• ই-পেপার

রমজান উপলক্ষে ১০২৫ কারাবন্দিকে মুক্তি দিল আমিরাত

ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইমাম তাবারি (রহ.) : জ্ঞান, সাধনা ও কর্মনিষ্ঠার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু মনীষীর আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম যুগে যুগে জ্ঞানপিপাসু মানুষের জন্য প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছে। তাঁদেরই অন্যতম হলেন মুহাম্মাদ ইবনে জারির আত-তাবারি। তিনি ছিলেন হাদিস, তাফসির, ফিকহ, ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্যসহ ইসলামী জ্ঞানের বহু শাখায় সমান পারদর্শী এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ছিল অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ, জ্ঞানচর্চা এবং আল্লাহভীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারে তাঁর অবদান এতই ব্যাপক যে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রম হওয়ার পরও তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

শৈশব ও ইলম অন্বেষণে যাত্রা  
ইমাম তাবারি (রহ.) ২২৪ হিজরিতে তাবারিস্তানের  আমুল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানার্জনের প্রবল আগ্রহ দেখা যায়। অল্প বয়সেই তিনি কোরআন হিফজ করেন এবং হাদিস ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্র অধ্যয়ন শুরু করেন। জ্ঞানের পিপাসা তাঁকে এক শহর থেকে অন্য শহরে, এক দেশ থেকে অন্য দেশে ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জ্ঞানকেন্দ্রে সফর করে অসংখ্য আলেমের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর এই জ্ঞানসন্ধানী জীবন তাঁকে শেষ পর্যন্ত বাগদাদ শহরে নিয়ে আসে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অবস্থান করেন এবং জ্ঞানচর্চা ও গ্রন্থ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন।

কর্মনিষ্ঠার বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত
ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর সময়ের সদ্ব্যবহার। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি টানা চল্লিশ বছর প্রতিদিন গড়ে চল্লিশ পৃষ্ঠা করে লিখেছেন। এ হিসাব অনুযায়ী তাঁর লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছায়। তাঁর কাছে সময় ছিল আল্লাহর এক মহামূল্যবান আমানত। তাই তিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে জ্ঞানার্জন, গবেষণা, শিক্ষা প্রদান এবং গ্রন্থ রচনায় ব্যয় করেছেন। আজকের যুগে যখন সামান্য সময় অপচয়ও আমাদের কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় না, তখন ইমাম তাবারির জীবন আমাদের শেখায় যে মানুষের প্রকৃত সফলতা তার সময়ের সঠিক ব্যবহারের মধ্যেই নিহিত।

তাফসির শাস্ত্রে অমর কীর্তি
ইমাম তাবারির শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘জামিউল বায়ান ফি তাবিলিল কোরআন। ইসলামী ইতিহাসে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং প্রাচীনতম তাফসির গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থ রচনার পূর্বে তিনি তিন বছর ধরে ইস্তেখারা করেছেন এবং আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। এরপর আল্লাহর তাওফিকে তিনি এই সুবিশাল তাফসির সংকলন করেন। এ গ্রন্থে তিনি সাহাবি, তাবেয়ি ও পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের মতামত সংগ্রহ করে গভীর বিশ্লেষণের মাধ্যমে কোরআনের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। আজও বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে তাঁর এই তাফসির অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়।

ইতিহাস রচনায় অনন্য অবদান
ইমাম তাবারির আরেকটি অমর কীর্তি হলো তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ তারিখুর রাসুল ওয়াল মুলুক। একদিন তিনি তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি আদম (আ.) থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাস লিখতে চাই।’ ছাত্ররা জানতে চাইল, ‘গ্রন্থটি কত বড় হবে?’ তিনি বললেন, ‘প্রায় ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা।’ এ কথা শুনে ছাত্ররা বলল, ‘এত বড় গ্রন্থ তো মানুষের আয়ু শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই পড়া সম্ভব হবে না!’

তখন ইমাম তাবারী গভীর বেদনার সঙ্গে বলেছিলেন, ‘মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও মহৎ হিম্মতের মৃত্যু ঘটেছে।’এই ঘটনাটি তাঁর দূরদৃষ্টি, সাহসী চিন্তা এবং জ্ঞানের প্রতি অসীম ভালোবাসার পরিচয় বহন করে। পরে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠায় গ্রন্থটি সম্পন্ন করেন। আজও এটি ইসলামের ইতিহাস গবেষণার অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে স্বীকৃত।

আত্মমর্যাদা ও দুনিয়াবিমুখতা
ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাশীল ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। শাসকগোষ্ঠী ও রাজা-বাদশাহরা তাঁকে সম্মান করতেন এবং বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করতে চাইতেন। কিন্তু তিনি কখনো এসব গ্রহণ করেননি। তাঁর পিতা যে সামান্য জমিজমা রেখে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি মনে করতেন, জ্ঞানকে দুনিয়াবি স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। এ কারণে তিনি স্বাধীনচেতা ও নির্ভীকভাবে সত্য কথা বলতে পেরেছিলেন।

মৃত্যুশয্যায় জ্ঞান অন্বেষণ
মৃত্যুশয্যাতেও তাঁর জ্ঞানপিপাসা শেষ হয়নি। ৩১০ হিজরিতে যখন তাঁর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তিনি উপস্থিত একজন ব্যক্তির কাছে একটি দোয়া সম্পর্কে জানতে চান। দোয়াটি শুনে আশ্বস্ত হন। তারপর কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করতে করতে মহান রবের ডাকে সাড়া দিয়ে নশ্বর এই পৃথিবী ত্যাগ করেন।

ইমাম তাবারি (রহ.) ছিলেন এক চলমান জ্ঞান-সভ্যতা। তাঁর কলমের কালি আজও লক্ষ লক্ষ মানুষের পথপ্রদর্শক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, একজন মানুষের জীবনকাল সীমিত হলেও তার জ্ঞান, চিন্তা ও কর্মের প্রভাব যুগের পর যুগ বেঁচে থাকতে পারে। এভাবে ইমাম তাবারি (রহ.)-এর জীবন আমাদের জীবনে সফল হতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অধ্যবসায়, জ্ঞানসাধনা এবং আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতার এক জীবন্ত পাঠ শিক্ষা দেয়।

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার উপায়

মুফতি ওমর বিন নাছির
আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার উপায়
সংগৃহীত ছবি

প্রত্যেক মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য হলো মহান আল্লাহ তাআলার প্রিয়পাত্র হওয়া। দুনিয়ার মানুষের ভালোবাসা সীমিত, স্বার্থনির্ভর এবং ক্ষণস্থায়ী; কিন্তু আল্লাহর ভালোবাসা চিরস্থায়ী, কল্যাণময় এবং মুক্তির নিশ্চয়তা প্রদানকারী। যে বান্দাকে আল্লাহ ভালোবাসেন, তার জীবন বরকতময় হয়, তার অন্তরে প্রশান্তি নেমে আসে, তার দোয়া কবুল হয় এবং আখিরাতে তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ থাকে। আর আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পথ শুরু হয় আন্তরিক তাওবা, আত্মশুদ্ধি এবং জীবন সংশোধনের মাধ্যমে। মানুষ ভুল করবে, গুনাহে জড়িয়ে পড়বে—এটাই মানবীয় দুর্বলতা। কিন্তু প্রকৃত সৌভাগ্যবান সে, যে ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর দরবারে ফিরে আসে এবং নিজের জীবনকে তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী গড়ে তোলে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে যারা এরপর তাওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে, তাহলে আল্লাহ তো অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : নুর : আয়াত : ৫)

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার পাঁচ আমল 

১. আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা : আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়ার প্রথম শর্ত হলো আন্তরিক তাওবা। তাওবা শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; বরং হৃদয়ের গভীর অনুতাপ, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে অগ্রসর হওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার। মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে তাওবা করে, সে এমন ব্যক্তির মতো যার কোনো গুনাহই নেই।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং : ৪২৫০)

অতএব, অতীতের ভুলে হতাশ না হয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে আসাই মুমিনের কর্তব্য।

২. আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র সংশোধন করা : আল্লাহ তাআলা শুধু তাওবার কথা বলেননি; বরং বলেছেন—‘যারা নিজেদের সংশোধন করে।’ প্রকৃত তাওবার প্রমাণ হলো জীবনের পরিবর্তন। নামাজে যত্নশীল হওয়া, হারাম কাজ বর্জন করা, মানুষের হক আদায় করা, চরিত্র সুন্দর করা এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে চলাই হলো আত্মসংশোধনের নিদর্শন। আল্লাহ সেই বান্দাকে ভালোবাসেন, যে প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করে।

৩. আল্লাহর আদেশ মেনে চলা ও নিষেধ থেকে বিরত থাকা : আল্লাহর ভালোবাসা লাভের অন্যতম উপায় হলো তাঁর আনুগত্য করা। যারা আল্লাহর আদেশ পালন করে এবং হারাম থেকে দূরে থাকে, আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৪)


৪. নিয়মিত নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা : ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি নফল নামাজ, তাহাজ্জুদ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির এবং দান-সদকা বান্দাকে আল্লাহর আরো নিকটবর্তী করে। হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, ‘আমার বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার এত নিকটবর্তী হয় যে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৬৫০২)

৫. কখনো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়া : শয়তানের অন্যতম কৌশল হলো মানুষকে হতাশ করে দেওয়া। কিন্তু মুমিন জানে, আল্লাহর রহমত তার সকল গুনাহের চেয়ে বড়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।’ (সুরা : জুমার, আয়াত : ৫৩)

আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া কোনো অসম্ভব বিষয় নয়; বরং এটি প্রত্যেক মুমিনের জন্য উন্মুক্ত একটি পথ। এই পথের সূচনা হয় আন্তরিক তাওবা দিয়ে, আর তা পরিপূর্ণ হয় আত্মশুদ্ধি, তাকওয়া, ইবাদত, উত্তম চরিত্র এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আনুগত্যের মাধ্যমে। মানুষ যত বড় গুনাহগারই হোক না কেন, যদি সে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে এবং নিজের জীবনকে সংশোধন করে, তবে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন, ভালোবাসেন এবং তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দেন।

অতএব, আমাদের প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি কি আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে আছি? আমি কি আমার ভুলগুলো সংশোধনের চেষ্টা করছি? যদি আমরা আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, তাহলে তিনিই আমাদের হাত ধরে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাবেন। কারণ তিনি ‘অতিশয় ক্ষমাশীল’ এবং ‘পরম দয়ালু’। তাঁর ভালোবাসাই একজন মুমিনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন এবং আখিরাতের সর্বোচ্চ সফলতা বয়ে আনে।
 

মা-বাবার জন্য সন্তানের পঠিতব্য তিনটি দোয়া

মুফতি ওমর বিন নাছির
মা-বাবার জন্য সন্তানের পঠিতব্য তিনটি দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মা-বাবার জন্য সন্তানের দোয়া সবচেয়ে বড় নেক আমল। জীবত বা মৃত—উভয় অবস্থাতেই সন্তানের দোয়া বাবা-মায়ের নাজাত ও ক্ষমার উসিলা হতে পারে। বাবা-মায়ের জন্য পবিত্র কোরআনে বর্ণিত সবচেয়ে সুন্দর ও বহুল পঠিত কিছু দোয়া নিচে দেওয়া হলো-

১. মা-বাবার জন্য রহমতের দোয়া 

 رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا

উচ্চারণ : রাব্বির হাম হুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা।
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি তাঁদের উভয়ের প্রতি রহম করুন, যেভাবে তাঁরা আমাকে শৈশবে সযতনে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা : বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৪)

আরো পড়ুন
হজের শিক্ষা ও পরবর্তী জীবন

হজের শিক্ষা ও পরবর্তী জীবন

 

২. মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া

 رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ

উচ্চারণ : রব্বানাগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া, ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াক্বুমুল হিসাব।
অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আপনি রোজ হাশরের দিন আমাকে, আমার মাতা-পিতা ও সকল মুমিনদের ক্ষমা করে দিন।’(সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আরো পড়ুন
কোরবানির মাংস সংরক্ষণের বিধান

কোরবানির মাংস সংরক্ষণের বিধান

 

৩. নিজেদের ও মা-বাবার জন্য ব্যাপক দোয়া

 رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَنْ دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ

উচ্চারণ : রাব্বিগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া, ওয়া লিমান দাখালা বাইতিয়া মুমিনান, ওয়ালিল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাত।
অর্থ : ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে মুমিন অবস্থায় প্রবেশ করবে তাকে এবং সকল মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করুন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ২৮)

সন্তান হিসেবে মা-বাবার প্রতি আমাদের নেক আমল এবং দোয়াই তাদের প্রশান্তির মাধ্যম হবে। দোয়ার পাশাপাশি তাদের পক্ষ থেকে দান-সদকা (সাদকা-ই জারিয়া) করা, হজ বা ওমরাহ করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তাদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।

হাদিসের বাণী

আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষায় মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা সবকিছু সৃষ্টির করার পর ‘রেহেম’ তথা আত্মীয়তার বন্ধন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, (হে আল্লাহ) আমি দাঁড়িয়েছি, (দুনিয়াতে) আমার থেকে যেন কেউ বিচ্ছিন্ন না হয়, সেই আশ্রয় কামনা করছি। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, হ্যাঁ, তুমি এতে খুশি নও যে, তোমার সঙ্গে যে সম্পর্ক বজায় রাখবে, আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব। তখন রেহেম বলল, অবশ্যই। তখন আল্লাহ তাআলা বললেন, তাহলে এই অধিকার তোমাকে দেওয়া হলো। এরপরে মহানবী (সা.) বললেন, তোমরা চাইলে এই আয়াতটি তিলাওয়াত করতে পারো, ‘ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে হয়তো তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। ওরা তো তারা, যাদের আল্লাহ অভিশপ্ত করে বধির ও দৃষ্টিশক্তিহীন করে দেন।’ (সুরা : মুহাম্মাদ, আয়াত : ২২-২৩)

অন্য বর্ণনায় আছে, যে আত্মীয়তার বন্ধন ঠিক রাখবে, আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখব। আর যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে, আমি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করব। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৯৮৭, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬৫১৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ৮৩৬৭)

শিক্ষা ও বিধান

১. আত্মীয়তার সম্পর্ক ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা আত্মীয়তার বন্ধনকে এত মর্যাদা দিয়েছেন যে, এর হেফাজতের ব্যাপারে তিনি বিশেষ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; বরং ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও বটে।

২. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের অন্যতম মাধ্যম যে ব্যক্তি আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে, তাদের খোঁজখবর নেয় এবং প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়ায়, আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত বর্ষণ করেন।

৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, আল্লাহও তার থেকে রহমত ও বিশেষ অনুগ্রহ প্রত্যাহার করেন। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ সতর্কবার্তা।

৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে। আত্মীয়দের মধ্যে বিচ্ছেদ, হিংসা, বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব সমাজে ফিতনা ও বিপর্যয়ের কারণ হয়। তাই ইসলাম পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার নির্দেশ দিয়েছে।

৫. আত্মীয়দের প্রতি সদাচরণ মুমিনের বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত মুমিন আত্মীয়দের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করে, তাদের দুঃখে-সুখে পাশে থাকে এবং সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে।

৬. সম্পর্ক রক্ষায় একতরফা উদ্যোগও প্রশংসনীয় আত্মীয়রা সম্পর্ক না রাখলেও একজন মুসলিমের উচিত সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা এবং সালাম, খোঁজখবর ও সহযোগিতার মাধ্যমে বন্ধন অটুট রাখা।

এক কথায় এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। পক্ষান্তরে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা আল্লাহর অসন্তুষ্টি, অভিশাপ এবং রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের খোঁজখবর নেওয়া এবং সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করা।