দেশে চার মাসের ব্যবধানে হাম ও হামের উপসর্গে শিশুমৃত্যু ৮০০ ছাড়িয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ হতে হতে একসময় শিশুর সংখ্যা যখন কমে আসবে, অর্থাৎ যখন আর কেউ বাকি থাকবে না, তখনই শুধু হামের সংক্রমণ কমবে। এর আগে নয়। কারণ অনেক শিশু হাম ও রুবেলার ‘এমআর’ টিকাবঞ্চিত হওয়া হাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গতকাল বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৩৭ জন। উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু চার শিশুর। এ নিয়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট মৃত্যু হয়েছে ৮০৩ জনের। আক্রান্ত এক লাখ ৩৫ হাজার ১৯৩ জন।
গত ১৪ জুলাই পর্যন্ত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দেশে হাম আক্রান্ত ও মৃত্যু শিশুদের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিশ্চিত হামে আক্রান্তদের ৮০ শতাংশ এবং মৃতদের ৯১.৪ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি।
হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা ৭৮.৬ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। এক ডোজ টিকা পেয়েছিল ১০.৯ শতাংশ এবং দুই ডোজ পেয়েছে ১০.৫ শতাংশ। ইপিআই উপসর্গে আক্রান্ত ৬৬ হাজার ৬৯০ জন ও নিশ্চিত হাম আক্রান্ত ১৪ হাজার শিশুর ওপর সমীক্ষা চালায়।
ইপিআইয়ের সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃতদের ৯১.৪ শতাংশ কোনো এমআর টিকা নেয়নি। মাত্র ৬.৫৪ শতাংশ এক ডোজ এবং ২.১ শতাংশ দুই ডোজ টিকা পেয়েছিল। ২৪ শতাংশের টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। ৩৩৭ জনের পৃথক বিশ্লেষণে আরো উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৃতদের ২২ শতাংশের বয়স ছিল ছয় মাসের কম, ৩০ শতাংশের বয়স ছয় থেকে ৯ মাস, ২৫ শতাংশের বয়স ৯ থেকে ১১ মাস এবং ১৭ শতাংশের বয়স এক থেকে চার বছর। অর্থাৎ অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটেছে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বলেন, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুরা সাধারণত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল থাকে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে মাতৃপ্রদত্ত প্রতিরোধক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত থাকছে না।
তিনি বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। এটি নিয়ন্ত্রণে অন্তত ৯৪ শতাংশ শিশুর সুরক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো টিকার কার্যকারিতা শতভাগ নয়। তাই শুধু নিয়মিত টিকাদান নয়, নির্দিষ্ট সময় পরপর গণটিকাদান কর্মসূচিও চালিয়ে যেতে হবে।
হামের প্রাদুর্ভাবের পর সরকার ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় এবং পরে সারা দেশে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি চালায়। ২০ মে পর্যন্ত চলা এই কর্মসূচিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর লক্ষ্যমাত্রার ১০৩ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়ার দাবি করে। কিন্তু চার সপ্তাহ পার হলেও সংক্রমণ প্রত্যাশিত হারে কমেনি।
এ নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এটি শুধু টিকাবঞ্চিত শিশুদের সংকট নয়; বরং দেশের টিকাদান কর্মসূচির কার্যকারিতা ও কাভারেজ নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
জাতীয় ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, যদি প্রকৃত অর্থেই শতভাগের কাছাকাছি টিকাদান সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সংক্রমণ আরো দ্রুত কমে আসার কথা। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো বর্তমানে কোন বয়সী শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং টিকাবঞ্চিত শিশু কোথায় রয়ে গেছে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করলেই সফলতা আসে না। প্রকৃত কাভারেজ জানতে স্বাধীন জরিপ করতে হবে। একই সঙ্গে বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ প্রত্যাশিত হারে না কমলে টিকার কার্যকারিতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন জরুরি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য বলছে, সংক্রমণ ও মৃত্যু ধীরে ধীরে কমতির দিকে। তবে সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং মৃত্যুও থামেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, যত দিন পর্যন্ত টিকাবঞ্চিত শিশুদের খুঁজে বের করে কার্যকরভাবে টিকার আওতায় আনা না যাবে, তত দিন হামের এই সংক্রমণচক্র পুরোপুরি ভাঙা কঠিন হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. বেনজির আহমেদ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে টিকার সময়সূচি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে। তিনি বলেন, আক্রান্ত ও মৃতদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে, টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজের ব্যবধান কিংবা বয়সসীমায় পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না। পাশাপাশি ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকার আওতায় আনার বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।