• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৮ ‍জুলাই, ২০২৬

ইসলামের দৃষ্টিতে

শিশুর জেদ : কারণ ও প্রতিকার

আতাউর রহমান খসরু
শিশুর জেদ : কারণ ও প্রতিকার
সংগৃহীত ছবি

শিশুর জেদ মা-বাবার বড় দুশ্চিন্তার কারণ। মা-বাবা ও অভিভাবক না সহ্য করতে পারেন শিশুর অযৌক্তিক জেদ, না পারেন তাকে কঠোরভাবে শাসন করতে। ফলে কখনো তারা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেন। আবার কখনো তাদের অতি কঠোরতায় বখে যায় আদরের সন্তান। ইসলাম সর্বাবস্থায় শিশুর প্রতি কোমল আচরণের পরামর্শ দেয়। শিশু জেদি হলে তার প্রতিপালনে বাস্তবমুখী আচরণ ও মধ্যপন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়।

 শিশু জেদি হয় কেন

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশু জেদি হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, বরং পারিপার্শ্বিক কারণে তারা জেদি হয়। জেদি শিশুর সঙ্গে যথোপযুক্ত আচরণ করতে চাইলে প্রথমেই এসব কারণ বুঝতে হবে। চিকিৎসক, গবেষক ও প্রাজ্ঞ লোকেরা শিশুর জেদের কিছু কারণ বর্ণনা করেন। তা হলো—

১. স্বভাবজাত কারণ : শিশুর কিছু কিছু জেদ স্বভাবজাত। শিশুদের ভাষা ও অভিব্যক্তি প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকায় তারা কখনো কখনো জেদকে ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। যেমন মা-বাবা বা অভিভাবকরা শিশুর প্রতি মনোযোগী না হলে, তাকে অবহেলা বা উপেক্ষা করলে শিশু জেদ দেখাতে পারে। কখনো ভয় পাচ্ছে এমন কাজ তার ওপর চাপিয়ে দিলেও শিশু জেদ দেখাতে পারে।

২. প্রতিপালনের ত্রুটি : মা-বাবা ও অভিভাবকদের ভুল প্রতিপালন, আচরণ ও শাসনের কারণেও শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে। যেমন—শিশুর প্রতি কথায় কথায় রাগ প্রকাশ করলে, বড়রা পরস্পরের প্রতি বেশি জেদ দেখালে, শিশুর যৌক্তিক দাবি প্রত্যাখ্যান করলে, পরিবারে সে বৈষম্য ও অবিচারের শিকার হলে শিশু জেদি হয়ে উঠতে পারে।

৩. পরিবেশগত কারণ : শিশু মন্দ সঙ্গ ও পরিবেশের কারণেও জেদি হয়ে উঠতে পারে। সে যদি তার কোনো বন্ধু বা খেলার সাথিকে জেদ দেখাতে এবং তা দেখিয়ে দাবি আদায় করতে দেখে তাতে তার ভেতরও জেদ প্রকাশের প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

৪. স্বাস্থ্যগত কারণ : চিকিৎসকরা বলেন, জেনেটিক বা পরিবেশগত কারণের বাইরেও স্বাস্থ্যগত ত্রুটির কারণেও শিশুর অতিরিক্ত জেদ হতে পারে। যেমন—শিশুর এপিলেপসি (খিঁচুনির) বা এডিএইচডির সমস্যা থাকলে শিশুরা অতিরিক্ত জেদ দেখাতে পারে।

জেদি শিশুর প্রতি আচরণ

ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুর বোধ-বুদ্ধি পরিপক্ব হওয়া পর্যন্ত তার সব কথা, কাজ ও আচরণ ক্ষমার যোগ্য। তাই যে শিশু ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝে না তার প্রতি ধৈর্য ও সহনশীলতা প্রদর্শন এবং কোমল আচরণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর যে শিশু বুঝমান তার প্রতি স্নেহ ও অকঠোর শাসনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিম্নে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা হলো—

১. স্নেহ ও মমতা প্রদর্শন : শিশু জেদি হলেও ইসলাম তার প্রতি কোমল ও স্নেহের আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে ছোটকে স্নেহ ও বড়কে সম্মান করে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৪৩)

২. ধৈর্য ও সহনশীলতা : ইসলাম শিশুর প্রতি সর্বোচ্চ সহনশীল আচরণের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে এর অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বীয় কন্যা জয়নব (রা.)-এর মেয়ে উমামাকে কোলে নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। তিনি যখন সিজদা করতেন তাকে নামিয়ে রাখতেন এবং যখন দাঁড়াতেন কোলে তুলে নিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৬)

৩. উত্তম আচরণ ও পরিবেশ : শিশুরা অনুকরণপ্রিয়, তারা চারপাশের মানুষগুলো থেকে আচরণ শেখে। তাই শিশুর সঙ্গে এবং তার উপস্থিতিতে তেমন আচরণ করা উচিত যেমন তার কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়। এটা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কর্মকৌশল ছিল। পবিত্র কোআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলের জীবনে তোমাদের জন্য আছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২১)

৪. সন্তানদের ভেতর ইনসাফ : পারিবারিক জুলুম, অবিচার ও অবহেলা শিশুকে জেদি ও এক রোখা করে তুলতে পারে। তাই ইসলাম সন্তানদের ভেতর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের ভেতর ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৮৭)

৫. ভালো কাজের প্রশংসা : শিশুরা প্রশংসা শুনতে পছন্দ করে। তাই সে কোনো ভালো করলে তার প্রশংসা করা এবং উৎসাহ দেওয়া উচিত। এতে তার ভেতর ইতিবাচক মানসিকতা গড়ে উঠবে। পবিত্র কোরআনে মুমিনদের ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ করে দেবেন এবং তাকে ধারণাতীত উৎস থেকে দান করবেন জীবিকা।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩)

৬. জেদের বিপরীতে জেদ নয় : অনেক সময় মা-বাবা ও অভিভাবক সন্তানের সঙ্গে জেদাজেদিতে লিপ্ত হন। এটা অনুচিত ও অগ্রহণযোগ্য। কেননা অবুঝ শিশু ও অভিভাবক কখনো সমান নয়। ইসলামের শিক্ষা হলো মন্দের পরিবর্তে ভালো। অর্থাৎ শিশু জেদ দেখালে অভিভাবক তাকে যুক্তি ও উপদেশের মাধ্যমে বোঝাবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো উত্কৃষ্ট দ্বারা, ফলে তোমার সঙ্গে যার শত্রুতা আছে, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো।’ (সুরা : হা-মিম-সাজদা, আয়াত : ৩৪)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোমলতা যেকোনো বিষয়কে সুন্দর করে এবং তা ত্যাগ করলে যেকোনো বিষয় কদর্য হয়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৭৮)

৭. ন্যায়সংগত শাসন : ইসলাম শিশুর সঙ্গে প্রথমে কোমল আচরণের নির্দেশ দেয়। কিন্তু শিশুর সংশোধন না হলে ন্যায়সংগত শাসনের অনুমতি দেয়। তা হলো শিশুর বয়স, পরিপক্বতা ও অবাধ্যতার মাত্রা বিবেচনা করে অকঠোর শাসন ও শাস্তি প্রদান করা। শাস্তি শুধু শারীরিক আঘাত নয়, বরং ভর্ৎসনা ও তিরস্কারও শাসন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং ১০ বছর হলে তাদেরকে নামাজের জন্য প্রহার কোরো। আর বিছানায় তাদের মধ্যে দূরত্ব রাখো।’(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৫)

৮. প্রয়োজনে চিকিৎসা : শিশুর জেদকে সব সময় স্বভাবজাত ও বংশগত বিষয় ভাবা উচিত নয়। শিশু অতিরিক্ত জেদ দেখালে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তার নিয়মিত চিকিৎসা করতে হবে। ইসলাম প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক রোগের প্রতিষেধক আছে। রোগী যখন সঠিক প্রতিষেধক লাভ করে তখন আল্লাহর নির্দেশে সে আরোগ্য লাভ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২০৪)

শিশুর জেদ সামলানোর উপায়

অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রাজ্ঞ আলেমরা জেদি শিশুকে সামলাতে নিম্নের পরামর্শগুলো দেন—

১. শিশুর প্রয়োজন ও আবেগ বুঝতে চেষ্টা করুন। তার কথা ও মতামতকে গুরুত্ব দিন।

২. শিশুর ভাষা ও অভিব্যক্তিগুলো পর্যালোচনা করুন। যেন জেদ দেখানোর আগেই তার সমস্যার সমাধান করা যায়।

৩. শিশুর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করুন। তার প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করুন। অহেতুক সমালোচনা পরিহার করুন।

৪. শিশুর প্রতি কার্পণ্যহীন ভালোবাসা প্রকাশ করুন। সাধারণত শিশুরা স্নেহ ও ভালোবাসা লাভে আগ্রহী হয়ে থাকে।

৫. শিশুর কাজের সীমা নির্ধারণ করে দিন। নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত তাকে স্বাধীনতা দিন। প্রয়োজনে ধীরে ধীরে তা সংকুচিত করুন।

৬. জেদের সময় শিশুকে অবকাশ দিন। জেদ কমে এলে তাকে স্নেহ, মমতা ও যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে বলুন।

৭. যথাসম্ভব শারীরিক শাস্তি পরিহার করুন।

সর্বোপরি আল্লাহর কাছে অধিক পরিমাণে দোয়া করুন। কেননা যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর ইচ্ছাই চূড়ান্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ দোয়া শিখিয়েছেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য এমন স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দান করো, যারা হবে আমাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর এবং আমাদেরকে করো মুত্তাকিদের জন্য অনুসরণযোগ্য।’ (সুরা : ফোরকান, আয়াত : ৭৪)

আল্লাহ সন্তানের ব্যাপারে সব মা-বাবার দুশ্চিন্তা দূর করে দিন। আমিন।

হাদিসের বাণী

যে হাদিস মুসলিম জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে হাদিস মুসলিম জীবনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর পরনে ছিল অত্যন্ত সাদা-পরিচ্ছন্ন পোশাক, মাথার চুল ছিল ঘন কালো। অথচ তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না এবং উপস্থিত সাহাবিদের কেউই তাঁকে চিনতে পারছিলেন না।

তিনি মহানবী (সা.)-এর একেবারে নিকটে এসে বসলেন। নিজের দুই হাঁটু নবীজি (সা.)-এর দুই হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন এবং দুই হাত তাঁর ঊরুর ওপর রেখে অত্যন্ত ভদ্র ও মনোযোগী ভঙ্গিতে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ইসলাম হলো—তুমি সাক্ষ্য দেবে যে আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে এবং সামর্থ্য থাকলে বায়তুল্লাহর হজ সম্পন্ন করবে।’

লোকটি বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ ওমর (রা.) বলেন, আমরা বিস্মিত হলাম—তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার তিনিই উত্তরের সত্যতাও স্বীকার করছেন! এরপর তিনি বললেন, ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ঈমান হলো—আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলদের প্রতি, আখিরাতের প্রতি এবং তাকদিরের ভালো-মন্দ—সব কিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে—এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।’

তিনি আবার বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ইহসান হলো—তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পারো, তবে অন্তত এ বিশ্বাস রাখবে যে তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন।’ পরে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এ বিষয়ে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।’

অতঃপর তিনি বললেন, ‘তাহলে কিয়ামতের কিছু আলামত সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘দাসী তার প্রভুর জননী হবে এবং তুমি দেখতে পাবে—খালি পায়ে চলা, অর্ধনগ্ন, দরিদ্র মেষপালকেরা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এরপর লোকটি চলে গেলেন। ওমর (রা.) বলেন, আমি কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে ওমর! তুমি কি জানো, প্রশ্নকারী ব্যক্তি কে ছিলেন?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সর্বাধিক অবগত।’ তখন তিনি বললেন, ‘তিনি ছিলেন জিবরাইল (আ.)। তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের দ্বিন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

শিক্ষা
এই বিশেষ হাদিসটি ‘হাদিসে জিবরাইল’ নামে প্রসিদ্ধ। এতে ইসলামের তিনটি মৌলিক ভিত্তি—ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি কিয়ামত সম্পর্কে মানুষের সীমিত জ্ঞানের কথা এবং তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামতও তুলে ধরা হয়েছে। তাই আলেমরা এই হাদিসকে ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূলক হাদিস হিসেবে গণ্য করেছেন।
 

অফুরন্ত রিজিক লাভে যে সুরা নিয়মিত পড়বেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
অফুরন্ত রিজিক লাভে যে সুরা নিয়মিত পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

রিজিক মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। জীবিকার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আজ বহু মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অভাব কখনো মানুষকে হতাশ করে, কখনো ভুল পথে পরিচালিত করে। অথচ একজন মুমিন জানেন, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা অগণিত রিজিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা হিসেবে রিজিক সংকুচিত করেন। তাই প্রকৃত মুমিন রিজিকের জন্য হারাম পথ অবলম্বন না করে আল্লাহর দরবারে ফিরে যায়, দোয়া করে, ইস্তিগফার করে এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী আমল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২–৩)
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, রিজিকের নিশ্চয়তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই তাঁর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলাই একজন মুমিনের কর্তব্য।

সুরা ওয়াকিয়া পাঠের ফজিলত
বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।’ (ইমাম বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮)

ইবনে মাসউদ (রা.)-এর শিক্ষণীয় ঘটনা
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তখন খলিফা হজরত উসমান (রা.) তাঁকে দেখতে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি কোনো কষ্ট?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আমার পাপই আমার কষ্ট।’ উসমান (রা.) বললেন, ‘আপনি কী চান? তিনি বললেন, "আমি আমার রবের রহমত চাই।’ খলিফা উসমান (রা.) সরকারি কোষাগার থেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। যখন বলা হলো, ‘এটি আপনার কন্যাদের উপকারে আসবে’, তখন তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার কন্যাদের নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ আমি তাদের নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে, সে দারিদ্র্যে পতিত হবে না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮, তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)

সন্তানদের সুরা ওয়াকিয়া শিক্ষা দেওয়া
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুরা ওয়াকিয়া প্রাচুর্যের সুরা। অতএব তোমরা এটি পাঠ করো এবং তোমাদের সন্তানদেরও শিক্ষা দাও।’ (আদ-দুররুল মানসুর, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৭৩)

সুরা ওয়াকিয়ার মূল শিক্ষা
সুরা ওয়াকিয়া শুধু দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুরা নয়; বরং এটি মানুষের সামনে আখিরাতের বাস্তবতা, কিয়ামতের ভয়াবহতা, জান্নাতিদের পুরস্কার, জাহান্নামিদের শাস্তি এবং আল্লাহর অসীম কুদরতের বর্ণনা তুলে ধরে। এ সুরা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়— প্রকৃত সফলতা কেবল দুনিয়ার সম্পদে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।

রিজিক বরকত লাভে করণীয়
রিজিকে বরকত লাভের জন্য সুরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আরো করণীয় হলো-

১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা।
৩. হালাল উপার্জনে সচেষ্ট হওয়া।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
৫. দান-সদকা করা।
৬. প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করা, বিশেষ করে সুরা ওয়াকিয়া পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৭. সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা।

মনে রাখতে হবে, রিজিকের প্রকৃত নিশ্চয়তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। কোরআন তিলাওয়াত, তাকওয়া, ইস্তিগফার, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই একজন মুমিনের জীবনে রিজিকে বরকত ও প্রশান্তির প্রকৃত চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং হালাল ও বরকতময় রিজিক অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

রাসুলের পরে শ্রেষ্ঠ যারা

মুফতি ওমর বিন নাছির
রাসুলের পরে শ্রেষ্ঠ যারা
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন এক সৌভাগ্যবান প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা সরাসরি মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাঁরা নবীর শিক্ষা, আদর্শ ও চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করে ইসলামের আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, ইবাদত, জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর পথে আত্মোৎসর্গ মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন আদর্শ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বহু ঘোষণা এসেছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের জীবন জানা এবং তাঁদের অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাহাবি কারা?
'সাহাবি' শব্দটি আরবি ‘সাহাবা’ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ—সঙ্গী, সহচর, বন্ধু বা সাহচর্যে অবস্থানকারী। ইসলামি পরিভাষায়, যিনি ঈমানসহ মহানবী (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই সাহাবি। এ সংজ্ঞাই হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা-এ উল্লেখ করেছেন। 

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবি
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় দশজন সাহাবিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা ইতিহাসে আশারায়ে মুবাশশারা নামে পরিচিত। তারা হলেন-

১. আবু বকর সিদ্দিক (রা.)
পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবি কুহাফা। তিনি সর্বপ্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম এবং ইসলামের প্রথম খলিফা। মিরাজের ঘটনাকে নিঃসংশয়ে সত্য বলে বিশ্বাস করায় তিনি 'সিদ্দিক' উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পিতা এবং মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে সমাহিত হওয়ার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেন।

২. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)
তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল প্রতীক। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে তিনি 'ফারুক' উপাধি লাভ করেন। তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্র অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর পিতা।

৩. উসমান ইবনে আফফান (রা.)
ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি রাসুল (সা.)-এর দুই কন্যা—রুকাইয়া (রা.) ও পরে উম্মে কুলসুম (রা.)-কে বিবাহ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এজন্য তিনি 'জুন-নুরাইন' (দুই নূরের অধিকারী) নামে পরিচিত। তাঁর যুগে পবিত্র কোরআন একক মুসহাফে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়।

৪. আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)
রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই, জামাতা এবং চতুর্থ খলিফা। তিনি শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাহস, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত।

৫. তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)
প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। উহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.)-কে রক্ষা করতে গিয়ে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

৬. জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)
রাসুল (সা.)-এর ফুফাতো ভাই এবং হাওয়ারি (বিশেষ সাহায্যকারী) হিসেবে পরিচিত। ইসলাম গ্রহণের পর কঠোর নির্যাতন সহ্য করেও তিনি ঈমানে অটল ছিলেন।

৭. আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)
অসাধারণ সফল ব্যবসায়ী এবং ইসলামের অন্যতম মহান দানশীল ব্যক্তি। তিনি ইসলামের জন্য বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছেন।

৮. সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)
তিনি ছিলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর সেনাপতি। তাঁর নেতৃত্বে কাদিসিয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধে পারস্য সাম্রাজ্য পরাজিত হয়।

৯. সাঈদ ইবনে জায়িদ (রা.)
তিনি প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের একজন এবং খলিফা ওমর (রা.)-এর ভগ্নিপতি ছিলেন। তাঁর জীবন ঈমান ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১০. আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে 'এই উম্মতের আমিন' (বিশ্বস্ত ব্যক্তি) বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ছিলেন।

সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিগণ
সাহাবায়ে কেরাম শুধু ইসলামের প্রচারই করেননি; তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস সংরক্ষণেও অমূল্য অবদান রেখেছেন।

১. আবু হুরাইরা (রা.) — ৫,৩৭৪টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
২. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) — ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৩. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) — ১,৬৬০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। 
৪. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) — ১,৬৩০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৫. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) — ১,৫৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।।

তাঁদের বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমেই আজ মুসলিম উম্মাহ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, ইবাদত, আখলাক ও সুন্নাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছে।

সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন মানবজাতির সর্বোত্তম প্রজন্ম। তাঁরা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও সর্বস্ব আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়, চরিত্র ছিল নির্মল এবং জীবন ছিল কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বর্তমান যুগের মুসলমান যদি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সফল হতে চায়, তবে সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ অনুসরণ করার বিকল্প নেই। তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁদের আদর্শকে জীবনে ধারণ করাই একজন মুমিনের ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ করে ঈমানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।