• ই-পেপার

প্রধান বিচারপতি

পেশার প্রতি জমির উদ্দিন সরকারের ছিল অসীম ডেডিকেশন

উক্তি

উক্তি

শহীদ জিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার মোজাফফর হোসেনের বিচার সেনা আইনে হবে।

সালাহউদ্দিন আহমদ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী বার্নহ্যাম

ব্রিটেনবাসী পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
ব্রিটেনবাসী পরিবর্তন প্রত্যাশা করছে
অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

ব্রিটেনের রাজনীতিতে শুরু হলো নতুন নেতৃত্বের অধ্যায়। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির নতুন নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায়ি প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে তিনি দেশের সরকারপ্রধানের দায়িত্ব নেন। ব্রিটেনের সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, রাজা তৃতীয় চার্লস তাঁকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান। বাকিংহাম প্রাসাদে আনুষ্ঠানিকতা শেষে ডাউনিং স্ট্রিটে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন বার্নহ্যাম।

দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম বক্তব্যে উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের কাছে কিং অব দ্য নর্থ নামে পরিচিত বার্নহ্যাম বলেন, ব্রিটেনের মানুষ পরিবর্তন, স্থিতিশীলতা এবং নতুন আশার প্রত্যাশা করছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিভাজন পেছনে ফেলে দেশের মানুষের আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই হবে তাঁর সরকারের প্রধান লক্ষ্য। একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় নেতৃত্বকে আরো শক্তিশালী করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

বার্নহ্যামের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। যুক্তরাজ্যের সাংবিধানিক রীতি অনুযায়ী, পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা পরিবর্তিত হলে সেই দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই লেবার পার্টির নতুন নেতা হিসেবে ব্রিটেনের নেতৃত্বে এলেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।

অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘদিন এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জাতীয় রাজনীতিতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বার্নহ্যামের নেতৃত্বে ব্রিটেনের রাজনীতিতে আঞ্চলিক উন্নয়ন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থনৈতিক ভারসাম্যের প্রশ্নটি আরো বেশি গুরুত্ব পাবে।

মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছাবিনিময়

দেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের আহবান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের আহবান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

মিত্র রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদারের বার্তা দিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও নৈশভোজে মিলিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এ সময় তিনি বলেন, অতীতের মতো ভবিষ্যতেও সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে দেশ গঠনে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফা এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।

গতকাল সোমবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। শুভেচ্ছাবিনিময় শেষে মিত্রদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করেন প্রধানমন্ত্রী। মেন্যুতে ছিল সবজি, সাদা ভাত, বুটের ডাল, মুরগির মাংস ও দই।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈঠকে ৪১টি রাজনৈতিক দলের ১৮৪ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। তবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও জমিয়তে ইসলাম অনুষ্ঠানে অংশ নেয়নি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একসঙ্গে ছিলাম, আছি এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকব। মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু বিভেদের কোনো কারণ নেই। ৩১ দফার মাধ্যমে আমরা একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছি।

তিনি বলেন, ৩১ দফা বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু লক্ষ্য এক। ৩১ দফা ও জুলাই সনদের আলোকে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

 

গুপ্তরা আন্দোলনে ছিল না

আন্দোলনের সময়ের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে যাঁরা বিভিন্ন দাবি করছেন, তাঁদের অনেককে আন্দোলনের সময় রাজপথে দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ১৭ বছর আমরা রাজপথে আন্দোলন করেছি। তখন যাদের আজকে দেখা যাচ্ছে, তাদের রাজপথে পাইনি।

তাঁর ভাষ্য, জনগণ দীর্ঘ আন্দোলনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে বলেই তাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সেই আস্থা ধরে রাখতে সব মিত্র দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তিনি বলেন, আগে জনগণের দায়িত্ব পালন করি, পরে নিজেদের কথা ভাবব।

 

আন্দোলনের স্মৃতিচারণা

বক্তব্যের শুরুতে দীর্ঘ আন্দোলনে অংশ নেওয়া নেতাদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সফল হওয়ার পর জনগণ তাঁদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।

তিনি বলেন, ৩১ দফা ঘোষণার সময় অনেক রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে কথা বলেননি। অথচ পরে তাঁরাই সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রবক্তা হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে, স্বৈরাচারী সরকারের চাপ উপেক্ষা করেই যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা করেছিল।

তিনি আরো বলেন, জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে ৩১ দফার পক্ষেই রায় দিয়েছে। তাই এটি এখন শুধু রাজনৈতিক জোটের কর্মসূচি নয়, বরং জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে।

 

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রসঙ্গ

তারেক রহমান বলেন, কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে। নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, ওই উপদেষ্টা তাঁকে বলেছেন, ১৮ মাস সরকার পরিচালনার সময় প্রশাসনের ৬০ শতাংশের বেশি অংশে একটি গুপ্ত বাহিনীর প্রভাব ছিল। তাঁর ভাষ্য, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ওই গোষ্ঠী দিশাহারা হয়ে পড়ে।

এ সময় তিনি আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনীতি, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতের সংকটের কথাও তুলে ধরেন এবং সেগুলো মোকাবেলায় সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

দেশ গড়তে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজের আহবান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার

শরিকদের উদ্দেশে

মিত্রদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এত দিন একসঙ্গে ছিলাম, ভবিষ্যতেও থাকব। পথ চলতে ছোটখাটো মতভেদ হতে পারে, কিন্তু ঐক্য অটুট রাখতে হবে।

অনুষ্ঠানে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক জানতে চান, এটি ফেয়ারওয়েল ডিনার কি না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই না, এটি ওয়েলকাম ডিনার। রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার কারণে একসঙ্গে বসা হয়নি। এখন থেকে নিয়মিত বসা হবে।

পরে তিনি বুফে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেন এবং শরিক নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে নৈশভোজে অংশ নেন। সেখানে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) মোস্তফা জামাল হায়দার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, গণফোরামের সুব্রত চৌধুরী এবং ভাসানী জনশক্তি পার্টির শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলুসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

 

ফখরুলের ব্রিফিং

শুভেচ্ছাবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পাঁচ মাস পর মিত্র দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এ বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ আন্দোলনের সহযোদ্ধাদের এই মিলন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও রাষ্ট্র সংস্কারের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্রিফিংয়ের শুরুতে তিনি জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী আন্দোলনকারীদের অবদানের কথাও স্মরণ করেন।

সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রম তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণ, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, পুরোহিত ও ফাদারদের ভাতা, খেলোয়াড়দের ভাতা এবং খাল খনন কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার একটি ভেঙে পড়া রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দায়িত্ব নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে।

রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, যুগপৎ আন্দোলনের সময় ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে স্বাক্ষরিত জুলাই সনদও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

তিনি জানান, জাতীয় ঐক্য সুসংহত করা, রাষ্ট্র সংস্কার এগিয়ে নেওয়া এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে সমন্বয় জোরদারে প্রধানমন্ত্রী ভবিষ্যতেও মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করবেন।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, বর্তমান আইনে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তবু মেসির কীর্তি উজ্জ্বল, অমলিন

রানা শেখ
তবু মেসির কীর্তি উজ্জ্বল, অমলিন
ম্যাচ শেষে মেসি ও ইয়ামালের আরাধ্য আলিঙ্গন। ছবি : রয়টার্স

মাঠ তখন প্রায় ফাঁকা। স্পেনের ফুটবলাররা উল্লাসে মেতেছেন, গ্যালারিজুড়ে উৎসবের ঢেউ। অথচ সেই কোলাহলের মধ্যেই এক কোণে একা বসে আছেন লিওনেল মেসি। মাথা নিচু, চোখ ভেজা। কয়েক গজ দূরে ঝলমল করছে বিশ্বকাপ ট্রফি। অথচ সেটি আর তাঁর নয়। চার বছর ধরে যে স্বপ্ন বুকে নিয়ে তিনি আবার ফিরেছিলেন, সেটি শেষ পর্যন্ত ভেঙে গেল এক নিঃশব্দ সন্ধ্যায়। নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামের সেই একাকী মুহূর্তটিই হয়তো বলে হয়তো বলে দিল, সব রূপকথার শেষটা জয় দিয়ে লেখা হয় না। ১-০ ব্যবধানে স্পেনের কাছে হেরে বিশ্বকাপের মুকুট হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। হারিয়েছে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়ার সুযোগও। কিন্তু স্কোরলাইনের চেয়েও বড় হয়ে থাকবে ম্যাচ শেষে একা বসে থাকা মেসির সেই ছবি। ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য জাদুকরী মুহূর্ত উপহার দেওয়া মানুষটিকে শেষ বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা গেল অশ্রুসিক্ত চোখে। হয়তো সেই এক ফোঁটা অশ্রুই বলে দিচ্ছিল, রূপকথার শেষটা এমন হওয়ার কথা ছিল না!

নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামে সূর্য পশ্চিম গ্যালারির আড়ালে নামার সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠল এক নির্মম সত্য, আর্জেন্টিনার জাদু শেষ হয়ে গেছে। আর সেই জাদুর শেষ দৃশ্যটি লিখেছে স্পেন। পুরো বিশ্বকাপে যে দল নাটকীয় প্রত্যাবর্তন আর আক্রমণাত্মক ফুটবলে দর্শকদের মুগ্ধ করেছে, ফাইনালে যেন সেই দলকে খুঁজেই পাওয়া গেল না। বল পায়ে ছিল, কিন্তু গতি ছিল না। পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু আত্মবিশ্বাস ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা, ছিল না সেই আর্জেন্টিনা, যারা প্রতিকূলতাকে নিজেদের শক্তিতে পরিণত করেছিল। ফাইনাল এমনিতেই অনেক সময় সৌন্দর্য হারায়। সতর্কতা আর স্নায়ুচাপ ম্যাচকে রুদ্ধশ্বাসের বদলে রুদ্ধ করে দেয়। কিন্তু এই ফাইনালে আর্জেন্টিনা যেন শুরু থেকেই নিজেদের গুটিয়ে ফেলেছিল। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটি শটও নিতে পারেনি তারা, বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রায় ১০০ বছরের ইতিহাসে যা আগে কখনো ঘটেনি। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটও সেই চিত্র বদলাতে পারেনি। গোল তো দূরের কথা, স্পেনের গোলরক্ষককে সত্যিকারের পরীক্ষায়ও ফেলতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

আর মেসি? ফাইনালের আগ পর্যন্ত এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটির নামই ছিল লিওনেল মেসি। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি সময়কে যেন নিজের ইচ্ছামতো বাঁকিয়ে দিয়েছেন। তাঁর প্রতিটি স্পর্শ যেন ফিরিয়ে এনেছে ফুটবলের সোনালি দিনগুলো। মনে হয়েছে, বয়স শুধু ক্যালেন্ডারের একটি সংখ্যা। কিন্তু ফাইনালে সেই মেসিকেও খুঁজে পাওয়া গেল না। স্পেনের নিখুঁত রক্ষণ তাঁকে ম্যাচের বাইরে ঠেলে দেয়। বল পেয়েছেন কম, জায়গা পেয়েছেন আরো কম। যিনি পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার প্রাণ ছিলেন, শিরোপার মঞ্চে তিনি হয়ে গেলেন প্রায় নীরব এক দর্শক। ট্রফি হাতছাড়া হয়েছে, কিন্তু কিংবদন্তির আলো নিভে যায়নি। বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, চ্যাম্পিয়নস লিগ, ব্যালন ডিঅরফুটবলে জেতার মতো প্রায় সবকিছুই তিনি জিতেছেন। এই ফাইনাল জিতলে শুধু তাঁর কিংবদন্তিতে আরেকটি অলংকার যোগ হতো; কিন্তু না জেতায় সেই কিংবদন্তির উজ্জ্বলতা এতটুকুও কমেনি। তবু আক্ষেপ থেকে যায়। কারণ এই ম্যাচ ছিল এক রূপকথার নিখুঁত সমাপ্তি লেখার সুযোগ। অথচ সেই রূপকথার শেষ লাইনটি লিখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। পুরো টুর্নামেন্টে যাদের দৃঢ়তা ছিল অনুপ্রেরণার প্রতীক, শেষ ম্যাচে তারাই হয়ে উঠল অস্থির, অসংলগ্ন ও হতাশ একটি দল।

লিওনেল স্কালোনির অর্জনও এই একটি ম্যাচে মুছে যাবে না। তিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করেছেন, কোপা আমেরিকা জিতিয়েছেন, একটি প্রজন্মকে বিশ্বাস ফিরিয়ে দিয়েছেন। তবু এটাও সত্য, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চেই নিজেদের সবচেয়ে বিবর্ণ রূপটি দেখল আর্জেন্টিনা। ম্যাচ শেষে ফুটবল যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল। স্পেনের ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন মেসিকে। একজনের চোখে বিশ্বজয়ের উচ্ছ্বাস, অন্যজনের চোখে অপূর্ণতার অশ্রু। এক ফ্রেমে দাঁড়িয়ে ছিল ফুটবলের দুই প্রজন্মএকজন যাঁর গল্প প্রায় শেষের পথে, আরেকজন যাঁর গল্প সবে শুরু। হয়তো এভাবেই ফুটবল তার উত্তরাধিকার এক হাত থেকে আরেক হাতে তুলে দেয়। এটাই কি তবে মেসির শেষ বিশ্বকাপ? উত্তরটা হয়তো সময়ই দেবে। কারণ এই মানুষটিকে নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলার সাহস ফুটবল বহুবার হারিয়েছে। ২০১৬ সালে জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েও ফিরেছিলেন। ২০২২ সালের পরও অনেকে ভেবেছিল বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ, অথচ তিনি আবারও ফিরে এসে স্বপ্ন দেখিয়েছেন একটি জাতিকে।

তবু যদি এটা সত্যিই শেষ হয়ে থাকে, তবে সেটি কোনো ব্যর্থতার গল্প নয়; বরং এক অসমাপ্ত সৌন্দর্যের গল্প। সব কিংবদন্তি ট্রফি উঁচিয়ে বিদায় নেন না। কেউ কেউ বিদায় নেন কোটি মানুষের স্মৃতিতে অমলিন থেকে, কিছু অপূর্ণতা আর একরাশ দীর্ঘশ্বাস সঙ্গে নিয়ে। তাই মেসির গল্পে হয়তো আজও ফুল স্টপ পড়েনি। শুধু শেষ অধ্যায়ে রয়ে গেছে অপূর্ণতার এক গভীর দাগ। বহু বছর পর মানুষ হয়তো এই ফাইনালের স্কোরলাইন ভুলে যাবে, কিন্তু মাঠের এক কোণে মাথা নিচু করে বসে থাকা লিওনেল মেসির সেই ছবি এবং তাঁকে জড়িয়ে ধরা তরুণ ইয়ামালের মুহূর্তটি ভুলবে না কখনো।