মেক্সিকো সিটির আকাশে তখন দুপুরের রোদ। আজতেকা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে লাখো দর্শকের গর্জন। ইংল্যান্ডের গোলপোস্টের সামনে হঠাৎ উড়ে এলো বল। গোলরক্ষক পিটার শিলটন দুই হাত বাড়িয়ে বলটা যেই না ধরতে যাবেন, অমনি পাশেই লাফিয়ে উঠলেন পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চির ঝাঁকড়া চুলের এক খেলোয়াড়। মুহূর্তেই বল জড়িয়ে দিলেন জালে। ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা দেখেছেন, গোলটি মাথায় নয়, হাতে হয়েছে। তবে তিউনিশিয়ান রেফারি আলী বিন নাসেরের বাঁশি ততক্ষণে বেজে গেছে। পরে ডিয়েগো ম্যারাডোনা জানিয়েছিলেন, গোলের সময় বলে তাঁর মাথার ছোঁয়া ছিল সামান্য, বাকিটা ছিল ‘ঈশ্বরের হাত’। কয়েক মিনিট পরে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ইংল্যান্ডের পাঁচ ফুটবলার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে এক অবিশ্বাস্য গোল করেন তিনি। ছিয়াশির বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সেদিন সেই দুই গোল করে ম্যারাডোনা শুধু ইংল্যান্ডকে হারাননি; তিনি যেন ইতিহাস, রাজনীতি আর জাতীয় অপমানের প্রতিশোধও নিয়েছিলেন। চার দশক পর ফের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। অন্য ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ অভিযান শেষ করেছে নরওয়ে। আর তাতেই তৈরি হয়েছে লড়াইয়ের এমন এক মঞ্চ, যেটি একটি ফুটবল ম্যাচ হলেও ইতিহাস জানে, তা শুধুই ফুটবল নয়।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা বৈরিতার বীজ আসলে বোনা হয়েছিল তারও ২০ বছর আগে, ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে। স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা। সেদিন ম্যাচের মাত্র ৩৫ মিনিটে তাকানোর ভঙ্গি ভালো না লাগায় আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রেইটলাইন। ভাষাগত সমস্যার কারণে রাত্তিন বুঝতেই পারেননি, কেন তাঁকে মাঠ ছাড়তে বলা হচ্ছে। তিনি মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে প্রায় আট মিনিট বন্ধ থাকে খেলা। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে যান। পরে জিওফ্রে হার্স্টের গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড। আর্জেন্টিনার কাছে সেটি ছিল প্রকাশ্য অবিচার। এ ছাড়া ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ স্যার আলফ রামসি আর্জেন্টাইনদের ‘পশু’ বলেও মন্তব্য করেন। তাতে বিশ্বকাপের একটি ম্যাচ মুহূর্তেই রূপ নেয় দুই দেশের অহমের লড়াইয়ে। ১৯৮২ সালে সেই ক্ষোভ আরো গভীর হয়। দক্ষিণ আটলান্টিকের ছোট্ট ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুদ্ধে জড়ায় দুই দেশ। ৭৪ দিনের যুদ্ধে জয়ী হয় যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনার জন্য যেটি ছিল সামরিক পরাজয়ের পাশাপাশি জাতীয় অপমানের প্রতীকও। ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ছিয়াশির বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামার পর তাঁদের সেই যুদ্ধের কথা মনে পড়েছিল, মনে পড়েছিল ফকল্যান্ডে নিহত তরুণদের কথা এবং ১৯৬৬ সালের অপমানও। তাইতো ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলকে তিনি প্রতারণা হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন ইতিহাসের পাল্টা জবাব হিসেবেই।
১৯৮৬ সালের সেই হার ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসে এক অমোচনীয় দাগ। ১৯৯৮-র বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। তবে ডেভিড বেকহামের লাল কার্ডে বিপদে পড়ে ইংল্যান্ড। টাইব্রেকারে ফের জেতে আর্জেন্টিনা। চার বছর পর জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে সেই ডেভিড বেকহামের গোলে অবশেষে জয়ের দেখা পায় ইংল্যান্ড। তবে সেটি ছিল গ্রুপ পর্বের ম্যাচ। তাই নক আউটের প্রতিশোধ এখনো অসম্পূর্ণ। ইংল্যান্ডের কাছে আর্জেন্টিনা এখন শুধু প্রতিপক্ষ নয়, এমন এক নাম, যা শুনলেই ফিরে আসে আজতেকার স্মৃতি।
সেই ম্যারাডোনা নেই। অবসরের পর মেসির পায়ের জাদুতে প্রেম জমেছে ডেভিড বেকহামের। শিলটন, লিনেকার, ভালদানো কিংবা বুরুচাগাও ইতিহাসের পাতায়।
ইংল্যান্ডের আক্রমণের প্রাণ এখন জুড বেলিংহাম। মাঝমাঠে তাঁর নেতৃত্ব, হ্যারি কেইনের গোল করার সক্ষমতা, বুকায়ো সাকার গতি আর টমাস টুখেলের পরিকল্পনা ইংল্যান্ডকে করেছে শিরোপার অন্যতম দাবিদার। অন্যদিকে ম্যারাডোনার রেখে যাওয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তরাধিকার আজও বয়ে চলেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা, যাদের প্রতিটি প্রজন্মকে শেখানো হয়—ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ কখনোই শুধু একটি ম্যাচ নয়। তাইতো আবারও ফিরে এসেছে ১৯৬৬ সালের বিতর্ক, ১৯৮২ সালের যুদ্ধ আর ১৯৮৬ সালের আজতেকা। ইতিহাস কখনো মাঠে খেলে না, তবে এক অদৃশ্য চাপ হয়ে বসে থাকে খেলোয়াড়দের কাঁধে। এ জন্য বুধবার রাতের সেমিফাইনাল শুধু ফাইনালিস্টই নির্ধারণ করবে না; আরো একবার লিখবে ফুটবল ইতিহাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন অধ্যায়। হয়তো আজতেকার সেই ক্ষত শুকাবে ইংল্যান্ডের, নয়তো আরো গভীর হবে।



