রিজিক মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। জীবিকার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আজ বহু মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অভাব কখনো মানুষকে হতাশ করে, কখনো ভুল পথে পরিচালিত করে। অথচ একজন মুমিন জানেন, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা অগণিত রিজিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা হিসেবে রিজিক সংকুচিত করেন। তাই প্রকৃত মুমিন রিজিকের জন্য হারাম পথ অবলম্বন না করে আল্লাহর দরবারে ফিরে যায়, দোয়া করে, ইস্তিগফার করে এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী আমল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২–৩)
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, রিজিকের নিশ্চয়তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই তাঁর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলাই একজন মুমিনের কর্তব্য।
সুরা ওয়াকিয়া পাঠের ফজিলত
বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।’ (ইমাম বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮)
ইবনে মাসউদ (রা.)-এর শিক্ষণীয় ঘটনা
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তখন খলিফা হজরত উসমান (রা.) তাঁকে দেখতে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি কোনো কষ্ট?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আমার পাপই আমার কষ্ট।’ উসমান (রা.) বললেন, ‘আপনি কী চান? তিনি বললেন, "আমি আমার রবের রহমত চাই।’ খলিফা উসমান (রা.) সরকারি কোষাগার থেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। যখন বলা হলো, ‘এটি আপনার কন্যাদের উপকারে আসবে’, তখন তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার কন্যাদের নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ আমি তাদের নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে, সে দারিদ্র্যে পতিত হবে না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮, তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)
সন্তানদের সুরা ওয়াকিয়া শিক্ষা দেওয়া
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুরা ওয়াকিয়া প্রাচুর্যের সুরা। অতএব তোমরা এটি পাঠ করো এবং তোমাদের সন্তানদেরও শিক্ষা দাও।’ (আদ-দুররুল মানসুর, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৭৩)
সুরা ওয়াকিয়ার মূল শিক্ষা
সুরা ওয়াকিয়া শুধু দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুরা নয়; বরং এটি মানুষের সামনে আখিরাতের বাস্তবতা, কিয়ামতের ভয়াবহতা, জান্নাতিদের পুরস্কার, জাহান্নামিদের শাস্তি এবং আল্লাহর অসীম কুদরতের বর্ণনা তুলে ধরে। এ সুরা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়— প্রকৃত সফলতা কেবল দুনিয়ার সম্পদে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।
রিজিক বরকত লাভে করণীয়
রিজিকে বরকত লাভের জন্য সুরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আরো করণীয় হলো-
১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা।
৩. হালাল উপার্জনে সচেষ্ট হওয়া।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
৫. দান-সদকা করা।
৬. প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করা, বিশেষ করে সুরা ওয়াকিয়া পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৭. সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা।
মনে রাখতে হবে, রিজিকের প্রকৃত নিশ্চয়তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। কোরআন তিলাওয়াত, তাকওয়া, ইস্তিগফার, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই একজন মুমিনের জীবনে রিজিকে বরকত ও প্রশান্তির প্রকৃত চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং হালাল ও বরকতময় রিজিক অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।




