সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণ বাতিল করা হলে কিছু ক্ষেত্রে কালো অধ্যায়ের দিকে ফিরে যাওয়া হবে। এর পরিণতি হতে পারে ধ্বংসাত্মক। তা ছাড়া পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করা হলে সংবিধান থেকে ‘বিস্মিল্লাহির-রহ্মানির রহিম’, সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ সংক্রান্ত ‘সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল’ এবং হাইকোর্ট বিভাগের রিট ক্ষমতা বাদ হয়ে যাবে। সংবিধানে পুনরুজ্জীবীত হবে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা ‘বাকশাল।’ এসব যুক্তিতে গেল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘গণভোট’ পর্যন্ত আপিল শুনানি স্থগিত রাখার আরজি জানিয়েছিল জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। পরে গত বছর ১১ মে আপিল বিভাগ মামলাটির শুনানি মুলতবি করেন।
গত ১২ ফেব্রিুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট হয়। এর পর বিভিন্ন সময় মামলাটি শুনানির জন্য কার্যতালিকায় ওঠে। সর্বশেষ গত ২৩ জুন মামলাটির শুনানি আজ সোমবার পর্যন্ত মুলতবি করেছিলেন আপিল বিভাগ। সেই ধারাবাহিকতায় প্রায় ১৪ মাস পর সোমবার প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চে আংশিক শুনানি হয়। সাংবিধানিক বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি আগামীকাল মঙ্গলবার ফের শুনানির জন্য রাখা হয়েছে।
সোমবার আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া। এসময় অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ অনীক রুশদ হকসহ অন্যান্য আইন কর্মকর্তারা। ছিলেন এ মামলায় ইন্টারভেনার (স্বার্থসংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারী) হিসেবে যুক্ত হওয়া জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।
শুনানিতে কী বলেছেন, জানতে চাইলে আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া সাংবাদিকদের বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ে যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত কিছু জিনিস পুনর্বহাল হয়েছে। কিন্তু সবকিছু হয়নি। তো, সেটা আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে সংশোধিত হতে পারে।’
শরীফ ভূইয়া বলেন, ‘পঞ্চদশ সংশোধনী সম্পূর্ণটাই একটা অবৈধ সংশোধনী। এটা যে সমস্ত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশোধন করা উচিত ছিল, তা করা হয়নি। এটাতে (পঞ্চদশ সংশোধনীতে) এত বেশি জনবিরোধী বিষয় আছে যে, দেশের জনগণের স্বার্থে এটা পুরোটাই বাতিল হওয়া উচিত।’
তবে পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল করলে কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে জানিয়ে এই আইজীবী বলেন, ‘যেগুলোর ব্যাপারে সমস্যার সৃষ্টি হয়, সেগুলোর ব্যাপারে আদালত সুরক্ষা দিতে পারেন। এগুলো আমরা আদালতে বলতে পারি।’
আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে অবসরে যাবেন। তাই এর আগেই শুনানি শেষ করে আদালত রায় ঘোষণা করবেন বলে আশা শরীফ ভূইয়ার।
২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে ‘পঞ্চদশ সংশোধনী আইন’ নামে পাস হয় এবং রাষ্ট্রপতি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তাতে অনুমোদন দেন। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতির পিতা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনসংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ৫০ করা হয় এই সংশোধনীর মাধ্যমে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা পুনর্বহাল এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি সংযোজন করা হয়। এছাড়াও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করাকে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং এই অপরাধের শাস্তির বিধানও যুক্ত করা হয়েছিল পঞ্চদশ সংশোধনীতে। আগে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনে নির্বাচন করার বিধান থাকলেও পঞ্চদশ সংশোধনীতে পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বিধান সংযোজন করা হয়। এসব সংশোধনী বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। এই রিটে প্রাথমিক শুনানির পর ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আইন, ২০১১ কেন অসাংবিধানিক এবং বাতিল ঘোষণা করা হবে না, জানতে চাওয়া হয় রুলে। পরে এই রুল সমর্থন করে সহায়তাকারী (ইন্টারভেনার) হিসেবে যুক্ত হন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দল হিসেবে যুক্ত করা হয় গণফোরাম এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব নামের একটি রাজনৈতিক দলকে। এছাড়া মোফাজ্জল হোসেন নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধা পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। চূড়ান্ত শুনানির পর রুল রিট দুটি নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট।
রায়ে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ ধারা সংবিধানের ৫৮ক অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে তা বাতিল ঘোষণা করা হল। রায়ে আরও বলা হয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো হিসেবে ধারা দুটি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে গত বছর ৩ নভেম্বর আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন (লিভটু আপিল) করেন চার রিট আবেদনকারী। পরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারও লিভ টু আপিল করেন। গত ১৩ নভেম্বর এসব লিভটু আপিল মঞ্জুর করে তাঁদের আপিল করার অনুমিত দেন সর্বাচ্চ আদালত। এরপর শুরু হয় শুনানি। আপিলে শুনানি চলার মধ্যে গত ২ ডিসেম্বর বিএনিপির পক্ষে এসব আপিলে পক্ষভুক্ত হন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত বছর ৭ ডিসেম্বর রিটকারীদের পক্ষে শুনানি শেষ করেছিলেন আইনজীবী মো. শরীফ ভূইয়া। এরপর শুনানি শুরু করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। গত বছর ১১ মে এই আইনজীবীর আরজিতেই শুনানি মুলতবি করেছিলেন সর্বোচ্চ আদালত।







