• ই-পেপার

সংকটময় জীবন থেকে পরিত্রাণের দোয়া

হাদিসের বাণী

যে হাদিস সাহাবারা জিবরাইল (আ.)-থেকে শুনেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে হাদিস সাহাবারা জিবরাইল (আ.)-থেকে শুনেছেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর পরনে ছিল অত্যন্ত সাদা-পরিচ্ছন্ন পোশাক, মাথার চুল ছিল ঘন কালো। অথচ তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না এবং উপস্থিত সাহাবিদের কেউই তাঁকে চিনতে পারছিলেন না।

তিনি মহানবী (সা.)-এর একেবারে নিকটে এসে বসলেন। নিজের দুই হাঁটু নবীজি (সা.)-এর দুই হাঁটুর সঙ্গে মিলিয়ে দিলেন এবং দুই হাত তাঁর উরুর ওপর রেখে অত্যন্ত ভদ্র ও মনোযোগী ভঙ্গিতে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ইসলাম হলো— তুমি সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল। তুমি সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, জাকাত আদায় করবে, রমজানের রোজা পালন করবে এবং সামর্থ্য থাকলে বায়তুল্লাহর হজ সম্পন্ন করবে।’

লোকটি বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ ওমর (রা.) বলেন, আমরা বিস্মিত হলাম—তিনি নিজেই প্রশ্ন করছেন, আবার তিনিই উত্তরের সত্যতাও স্বীকার করছেন! এরপর তিনি বললেন, ‘আমাকে ঈমান সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ঈমান হলো—আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলদের প্রতি, আখিরাতের প্রতি এবং তাকদিরের ভালো-মন্দ—সবকিছু আল্লাহর পক্ষ থেকে—এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা।’

তিনি আবার বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ এরপর তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাকে ইহসান সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘ইহসান হলো—তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পারো, তবে অন্তত এ বিশ্বাস রাখবে যে, তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন।’ পরে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এ বিষয়ে যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে, সে প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।’

অতঃপর তিনি বললেন, ‘তাহলে কিয়ামতের কিছু আলামত সম্পর্কে জানান।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘দাসী তার প্রভুর জননী হবে এবং তুমি দেখতে পাবে—খালি পায়ে চলা, অর্ধনগ্ন, দরিদ্র মেষপালকেরা সুউচ্চ অট্টালিকা নির্মাণে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে। এরপর লোকটি চলে গেলেন। ওমর (রা.) বলেন, আমি কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করলাম। পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে ওমর! তুমি কি জানো, প্রশ্নকারী ব্যক্তি কে ছিলেন?’ আমি বললাম, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই সর্বাধিক অবগত।’ তখন তিনি বললেন, ‘তিনি ছিলেন জিবরাইল (আ.)। তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

শিক্ষা
এই বিশেষ হাদিসটি 'হাদিসে জিবরাইল' নামে প্রসিদ্ধ। এতে ইসলামের তিনটি মৌলিক ভিত্তি—ইসলাম, ঈমান ও ইহসান—অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ পূর্ণাঙ্গভাবে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি কিয়ামত সম্পর্কে মানুষের সীমিত জ্ঞানের কথা এবং তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামতও তুলে ধরা হয়েছে। তাই আলেমরা এই হাদিসকে ইসলামের অন্যতম ভিত্তিমূলক হাদিস হিসেবে গণ্য করেছেন।
 

অফুরন্ত রিজিক লাভে যে সুরা নিয়মিত পড়বেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
অফুরন্ত রিজিক লাভে যে সুরা নিয়মিত পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

রিজিক মানুষের জীবনের অন্যতম মৌলিক প্রয়োজন। জীবিকার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আজ বহু মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অভাব কখনো মানুষকে হতাশ করে, কখনো ভুল পথে পরিচালিত করে। অথচ একজন মুমিন জানেন, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি যাকে ইচ্ছা অগণিত রিজিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পরীক্ষা হিসেবে রিজিক সংকুচিত করেন। তাই প্রকৃত মুমিন রিজিকের জন্য হারাম পথ অবলম্বন না করে আল্লাহর দরবারে ফিরে যায়, দোয়া করে, ইস্তিগফার করে এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী আমল করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।’ (সুরা : হুদ, আয়াত : ৬)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২–৩)
এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে শিক্ষা দেয় যে, রিজিকের নিশ্চয়তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। তাই তাঁর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর নির্দেশিত পথে চলাই একজন মুমিনের কর্তব্য।

সুরা ওয়াকিয়া পাঠের ফজিলত
বিশিষ্ট সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করবে, তাকে কখনো দারিদ্র্য স্পর্শ করবে না।’ (ইমাম বাইহাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮)

ইবনে মাসউদ (রা.)-এর শিক্ষণীয় ঘটনা
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) মৃত্যুশয্যায় ছিলেন। তখন খলিফা হজরত উসমান (রা.) তাঁকে দেখতে যান এবং জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কি কোনো কষ্ট?’ তিনি উত্তর দেন, ‘আমার পাপই আমার কষ্ট।’ উসমান (রা.) বললেন, ‘আপনি কী চান? তিনি বললেন, "আমি আমার রবের রহমত চাই।’ খলিফা উসমান (রা.) সরকারি কোষাগার থেকে সাহায্যের প্রস্তাব দিলে তিনি তা গ্রহণ করেননি। যখন বলা হলো, ‘এটি আপনার কন্যাদের উপকারে আসবে’, তখন তিনি উত্তর দিলেন, ‘আমি আমার কন্যাদের নিয়ে চিন্তিত নই। কারণ আমি তাদের নির্দেশ দিয়েছি, তারা যেন প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া তিলাওয়াত করে। আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সুরা ওয়াকিয়া পাঠ করবে, সে দারিদ্র্যে পতিত হবে না।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস: ২৪৯৮, তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন)

সন্তানদের সুরা ওয়াকিয়া শিক্ষা দেওয়া
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুরা ওয়াকিয়া প্রাচুর্যের সুরা। অতএব তোমরা এটি পাঠ করো এবং তোমাদের সন্তানদেরও শিক্ষা দাও।’ (আদ-দুররুল মানসুর, খণ্ড: ১৪, পৃষ্ঠা: ১৭৩)

সুরা ওয়াকিয়ার মূল শিক্ষা
সুরা ওয়াকিয়া শুধু দারিদ্র্য থেকে মুক্তির সুরা নয়; বরং এটি মানুষের সামনে আখিরাতের বাস্তবতা, কিয়ামতের ভয়াবহতা, জান্নাতিদের পুরস্কার, জাহান্নামিদের শাস্তি এবং আল্লাহর অসীম কুদরতের বর্ণনা তুলে ধরে। এ সুরা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়— প্রকৃত সফলতা কেবল দুনিয়ার সম্পদে নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।

রিজিক বরকত লাভে করণীয়
রিজিকে বরকত লাভের জন্য সুরা ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াতের পাশাপাশি আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আরো করণীয় হলো-

১. নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার পাঠ করা।
৩. হালাল উপার্জনে সচেষ্ট হওয়া।
৪. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
৫. দান-সদকা করা।
৬. প্রতিদিন কোরআন তিলাওয়াত করা, বিশেষ করে সুরা ওয়াকিয়া পাঠের অভ্যাস গড়ে তোলা।
৭. সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল রাখা।

মনে রাখতে হবে, রিজিকের প্রকৃত নিশ্চয়তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার হাতে। কোরআন তিলাওয়াত, তাকওয়া, ইস্তিগফার, হালাল উপার্জন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসাই একজন মুমিনের জীবনে রিজিকে বরকত ও প্রশান্তির প্রকৃত চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার এবং হালাল ও বরকতময় রিজিক অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

রাসুলের পরে শ্রেষ্ঠ যারা

মুফতি ওমর বিন নাছির
রাসুলের পরে শ্রেষ্ঠ যারা
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের ইতিহাসে এমন এক সৌভাগ্যবান প্রজন্মের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা সরাসরি মহানবী (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাঁরা নবীর শিক্ষা, আদর্শ ও চরিত্রকে নিজেদের জীবনে ধারণ করে ইসলামের আলো পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের ঈমান, ত্যাগ, ইবাদত, জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা এবং আল্লাহর পথে আত্মোৎসর্গ মুসলিম উম্মাহর জন্য চিরন্তন আদর্শ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে তাঁদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বহু ঘোষণা এসেছে। তাই সাহাবায়ে কেরামের জীবন জানা এবং তাঁদের অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সাহাবি কারা?
'সাহাবি' শব্দটি আরবি ‘সাহাবা’ থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ—সঙ্গী, সহচর, বন্ধু বা সাহচর্যে অবস্থানকারী। ইসলামি পরিভাষায়, যিনি ঈমানসহ মহানবী (সা.)-এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ইসলামের ওপর অবিচল থেকে মৃত্যুবরণ করেছেন, তিনিই সাহাবি। এ সংজ্ঞাই হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা-এ উল্লেখ করেছেন। 

জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবি
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় দশজন সাহাবিকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। তাঁরা ইতিহাসে আশারায়ে মুবাশশারা নামে পরিচিত। তারা হলেন-

১. আবু বকর সিদ্দিক (রা.)
পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনে আবি কুহাফা। তিনি সর্বপ্রথম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম এবং ইসলামের প্রথম খলিফা। মিরাজের ঘটনাকে নিঃসংশয়ে সত্য বলে বিশ্বাস করায় তিনি 'সিদ্দিক' উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.)-এর পিতা এবং মৃত্যুর পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পাশে সমাহিত হওয়ার বিরল সৌভাগ্য লাভ করেন।

২. ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)
তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা এবং ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল প্রতীক। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে তিনি 'ফারুক' উপাধি লাভ করেন। তাঁর শাসনামলে ইসলামী রাষ্ট্র অভূতপূর্ব বিস্তার লাভ করে। তিনি উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.)-এর পিতা।

৩. উসমান ইবনে আফফান (রা.)
ইসলামের তৃতীয় খলিফা। তিনি রাসুল (সা.)-এর দুই কন্যা—রুকাইয়া (রা.) ও পরে উম্মে কুলসুম (রা.)-কে বিবাহ করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। এজন্য তিনি 'জুন-নুরাইন' (দুই নূরের অধিকারী) নামে পরিচিত। তাঁর যুগে পবিত্র কোরআন একক মুসহাফে সংকলিত ও সংরক্ষিত হয়।

৪. আলী ইবনে আবি তালিব (রা.)
রাসুল (সা.)-এর চাচাতো ভাই, জামাতা এবং চতুর্থ খলিফা। তিনি শৈশবেই ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাহস, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সমাদৃত।

৫. তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ (রা.)
প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। উহুদের যুদ্ধে রাসুল (সা.)-কে রক্ষা করতে গিয়ে অসাধারণ বীরত্ব প্রদর্শন করেন।

৬. জুবাইর ইবনুল আওয়াম (রা.)
রাসুল (সা.)-এর ফুফাতো ভাই এবং হাওয়ারি (বিশেষ সাহায্যকারী) হিসেবে পরিচিত। ইসলাম গ্রহণের পর কঠোর নির্যাতন সহ্য করেও তিনি ঈমানে অটল ছিলেন।

৭. আবদুর রহমান ইবনে আউফ (রা.)
অসাধারণ সফল ব্যবসায়ী এবং ইসলামের অন্যতম মহান দানশীল ব্যক্তি। তিনি ইসলামের জন্য বিপুল সম্পদ ব্যয় করেছেন।

৮. সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.)
তিনি ছিলেন ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর সেনাপতি। তাঁর নেতৃত্বে কাদিসিয়ার ঐতিহাসিক যুদ্ধে পারস্য সাম্রাজ্য পরাজিত হয়।

৯. সাঈদ ইবনে জায়িদ (রা.)
তিনি প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের একজন এবং খলিফা ওমর (রা.)-এর ভগ্নিপতি ছিলেন। তাঁর জীবন ঈমান ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

১০. আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ (রা.)
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে 'এই উম্মতের আমিন' (বিশ্বস্ত ব্যক্তি) বলে অভিহিত করেছিলেন। তিনি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ছিলেন।

সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবিগণ
সাহাবায়ে কেরাম শুধু ইসলামের প্রচারই করেননি; তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস সংরক্ষণেও অমূল্য অবদান রেখেছেন।

১. আবু হুরাইরা (রা.) — ৫,৩৭৪টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
২. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) — ২,২১০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৩. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) — ১,৬৬০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। 
৪. আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) — ১,৬৩০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৫. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) — ১,৫৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন।।

তাঁদের বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমেই আজ মুসলিম উম্মাহ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন, ইবাদত, আখলাক ও সুন্নাহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করেছে।

সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন মানবজাতির সর্বোত্তম প্রজন্ম। তাঁরা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও সর্বস্ব আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁদের ঈমান ছিল পাহাড়সম দৃঢ়, চরিত্র ছিল নির্মল এবং জীবন ছিল কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বর্তমান যুগের মুসলমান যদি ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সফল হতে চায়, তবে সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ অনুসরণ করার বিকল্প নেই। তাঁদের ভালোবাসা, তাঁদের মর্যাদা রক্ষা এবং তাঁদের আদর্শকে জীবনে ধারণ করাই একজন মুমিনের ঈমানের দাবি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সাহাবায়ে কেরামের পথ অনুসরণ করে ঈমানের সঙ্গে জীবন অতিবাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেভাবে আত্মিক অধঃপতন শুরু হয়

মাইমুনা আক্তার
যেভাবে আত্মিক অধঃপতন শুরু হয়
সংগৃহীত ছবি

মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার অন্তর। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি ঈমান, তাকওয়া, বিবেক ও আল্লাহকে চেনার কেন্দ্র। এ কারণেই কোরআন ও হাদিসে বাহ্যিক আমলের পাশাপাশি অন্তরের পবিত্রতা অর্জনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ একটি পবিত্র অন্তর মানুষকে আল্লাহর দিকে টেনে নেয়, আর অপবিত্র অন্তর ধীরে ধীরে তাকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

মানুষের অন্তর কলুষিত হয় গুনাহ ও অবিশ্বাসের প্রভাবে। মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে যায়, গাফেল হয়ে পড়ে, তখন তার অন্তরও আস্তে আস্তে কলুষিত হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে গিয়ে তাতে মোহর মেরে দেওয়া হয়, ফলে তার মধ্যে আর সত্য অনুধাবনের শক্তি থাকে না। এটাই হয়ে ওঠে তার চূড়ান্ত আত্মিক অবক্ষয়, যা তাকে স্বদর্পে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে। তারা জেনে-বুঝে সত্যকে উপেক্ষা করে।

অন্তরের অবক্ষয় শুরু হয় একটি গুনাহ দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বান্দা যখন একটি গুনাহ করে তখন তার অন্তরের মধ্যে একটি কালো চিহ্ন পড়ে। অতঃপর যখন সে গুনাহর কাজ পরিহার করে, ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং তাওবা করে, তার অন্তর তখন পরিষ্কার ও দাগমুক্ত হয়ে যায়। সে আবার পাপ করলে তার অন্তরে দাগ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং তার পুরো অন্তর এভাবে কালো দাগে ঢেকে যায়। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৩৩৪)

অর্থাৎ প্রতিটি গুনাহ অন্তরের ওপর একটি ক্ষত তৈরি করে। তাওবাই সেই ক্ষতের চিকিৎসা। কিন্তু তাওবা না করলে তার মাত্রা দিন দিন খারাপ হতে থাকে। একটা সময় সেই অন্তরের গুনাহের মরিচার আবরণ তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘কখনো না, বরং তাদের কর্মই তাদের অন্তরে জং ধরিয়ে দিয়েছে।’ (সুরা : মুতাফফিফিন, আয়াত : ১৪)

অন্তরের অবস্থা এ স্তরে চলে গেলে মানুষের বিবেক দুর্বল হতে থাকে। তখন তাদের কাছে গুনাহকে আর গুনাহ বলে মনে হয় না (নাউজুবিল্লাহ)। এটা অন্তরের কঠিন ব্যাধি। এ সময়ও যদি কারো তাওবা নসিব না হয়, নিজেকে শুধরে না নেয়, তবে তাদের অন্তর কঠিন হয়ে যায়। তখন কোনো উপদেশ তাদের অন্তরকে স্পর্শ করে না, গুনাহে লিপ্ত হলেও অনুশোচনাবোধ আসে না (নাউজুবিল্লাহ)। পবিত্র কোরআনে অন্তরের এই অবস্থার ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘তাদের অন্তরসমূহে রয়েছে ব্যাধি। সুতরাং আল্লাহ তাদের ব্যাধি বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আজাব। কারণ তারা মিথ্যা বলত।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১০)

গুনাহ করতে করতে যখন মানুষের অন্তর কঠিন হয়ে যায়, তখন আর মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের প্রতিও তাদের কোনো আগ্রহ কাজ করে না। এমনকি কোনো ইবাদতেও মন বসে না (নাউজুবিল্লাহ)। হেদায়াতের বাণী তাদের কাছে বিরক্তিকর লাগে। কেউ দ্বিনের দাওয়াত নিয়ে এলে তার প্রতি ক্ষোভ জন্ম নেয়। এমনকি শুধু ইসলাম পালনের কারণে মানুষ তাদের শত্রুতাসুলভ প্রোপাগান্ডার শিকার হয় (নাউজুবিল্লাহ)।

 এ অবস্থা থেকে আস্তে আস্তে তারা ধ্বংসের শেষ সীমানায় চলে যায়। এবং তাদের অন্তরে মহর মেরে দেওয়া হয়। যার ফলে তাদের অন্তরে হেদায়াতের আলো গ্রহণের আর কোনো শক্তিই থাকে না। পবিত্র কোরআনে এমন অন্তরের ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাআজাব।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ৭)

নাউজুবিল্লাহ। এ মোহর প্রথম গুনাহের শাস্তি নয়; বরং দীর্ঘদিন সত্য অস্বীকার, অহংকার ও অবাধ্যতার পরিণতি। তখন মানুষ সত্য শুনেও তা গ্রহণ করতে পারে না।

তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত অন্তরকে পবিত্র রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা। যেসব কাজে অন্তর আধ্যাত্মিকভাবে সতেজ থাকে, নিজেকে সেসব কাজে নিয়োজিত রাখার চেষ্টা করা। নিয়মিত তাওবা-ইস্তিগফার করা, গুরুত্ব সহকারে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা, নিয়মিত কোরআন চর্চার চেষ্টা করা, আল্লাহর জিকির করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা এবং সৎ মানুষের সাহচর্য গ্রহণ করা। 

এ ধরনের প্রতিটি পদক্ষেপ অন্তরকে জীবিত রাখতে সহায়তা করে। মানুষ তার মানবীয় দুর্বলতায় গুনাহে পড়ে যাওয়া স্বাভাবিক, তবে মুমিনের কর্তব্য গুনাহ থেকে বিরত থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা এবং তার পরও যদি গুনাহ হয়ে যায়, অবিলম্বে তাওবা করে মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা। মহান আল্লাহ সবাইকে অন্তরের ব্যাধি ও আত্মিক অবক্ষয় থেকে মুক্ত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।