতু উমায়স (রা.) কে বললেন, আমার ভাই জাফার (রা.) এর ছেলে-মেয়েদের কী হলো যে, তাদের শরীর আমি দুর্বল দেখতে পাচ্ছি? তাদের কি অভাব দেখা দিয়েছে? জবাবে আসমা (রা.) বললেন, না। কিন্তু তাদের ওপর তাড়াতাড়ি কুনজর লেগে যায়। এরপর নবীজি (সা.) বললেন, তুমি তাদের ঝাড়-ফুঁক করো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৬১৯)

তবে বদনজর লাগা নিয়ে প্রচলিত একটি কথা প্রায়ই শোনা যায় যে, বদনজর লাগলে সোনা বা রূপা ধৌত করা পানি খেলে বা সেই পানি দিয়ে গোসল করলে বদনজর কেটে যায়। আবার কেউ কেউ বদনজর কাটাতে পশুর হাড় ঝুলিয়ে রাখেন। তবে শরিয়তে এমন সবকিছুর ভিত্তি নেই।

ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহর মতে, কারও বদনজর লেগেছে এমনটা নিশ্চিত হলে দুইভাবে মূলত বদনজর কাটানো যায়। এর মধ্যে একটি হলো যার বদনজর লেগেছে কোনোভাবে তার শরীর নিসৃত পানি (হাত ধোয়, গোসল করা পানি ইত্যাদি) সংগ্রহ করে যার ওপর বদনজর লেগেছে তার ওপর প্রয়োগ করা। অর্থাৎ, সেই পানি দিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নেয়া বা গোসল করা। এছাড়া অন্যটি হলো- বিশেষ কোনো দোয়া বা কোরআনের আয়াত পাঠ করা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটি করা যেতে পারে সেটি হলো- সুরা ফালাক ও সুরা নাস পাঠ করা। এ ক্ষেত্রে কোনো পানিতে এই দুই সুরা পড়ে ফুঁ দিয়ে সেই পানি দিয়ে যার ওপর বদনজর লেগেছে তার শরীর ধুয়ে নেয়া যেতে পারে।

এর বাইরেও বদনজর কাটাতে বিভিন্ন দোয়া পড়া যেতে পারে। সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এমন একটি দোয়ার কথা এসেছে। যার মাধ্যমে জিবরিল (আ.) নবীজিকে (সা.) ঝাড়ফুঁক করেছিলেন। সহিহ মুসলিমে আসা হাদিসটি হলো- একবার জিবরিল (আ.) রাসুল (সা.) এর কাছে এসে বললেন, ইয়া মুহাম্মদ! (সা.) আপনি কি অসুস্থতা বোধ করছেন? জবাবে নবীজি বললেন, হ্যাঁ। পরে জিবরিল (আ.) বললেন-

بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَىْءٍ يُؤْذِيكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ

বাংলা : বিসমিল্লাহি আরক্বিকা মিন কুল্লি শাইয়্যিন ইয়্যুজিকা মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসাদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা, বিসমিল্লাহি আরক্বিকা।

অর্থ : আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি- সেসব জিনিস থেকে, যা আপনাকে কষ্ট দেয়, সব প্রাণের অনিষ্ট কিংবা হিংসুকের বদনজর থেকে আল্লাহ আপনাকে শিফা দিন, আল্লাহর নামে আপনাকে ঝাড়-ফুঁক করছি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৫১২)

এছাড়া কারও বদনজর লাগলে যে ঝাড়-ফুক করা যায় হাদিসে সে বিষয়টিও এসেছে। উবাইদ ইবনু রিফাআ আয-যুরাকী (রাহ.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, একবার আসমা বিনতু উমাইস (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), জাফরের সন্তানদের তাড়াতাড়ি বদনজর লেগে যায়। আমি কি তাদের ঝাড়-ফুঁক করতে পারি? জবাবে নবীজি (সা.) বলেন, হ্যাঁ। কেননা, কোনো জিনিস যদি ভাগ্যকে অতিক্রম করতে পারত তাহলে বদনজরই তা অতিক্রম করতে পারত। (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস : ২০৫৯)

জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ

মুফতি ওমর বিন নাছির
জাহেলি যুগে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণসমূহ
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন পৃথিবী জ্ঞান, ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। আরব উপদ্বীপের সেই সময়টিই ইতিহাসে 'জাহেলিয়াতের যুগ' নামে পরিচিত। 'জাহেলিয়াত' শব্দের অর্থ শুধু অজ্ঞতা নয়; বরং আল্লাহর বিধান থেকে বিচ্যুতি, নৈতিক অবক্ষয়, অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার ও মানবিক মূল্যবোধের পতন। সে যুগে শক্তিই ছিল ন্যায়ের মানদণ্ড, নারীরা ছিল অবহেলিত, দুর্বলরা ছিল নির্যাতিত এবং সমাজজুড়ে ছিল শিরক, মূর্তিপূজা, মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচার ও গোত্রবাদ। তবে জাহেলি যুগের সেই সামাজিক অবক্ষয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বর্তমান সমাজের অনেক সংকটেরও সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়।

১. হেদায়াতের পথ থেকে বিচ্যুতি ও শিরকে অবাধ বিস্তার
জাহেলি সমাজের সর্ববৃহৎ অবক্ষয়ের কারণ ছিল আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত হয়ে মূর্তিপূজায় লিপ্ত হওয়া। তারা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে স্বীকার করলেও ইবাদতে বহু দেব-দেবীকে শরিক করত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অবশ্যই শিরক এক মহা জুলুম।’ (সুরা : লুকমান, আয়াত : ১৩)
শিরক মানুষের বিবেককে অন্ধ করে দেয় এবং সব ধরনের নৈতিক অবক্ষয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে।

২. অজ্ঞতা ও ওহির জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হওয়া
জাহেলি সমাজে মানুষের জীবন পরিচালিত হতো কুসংস্কার, অন্ধ অনুসরণ ও মনগড়া বিশ্বাসের মাধ্যমে। আল্লাহর কিতাব ও নবীদের শিক্ষা থেকে দূরে থাকার ফলে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তারা হারিয়ে ফেলেছিল।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তিনি তাদেরকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ১৬)

৩. অহংকার ও গোত্রবাদ
বংশ, গোত্র ও জাতিগত অহংকার ছিল জাহেলি সমাজের অন্যতম বড় ব্যাধি। তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধ চলত। আল্লাহ বলেন, ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি... নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)

৪. নারীর প্রতি অবিচার
জাহেলি যুগে নারীদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাদেরকে সম্পদের মতো বিবেচনা করা হতো এবং কন্যাসন্তান জন্ম নিলে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নিষ্ঠুর প্রথাও প্রচলিত ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে— কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা : তাকভির, আয়াত : ৮–৯)

৫. মদ, জুয়া ও অশ্লীলতার প্রসার
মদ্যপান, জুয়া, ব্যভিচার ও অশ্লীলতা ছিল জাহেলি সমাজের সাধারণ সংস্কৃতি। এসব অপরাধ ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংস করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী শরসমূহ শয়তানের অপবিত্র কাজ। অতএব তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাক।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৯০)

৬. সুদ ও অর্থনৈতিক শোষণ
ধনীরা সুদের মাধ্যমে গরিবদের শোষণ করত। ফলে সমাজে বৈষম্য ও অন্যায় বেড়ে যেত। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

৭. ন্যায়বিচারের অভাব
ক্ষমতাবানরা দুর্বলদের ওপর জুলুম করত। বিচার হতো প্রভাব ও শক্তির ভিত্তিতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে তার ওপর শাস্তি কার্যকর করত।’ (বুখারি)

৮. নৈতিকতা ও আখিরাতের জবাবদিহিতার অভাব
আখিরাতের জবাবদিহিতার বিশ্বাস দুর্বল হওয়ায় মানুষ পাপকে ভয় করত না। ফলে অন্যায়, প্রতারণা ও অপরাধ সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ সৎকাজ করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে ব্যক্তি অণু পরিমাণ অসৎকাজ করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা : জিলজাল, আয়াত : ৭–৮)

হাদিসের বাণী

দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাতের এক-তৃতীয়াংশ হলে মহানবী (সা.) উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, হে মানুষসকল, তোমরা আল্লাহকে স্মরণ করো। কম্পনকারী এবং তার সহযোগী (কিয়ামতের আগে শিঙ্গার ফুঁৎকার) চলে এসেছে এবং মৃত্যুও তার ভয়ংকর রূপ নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। 
(এ ঘোষনা শুনে একবার) আমি বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি আপনার ওপর দরুদ পাঠ করি। তাই আমি আপনার ওপর দরুদ শরিফ পাঠ করার জন্য কোন সময় নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তোমার সময় অনুযায়ী করতে পারো। আমি বললাম, এক-চতুর্থাংশ সময়? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক সময়ে? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে পারলে যদি বেশি করো, তাহলে তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে দুই-তৃতীয়াংশ সময় করব? মহানবী (সা.) বললেন, যত সময় চাও, করতে পারো। তবে বেশি করে করতে পারলে, তা তোমার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, আমি আমার সম্পূর্ণ সময় দরুদের জন্য নির্দিষ্ট করব? এবার মহানবী (সা.) বললেন, তাহলে এই দরুদ তোমার চিন্তা দূর করে দেবে এবং তোমার সব গুনাহকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৫৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১২৪১)

শিক্ষা ও বিধান
1. রাতের শেষাংশ ইবাদতের সর্বোত্তম সময়। মহানবী (সা.) রাতের এক-তৃতীয়াংশে জেগে আল্লাহর জিকির করতেন এবং উম্মতকে ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাতেন।
2. মৃত্যু ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করা ঈমানকে শক্তিশালী করে। তাই মানুষের উচিত সব সময় মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়া এবং আখিরাতমুখী জীবন গড়ে তোলা।
3. আল্লাহর জিকির মুমিনের সর্বোত্তম আমল। বিপদ-আপদ, গাফেলতি ও পাপ থেকে বাঁচতে নিয়মিত জিকির করা জরুরি।
4. মহানবী (সা.)-এর প্রতি বেশি বেশি দরুদ পাঠ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ইবাদত।
5. দরুদ পাঠের নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই। প্রত্যেকে নিজের সামর্থ্য ও সুযোগ অনুযায়ী যত ইচ্ছা সম্ভব দরুদ পড়তে পারে।
6. দরুদ দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। আল্লাহ তাআলা দরুদের বরকতে বান্দার দুঃখ-কষ্ট লাঘব করেন।
৭. দরুদ গুনাহ মাফের অন্যতম মাধ্যমও বটে। তাই আন্তরিকভাবে দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা বান্দার পাপ ক্ষমা করে দেন।


 

অশ্লীলতা মানব জীবনে সর্বদা লাঞ্ছনা বয়ে আনে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অশ্লীলতা মানব জীবনে সর্বদা লাঞ্ছনা বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানবজাতিকে চারিত্রিক পবিত্রতা, শালীনতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। ঈমানের দাবি হলো মানুষের মুখের ভাষা, আচরণ, পোশাক, দৃষ্টি, চিন্তা-সবকিছুর মধ্যেই যেন শালীনতা ও পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে। তাই ইসলাম শুধু অশ্লীল কাজকেই হারাম করেনি; বরং অশ্লীলতার প্রচার, প্রসার, স্বাভাবিকীকরণ এবং তাতে সহযোগিতা করাকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। কারণ অশ্লীলতা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয় এবং তা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে অপমান ও লাঞ্ছনার কারণ হয়।

এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, 'নিশ্চয়ই যারা এটা পছন্দ করে যে মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।' (সুরা : নুর, আয়াত : ১৯)

পবিত্র কোরআনের এই আয়াত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে শুধু অশ্লীল কাজের কথা বলা হয়নি; বরং অশ্লীলতার 'প্রচার ও প্রসার' কামনা করাকেও ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কেউ যদি নিজে অশ্লীলতায় লিপ্ত না-ও হয়, কিন্তু এমন পরিবেশ তৈরি করে, যাতে অশ্লীলতা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলেও সেও এ সতর্কবার্তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে (নাউজুবিল্লাহ!)।

শয়তান মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য অশ্লীলতার স্বাভাবিকীকরণের প্রক্রিয়া অবলম্বন করে। এটা তার অন্যতম বড় কৌশল। যে কৌশলের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেছেন, 'হে মুমিনরা, তোমরা শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ কোরো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্কসমূহ অনুসরণ করবে, নিশ্চয়ই সে অশ্লীলতা ও মন্দ কাজের নির্দেশ দেবে।' (সুরা : নুর, আয়াত : ২১)

বোঝা গেল, মানব সমাজে যারা অশ্লীলতা স্বাভাবিকীকরণে কাজ করে, তারা মূলত শয়তানের ফাঁদে পা দিয়েছে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই কিছু অশ্লীল শব্দ, বাক্য বা স্লোগান 'ট্রেন্ড' হয়ে যায়। অসংখ্য মানুষ না বুঝেই সেগুলো 'মিম' বা 'ট্রেন্ড' মনে করে শেয়ার করে, মন্তব্যে ব্যবহার করে কিংবা ভিডিও বানিয়ে আরো ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য কোনো বিষয় জনপ্রিয় হওয়াই তার বৈধতার প্রমাণ নয়। মুমিন কখনো এসব কাজে লিপ্ত হতে পারে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, 'মুমিন কখনো দোষারোপকারী ও নিন্দাকারী হতে পারে না, অভিশাপকারী হতে পারে না, অশ্লীল কাজ করে না এবং কটুভাষীও হয় না।' (তিরমিজি, হাদিস : ১৯৭৭) 

অনেক ক্ষেত্রে মানুষ মতবিরোধ ও বিতর্কে জেতার জন্য অশ্লীল পথ অবলম্বন করে বসে। অথচ ইসলাম মতবিরোধ ও বিতর্কের ক্ষেত্রেও শালীনতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, 'তুমি তোমার রবের পথে হিকমত ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করো এবং সুন্দরতম পন্থায় তাদের সঙ্গে বিতর্ক করো।' (সুরা : নাহল, আয়াত : ১২৫)

অতএব, প্রতিপক্ষ ভুল করলেও তার জবাবে অশ্লীল ভাষা, কুরুচিপূর্ণ উপহাস বা নোংরা শব্দ ব্যবহার করা ইসলামের শিক্ষা নয়। সত্য প্রতিষ্ঠার জন্যও শালীনতা বিসর্জন দেওয়া বৈধ নয়। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি অশ্লীলতা ছড়ানো হয় ইন্টারনেটে। অশ্লীল একটি পোস্ট, মন্তব্য বা শেয়ার মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের চিন্তা করা উচিত আমার একটি লাইক, শেয়ার, কমেন্ট ইত্যাদি মানুষের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটাচ্ছে কি না? আমি কি নিজের অজান্তেই শয়তানের কোনো পরিকল্পনার অংশ হয়ে যাচ্ছি?

রাসুল (সা.) বলেন, 'আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোনো খারাপ নিয়মের প্রচলন ঘটাবে, তার জন্য তার গুনাহ তো রয়েছেই, অন্যদিকে সে অনুসারে আমলকারীদের গুনাহও তার জন্য রয়েছে। অবশ্য এর কারণে তাদের গুনাহ বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।' (নাসায়ি, হাদিস : ২৫৫৪)

সুতরাং অশ্লীল শব্দ, অশ্লীল কৌতুক, অশালীন ট্রেন্ড কিংবা নোংরা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার আগে একজন মুমিনের মনে রাখা উচিত কঠিন কিয়ামতের দিনে প্রতিটি শেয়ার, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি শব্দেরও হিসাব দিতে হবে। মহান আল্লাহ সবাইকে এসব থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আল-আজহারের ১০৮৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন | কালের কণ্ঠ