ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম যুগে যুগে জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে। তাঁদেরই অন্যতম হলেন মুহাম্মাদ ইবনে জারির আত-তাবারি। তিনি ছিলেন হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্যসহ ইসলামী জ্ঞানের বহু শাখায় সমান পারদর্শী এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ, জ্ঞানচর্চা এবং আল্লাহভীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে তাঁর অবদান এতই ব্যাপক যে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম হওয়ার পরও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।
শৈশব ও ইলম অন্বেষণে যাত্রা
ইমাম তাবারি (রহ.) ২২৪ হিজরিতে তাবারিস্তানের আমুল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। অল্প বয়সেই তিনি কোরআন হিফজ করেন এবং হাদিস ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন। জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে সফর করে অসংখ্য আলেমের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর এই জ্ঞানসন্ধানী জীবন তাঁকে শেষ পর্যন্ত বাগদাদ শহরে নিয়ে আসে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।
কর্মনিষ্ঠার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত
ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর সময়ের সদ্ব্যবহার। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি টানা চল্লিশ বছর প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা করে লিখেছেন। এ হিসাব অনুযায়ী তাঁর লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছায়। তাঁর কাছে সময় ছিল আল্লাহর এক মহামূল্যবান আমানত। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে জ্ঞানার্জন, গবেষণা, শিক্ষা প্রদান এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করেছেন। আজকের যুগে যখন সামান্য সময় অপচয়ও আমাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, তখন ইমাম তাবারির জীবন আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা তার সময়ের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত।
তাফসির শাস্ত্রে অমর কীর্তি
ইমাম তাবারির শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কোরআন। ইসলামী ইতিহাসে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম তাফসির গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থ রচনার পূর্বে তিনি তিন বছর ধরে ইস্তেখারা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। এরপর আল্লাহর তাওফিকে তিনি এই সুবিশাল তাফসির সংকলন করেন। এ গ্রন্থে তিনি সাহাবি, তাবেয়ি ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত সংগ্রহ করে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আজও বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর এই তাফসির অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।
ইতিহাস রচনায় অনন্য অবদান
ইমাম তাবারির আরেকটি অমর কীর্তি হলো তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক। একদিন তিনি তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি আদম (আ.) থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস লিখতে চাই।’ ছাত্ররা জানতে চাইল, ‘গ্রন্থটি কত বড় হবে?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা।’ এ কথা শুনে ছাত্ররা বলল, ‘এত বড় গ্রন্থ তো মানুষের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই পড়া সম্ভব হবে না!’
তখন ইমাম তাবারী গভীর বেদনার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মহৎ হিম্মতের মৃত্যু ঘটেছে।’এই ঘটনাটি তাঁর দূরদৃষ্টি, সাহসী চিন্তা এবং জ্ঞানের প্রতি অসীম ভালোবাসার পরিচয় বহন করে। পরে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠায় গ্রন্থটি সম্পন্ন করেন। আজও এটি ইসলামের ইতিহাস গবেষণার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত।
আত্মমর্যাদা ও দুনিয়াবিমুখতা
ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। শাসকগোষ্ঠী ও রাজা-বাদশাহরা তাঁকে সম্মান করতেন এবং বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি কখনো এসব গ্রহণ করেননি। তাঁর পিতা যে সামান্য জমিজমা রেখে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি মনে করতেন, জ্ঞানকে দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। এ কারণে তিনি স্বাধীনচেতা ও নির্ভীকভাবে সত্য কথা বলতে পেরেছিলেন।
মৃত্যুশয্যায় জ্ঞান অন্বেষণ
মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর জ্ঞানপিপাসা শেষ হয়নি। ৩১০ হিজরিতে যখন তাঁর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তিনি উপস্থিত একজন ব্যক্তির কাছে একটি দোয়া সম্পর্কে জানতে চান। দোয়াটি শুনে আশ্বস্ত হন। তারপর কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করতে করতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে নশ্বর এই পৃথিবী ত্যাগ করেন।
ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন এক চলমান জ্ঞান-সভ্যতা। তাঁর কলমের কালি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের পথপ্রদর্শক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন মানুষের জীবনকাল সীমিত হলেও তার জ্ঞান, চিন্তা ও কর্মের প্রভাব যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে পারে। এভাবে ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের জীবনে সফল হতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অধ্যবসায়, জ্ঞানসাধনা এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার এক জীবন্ত পাঠ শিক্ষা দেয়।






