
তাঁর জাদুও বাঁ পায়েই
আজ কী হতে পারে

স্পেনের নিরাপত্তা সিমনের হাতে

ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মে আছেন এখন তিনি। সেটিও আবার মর্যাদার বিশ্বকাপ মঞ্চে। গোলপোস্টে উনাই সিমন চলতি বিশ্বকাপে যা করেছেন, সে কারণেই আজ ফাইনালে স্পেন বেশ নিরাপদ বোধ করছে। কারণ এবারের আসরে সাত ম্যাচে রেকর্ড ছয়টিতেই তিনি লা রোজাদের গোলপোস্ট রেখেছেন সুরক্ষিত। এবার রীতিমতো অগ্নিপরীক্ষা এই ২৯ বছর বয়সী গোলরক্ষকের। কারণ প্রতিপক্ষ দলে আছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ২১ গোলের রেকর্ডধারী লিওনেল মেসি। তিনি শুধু গোলই করছেন তা নয়, পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করাচ্ছেনও। অবিশ্বাস্য সব সুযোগও তৈরি করে দিচ্ছেন।
নক আউটের ম্যাচগুলোয় শেষ দিকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে আর্জেন্টাইনরা। এবারের আসরে দল হিসেবে সর্বাধিক ১৯টি গোল করেছে আর্জেন্টিনা, যার মধ্যে ম্যাচের ৭৫ মিনিটের পরই প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়েছে ১১টি গোল। এই পরিসংখ্যানটা যেকোনো গোলরক্ষকের জন্যই হুমকি। সিমন অবশ্য পুরো টুর্নামেন্টে শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে একটি গোল হজম করেছেন। এ ছাড়া পর্তুগালের মতো বড় দল ও ফ্রান্সের মতো বিধ্বংসী আক্রমণভাগও তাঁকে পরাস্ত করতে পারেনি। স্প্যানিশ লা লিগায় ২০২৩-২৪ মৌসুমে সিমন সবচেয়ে কম ৩৩ গোল (৩৬ ম্যাচ) হজম করে জেতেন মর্যাদার ‘জামেরা ট্রফি’। ক্যারিয়ারে সেটাই তাঁর সেরা ব্যক্তিগত অর্জন। সেটিকে ছাপিয়ে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জেতার ক্ষেত্রে এগিয়েই আছেন সিমন। এবার বিশ্বকাপে ১৪টি সেভ করেছেন তিনি। ডি-বক্সে তাঁর ১০৮টি দুর্দান্ত মুভমেন্ট প্রতিপক্ষের আক্রমণকে বিফল করে দিয়েছে। গোলপোস্ট যেখানে এতটাই নিরাপদ, সেখানে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আজ ফাইনালে ভারমুক্তই থাকতে পারবে স্প্যানিয়ার্ডরা।
জেতার স্বপ্ন অটুট এমিলিয়ানোর

কৈশোরে নিবিড় অনুশীলন করতেন নিজ শহর মার দেল প্লাতার এক বাগানে। আর মনে মনে বুনে চলতেন অনেক বড় কিছু অর্জনের স্বপ্ন। পরের ১৪ বছরের মধ্যেই তাঁকে ধরা দিয়েছে অনেক প্রাপ্তি, যার মধ্যে আছে মর্যাদার বিশ্বকাপ ট্রফি এবং গোল্ডেন গ্লাভস পুরস্কারও। সেই স্বপ্ন দেখার অভ্যাসটা ৩৩ বছর বয়সেও এমিলিয়ানো মার্তিনেসের মধ্যে অটুট। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে নামার আগে তিনিই মনে করিয়ে দিয়েছেন সেটি, “পোস্টের নিচে আমি বেশ আত্মবিশ্বাসী, মার দেল প্লাতার বাগানে খেলা সেই পুরনো ‘দিবু’-ই আছি আমি।”
যদিও ইনজুরির কারণে বেশ ভুগেছেন এবার, সে কারণে তেমন আলোচিত কোনো পারফরম্যান্স দেখাতে পারেননি এমিলিয়ানো। বরং সমালোচকরা কানাঘুষা করছেন আগের সেই ‘বাজপাখি’ দিবুকে পাওয়া যাচ্ছে না এবার। কিন্তু এসব নিয়ে না ভেবে স্পেনের বিপক্ষে নামার আগে এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের ঘোষণা একটাই, ‘জেতার বাইরে অন্য কিছুতে মনোযোগ নেই।’ বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে পাওয়া আঙুলের চোটের প্রভাবে আগের ম্যাচগুলোয় খুঁজে পাওয়া যায়নি আসল এমিলিয়ানোকে। বিশেষজ্ঞরা অস্ত্রোপচার করাতে বললেও বিশ্বকাপের জন্যই সেই পথে হাঁটেননি। এখন তাঁর দাবি, ‘শেষ ষোলোর পর থেকে বেশ ভালো অবস্থায় আছি।’ তার মানে ফাইনালে গত আসরের ‘বাজপাখি’-কে এবার দেখবে স্পেন। তিনি চ্যালেঞ্জ জানাবেন মিকেল ওয়াইরসাবাল, মিকেল মেরিনো, লামিন ইয়ামালদের। এমিলিয়ানো বলেছেন, ‘আমি চাই জিততে। এই বিশ্বকাপটি উপভোগ করছি আগেরটির চেয়েও অনেক বেশি। আমার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এখন আরো ভালো, বল পায়েও আমি পরিপক্ব হয়েছি আগের চেয়ে।’
মেসি আছেন বলেই...

ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলন সাধারণত ম্যাচের আগের দিনই হয়ে থাকে। ফাইনালের আগে হলো ব্যতিক্রম। সংবাদ সম্মেলন হলো তারও এক দিন আগে। ফাইনালের আগের দিনটায় দুই দলের মনঃসংযোগে ব্যাঘাত না ঘটাতেই হয়তো বা। দুটি দলই উঠেছে নিউজার্সিতে, কিন্তু সংবাদ সম্মেলন হলো নিউইয়র্ক সিটিতে। পৃষ্ঠপোষকদের কিছু চাহিদা তো ছিলই। কোচের সঙ্গে একজন করে খেলোয়াড় এলেন, লুইস দে লা ফুয়েন্তের সঙ্গে রদ্রি আর লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে এমিলিয়ানো মার্তিনেস; কিন্তু এর বাইরে এলেন লিওনেল মেসি। ফাইনালের আগে সেটিই হয়তো চাহিদা। নিউজার্সি থেকে হেলিকপ্টারে করে উড়িয়ে আনা হলো মেসিদের।
প্রথাগত সংবাদ সম্মেলনের বাইরে দর্শক উপস্থিতিতে আরো একটি আয়োজন ছিল। স্বাভাবিকভাবে মেসিই সেখানে মধ্যমণি। রিও ফার্ডিনান্ড অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন, একটু পর তাঁর সঙ্গে যোগ হলেন নোভাক জোকোভিচ। দর্শকদের তেমনি চমকে দিয়ে মঞ্চে হাজির বাস্কেটবল তারকা কেভিন ডুরান্ট। পরে মূল সংবাদ সম্মেলন শুরু হলে আর্জেন্টাইন একজন সাংবাদিক রাখঢাক না রেখেই স্কালোনির কাছে জানতে চাইলেন, এটিই আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির শেষ ম্যাচ কি না? ফাইনালের আগের দিন মেসিকে নিয়ে বাড়তি আয়োজন থাকলেও এই প্রশ্নটা সেখানে এড়িয়েই যাওয়া হয়েছে। মেসির শেষ ম্যাচ—তেমন কিছু যে ফাইনালের আবহকেও ছাপিয়ে যেতে পারে। মেসি নিজেও হয়তো চাননি তা। স্কালোনিও জবাব দিতে চাননি, ‘আপনি এটি মেসিকেই জিজ্ঞাসা করুন, আমি কিভাবে জানব। সে ক্রমাগত আমাদের চমকে দিয়ে যাচ্ছে।’ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের আগেও আলোচনাটা উঠেছিল, সেটিই বিশ্বকাপে মেসির শেষ ম্যাচ কি না। সেখান থেকে আরো একটা বিশ্বকাপ, মেসির ফাইনালে উঠে আসা, শেষটা সত্যিই মেসি ছাড়া আর কে বলতে পারেন।
স্কালোনি বরং এই সুযোগে আর্জেন্টাইন খুদে জাদুকরের প্রতি আরো একবার নিজের নৈবেদ্য ঢেলে দিলেন, ‘আমরা ডিয়েগোকে (ম্যারাডোনা) এখনো মিস করি। তবে মেসি এখনো আমাদের সামনে আছে, আসুন তাকে উপভোগ করি। ৩৯ বছর বয়সে আরো একটা বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে নিয়ে গেছে সে দলকে, এটি অবিশ্বাস্য।’ ৮ গোল আর ৪ অ্যাসিস্ট নিয়ে বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটও হয়তো জিততে যাচ্ছেন তিনি। ফাইনালে আরো একবার তাঁর জাদুকরী পায়ের দিকে তাকিয়ে সবাই। লুইস দে লা ফুয়েন্তেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, এই মেসিকে তিনি কিভাবে থামাবেন। উত্তরে স্প্যানিশ কোচ বরং গল্প শুনিয়েছেন, ‘আমি তখন সেভিয়ার যুব দলে কাজ করি। মেসি বার্সেলোনার জুনিয়র দলের হয়ে খেলতে এসেছিল। আমি তখন তাকে মার্ক করার জন্য একজনকে ঠিক করি। দেখা গেল, সে সেই কাজ করতে গিয়ে হলুদ কার্ড খেয়ে বসেছে। আমি ওকে তুলে নিলাম, কিন্তু মেসি এরপর ৪ গোল করল আমাদের বিপক্ষে।’ সেই মেসিকে নিয়ে পরিকল্পনা সাজানো তাই অনেক ক্ষেত্রেই অর্থহীন। সর্বশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও প্রত্যাবর্তনের নায়ক তিনি।
ফাইনালের জন্য তাঁর জাদুর ঝুলিতে আর কী কী তুলে রেখেছেন, সেটিই এখন দেখার। মেসিহীন আর্জেন্টিনা দলটাকে সাধারণই মনে হবে; কিন্তু মেসিকে মাঝখানে রেখে এই সাধারণ গোছের দলটিই যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। হতে পারে আজ শেষবার এই ছবিটা দেখা। শেষ হাসিটাও হয়তো থাকবে।
