দেশে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ক্রমাগত বাড়লেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা এখনো অধিকাংশের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এই জনগোষ্ঠীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় চিকিৎসা ঘাটতির হার প্রায় ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ।
সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীতে জিএইচএআই অ্যাডভোকেসি অ্যাকসিলারেটরের সহযোগিতায় সিরাক-বাংলাদেশ আয়োজিত মিডিয়া প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের নিয়ে এক সংলাপে এসব তথ্য জানানো হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে (এএফএইচসি) ‘ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার’ (ভিপিএল) মডেল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক (প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ) এবং ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এর বিপরীতে সেবার চিত্র অত্যন্ত নাজুক। প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র ০.০৭৩ জন এবং মনোবিজ্ঞানী আছেন মাত্র ০.১২ জন। এছাড়া জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ থাকায় মানসম্মত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বক্তারা বলেন, এই বিশাল ঘাটতি ও সংকট মোকাবিলায় কমিউনিটি পর্যায়ে প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডারদের (সমবয়সী স্বেচ্ছাসেবী দল) সম্পৃক্ত করা জরুরি। এর মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা সহজেই প্রাথমিক মানসিক সহায়তা, সচেতনতা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে। একই সঙ্গে সরকারি মূল স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপও অনেকটা কমবে।
অনুষ্ঠানে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তিনজন ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার। তারা জানান, সমবয়সীদের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের কাছে রেফার করার ক্ষেত্রে এ মডেল ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে ইতিবাচক ফল দিতে শুরু করেছে।
সিরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস এম সৈকত বলেন, ‘ভিপিএল মডেলকে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে নীতিগত স্বীকৃতি দেওয়া দরকার।’ সংগঠনের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. নাজমুল হাসান এক উপস্থাপনায় দেশের কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং ভিপিএল মডেলের কার্যক্রম, অর্জন ও সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, সহিংসতা ও অন্যান্য সামাজিক ঝুঁকির সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম, পরিবার ও কমিউনিটির সম্পৃক্ততা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সংকট মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
তারা আরো বলেন, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় এই ভিপিএল মডেল বাস্তবায়ন করলে সরকারি উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে তৃণমূল পর্যায়ে কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব। এটি একই সঙ্গে তরুণদের নেতৃত্ব, যোগাযোগ দক্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তুলতেও ভূমিকা রাখবে।
কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে এই মডেলকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের নীতিগত অঙ্গীকার, আন্ত মন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান সংলাপে অংশ নেওয়া বিশিষ্টজনরা।





