• ই-পেপার

বিজিবির সাফল্যের নেপথ্যে সৈনিক ও টপ কমান্ডের রসায়ন

  • মোস্তফা কামাল

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা

এ কে এম আতিকুর রহমান

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষা

গত ৭ জুন কলেজ শিক্ষকদের জন্য কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে সনদভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতা ও প্রযুক্তি ভিত্তিক ব্যাবহারিক এবং কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলেন। একই সঙ্গে তিনি নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। ওই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা যায়, শিক্ষাকে আরো আধুনিক, দক্ষতানির্ভর এবং কর্মমুখী করার জন্য সরকার একটি নতুন শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ওই ব্যবস্থায় শুধু ডিগ্রি অর্জনই লক্ষ্য হবে না, বরং দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন যে শুধু বিপুলসংখ্যক স্নাতক তৈরি করাই সরকারের উদ্দেশ্য নয়, বরং প্রধান লক্ষ্য হলো একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা।

বাংলাদেশে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করাই নয়, সব শিশুকে শিক্ষা কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। নিঃসন্দেহে তাতে শিক্ষার হার হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আসলেই কি শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, না সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা বাড়ছে? তাহলে সার্টিফিকেট অর্জন করাই কি শিক্ষার উদ্দেশ্য? একজন শিক্ষার্থী যে ডিগ্রি অর্জন করছে, সেই স্তরের জ্ঞান কি তার অর্জিত হচ্ছে? সে কি তার সার্টিফিকেট অনুযায়ী মেধার প্রমাণ দিতে সক্ষম হচ্ছে বা কাজ খুঁজে পাচ্ছে, নাকি এই দরিদ্র দেশটির বেকার তালিকাটিকেই শুধু দীর্ঘতর করে চলছে? এমন আরো হাজারো প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি মারে। এ প্রসঙ্গে কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিগত ২০ বছরের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ যে কথাটি বলেছিলেন তা হলো, ‘অতীতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় যে চরম নৈরাজ্য চলেছে, তা এখন স্পষ্ট, যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী পাস পর্যন্ত করতে পারে না। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ সিঙ্গাপুরে আমাদের দেশের উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) লেভেলকে তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির সমমান হিসেবে তুলনা করা হয়।’       

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে প্রয়োজন কর্মমুখী শিক্ষামাননীয় প্রতিমন্ত্রীর মতো দেশের অনেকেই বিদ্যমান শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে থাকেন। বিএ, এমএ পাস করেও নাকি অনেকে পিয়নের একটি চাকরি খুঁজে পেতে গলদঘর্ম হয়ে পড়ছেন। যে স্বপ্ন দেখে গরিব মা-বাবা সর্বস্ব দিয়ে সন্তানকে বিএ পাস করালেন, সেই সন্তানের এহেন অবস্থা দেখে মা-বাবার দুচোখে দারিদ্র্যের অন্ধকার আরো ঘনীভূত হচ্ছে। বাংলাদেশ একটি শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হবে—এই প্রত্যাশা আমাদের সবার। তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য যেন হয় একজন মানুষকে কর্মের উপযোগী করে তৈরি করা। দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম এমন জনশক্তি তৈরি করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশে শিক্ষিত মানুষের হার শতভাগে উন্নীত হোক, তা সবাই চায়। তবে তারা যেন হয় মানসম্পন্ন শিক্ষায় শিক্ষিত। একজন শিক্ষার্থী যে স্তর পর্যন্তই লেখাপড়া করুক না কেন, তার সেই লব্ধ জ্ঞান যেন উন্নত বিশ্বের সমমানের হয়। আর সেটি সম্ভব হলে তারা শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ খুঁজে পাবে। তাই চলমান শিক্ষার হার বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে মানসম্পন্ন শিক্ষার বিকাশ ঘটানোর উদ্যোগ নিতে হবে। সার্টিফিকেটধারী লোকের সংখ্যা না বাড়িয়ে শিক্ষাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানে নিয়ে যেতে হবে। বিদ্যমান অবকাঠামোতেই প্রয়োজনীয় সংস্কার করে শিক্ষার মানকে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থা যেন আর শিক্ষিত বেকার সৃষ্টি না করতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার আশু সংস্কার প্রয়োজন।

সংস্কার প্রসঙ্গে বলতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি আসে সেটি হলো, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা কতটা কর্মমুখী বা উৎপাদনমুখী। আমাদের যে বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে, তাদের কতজনের কাজের সংস্থান আমরা করতে পারছি? তাদের মধ্যে কতজন তাদের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কর্ম সৃষ্টি করতে সমর্থ হচ্ছে? অন্যদিকে এ ক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে ওই সব শিক্ষিত যুবকের আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারণে কী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, তা-ও ভাবতে হবে। আমরা শিক্ষা সনদের অবমূল্যায়ন বা অসম্মান হোক, তা চাই না। একটি সনদ যেন হয় তাদের অহংকারের প্রতীক।

বেকারত্ব থেকে উত্তরণ এবং দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য শিক্ষার্থীদের দুটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। তবে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা বাধ্যতামূলক থাকতে পারে। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর একটি হবে বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং অন্যটি সাধারণ শিক্ষা। বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় তিনটি স্তরে শিক্ষার্থী নেওয়া যেতে পারে এবং স্তর অনুযায়ী তাদের শিক্ষার মান নির্ধারিত হবে। তবে যে স্তরের শিক্ষার্থীই হোক না কেন, তাকে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলাই হবে মুখ্য কাজ। প্রথম স্তরে যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা ভালো ফল করলেও অভিভাবকের আর্থিক সংগতি নেই পরবর্তী শিক্ষা ব্যয় নির্বাহের, তাদের বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থায় বিভিন্ন ট্রেড কোর্সে ভর্তি করার সুযোগ থাকতে হবে। দ্বিতীয় স্তরটি হচ্ছে, যেসব শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে সাধারণ শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারবে না, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাবে। তৃতীয় স্তরটি হচ্ছে, যারা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না বা আর্থিক কারণে উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে অক্ষম, তারা বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবে। তবে শিক্ষার্থীর শিক্ষাস্তর অনুযায়ী বৃত্তিমূলক শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হবে। বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তির জন্য দেশে বা বিদেশে কর্মের সংস্থান করা অনেক সহজ। এ ছাড়া পারিশ্রমিকের দিক থেকে তারা সাধারণ কর্মীর চেয়ে অনেক বেশি উপার্জনে সক্ষম হয়ে থাকে।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসতে পারে যে বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য এত প্রতিষ্ঠান আমরা কোথায় পাব। এর সহজ উত্তর হচ্ছে, বিদ্যমান সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েই বৃত্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সরকার নীতিগতভাবে এ বিষয়ে আগ্রহী হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হবে না। সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নবম শ্রেণিতে যেমন বিজ্ঞান বা বাণিজ্য বিভাগে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে, তেমনি কারিগরি বিভাগেও পড়াশোনার ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার অবকাঠামোগত ব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জানা মতে, বাংলাদেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এ ধরনের ব্যবস্থা চলমান। আমাদের লক্ষ্য হলো, আমরা কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষিতের হার বাড়াব, সার্টিফিকেটধারীর সংখ্যা নয়। অন্যদিকে যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী, বিশেষ করে চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যারা পড়াশোনা ও গবেষণা করবে, তারা পরবর্তী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে শিক্ষা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। রাষ্ট্র সেই অধিকার নিশ্চিত করবে। তবে এর অর্থ এমন হওয়া উচিত নয় যে লেখাপড়া শিখে কেউ রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হবে, দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়িয়ে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই পথ দেখিয়ে দিতে হবে কোন শিক্ষার্থী কোন পথে গেলে সে আর বেকার থাকবে না, রাষ্ট্রকেও তার বোঝা বইতে হবে না। আর এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব একমাত্র কর্মমুখী ও মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, একজন উচ্চ ডিগ্রিধারী বেকারের চেয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখতে সক্ষম একজন স্বল্পশিক্ষিত ব্যক্তি তার পরিবারের কাছে তথা দেশের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্য। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যেন প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মানবিক গুণসম্পন্ন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, সেই প্রত্যাশা করি। শুধু তথাকথিত সার্টিফিকেটধারী লাখ লাখ স্নাতক তৈরি না করে সরকার যেন একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয় এবং জরুরিভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

গত ২৮ জুন একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে পরবর্তী প্রজন্মের একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার সক্ষমতার ওপর, যার জন্য তাদের দক্ষ, যোগ্য এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রস্তুত করতে হবে। তিনি আমাদের প্রত্যাশার কথাটিই উচ্চারণ করেছেন এবং খুব তাড়াতাড়ি তাঁর কথার বাস্তবায়ন শুরু হবে, তা দেখার অপেক্ষায় রইলাম।

 

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিল

ইকরামউজ্জমান

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিল

আনন্দ, বেদনা, আলোচনা, সমালোচনা ও বিতর্কের বিশ্বকাপের বৃহৎ জাহাজটি কোয়ার্টার ফাইনালের ঘাটে এসে পৌঁছেছে। আমাদের নিজস্ব মনোভাব, বক্তব্য, প্রতিবাদ, অনুভূতির পেছনে আছে প্রত্যেকের নিজস্ব ধ্যান-ধারণার হিসাব। আর তাই বিষয়টিকে খারাপ বলার সুযোগ নেই। এই পৃথিবী চলছে কিভাবে? কিভাবে চলছে আমাদের জীবন, সমাজ ও দেশ? আর তাই ফুটবলের জীবনকে সন্দেহের চোখে দেখব কেন?

ফুটবল নিয়ে ভীষণ আনন্দ, ক্ষোভ, হতাশা ও প্রতিবাদ আছে, তা সত্ত্বেও সবাই কিন্তু স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছে। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল ফিরে আসে। সমাজের বৃহৎ জনগোষ্ঠী সেই উৎসবকে দুই হাত ভরে লুফে নেয়। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে আমাদের কী ধরনের সম্পর্ক, তা সবাই জানি। তা সত্ত্বেও ফুটবলের পূর্ণিমার জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়।

শিরোপা কে জিতবে বলা মুশকিলঢাকা নগরীর পাশেই একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ক্যাম্পাসে প্রতিদিন রাতে ও ভোরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী খুব মজা করে খেলা দেখে। ওরা অবশ্যই বিভিন্ন দলের সমর্থক। এর পরও খেলা দেখছে একসঙ্গে। ফুটবল পেরেছে সব মতকে একসঙ্গে খেলাতে। অসাধারণ বিষয়। যে আটটি দেশ কোয়ার্টার ফাইনালের ভিসা নিশ্চিত করেছে, তাদের মধ্যে একটি দেশেরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে এভাবে এত হাজার হাজার শিক্ষার্থী একসঙ্গে বিশাল বড় পর্দায় খেলা দেখেএ ধরনের উদাহরণ নেই। অথচ বিশ্বকাপের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা নেই। শুধু নির্মল আনন্দ উপভোগের জন্য মেতে ওঠা। দুঃখের বিষয় হলো, এই ফুটবল উৎসবে আবার বিষাদও নেমে এসেছে। অনেক তরুণ প্রাণ হারিয়ে গেছে শুধু ফুটবলের উৎসব ঘিরে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার খবরগুলো অনুসরণ করি মনোযোগের সঙ্গে বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য। চোখে এখনো পড়েনি বিগত দিনগুলোতে বিশ্বকাপ বিজয়ী দল উরুগুয়ে, জার্মানি ও ব্রাজিল। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডস ও পর্তুগালের মতো দলগুলো যে অসময়ে বিদায় হয়েছে, এরপর সেই দেশের মানুষ কি প্রাণ দিয়েছে ফুটবলের পরাজয়ের দুঃখে? ফুটবল ঘিরে অতিরিক্ত আবেগ কখনো কাম্য নয়। ফুটবল একটি খেলা। অবশ্যই জীবনের খেলা। কিন্তু জীবন থেকে যেন ফুটবল বড় নয়। তা ছাড়া খেলাধুলা তো একটি জিনিস, যেটি পরাজয় মেনে নিতে শেখায়। আমরা সবাই জিততে চাই। সেটি তো সম্ভব নয়। জীবন সুন্দর করতে ফুটবলের নির্মল বিনোদন সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংক্রমিত হবেএটি লক্ষ্য হওয়া উচিত। খেলার ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হওয়া ঠিক নয়। আমরা সবাই জানি, বৃহৎ খেলার অনুষ্ঠানের প্রভাবকে অনেক সময় অতিরঞ্জিত করে দেখা হয়। চলমান বিশ্বকাপ এর বাইরে নয়। খেলার ভেতরেও অন্য খেলা হয়েছে। খেলা হয়েছে বাইরে। এর পরও ফুটবলের আলো নিভে যায়নি। এখানেই ফুটবলের আবেদনের জয়।

ফুটবল ঘিরে আন্তর্জাতিক কূট রাজনীতি। ফিফার বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক কার্যকলাপ। মতলব হাসিলের খেলা। বৃহৎ শক্তির প্রকাশ্য ক্ষমতা প্রদর্শন। অমানবিক আচরণ অংশগ্রহণকারী দলের প্রতি। প্রকাশ্য পক্ষপাতিত্ব। বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য চোখে পড়া ফিফার ডিগবাজি। ব্যবসায়ীদের শতভাগ স্বার্থ রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা। ফিফার প্রেসিডেন্ট মুখে মুখে লম্বা কথা বললেও শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে চাটুকার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। ফুটবল থেকে বাণিজ্যকে বড় করে দেখা হচ্ছে। ২১১ দেশের ফুটবল প্রতিষ্ঠান একটি বৃহৎ শক্তির কাছে কিছুই নয়এর প্রমাণ সবাই দেখলেন। তবে একটি সান্ত্বনা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেননি ফুটবলের সব আলোকে তাঁর দিকে নিয়ে নিতে।

তিন দেশে (যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা) ৪৮টি দেশ নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু। শেষ পর্যায়ে ১৬টি দেশ বাদ পড়েছে। এরপর ৩২ থেকে ১৬ দেশের নক আউট, যাকে বলা হয় প্রাক-কোয়ার্টার। এখানে স্থান হয়নি স্বাগতিক দেশগুলোর। এখানে এসেই ব্রাজিলের যাত্রা থেমে গেছে। ২৪ বছর অপেক্ষার অবসান হলো না। এখন আবার চার বছর পর বড় লড়াইয়ের মাঠে আসা নিশ্চিত করতে হবে। ব্রাজিল নিয়ে এত বেশি লেখালেখি আর কথাবার্তা হয়েছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমেআর তাই চর্বিতচর্বণ অর্থহীন। ব্রাজিল কেন অসময়ে চলে গেছে, কমবেশি সবাই বুঝেছে। আমাদের ফুটবল মননে স্থান জুড়ে আছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। ব্রাজিল না থাকায় এরই মধ্যে বিশ্বকাপ বাংলাদেশে রং হারিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এটিই নিয়মকেউ সফল হবে, কেউ ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে অসময়ে চলে যাবে। দেশের মানুষের কাছে আরেকটি জনপ্রিয় দল হলো আর্জেন্টিনা। আর্জেন্টিনা কোয়ার্টার ফাইনালে লড়বে ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। শেষ আটে চলে এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবল উৎসব। তা সত্ত্বেও বলা মুশকিল শেষ পর্যন্ত কোন দল শিরোপা জিতবে। আট দলের মধ্যে লাতিন আমেরিকার আছে আর্জেন্টিনা, আফ্রিকার মরক্কো। বাকি ছয়টি ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, নরওয়ে, বেলজিয়াম ও সুইজারল্যান্ড ইউরোপের দেশ। অর্থাৎ ইউরোপীয় দেশগুলো সরাসরি ডমিনেট করছে ফুটবল বিশ্বকাপের উৎসবে। ২০২২ সালে কাতারে ইউরোপের ফ্রান্সকে পরাজিত করে জিতেছিল আর্জেন্টিনা ৩৬ বছর পর। মেসির জীবনের শেষ বিশ্বকাপের শেষ পর্যন্ত এবার কী ঘটতে যাচ্ছে, তা এখন বলা মুশকিল। ইউরোপের দলগুলো কিন্তু ক্রমেই গোছানো এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছে। মরক্কো গত বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল। এবার তাদের মোকাবেলা করতে হবে ফ্রান্সকে। মরক্কোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তারা ইতিবাচক ও আত্মবিশ্বাসী ফুটবল খেলছে। এখন যে আটটি দল কোয়ার্টার ফাইনালে আছে, এর মধ্যে তো আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও স্পেন অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে। নরওয়ে, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড ও মরক্কো অতীতের বিশ্বকাপে যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান (২০১৮), কোয়ার্টার ফাইনাল এবং কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে। শিরোপা জয় এখন উন্মুক্ত অবস্থায় আছে।

যে চারটি দেশ অতীতে বিশ্বকাপ জিতেছে, তাদের মধ্যে আর্জেন্টিনা সবচেয়ে বেশি, তিনবার জিতেছে। আর রানার্স আপ হয়েছে তিনবার। ফুটবলকে বোঝা মুশকিল। ফুটবলের নাটকের স্ক্রিপ্ট অনেক আগে থেকে লেখার সুযোগ নেই। আর সব রোমাঞ্চ ও উত্তেজনার মাঠেই জন্ম হয় মিনিটে মিনিটে। ৯০ মিনিট সেখানে কিছু না হলে অতিরিক্ত সময়, সেখানেও না হলে পেনাল্টি শ্যুট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্প সৃষ্টি হচ্ছে। এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হয় না খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। শুধু প্রার্থনা করা, যাতে প্রিয় দল শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে আর শেষ হাসি হাসতে পারে। আর এই হাসি কেড়ে নেওয়ার জন্য একটি খেলাই এখন যথেষ্ট। কারো পৌষ মাস কারো সর্বনাশএটি তো জগৎসংসারের অতিপরিচিত খেলা।

বিশ্বকাপের মাঠে লক্ষ করেছি যে ইউরোপের সেরা দলগুলো কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছে। এই দেশগুলোর খেলোয়াড়দের বড় অংশই অভিবাসী বা অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের নিয়ে গঠিত হয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি দলের প্রাণভোমরা এখন অভিবাসী এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান। এই সবকিছুই ফুটবলের বিশ্বায়নের অবদান।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভব

ড. মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন হাওলাদার

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভব

মশা নিধনে পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া ব্যাসিলাস থুরিনজেনসিস ইসরায়েলেনসিস (বিটিআই) এবং এর দেশীয় উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বিটিআই প্রাকৃতিকভাবে মাটিতে বসবাসকারী একটি পরিবেশবান্ধব ব্যাকটেরিয়া, যা মশার লার্ভা ধ্বংসে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। স্পোর গঠনের সময় এই ব্যাকটেরিয়া একাধিক বিষাক্ত মশানাশক প্রোটিন তৈরি করে, যা লার্ভার পাকস্থলীতে গিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বিষক্রিয়া ঘটিয়ে লার্ভা মেরে ফেলে। তবে মানুষ, গবাদি পশুসহ অন্যান্য প্রাণীর ওপর এর ক্ষতিকর কোনো প্রভাব না থাকায় একে সম্পূর্ণ নিরাপদ বিবেচনা করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থা বিটিআইকে পরিবেশবান্ধব কীটনাশক হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে। বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক বায়োপেস্টিসাইড সফলভাবে ব্যবহার করছে। বিটিআইয়ের পাশাপাশি লাইসানিব্যাসিলাস স্পেরিকাস (এলএস) নামের আরেকটি ব্যাকটেরিয়াও কিউলেক্সসহ অন্যান্য মশা দমনে সফলভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে।

মশা নিধনের জন্য সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ভ্যালেন্ট বায়োসায়েন্সেস কম্পানি থেকে বিটিআই ক্রয়ের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। কেননা এই আমদানীকৃত পণ্যের কার্যকারিতা, পরিবেশগত প্রভাব, এমনকি দেশে এর বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন কতটা হয়েছে, তা নিয়ে জনসমক্ষে স্পষ্ট তথ্য নেই। এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বিটিআই আমদানিপ্রক্রিয়া ঘিরে ভুয়া সনদ, জাল কাগজপত্র এবং চীনা পণ্যকে সিঙ্গাপুরের বলে চালিয়ে দেওয়ার মতো কেলেঙ্কারি সামনে আসে। এতে প্রমাণিত হয় বিদেশনির্ভর ব্যবস্থার ভেতর কতটা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা লুকিয়ে থাকে। শুধু অর্থ অপচয় নয়, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত আমদানি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় জৈবনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। তাই এই মুহূর্তে জরুরি প্রশ্ন, আমরা কি নিজেরাই এই প্রযুক্তি ও পণ্য তৈরি করতে পারি না? কেন নিজেদের বিজ্ঞানী ও গবেষণাগারকে যথেষ্ট আস্থা ও বিনিয়োগ দিতে পারছি না?

মশা নিধনে বিটিআই : দেশেই উৎপাদন সম্ভববৈজ্ঞানিক তথ্য বলছে, বিটিআইয়ের নানা স্ট্রেইন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মাটি ও জলাশয়ে স্বাভাবিকভাবে উপস্থিত থাকে, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, স্থানীয় পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা স্ট্রেইন সেই এলাকার মশা দমনে বিদেশ থেকে আনা স্ট্রেইনের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। কারণ স্থানীয় স্ট্রেইন বছরের পর বছর ধরে সেই অঞ্চলের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, জলাশয়ের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় মশার প্রজাতির সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে জীববৈচিত্র্যকে সামঞ্জস্য গড়ে তোলে, যা বহিরাগত স্ট্রেইনের পক্ষে সহজে অর্জন করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের জলাভূমি, ডোবা, খাল-বিল, ধানক্ষেত ও অন্যান্য কৃষিজমিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রচুর সম্ভাবনাময় বিটিআই স্ট্রেইন বিদ্যমান। সেগুলো সংগ্রহ, বিশুদ্ধকরণ ও মাননির্ধারণের মাধ্যমে সহজেই দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড গড়ে তুলতে পারিপ্রয়োজন শুধু দূরদর্শী নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং তুলনামূলকভাবে সামান্য বিনিয়োগ।

সম্ভাবনার ঘাটতি এখানে নয়, ঘাটতি নীতি সহায়তায় ও বিনিয়োগ ইচ্ছায়। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে বিটিআই ব্যাকটেরিয়া, বায়োপেস্টিসাইড ও মশাবাহক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে দক্ষ গবেষক ও বিজ্ঞানী রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাকাজ করেছেন, আবার বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা শেষে দেশে ফিরে কাজ করতে আগ্রহী তরুণ বিজ্ঞানীদেরও সংখ্যা কম নয়। কিন্তু তাঁদের জন্য আধুনিক ল্যাব, স্থিতিশীল অর্থায়ন ও নীতিগত প্রণোদনার ঘাটতির কারণে এই মানবসম্পদকে কাঙ্ক্ষিতভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এখনই সময় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সামনে পরিষ্কার বার্তা তোলারমশা নিধনের প্রযুক্তি আমাদের আমদানিযোগ্য পণ্য নয়, বরং দেশীয় উদ্ভাবন ও শিল্পায়নের সুযোগ

দেশীয় বিটিআইভিত্তিক বায়োপেস্টিসাইড শিল্প গড়ে তুলতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। প্রথমে প্রয়োজন সারা দেশের জলাভূমি, মাটি, অন্যান্য স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সম্ভাবনাময় বিটিআই ও এলএস স্ট্রেইন সংগ্রহ, তাদের নির্ভুল শনাক্তকরণ ও ল্যাবরেটরি পর্যায়ে কার্যকারিতা পরীক্ষা এবং এর মধ্যে সর্বোচ্চ কার্যকর স্ট্রেইন নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপে নির্বাচিত স্ট্রেইনকে ভিত্তি করে একটি মানসম্পন্ন বায়োপেস্টিসাইড গবেষণাগার গড়ে তুলতে হবে; যেখানে সংরক্ষণ, ফার্মেন্টেশন, স্পোর শুকানো এবং বিভিন্ন ফর্মুলেশন তৈরির সুযোগ থাকবে। তৃতীয় ধাপে অপেক্ষাকৃত স্বল্প খরচে একটি পাইলট স্কেলের উৎপাদন ইউনিট স্থাপন ছাড়া বড় ধরনের ঝুঁকি নেই। পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ দিয়েই এমন একটি কারখানা দাঁড় করানো সম্ভব, যা পরবর্তী সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সম্প্রসারণযোগ্য। সর্বশেষ ধাপে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ মশাক্রান্ত শহরগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠ পরীক্ষা চালিয়ে প্রমাণিত কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা।

চসিক একবারেই প্রায় পৌনে চার কোটি টাকা ব্যয়ে বিদেশি বিটিআই কিনেছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর নীতির ফল। অথচ পাঁচ থেকে ১০ কোটি টাকার প্রাথমিক বিনিয়োগ দিয়েই সম্পূর্ণ দেশীয় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে একটি আধুনিক বায়োপেস্টিসাইড শিল্প দাঁড় করানো সম্ভব, যা দীর্ঘ মেয়াদে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। স্থানীয় সরকার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে জাতীয় এক বায়োপেস্টিসাইড উদ্যোগ গ্রহণ করলে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন কিছু নয়। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ কিংবা জলবায়ু অর্থায়ন প্ল্যাটফর্ম থেকে অনুদান ও স্বল্পসুদে অর্থায়নের সুযোগও জোরালোভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

দেশীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাংলাদেশি বিটিআই পণ্য প্রতিবেশী দেশগুলোতে রপ্তানি করার সুযোগ রয়েছে। মায়ানমার, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গুসহ বাহকবাহিত রোগের মারাত্মক চাপে রয়েছে; যেখানে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী বায়োপেস্টিসাইডের বড় ধরনের বাজার ও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ভারত, থাইল্যান্ড, চীন তাদের বিটিআই পণ্য এসব দেশে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের কম উৎপাদন খরচ ও উষ্ণ-আর্দ্র জলবায়ু এই শিল্পের জন্য সুবিধাজনক। এভাবে একটি দেশীয় বায়োপেস্টিসাইড শিল্প গড়ে উঠলে শুধু মশা নিধনের হাতিয়ার হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে এক রপ্তানিমুখী সবুজ শিল্প খাত গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় দুটিই নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশে বিটিআই পণ্য উৎপাদনে অনুকূল পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ এই শিল্পকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নিতে সক্ষম। ফলাফল হিসেবে একদিকে মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন পথ থুলে যাবেএককথায় এটি হতে পারে একটি পূর্ণাঙ্গ সবুজ শিল্প বিপ্লব

জনস্বাস্থ্য ছাড়াও কৃষিতে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হিসেবে বায়োপেস্টিসাইডের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার সহায়তায় বাকৃবির কীটতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কমপক্ষে ১০৯টি বায়োপেস্টিসাইড নিবন্ধিত রয়েছে, যা ইঙ্গিত করে জৈব কীটনাশকের সংখ্যা ও বৈচিত্র্য আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এগুলোর মধ্যে ফেরোমন ও অন্যান্য সেমিওকেমিক্যাল, উদ্ভিদজাত (বোটানিক্যাল) পণ্যই বেশি এবং মাইক্রোবিয়াল বায়োপেস্টিসাইডের সংখ্যা খুবই নগণ্য। জৈব কীটনাশক এখনো মোট কীটনাশক বাজারের তুলনায় ছোট অংশ হলেও নিবন্ধিত পণ্যের সংখ্যা, সরকারি বিভিন্ন নীতি ও বেসরকারি কম্পানির আগ্রহ থেকে বোঝা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট, ফেরোমন এবং উদ্ভিদজাত কীটনাশকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রীর ডোবার পাশে বসার কথাটি রূপকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন সমাধান আমাদের দোরগোড়ায়মাটিতে, জলাশয়ে, গবেষণাগারে এবং বিজ্ঞানীদের মেধায়। প্রয়োজন শুধু দেখার চোখ ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা। মশা দমনে বিটিআই বা অন্য মশাখেকো ব্যাকটেরিয়ার ব্যবহারের প্রযুক্তি ঠিক তেমনই একটি সমাধান। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহই ছিল। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ওই বছরে ডেঙ্গুতে অন্তত চার শর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানের সারসংক্ষেপ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালে সারা বছরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ দুই হাজারের কিছু বেশি। এর মধ্যে ৪১২ থেকে ৪১৩ জন মারা গেছে, যা ২০২৪ সালের ৫৭৫ জন মৃত্যুর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক মৃত্যু। চিকুনগুনিয়ার ক্ষেত্রে ২০২৫ সালে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মশার কামড়ে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু যখন আমাদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে, তখন বিদেশি কম্পানির ওপর আস্থা রেখে শুধু আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধির কোনো নৈতিক বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এখন সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার, আমরা কি বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে অনিশ্চিত আমদানির ওপর ভর করে থাকব, নাকি নিজেদের বিজ্ঞানী, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে মেড ইন বাংলাদেশ বায়োপেস্টিসাইডের এক নতুন অধ্যায় শুরু করব? সুযোগ এখনো হাতের মুঠোয়। যদি এই মুহূর্তে আমরা ব্যর্থ হই, তবে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠিয়েও যে বাস্তব সমাধান পাইনি, ভবিষ্যতেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তাই সময় এসেছে, নিজেদের একটি আত্মনির্ভরশীল ও পরিবেশবান্ধব মশা নিধন ব্যবস্থা গড়ে তোলার।

লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ব বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

বিটি ও বায়োপেস্টিসাইড বিশেষজ্ঞ

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা যখন অনেক সমস্যার কারণ

সমাজ যে সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাকে আমরা সহজভাবে সমাজকাঠামো বলি। একটি অবকাঠামো যেমন ইট, বালু, সিমেন্ট, কাঠ কিংবা অন্য কিছুর ওপর ভর করে থাকে, তেমনি সমাজ টিকে থাকে তার সামাজিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। ধরুন, আপনি অপরিমিত উপাদান দিয়ে একটি ভবন তৈরি করলেন। কিন্তু ভবনটি বেশিদিন টিকে থাকবে না। আপনি অস্বস্তি অনুভব করবেন এবং প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করবেন। সমাজের অবস্থাও তাই। সমাজের কাঠামো যদি ঠিক না থাকে, তাহলে সমাজ ভেঙে পড়ে, সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়, যা সমাজে অনেক সমস্যার জন্ম দেয়। আমরা ইচ্ছা করলেও সমস্যা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি না।

আমাদের সমাজকাঠামো ঠিক রাখাই এখানে বড় কাজ। সমাজকাঠামো অনেকগুলো উপাদানের সমষ্টি। সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক রীতিনীতি, আদর্শ, আইন, ধর্ম, নৈতিক মানদণ্ড ইত্যাদি উপাদান দিয়ে গঠিত। এগুলোর ভিত্তিতেই একটি সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, দলের সঙ্গে দলের, সমষ্টির সঙ্গে সমষ্টির এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্ক যদি শুধু সাময়িক স্বার্থ কিংবা প্রয়োজনের ভিত্তিতে তৈরি হতো, তাহলে সমাজ পুরোটাই ভেঙে পড়ত। কিন্তু আমরা লক্ষ করি যে আমাদের সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে যথেষ্ট গলদ তৈরি হচ্ছে। আমরা কেন যেন অতি মাত্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছি। আমরা শুধু ছুটছি আর ছুটছি, কিন্তু কোথায় থামতে হবে, তা জানি না। আমাদের যোগাযোগ মাধ্যম এতটা ভালো হওয়া সত্ত্বেও আমরা একে অপরের খোঁজখবর পর্যন্ত রাখছি না। আবার এই আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটাচ্ছি। যেখানে এক মিনিটে কারো অবস্থান এবং অবস্থা জানা সম্ভব, সেখানে আমরা কেউ মরে পচে গন্ধ বের হওয়ার পরও আমাদের নজরে আসছে না। আমাদের একজন সম্ভাবনাময় মেধাবী চিকিৎসক মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর গন্ধময় লাশ আমরা উদ্ধার করি। এই তিন দিন কি তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধুবান্ধব ছিল না, যারা তাঁর বাসায় গিয়ে একটু খোঁজখবর নিতে পারত। তাঁর কর্মস্থল এবং বাসা একদম কাছাকাছি ছিল। ধরে নিলাম পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকে, কিন্তু তাঁর সহকর্মী, কর্মস্থলের অভিভাবক কিংবা অন্য কেউ কি পারত না তাঁর বাসায় গিয়ে তাঁর অবস্থা জানতে। কী কারণে মারা গেছেন সেটি অন্য বিষয়, কিন্তু আমাদের ভাবার বিষয় অন্য জায়গা, যেখানে প্রতি মুহূর্তে একজনের খবরাখবর রাখা যায়, অথচ তিন দিন হয়ে গেলেও রাখছি না। ঠিক একইভাবে কয়েক মাস আগে একজন বয়স্ক মহিলার লাশ উদ্ধার করা হয়, যাঁর ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষিত। ঘটনাটি আমাদের অনেককে নাড়া দিয়েছিল। সবকিছুই সামাজিক সম্পর্কের অবনতি এবং সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতা। আমাদের সনাতন যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় আধুনিক এবং সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হওয়া সত্ত্বেও আমরা সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে।

সামাজিক মূল্যবোধ, রীতিনীতি সমাজের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বর্তায় ও রূপান্তরিত হয়ে সমাজ টিকে থাকে এবং সমাজের মধ্যে সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি মজবুত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে আজ সেটি কমে যাচ্ছে কিংবা আমরা তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি। এ ছাড়া আমাদের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবও অন্যতম কারণ। একসময়ে আমাদের পাশের বাসা, পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে অনেক সুন্দর সম্পর্ক ছিল। আমরা প্রয়োজনে ছোট বাচ্চাদের প্রতিবেশী কারো বাসায় রেখে নিজের কাজে যেতাম। কিন্তু আজ আমরা তা পারছি না। বিশেষ করে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে এটি একদম সম্ভব নয়। এমনকি আজ নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের কাছেও কন্যাশিশু নিরাপদ নয়। আমরা এমন এক সমাজে বসবাস করছি, যেখানে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা, মতবিনিময়, ভাবের আদান-প্রদান, মুখোমুখি আলাপ-আলোচনা অনেক কমে যাচ্ছে; যার পরিণতি আজকে মরে গেলেও কেউ খোঁজখবর না রাখার সমাজ। সবার কাছে আজ বড় প্রশ্ন, আমরা তো আগে এমন ছিলাম না। প্রযুক্তিজ্ঞানে আমরা দক্ষ ছিলাম না সত্য, কিন্তু সামাজিক সম্পর্কে আমরা ছিলাম অনেক ভালো। তবে কি প্রযুক্তি আমাদের দূরে সরিয়ে রেখেছে? একদম না। কেননা প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু প্রযুক্তির ডামাডোলে আমরা নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। আমরা ব্যর্থ হচ্ছি আমাদের সনাতন মূল্যবোধ এবং ধ্যান-ধারণাকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে। এবং আমরা নিজেরাও তা ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি; যার চরম পরিণতি সামাজিক সম্পর্কের দারুণ অবক্ষয়, যা প্রকান্তরে সমাজকাঠামোর ভঙ্গুরতাকে ইঙ্গিত করে। আমরা একটি টেকসই সমাজকাঠামোর প্রত্যাশা করি, যেখানে প্রত্যেকে সঠিক মূল্যবোধ ধারণ ও লালন করবে। আমরা এমন এক সামাজিক সম্পর্কের আশা করি, যেখানে প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে একটি সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখবে। সেই সম্পর্ক শুধু কথা দিয়ে নয়, শুধু ছবি শেয়ার করে নয়, কারো ভালো মুহূর্তগুলো শুধু প্রদর্শন এবং স্মরণ করে নয়, বরং কারো বিপদে সত্যিকারভাবে পাশে থাকা, প্রয়োজনে কারো খোঁজখবর নেওয়া এবং একটি স্বার্থহীন সম্পর্ক বজায় রাখা। সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি হবে এমন, যেখানে মূল্যবোধের লালন হবে, লালন হবে সামাজিক রীতিনীতির, সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ। সমাজের মানুষের মধ্যে প্রাত্যহিক সম্পর্ক বজায় রাখার সামর্থ্য থেকে কোনোভাবেই যেন আমরা বিচ্যুত না হই। আমাদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে যদি আমরা আমাদের মূল্যবোধগুলো পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে আমরা অনেকটা সফল হব বলে বিশ্বাস।                

লেখক : সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট