• ই-পেপার

পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা কিসের আলামত

  • ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন

অনেক সময় একটি দেশের ভবিষ্যেক বোঝা যায় তার শিশু বা কিশোরদের দিকে তাকিয়েই। শিশুরা নিজে থেকে কোনো সমাজকে বদলে দিতে পারে না। তারা প্রথমে বিদ্যমান সমাজকেই অনুকরণ করে। তারা বড়দের ভাষা ধার করে, বড়দের আচরণ নকল করে, বড়দের রাজনীতির প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কয়েক দিন আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রবল বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বন্যার মধ্যেও পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া হয়েছে; অনেক পরীক্ষার্থী চরম ভোগান্তির মধ্যে কেন্দ্রে পৌঁছেছে, কেউ কেউ পরীক্ষায় অংশ নিতেও ব্যর্থ হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো কোনো প্রশ্নপত্রের মান নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষামন্ত্রীর কিছু মন্তব্য নিয়েও শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো আন্দোলনের যৌক্তিকতা বিচার করা নয়। এখানে আমি একটি ভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করতে চাই। আমাদের শিশুরা আন্দোলন করতে গিয়ে যেসব আচরণ করছে, যেসব ভাষা ব্যবহার করছে, সেগুলোর সবকিছু কি কাঙ্ক্ষিত? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, শিশুরা কেন আজ এমন ভাষায় কথা বলছে? তাদের ব্যবহৃত ভাষা, অনেক শব্দ একসময় প্রাপ্তবয়স্ক রাজনীতিকদের কাছেও অশোভন বলে বিবেচিত হতো। কিন্তু আজ তা কি স্বাভাবিকে পরিণত হতে চলেছে? এর কারণ কি শিশু বা কিশোররা? এর উত্তরে সহজেই বলা যায়, না।

সাম্প্রতিক বেশ কয়েকটি আন্দোলনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বহু মানুষ একটি বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সেটি হলো কিছু স্লোগান ও বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণ, কটাক্ষ এবং অসম্মানজনক ভাষার ব্যবহার। আবার অন্যদিকে অনেকেই বলেছে, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিষয়টি দেখা উচিত। অর্থাৎ জনপরিসরে দুটি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছেএকটি প্রতিবাদের অধিকারের পক্ষে, অন্যটি প্রতিবাদের ভাষা ও আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্নতা।

আন্দোলনে ভাষা ব্যবহারের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্নএই দুই অবস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়েই আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি করা দরকার। শিশুরা এমন ভাষা শিখল কোথা থেকে? শিশু জন্মের সময় কোনো রাজনৈতিক ভাষা নিয়ে পৃথিবীতে আসে না। সে জানে না কাকে অপমান করতে হয়, কাকে বিদ্রুপ করতে হয় কিংবা কিভাবে প্রতিপক্ষকে হেয় করতে হয়। এসব সে শেখে পরিবার থেকে, আশপাশের সমাজ থেকে, টেলিভিশনের পর্দা থেকে, ফেসবুকের ভিডিও থেকে, ইউটিউবের শর্টস থেকে এবং সর্বোপরি বড়দের কাছ থেকে। অর্থাৎ শিশুর মুখে যে ভাষা আমরা শুনি, সেটি আসলে আমাদেরই ভাষা।

আমরা যদি গত এক দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে তাকাই, তাহলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মতের অমিলকে যুক্তি দিয়ে মোকাবেলা করার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, প্রতিপক্ষকে অপমান এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলএসব ধীরে ধীরে যেন স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সংসদে, রাজনৈতিক সমাবেশে, টক শোতে, এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আমরা প্রতিদিন এমন সব ভাষা শুনছি, যা কয়েক বছর আগেও অস্বাভাবিক বলে মনে হতো। এমন বাস্তবতায় বড় হওয়া একটি শিশু যখন আন্দোলনে নামে, তখন সে কি হঠাৎ করেই ভদ্র, সংযত ও যুক্তিনির্ভর ভাষা ব্যবহার করবে? সম্ভবত না।

মনোবিজ্ঞানে একটি বহুল আলোচিত ধারণা আছে, অবজারভেশনাল লার্নিং বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক শিক্ষা। মানুষ, বিশেষ করে শিশু অন্যকে দেখে আচরণ শেখে। পরিবারে, বিদ্যালয়ে কিংবা সমাজে যে আচরণকে পুরস্কৃত হতে দেখে, সেটিকেই সে গ্রহণ করতে শুরু করে।

আজ যদি কোনো শিশু দেখে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলে; রাজনৈতিক আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে তীব্র ভাষা ব্যবহার করে; তাহলে সে অবচেতনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করবে, নেতৃত্ব মানেই উচ্চকণ্ঠ হওয়া, আর প্রতিবাদ মানেই প্রতিপক্ষকে অপমান করা। এই বিশ্বাসের জন্ম এক দিনে হয় না। এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সাল একটি বড় মোড়। সেই সময়ের ছাত্র আন্দোলন শুধু একটি নীতিগত দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পরবর্তী পর্যায়ে তা বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের অংশে পরিণত হয়েছিল। আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে দাবির ধরন বদলেছে, নতুন নেতৃত্ব উঠে এসেছে এবং পরে সেই আন্দোলনের কিছু মুখ আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পরিসরেও সক্রিয় হয়েছেন। আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁরা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা ছিলেন। কেউ কেউ এখন দেশের সংসদ সদস্য। অনেকটা ধারণা করে বলা যায় যে ২০২৪ সালের ওই আন্দোলন না হলে তাঁরা অনেকেই এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে এত সহজে যেতে পারতেন কি না, সন্দেহ আছে। তবে এটি গণতান্ত্রিক সমাজে অস্বাভাবিক নয়। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতা ছাত্র আন্দোলন থেকেই উঠে এসেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের পর এ ক্ষেত্রে একটি নতুন সামাজিক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে।

আজকের কিশোর-কিশোরীরা খুব কাছ থেকে দেখেছে একটি আন্দোলন জাতীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। আন্দোলনের নেতৃত্ব জাতীয় পরিচিতি এনে দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কয়েক মিনিটের একটি ভিডিও লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এখানেই একটি সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটেছে। আগে আন্দোলন ছিল মূলত দাবি আদায়ের মাধ্যম। এখন অনেকের কাছে আন্দোলন ব্যক্তিগত দৃশ্যমানতারও একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠছে। অবশ্যই এটি সব আন্দোলনকারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী আন্তরিকভাবেই নিজেদের দাবি নিয়ে রাজপথে নামে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যুগে ব্যক্তিগত পরিচিতি অর্জনের আকর্ষণও শিশু-কিশোরদের আকৃষ্ট করছে।

যদি কোনো শিশু কিংবা কিশোর বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সবচেয়ে জোরে স্লোগান দিলেই সে নেতা হয়ে যাবে, সবচেয়ে কঠোর ভাষা ব্যবহার করলেই তার ভিডিও ভাইরাল হবে, তাহলে আমরা তাকে আসলে কী শিক্ষা দিচ্ছি? রাজনীতি কি তখন আর জনসেবার শিক্ষা থাকে, নাকি জনদৃষ্টিতে আসার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়? আমাদের আত্মসমালোচনা সেখানেই প্রয়োজন। কারণ শিশুরা আমাদের শুধু ভবিষ্যৎ নয়, তারা আমাদের বর্তমানেরই প্রতিফলন। তারা আমাদের ভাষা ধার করে, আমাদের রাগ ধার করে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ধার করে। শিশুরা শুধু আমাদের দেশে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলনে নামে। কিন্তু তারা কিভাবে আন্দোলন করে, তাদের ভাষা কেমন থাকে, সেটি একটি নতুন গবেষণাযোগ্য বিষয়।

শিশুরা শুধু আমাদের উপদেশ শোনে না, তারা আমাদের আচরণও পর্যবেক্ষণ করে। যদি মা-বাবা প্রতিদিন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গালি দেন, যদি শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে ভিন্নমতকে বিদ্রুপ করেন, যদি সমাজে অসহিষ্ণুতা স্বাভাবিক হয়ে যায়, তাহলে শিশুদের কাছ থেকে সহনশীলতা আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, আমরা পরীক্ষার ফল নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, নাগরিক চরিত্র গঠনের বিষয়ে ততটা নই। একজন শিক্ষার্থী গণিতে এ প্লাস পেলেও যদি সে ভিন্নমতকে সম্মান করতে না শেখে, যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে না শেখে, পরাজয় মেনে নিতে না শেখে, তাহলে সে শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক নাগরিক হয়ে ওঠে না।

বিদ্যালয়ে নাগরিক শিক্ষা, বিতর্কচর্চা, মতবিনিময়, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের সংস্কৃতি নিয়ে আরো বেশি কাজ করা দরকার। প্রতিবাদ শেখাতে হবে, কিন্তু সেই সঙ্গে শেখাতে হবে প্রতিপক্ষকে অপমান না করেও প্রতিবাদ করা যায়।

আজ অনেক শিশুই মনে করে, প্রতিবাদ মানেই রাস্তা অবরোধ, চিৎকার, ভাইরাল ভিডিও এবং উত্তেজনাপূর্ণ স্লোগান। কিন্তু ইতিহাস বলে, পৃথিবীর সবচেয়ে সফল আন্দোলনগুলোর অনেকগুলোই টিকে ছিল শৃঙ্খলা, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সংগঠনের ওপর। আজকের শিশুরা আগামী দিনের নেতা, শিক্ষক, বিচারক, সংসদ সদস্য, সাংবাদিক ও প্রশাসক। আমরা যদি আজ তাদের শেখাই যুক্তির চেয়ে গালি শক্তিশালী, তাহলে আগামী দিনের গণতন্ত্রও সেই ভাষায়ই কথা বলবে। অতএব প্রশ্নটি শুধু একটি আন্দোলন ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আরো বড়। আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ছি, যেখানে শিশুদের প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষা হবে শালীনতা, সহনশীলতা ও যুক্তি; নাকি এমন একটি সমাজ গড়ছি, যেখানে নেতৃত্বের প্রথম পাঠই হবে বিদ্বেষ, বিভাজন ও চিৎকার? এই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে যেমন দিতে হবে, তেমনি বিরোধী দলকে, শিক্ষককে, অভিভাবককে, গণমাধ্যমকে এবং আমাদের প্রত্যেককেও দিতে হবে। কারণ শিশুরা কখনো একা বদলে যায় না। তারা বড়দের পৃথিবী থেকেই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নির্মাণের ভাষা ধার করে।

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ঐতিহ্যের মিশেল হোক ‘কবি নজরুল সিটি’

ফাহিম আহম্মেদ মন্ডল

ঐতিহ্যের মিশেল হোক ‘কবি নজরুল সিটি’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালকে ‘কবি নজরুল সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সরকারি ঘোষণা শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয় ও মননের এক নবজাগরণ। প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী ঘোষণা আমাদের সামনে এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে, যেখানে আমরা বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ‘হেরিটেজ থিম সিটি’ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারি।

বিশ্বমানের থিম শহর হিসেবে ত্রিশালকে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমাদের সামনে দুটি পথ উন্মুক্ত। একদিকে ইউরোপীয় থিম শহরগুলোর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, যা নগর ব্যবস্থাপনাকে করে তোলে অত্যন্ত কার্যকর; অন্যদিকে শান্তিনিকেতন বা কুমিল্লার বার্ডের মতো দেশীয় প্রেক্ষাপটে পরীক্ষিত ‘নগর-গ্রাম’ মেলবন্ধনের সফল নজির, যা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে প্রগাঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। তাই আমাদের পরিকল্পনাটি শুধু প্রযুক্তিনির্ভর কিংবা শুধু ঐতিহ্যবাহী হলেই হবে না, বরং এই দুই ধারার এক দারুণ সমন্বয় হতে হবে। টেকসই ও প্রাণবন্ত নজরুল সিটি গড়ার স্বার্থে আমাদের দেশীয় মাটির বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে তার সঙ্গে বৈশ্বিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠ নির্যাসটুকু মিলিয়ে একটি সমন্বিত মডেল তৈরির দিকেই এখন নীতিনির্ধারকদের মনোনিবেশ করা প্রয়োজন।

বিদেশি মডেলের সঙ্গে দেশীয় প্রেক্ষাপটের এই মেলবন্ধন কেন জরুরি, তা বুঝতে হলে আমাদের সামাজিক ও ভৌগোলিক মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে। স্ট্র্যাটফোর্ড-আপন-অ্যাভন বা ডেনমার্কের ওডেন্সের মতো শহরগুলো তাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে যেভাবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করেছে, তা নিঃসন্দেহে অনুকরণীয়। কিন্তু একই সঙ্গে শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের শিখিয়েছে, কিভাবে আধুনিকতার যান্ত্রিকতাকে এড়িয়ে প্রকৃতির কোলে শিল্প-সাহিত্য ও জীবনবোধকে লালন করা যায়।

শান্তিনিকেতনের তপোবনসদৃশ পরিবেশ কিংবা বার্ডের সমন্বিত গ্রাম উন্নয়ন মডেল আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নগর মানেই কংক্রিটের জঙ্গল নয়; নগর মানে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় সহাবস্থান। নীতিনির্ধারকদের কাছে আবেদন, ইউরোপীয় মডেলগুলোর কারিগরি উৎকর্ষ গ্রহণের পাশাপাশি দেশীয় এই ‘কেস স্টাডিগুলো’ নিয়ে গভীরে কাজ করা প্রয়োজন। কারণ যে প্রযুক্তি বা পরিকল্পনা স্থানীয় মানুষের জীবনধারা, আবহাওয়া ও ভূ-প্রকৃতির সঙ্গে বিযুক্ত, তা দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হতে পারে না। আমরা এমন এক ‘হাইব্রিড নগরায়ণ’ চাচ্ছি, যেখানে প্রযুক্তি হবে আধুনিক এবং প্রাণ হবে দেশীয়।

 ‘স্থানিক পরিকল্পনা আইন, ২০২৬’-এর প্রয়োগ এবং ‘ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর)’ ও ‘ল্যান্ড পুলিং’-এর মতো কৌশলী আইনি মডেলগুলো এখানে কার্যকর করা সম্ভব। অযোধ্যার রামমন্দির নির্মাণ প্রকল্প বা সমগোত্রীয় মেগাপ্রজেক্টের ক্ষেত্রে আমরা উচ্ছেদ ও সামাজিক ভোগান্তির যে করুণ চিত্র দেখেছি, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা স্থানীয় বাসিন্দাদের অংশীদারির মাধ্যমে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারি। ল্যান্ড পুলিং মডেলে স্থানীয় মালিকদের উচ্ছেদ না করে বরং তাঁদের জমির একটি অংশ উন্নয়নের কাজে লাগিয়ে অবশিষ্ট অংশকে বহুগুণ মূল্যবান করে তোলা সম্ভব, যা নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের এক আধুনিক বাস্তবায়ন।

প্রস্তাবিত নতুন এই শহরকে সফল করতে হলে আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট ‘ইনক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নজরুলের সাহিত্যিক দর্শন এবং আধুনিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি চলবে। আমরা বিশ্বাস করি, শান্তিনিকেতন যেমন রবীন্দ্রনাথকে ধারণ করে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, ত্রিশালও তেমনি নজরুলের দ্রোহ ও প্রেমকে অন্তরে ধারণ করে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যের এক অভাবনীয় সেতুবন্ধ তৈরি করবে। যথাযথ আইনি সুরক্ষা, স্থানীয় জনগণের অংশীদারি এবং দেশজ ও বৈশ্বিক জ্ঞানের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে সেই নজরুল সিটি, যা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হবে এক আস্থার ঠিকানা। ত্রিশালের সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, এই জনপদকে শুধু ইটের দালানে রূপান্তর না করে, একে নজরুলের দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জীবন্ত নগরীতে রূপ দেওয়া সম্ভব। শৈশবে দেখা ছিমছাম নগরী ত্রিশাল এবং ভবিষ্যতের নজরুল সিটির মাঝে ঐতিহ্যের নিরবচ্ছিন্ন ধারাটি অটুট রাখাই আমার এই প্রস্তাবের মূল উদ্দেশ্য।

পরিশেষে নজরুল সিটি যেন কোনো আর্টিফিশিয়াল শহরের প্রতিচ্ছবি না হয়ে ওঠে। আমরা এমন এক নগরীর স্বপ্ন দেখি, যা শুধু অবকাঠামোগত সূচক নয়, বরং মানবিক মূল্যবোধ ও শৈল্পিক চর্চার এক ধ্রুবতারা হয়ে থাকবে। ইউরোপীয় প্রযুক্তি আমাদের দেখাবে কিভাবে শহরকে কার্যকর করা যায়, আর শান্তিনিকেতন বা বার্ড আমাদের শেখাবে কিভাবে শহরকে মানুষের জন্য বাঁচাতে হয়। এই দুইয়ের একীভূতকরণই হবে আমাদের মূল সাফল্য।

আমাদের স্বপ্নটি যেন শুধু দাপ্তরিক নথিপত্র বা কাগজের নকশায় বন্দি না থাকে, বরং নীতিনির্ধারকদের দূরদর্শিতা এবং পরিকল্পনাবিদদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ত্রিশাল যেন বিশ্বমঞ্চে টেকসই, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনার এক অনন্য ধ্রুবতারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে—এই প্রত্যাশাই আমাদের সব কাজের প্রেরণা।

লেখক : নগর পরিকল্পনাবিদ

নৈতিকতার সংকট ও আমাদের আগামী প্রজন্ম

এম আরিফুজ্জামান

নৈতিকতার সংকট ও আমাদের আগামী প্রজন্ম

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব, আর এই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি হলো বিবেক, বুদ্ধি, আত্মসংযম ও মনুষ্যত্ববোধ। সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার নামই হলো জীবন। আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিক্ষার মূল লক্ষ্য ‘মানুষ হওয়া’র চেয়ে ‘সার্টিফিকেট অর্জন’ বা ‘ভালো ফলাফল’ করাকেই জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির বিচ্যুতিই আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে, যার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বর্তমানের উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর মাধ্যমে।

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কর্তৃক শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার যে ধারাবাহিক চিত্র আমরা দেখছি, তা আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ের অশনিসংকেত। যে শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, তাঁর প্রতি অমর্যাদা প্রদর্শন শুধু একজন ব্যক্তির অবমাননা নয়, এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার নামান্তর। অন্যদিকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন এবং ফলাফলকেন্দ্রিক অস্থিরতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা শিক্ষার্থীদের মেধার চেয়ে প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে বেশি ঠেলে দিচ্ছি। পরীক্ষার নম্বরই যখন সাফল্যের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—উভয়ই নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে যেকোনো উপায়ে ফলাফল অর্জনের মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হন। এই মরিয়া ভাবই আজকের সামাজিক অস্থিরতার মূল উৎস।

আজকের প্রজন্ম এক দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে প্রযুক্তির অবারিত সুবিধা, অন্যদিকে ভার্চুয়াল জগতের কৃত্রিম সাফল্যের ইঁদুর দৌড়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘লাইক’ ও ‘ভিউ’-এর প্রতিযোগিতার মতো পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পাওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতা তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। তারা ভার্চুয়াল জগতের চকচকে মোড়কে নিজেদের মূল্যায়ন করতে শিখছে, ফলে বাস্তবের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল আগ্রাসনের যুগে সহমর্মিতা ও ধৈর্য কমে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণে।

অথচ শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরি হয় পরিবারে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেছিলেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দেব।’ কিন্তু আজ সেই পারিবারিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের অভাব প্রকট। যখন পরিবার থেকে সন্তানকে সাফল্যের চেয়ে সততার মূল্য শেখানো হয় না, যখন কোনো অভিভাবক তার সন্তানের ভুল সংশোধন না করে শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ করেন, তখন সেই সন্তান শুধু মেধাবী হতে পারে, কিন্তু মানুষ হতে পারে না।

নটর ডেম কলেজে অধ্যয়নকালীন স্মৃতি আজও আমার মানসপটে অম্লান হয়ে আছে। ফিজিক্সের অধ্যাপক সুশান্ত স্যার একবার কুইজ পরীক্ষায় ভুলবশত অনেককে ১০ নম্বর বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। এটি ছিল মূলত একটি ‘নৈতিক পরীক্ষা’। আমি ও আমার বন্ধুরা সেই লোভ সংবরণ করে স্যারকে জানালে তিনি সবাইকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘বাবারা, আজকের ক্লাসের শিক্ষা হলো—ছোটখাটো লোভ সামলাতে হবে। যারা আজ ১০ নম্বরের লোভ সামলাতে পারলে না, তারা ভবিষ্যতে কোটি টাকার লোভে বিবেক বিসর্জন দেবে। আমি চাই না আমার ছাত্ররা অসৎ হোক।’ আজ সেই স্যারের আদর্শের বড় অভাব। শিক্ষকের সেই ধমক বা শাসনকে আজ আর কেউ ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারছে না; উল্টো শিক্ষকের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্কটি আজ দাতা-গ্রহীতার ব্যাবসায়িক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি চরিত্র গঠনের কারিগর। মেধাবী হওয়ার চেয়ে অনুগত ও নীতিবান হওয়া অধিক জরুরি।

আগামী প্রজন্মকে এই নৈতিক অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। প্রথমেই পরিবারকে শিক্ষার মূল কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে হবে, কারণ পারিবারিক মূল্যবোধই শিশুর নৈতিকতার প্রথম সোপান। সন্তানকে শুধু জিপিএ ৫ পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ঠেলে না দিয়ে সৎ ও নীতিবান হওয়ার গুরুত্ব বোঝাতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পবিত্র সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনগুলোতে শিক্ষকদের ভয় নয়, বরং গভীর শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি মানবিক, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার বাস্তবধর্মী প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমন নীতি প্রণয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন, যেখানে মেধাবীদের চেয়েও মানবিক গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হবে। সমাজ থেকে দুর্নীতির চর্চা কমিয়ে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে যেন শিক্ষার্থীরা ইতিবাচক ও সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে নিজেদের দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

পরিশেষে সুশিক্ষিত ও মানবিক প্রজন্ম গড়তে হলে পরিবার, শিক্ষাঙ্গন এবং রাষ্ট্রকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নটর ডেমের সেই ১০ নম্বরের লোভ বর্জন বা স্যারের সেই কঠোর শাসন আজও আমাদের পথ দেখাতে পারে। আমরা কি পারব না আজকের অস্থির প্রজন্মকে সত্য ও সুন্দরের পথে ফিরিয়ে আনতে? মনে রাখতে হবে, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি নয়, প্রকৃত ‘মানুষ’ গড়ে তোলা। সমাজ ও রাষ্ট্রের এই সন্ধিক্ষণে এসে আমাদের প্রত্যয়ের নাম হোক—‘নৈতিকতায় মেধার উৎকর্ষ’।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জিয়ানগর, পিরোজপুর

 

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর

মাসুদ রুমী

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর

বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন অর্থনীতির গুণগত রূপান্তর। গত পাঁচ দশকে দেশ যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ, তৈরি পোশাক শিল্পের বৈশ্বিক অবস্থান এবং সামাজিক সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু একই সঙ্গে স্পষ্ট হয়েছে যে পুরনো প্রবৃদ্ধির মডেল আর আগের মতো কার্যকর থাকবে না। বৈশ্বিক বাণিজ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতা, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, জলবায়ু সংকট, ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা নতুন ধরনের প্রস্তুতি দাবি করছে।

আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য শুধু আরেকটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় নয়, এটি হতে পারে অর্থনীতির ভিত্তিগত রূপান্তরের সময়। এই রূপান্তর শুধু শিল্প বা রপ্তানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনা, বাজারব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, আর্থিক খাত এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সমন্বিত পরিবর্তন।

প্রবৃদ্ধি বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, চাই অর্থনীতির গুণগত রূপান্তররপ্তানি খাতের প্রসঙ্গ দিয়ে শুরু করা যাক। বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান ভিত্তি এখনো তৈরি পোশাক শিল্প। এই খাত দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দিয়েছে। কিন্তু একটিমাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। একই সঙ্গে ক্রেতারা এখন শুধু কম দামের পণ্য নয়; পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রম অধিকার, কার্বন নিঃসরণ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

আগামী পাঁচ বছরে তাই তৈরি পোশাক শিল্পকে উচ্চমূল্য সংযোজনের দিকে যেতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন, নকশা উন্নয়ন, নিজস্ব ব্র্যান্ড, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বিনিয়োগ অপরিহার্য। পাশাপাশি ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, চামড়া, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং সৃজনশীল অর্থনীতির মতো খাতকে রপ্তানির নতুন স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। রপ্তানি বৈচিত্র্য শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বাড়াবে না, এটি কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন উৎসও সৃষ্টি করবে।

বেসরকারি খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই উদ্যোক্তারা নানা ধরনের অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। নীতির ধারাবাহিকতার অভাব, জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো, অনুমোদনের দীর্ঘসূত্রতা, করব্যবস্থার জটিলতা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগের পরিবেশকে দুর্বল করে।

একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়তে হলে সরকারকে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করতে হবে, কিন্তু বাজারের স্বাভাবিক গতিশীলতাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ব্যবসা শুরু করা, জমি নিবন্ধন, বিদ্যুৎ সংযোগ, কর পরিশোধ, আমদানি-রপ্তানি অনুমোদন—সবকিছুই ডিজিটাল ও সময়মাফিক করতে হবে। নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা বিনিয়োগকারীর আস্থা তৈরির অন্যতম শর্ত।

বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনো প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছতে পারেনি। শুধু করছাড় বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করলেই বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন আইনের শাসন, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা, মুদ্রানীতির স্থিতিশীলতা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং দ্রুত প্রশাসনিক সেবা।

বাংলাদেশ যদি আগামী পাঁচ বছরে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ গন্তব্য হতে চায়, তাহলে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশকে কাগজে নয়, বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একটি কার্যকর ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস’, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থা বিনিয়োগ বৃদ্ধির মূল শর্ত।

অর্থনীতির রূপান্তরের কেন্দ্রে থাকতে হবে সুশাসন। উন্নয়নের ইতিহাস বলে, যে দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি অর্জন করেছে, তারা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে নীতি কার্যকর হয় না, বিনিয়োগ কমে যায়, জন-আস্থা নষ্ট হয় এবং উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সুশাসনের অর্থ শুধু দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নয়। এর অর্থ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ বিচারব্যবস্থা এবং মেধাভিত্তিক প্রশাসন। অর্থনৈতিক নীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়।

ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং আর্থিক খাতের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান কিংবা বিনিয়োগ—কোনোটিই টেকসই হতে পারে না। আর্থিক খাতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত স্বাধীনতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ এবং আর্থিক খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন আগামী পাঁচ বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ। কিন্তু দক্ষতার ঘাটতি থাকলে এই জনসংখ্যা সম্পদে পরিণত হবে না। শিক্ষাব্যবস্থাকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিতভিত্তিক শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং ডিজিটাল সক্ষমতা উন্নয়নের ওপর জোর দিতে হবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশ্ব অর্থনীতিকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এখনই প্রস্তুতি না নেয়, তাহলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। আবার সঠিক প্রস্তুতি নিতে পারলে এই প্রযুক্তিই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করবে। ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

জ্বালানি নিরাপত্তা অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তি। শিল্প, কৃষি, সেবা খাত—সবকিছুই নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানির ওপর। আমদানিনির্ভর জ্বালানিব্যবস্থার ঝুঁকি এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি দক্ষতা এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

কৃষির ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; কৃষিকে উচ্চমূল্য সংযোজন, প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জলবায়ুসহনশীল কৃষি প্রযুক্তি আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম শর্ত।

বাংলাদেশের নগরায়ণ নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ উৎপাদনশীলতা কমায়, পরিবেশদূষণ বাড়ায় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করে। পরিবহন, আবাসন, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ অবকাঠামোতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত অর্থনীতির প্রতিটি খাতে প্রভাব ফেলছে। অভিযোজন ও সহনশীলতা এখন আর পরিবেশগত বিষয় নয়, এটি অর্থনৈতিক নীতিরও অংশ। উপকূলীয় অঞ্চল, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকিকে মূলধারায় আনতে হবে।

সামাজিক উন্নয়নকে অর্থনৈতিক নীতির বাইরে রাখা যাবে না। বৈষম্য বাড়তে থাকলে প্রবৃদ্ধির সুফল টেকসই হয় না। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীর জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শিশুযত্ন সুবিধা এবং সমান সুযোগ নিশ্চিত করা অর্থনীতির জন্যও লাভজনক।

করব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি। করের আওতা বাড়াতে হবে, কিন্তু ব্যবসার ওপর অযৌক্তিক চাপ সৃষ্টি না করে। ডিজিটাল কর প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং করদাতাবান্ধব সেবা রাজস্ব বাড়ানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।

অবশেষে একটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতির

রূপান্তর শুধু সরকারি পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য রাষ্ট্র, বেসরকারি খাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, নাগরিক সমাজ এবং উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা দরকার। নীতির ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক আস্থা ছাড়া বড় কোনো অর্থনৈতিক রূপান্তর সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ এখনো রয়েছে। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্বিন্যাস, তরুণ জনশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু সুযোগ নিজে থেকে সাফল্যে রূপ নেয় না। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক নীতি, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং বাস্তবায়নের সক্ষমতা।

আগামী পাঁচ বছর তাই শুধু আরেকটি উন্নয়ন পরিকল্পনার সময় নয়, এটি হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন ভিত্তি নির্মাণের সময়। সেই ভিত্তি হবে বৈচিত্র্যময়, উদ্ভাবননির্ভর, পরিবেশসহনশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সুশাসনভিত্তিক। প্রবৃদ্ধি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হবে উৎপাদনশীলতা, ন্যায়সংগত সুযোগ, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং নাগরিকের মর্যাদা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী অধ্যায়ের মূল প্রশ্ন তাই প্রবৃদ্ধির হার কত হবে, তা নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি কতটা শক্ত, কতটা বৈচিত্র্যময় এবং কতটা টেকসই হবে। আগামী পাঁচ বছরে যদি আমরা সেই ভিত্তি নির্মাণে সফল হই, তবে অর্থনীতির রূপান্তর আর শুধু একটি নীতিগত আকাঙ্ক্ষা থাকবে না, সেটি বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠবে।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

কালের কণ্ঠের ডেপুটি এডিটর