• ই-পেপার

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি : বিশ্বমন্দা ও খাদ্যসংকট কি অনিবার্য

  • ড. মো. ফখরুল ইসলাম

সংসদ হোক জনগণের কণ্ঠস্বর

ড. হারুন রশীদ

সংসদ হোক জনগণের কণ্ঠস্বর

একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে সংসদ কতটা উপস্থিত? তিনি যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল বা সবজির দাম নিয়ে চিন্তিত হন, তখন সংসদ কি তাঁর উদ্বেগের ভাষা হয়ে ওঠে? যখন একজন তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকেন, তখন সংসদ কি তাঁর হতাশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে উচ্চারণ করে? যখন একজন কৃষক উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের অসম লড়াইয়ে পরাজিত হন, যখন একজন শ্রমিক মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে প্রতিদিন নতুন হিসাব কষেন, যখন কোনো পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সঞ্চয় হারায়তখন জাতীয় সংসদ কি সত্যি তাঁদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে?

গণতন্ত্রে সংসদ হলো জনগণের প্রতিনিধিত্বের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষাএই তিনটি দায়িত্ব সংসদের মূলভিত্তি। কিন্তু একটি সংসদ শুধু তখনই জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, যখন সেখানে জনগণের বাস্তব জীবন, উদ্বেগ, আকাঙ্ক্ষা ও  প্রশ্নের প্রতিফলন ঘটে। শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না; প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত মান নির্ভর করে সংসদ কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এবং কতটা কার্যকরভাবে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে তার ওপর।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বরাবরই বেশি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণেতারা একটি প্রতিনিধিত্বশীল, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতির নানা সীমাবদ্ধতা সেই স্বপ্নকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কখনো সংসদ কার্যকর বিরোধী দলের অভাবে দুর্বল হয়েছে, কখনো দলীয় আনুগত্যের কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ সংকুচিত হয়েছে, আবার কখনো রাজনৈতিক সংঘাত সংসদকে জনগণের সমস্যা সমাধানের জায়গা না বানিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত করেছে।

সংসদ হোক জনগণের কণ্ঠস্বর সংসদের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, বিতর্কের মানে। একটি গণতান্ত্রিক সংসদে সরকারপক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে, কিন্তু বিরোধী মতকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে পারে না। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলোসংখ্যাগরিষ্ঠতা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সংখ্যালঘু মত দিতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে। সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়; বিকল্প নীতি, বিকল্প বাজেট, বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। কিন্তু সংসদ যদি শুধু সংখ্যার খেলায় পরিণত হয়, তাহলে জনগণের প্রতিনিধিত্বের জায়গা সংকুচিত হয়। তখন আইন পাস হয়, বাজেট অনুমোদিত হয়, নীতি গ্রহণ করা হয়, কিন্তু জনগণের জীবনে সেই সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত বিতর্ক হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূলশক্তি হলো প্রশ্ন। সংসদে যত বেশি তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন হবে, তত বেশি সরকারকে জবাব দিতে হবে। আর সরকার যত বেশি জবাব দেবে, তত বেশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে।

এখানে সংসদীয় কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে সংসদীয় কমিটিগুলো সরকারের নীতি ও ব্যয়ের ওপর গভীর নজরদারি করে। সরকারি হিসাব, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বড় প্রকল্প, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তাবিভিন্ন বিষয়ে কমিটি বিস্তারিত তদন্ত করতে পারে। কিন্তু কমিটি যদি দলীয় আনুগত্যের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে তার নজরদারি কার্যকারিতা হারায়।

একটি শক্তিশালী সংসদে সংসদ সদস্যরা শুধু নিজেদের দলের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন না, তাঁরা জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। তাঁদের প্রশ্নে সরকারের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই অস্বস্তিই গণতন্ত্রের প্রাণ। কারণ জবাবদিহি সব সময় আরামদায়ক নয়।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, সংসদ সদস্যের ভূমিকা অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভোটাররা একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা কতটা থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজন সংসদ সদস্য যদি নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের সমস্যা নিয়ে সংসদে কথা বলতে চান, কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো মত প্রকাশ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর প্রতিনিধিত্বের স্বাধীনতা কতটা থাকে?

এখানে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা যদি প্রতিটি বিষয়ে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তাহলে সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক ভূমিকা দুর্বল হয়। সংসদ সদস্য শুধু দলের প্রতিনিধি নন, তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা এবং জনগণের প্রতিনিধি। এই দুই ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সংসদে জনগণের কণ্ঠস্বর পৌঁছাতে হলে নির্বাচনী রাজনীতিতেও পরিবর্তন দরকার। অর্থ, প্রভাব, দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যদি প্রার্থী হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে, তাহলে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। নির্বাচনে ব্যয়ের সীমা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হয়, প্রার্থীদের অর্থের উৎস কতটা স্বচ্ছ, তাঁদের সম্পদের হিসাব কতটা যাচাই করা হয়এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সংসদের প্রতিনিধিত্বের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়। সংসদ সদস্যদের নিয়মিত জনশুনানি, নির্বাচনী এলাকার সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদন এবং জনগণের মতামত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা উচিত। জনগণের সঙ্গে প্রতিনিধির সম্পর্ক শুধু নির্বাচনের সময়কার হওয়া উচিত নয়।

সংসদকে আরো কার্যকর করতে প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। সংসদীয় কার্যক্রমের তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা, ভোটাভুটিতে সংসদ সদস্যের অবস্থান জানানো, সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা এবং আইন প্রণয়নের আগে নাগরিক মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হবে। তবে সংসদকে দুর্বল করার সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা। সরকার যদি বিরোধী দলকে শত্রু মনে করে এবং বিরোধী দল যদি সরকারকে রাষ্ট্রের শত্রু মনে করে, তাহলে সংসদ কখনোই সুস্থ বিতর্কের জায়গা হতে পারে না।

আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার পালাবদল অনেক সময় নীতির পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিশোধের চেহারা ধারণ করে। ক্ষমতায় থাকা দল বিরোধী দলে গেলে যে অধিকার দাবি করে, ক্ষমতায় ফিরে সেই একই অধিকার অন্যদের দিতে অনিচ্ছুক হয়। এই দ্বৈত মানসিকতা সংসদীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। সংসদকে সত্যিকার অর্থে জনগণের কণ্ঠস্বর করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এমন নিয়মে একমত হতে হবে, যা ক্ষমতায় থাকলেও এবং বিরোধী দলে থাকলেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

সব শেষে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসেসংসদ কি সত্যি জনগণের কণ্ঠস্বর? এর উত্তর এককথায় হ্যাঁ বা না বলা কঠিন। সংসদ জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু বাস্তবে সে কণ্ঠ কতটা শোনা যায়, তা নির্ভর করে নির্বাচনের মান, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্র, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা এবং সরকারের জবাবদিহির ওপর।

সংসদে যদি জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়, বেকার তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর নীতি তৈরি হয়, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য দাম নিয়ে সরকারকে জবাব দিতে হয়, দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রী ও আমলাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা দিতে হয়তাহলেই সংসদ সত্যিকারের জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।

একটি সংসদ তখনই সফল, যখন তার বিতর্কের শব্দ সংসদ ভবনের দেয়াল পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে। যখন একজন দিনমজুর মনে করেন, তাঁর কষ্টের কথা কেউ বলছেন; একজন বেকার তরুণ মনে করেন, তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র চিন্তা করছে; একজন কৃষক মনে করেন, তাঁর ঘামের মূল্য নিয়ে আইন প্রণেতারা প্রশ্ন তুলছেনতখনই সংসদ জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।

গণতন্ত্রের শেষ বিচার তাই সংসদ ভবনের জাঁকজমকে নয়, জনগণের জীবনে। সংসদে কত আইন পাস হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, কত মানুষের জীবন বদলাল? কত অন্যায় থামল? কত দুর্নীতির জবাবদিহি হলো? কত সাধারণ মানুষের কথা ক্ষমতার টেবিলে পৌঁছল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবেআমাদের সংসদ শুধু জনগণের নামে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান, নাকি সত্যি জনগণের কণ্ঠস্বর।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

স্থানীয় নির্বাচনে যেভাবে সেনা মোতায়েন চায় ইসি

কাজী হাফিজ

স্থানীয় নির্বাচনে যেভাবে সেনা মোতায়েন চায় ইসি

দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী  অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথ ধরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই বিধান চায় নির্বাচন কমিশন। সম্প্রতি  কমিশন এ বিষয়ে আইন সংশোধনের প্রস্তাব চূড়ান্ত  করেছে। কমিশনের পক্ষে বলা হয়েছে, আইনগত এই ব্যবস্থা থাকলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রয়োজন বোধে কার্যকরভাবে সশস্ত্র বাহিনীর   সহযোগিতা নেওয়া যাবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালন দরকার এবং কী কারণে কারা এটি চায় না, তা বুঝতে ২০১৫ সালে ঢাকার দুই সিটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনটি স্মরণ করা যেতে পারে। সে সময় স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে বাদ রাখা হয়েছিল। তার পরও নির্বাচন কমিশন বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায়  সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশনের পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়, ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়ে আরো আশ্বস্ত করার জন্য সেনাবাহিনীর তাৎক্ষণিক মুভমেন্ট ও জরুরিভিত্তিতে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সুবিধার্থে  ঢাকা মহানগরীর ভেতরেই ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট ও পোস্তগোলা ক্যান্টনমেন্ট এবং চট্টগ্রাম মহানগরীর ভেতর হালিশহর, দামপাড়া ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকবে। রিটার্নিং অফিসারের নির্দেশ পাওয়া মাত্র সেনাবাহিনী সঙ্গে সঙ্গে অকুস্থলে গমন করে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা  নেবে। সেনা সদস্যদের সঙ্গে ১৬ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়। কিন্তু তাতেও আপত্তি। ক্ষমতাসীনরা মনে করলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলে তাঁদের প্রার্থীদের জিতিয়ে আনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। কারণ নির্বাচনী মাঠে সেনা সদস্যরা কে কতটা প্রভাবশালী, কে কোন দলের তা দেখেন না। চাপ সৃষ্টি হলো নির্বাচন কমিশনের ওপর। কমিশন সেই চাপে নতি স্বীকার করে জানাল, সেনাবাহিনী মূলত সেনানিবাসের অভ্যন্তরে রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে অবস্থান করবে এবং রিটার্নিং অফিসারের অনুরোধে স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করবে। ভোটগ্রহণের দিন কেন্দ্র দখলের মহোৎসব চললেও রিটার্নিং অফিসাররা এ ধরনের কোনো অনুরোধ করেননি বা সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করা হয়নি। জানা যায়, সে সময় সেনানিবাসের অভ্যন্তরেও রিজার্ভ ফোর্স  অপেক্ষায় রাখার ঘটনা ঘটেনি।

স্থানীয় নির্বাচনে যেভাবে সেনা মোতায়েন চায় ইসি তার আগে ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকার পরও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর চার কম্পানি সেনা  চেয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে চিঠি দেয় কমিশন। কিন্তু কমিশনের ওই চাহিদা পূরণ হয়নি। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের অসহযোগিতা ও অমনোযোগিতাকে দায়ী করেন। সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনেরও অভিযোগ ওঠে। কারণ সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে,  নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা নির্বাহী বিভাগের কর্তব্য হইবে। কিন্তু তৎকালীন সরকার এই বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করে।

২০১১ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ১২টি পৌরসভা এবং জাতীয় সংসদের হবিগঞ্জ-১ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উপনির্বাচনেও একই ঘটনা ঘটে। ওই নির্বাচনগুলোতে  সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েও ড. হুদা কমিশন তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। সে সময় সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে এ বিষয়ে কয়েক দফা চিঠি দিয়েও জবাব পায়নি নির্বাচন কমিশন। এতে কমিশনের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও অনেকে অভিযোগ করেন।

নির্বাচন কর্মকর্তাদের ধারণা, নির্বাচনে কার্যকরভাবে সেনা মোতায়েন থাক তা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার চায়নি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবে  গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) বা সংসদ নির্বাচনের আইন সংশোধন করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই সঙ্গে আরপিওর ৮৭ অনুচ্ছেদে এই বিধান যুক্ত করা হয় যে  ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি বা আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা-ই থাকুক না কেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোনো সদস্য একজন পুলিশ কর্মকর্তা না হয়েও নির্বাচনী অপরাধের  জন্য কাউকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করতে পারবে।

এর আগের জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনী নিয়োগ করা হতো ১৮৯৮ সালের প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায়।

আওয়ামী লীগ ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের দলগুলো  ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকায় সন্তুষ্ট ছিল না। দলগুলো ওই সময় থেকে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত না রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনী ব্যবস্থার যে সংস্কার প্রস্তাব রেখেছিল তাতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তবে নবম জাতীয় সংসদ  নির্বাচনের আগে ওয়ান-ইলেভেন সৃষ্ট সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে  নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে আওয়ামী লীগ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা সম্পর্কে তাদের বিরোধিতা থেকে সরে আসে। এ সময়  র‌্যাবকেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ফলে ওই নির্বাচনে সেনাবাহিনী ২০০১ সালের মতো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশ হিসেবেই দায়িত্ব পালন করে; যদিও ওই নির্বাচন তৎকালীন বিতর্কিত  সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদের দুরভিসন্ধি থেকে মুক্ত হতে পারেনি। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই নয়, অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনগুলোতেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হলে ওই সংসদে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও স্থানীয় সরকার আইনগুলোর  আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞা থেকে সশস্ত্র বাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে পুলিশ, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ড ও র‌্যাব সদস্যদের  নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকালে নির্বাচনী অপরাধের জন্য কাউকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকলেও সশস্ত্র বাহিনী বা সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের তা থাকে না।

এ অবস্থায় ২০১১ সালে ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন  নির্বাচনী আইন সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যে সংলাপের আয়োজন করে  তাতে বেশির ভাগ দলের জোর দাবি ছিল নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় আবারও সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করার।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই সংলাপে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ২০০১ সালে সেনা সদস্যদের পুলিশ কর্মকর্তাদের মতো ক্ষমতা দেওয়ায় আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওই ঘটনার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের অন্য দলগুলোর সঙ্গে আমরাও সেনাবাহিনীকে এ ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে।

সার্বিক এ অবস্থায় পরের তিন নির্বাচন কমিশনও   নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে আবারও অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নিতে পারেনি বা নিতে চায়নি। এ অবস্থায় দশম, একাদশ ও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী  মোতায়েন করা হলেও তা কার্যকর ছিল না।

এই প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে সাবেক নির্বাচন কমিশনাররা এই মত প্রকাশ করেন যে নির্বাচনে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯ থেকে ১৩০ ধারায় এবং সেনা বিধিমালা ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার-এর আওতায়  সেনাবাহিনী  মোতায়েনে কোনো কাজ হবে না। সেনাবাহিনী মোতায়েন হলে তা যদি ম্যাজিস্ট্রেটের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে তাদের দায়িত্ব পালন নির্বিঘ্ন হবে না। আগের মতো আরপিওতে  আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় সশস্ত্র বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ওই সংলাপ নিয়ে কে এম নুরুল হুদার নির্বাচন কমিশন ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনী সংলাপ -২০১৭ নামে যে গ্রন্থ প্রকাশ করে তাতে সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের এই মতামত স্থান পায়। কিন্তু সে সময় ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার বিপরীতে নির্বাচন কমিশন এই মতামত গ্রহণ করতে পারেনি।

বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। সে সময় নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনও জনদাবি অনুসারে সংসদ নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করে এবং তা বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার আইনগুলোতে এই ব্যবস্থা এখনো ফিরে আসেনি।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় সরকারের মধ্যে সিটি করপোরেশনগুলো আয়তন, জনসংখ্যা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও জাতীয় সংসদের  কোনো একটি আসনের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জাতীয় সংসদের আসন রয়েছে ১৫টি। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেও সম্পূর্ণ ও আংশিক আটটি সংসদীয় আসন রয়েছে। সে কারণে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন  জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় আরো বেশি প্রয়োজন। পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আবার কারো কারো ধারণা, নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে গড়ে উঠতে পারে না। কিন্তু  সেই প্রকৃত প্রধান প্রতিষ্ঠান পুলিশ বাহিনী  সঠিকভাবে গড়ে ওঠার প্রধান বাধাগুলো এখনো বহাল। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের ধাক্কা সামলিয়ে এখনো পুরোপুরি সুস্থির হতে পারেনি এ বাহিনী। এদিকে  স্থানীয় সরকার নির্বাচনেরও আর দেরি নেই। আগামী বছরের প্রথম থেকে এই নির্বাচন শুরু হতে যাচ্ছে। একটি শান্তিপূর্ণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একই পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যলেঞ্জ বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের জন্যও। সে কারণে স্থানীয় নির্বাচনেও সশস্ত্র বাহিনীর কার্যকর দায়িত্ব পালনের পক্ষে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়ন অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য জরুরি। নির্বাচনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী বহাল থাকা দরকার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে গড়ে ওঠা পর্যন্ত।

লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক ও

নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্লেষক

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

সুমিত বণিক

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ বন্যা এবং অতি সম্প্রতি ভোলা, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পানির ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়াসার্বিক পরিস্থিতি আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ফল এখন আমাদের ঘরের দরজায়। কোথাও পাহাড়ি ঢল, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী নদীভাঙন, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। পানি নেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মানুষ কাদা, ক্ষুধা, রোগ-ব্যাধি ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। বসতঘর ধ্বংস, কৃষিজমি নষ্ট, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং জীবিকা হারানোর মতো সমস্যা বহু পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম চললেও মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি) এবং ন্যাশনাল প্ল্যান ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (২০২১-২০২৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, জরুরি সাড়া এবং পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রম এখনো দুর্যোগের পরে সক্রিয় হয়। দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানো, প্রস্তুতি গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এরই মধ্যে উন্নত হাইড্রোলজিক্যাল মডেল, স্যাটেলাইট তথ্য এবং আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে আগাম বন্যা পূর্বাভাস দিচ্ছে। এমনকি ১০ দিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাসও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেএই তথ্য কি শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষক, জেলে বা পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে? অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটি নেতিবাচক। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। ফলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও অনেক এলাকায় আগাম প্রস্তুতি যথাসময়ে নেওয়া যায় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানদুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরো শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রস্তুতি সভা এবং যৌথ কর্মপরিকল্পনা চালু করা গেলে বন্যার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বন্যার সময় উদ্ধার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সংকট শুরু হয় পানি নেমে যাওয়ার পর। তখন মানুষের প্রয়োজন হয় নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি পুনরুদ্ধার, শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা এবং জীবিকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রম অনেক সময় বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে কেউ একাধিকবার সহায়তা পায়, আবার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ সহায়তার বাইরে থেকে যায়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় সমন্বিত ডিজিটাল ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসন তথ্যভাণ্ডার (ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিকভারি ডেটা বেইস) গড়ে তোলা সময়ের দাবি। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে একটি ইউনিক আইডি দেওয়া হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, মোবাইল অ্যাপ কিংবা তথ্যসেবা কেন্দ্রযেখান থেকেই তথ্য নিবন্ধন করা হোক না কেন, সব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটা বেইসে সংরক্ষিত থাকবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন পরিবার কী ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে, কারা ত্রাণ পেয়েছে, কারা এখনো সহায়তা পায়নি, কোথায় ঘর নির্মাণ প্রয়োজন, কোথায় কৃষি পুনর্বাসন জরুরিসবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে। ফলে একই পরিবারের কাছে বারবার ত্রাণ পৌঁছানো এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাদ পড়ার মতো সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে।

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনকে শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একজন কৃষকের জমিতে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়ের উৎস পুনর্গঠন, একজন জেলের জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করাসবকিছুকে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

পুনর্বাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো, দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক সহায়তা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি) ২১০০ এবং ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ জলবায়ুসহনশীল উন্নয়ন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব নীতিমালাকে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করা। নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ধস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ব্যবস্থাপনাএসব উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে বন্যার ক্ষতি কমাতে সহায়তা করবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, যুবসমাজ এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষিত করে একটি কার্যকর স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ দুর্যোগের প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় স্থানীয় মানুষই দিয়ে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় যে কমিটিগুলো রয়েছে, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অকার্যকর এবং বেশির ভাগ মানুষ নিষ্ক্রিয়। বাংলাদেশ অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় শুধু দুর্যোগ মোকাবেলা যথেষ্ট নয়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং জলবায়ুসহনশীল উন্নয়ন।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু ত্রাণের ট্রাক নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা; শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত; শুধু পুনর্বাসন নয়, প্রয়োজন দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি জলবায়ুসহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে এখনই একটি জাতীয় সমন্বিত বন্যা-পূর্ব প্রস্তুতি ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে হবে; যেখানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় জনগণ একই তথ্যভাণ্ডারের আওতায় কাজ করবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যা হয়তো পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ, বৈষম্য ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো অবশ্যই সম্ভব। এটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নতুন দর্শন।

লেখক : জনস্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশিক্ষক

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

ইকরামউজ্জমান

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

৩৯ দিন ধরে চলা ফুটবলের গল্প বলা শেষ হয়েছে। ৪৮টি দেশের ১০৪টি খেলায় ৩০৮টি গোলের ঘটনাবহুল অসাধারণ ফুটবল উৎসব সাঙ্গ হয়েছে। ফুটবল শুধু মাঠে চিত্তাকর্ষক হয়নি, মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়ে ইচ্ছামতো খেলেছে গোলকপিণ্ডটি। ফিফা ফুটবলকেন্দ্রিক ব্যবসায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ফিফার বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনে বেজায় খুশি ফিফার সব সদস্য দেশ। এরই মধ্যে উয়েফার পক্ষ থেকে অনুদান বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। দাবি উঠেছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং অন্য মহাদেশগুলো থেকেও। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে প্রচুর বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠলেও এই সুইস ব্যক্তিত্ব কিন্তু নির্ভার। তাঁকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্য প্রায় ২০০ দেশ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর পুনরায় নির্বাচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

এরই মধ্যে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপে ৬৪ দলের অংশ নেওয়ার বিষয়টি আমরা অবশ্যই বিশ্বকাপ শেষে পর্যালোচনা করব। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখার সুযোগ সব দলকেই দেওয়া উচিত। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহাদেশের যেসব দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলার সুযোগ পায়নি, তারা এখন উত্তেজনায় ভুগছে। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলেছে ৮৪টি দেশ। চূড়ান্ত রাউন্ডে ৬৪টি দেশের অংশগ্রহণ মানে আরো বেশ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন মহাদেশ থেকে খেলার সুযোগ বাড়বে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা তো বেল পাকলে কাকের কী। বিশাল মানবসম্পদের কী মারাত্মক অপচয়। আমাদের তো আবার সবাই মিলে লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেখানে পৌঁছার ইচ্ছাশক্তি নেই। আমরা কবে জেগে উঠব। আত্মপ্রচারের পরিবর্তে দেশ ও ক্লাব ফুটবল নিয়ে ভাবব?

৩২ থেকে ৪৮ দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের পর রব উঠেছিল, বিশ্বকাপে চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঝুলে পড়বে। বাস্তবতায় ২৩তম বিশ্বকাপে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ফুটবল দুনিয়া তো আর সেই ২০ বছর আগের অবস্থায় নেই। দেশে দেশে ফুটবলে যে সংস্কার সাধন হয়েছে, এটি শুধু ইতিবাচক নয়, অনন্যও বটে। ফুটবল নিয়ে এখন গবেষণাগারে নিয়মিত গবেষণা চলে।

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করেবিশ্ব-মাতানো উৎসব শেষ। ফুটবলের মালা ছিঁড়ে খসে পড়েছে আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, আফসোস, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অখেলোয়াড়সুলভ মনোভাব, সুবিধা দেওয়া এবং অসুবিধা সৃষ্টি, সর্বোপরি বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব ইত্যাদি। ফুটবলের জাদুর সেই টান টান উত্তেজনা এখন আর নেই। এখন চলছে স্মৃতি রোমন্থনের পালা। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানো। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসেমানুষ জাতিকে আবদ্ধ করে ফেলে একটা মোহের মধ্যে। ফুটবলের মধ্যে আছে আশ্চর্য একটি সম্মোহনী শক্তি, যা মানুষকে আচ্ছন্ন করে সহজেই।

দেশ ফুটবলের অসিলায় অনেক কিছুই ভুলে মেতে উঠেছে। কোনো ভূমিকা নেই বিশ্বকাপের কম্পিটিশনের সঙ্গে। শুধু খেলার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বা অন্যের সাফল্যের ভাগীদার হওয়ার পাশাপাশি নিজ ব্যর্থতাকে ভুলে থাকার জন্য এত মাতামাতি! দেশে ২৩তম বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ১২-১৩ জন তরুণের প্রাণ গেছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দুই শর বেশি মানুষ দল সমর্থনকে কেন্দ্র করে মারামারিতে আহত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়িতে হামলা করা হয়েছে। অথচ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে অসময়ে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে যারা দেশে ফিরে গেছে, তাদের দেশে এর প্রতিবাদে হিংসাত্মক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছেআর সেই ক্ষোভে মূল্যবান প্রাণ ঝরেছেএমন খবর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বদৌলতে চোখে পড়েনি। এটি কি ফুটবলের সমস্যা, না মানসিক অসুস্থতা? অসচেতনতা ও অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে সাধারণ ফুটবল অনুরাগীদের মনন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলকে ঘিরে। মেসি আর নেইমার নিয়ে ছিল সব আবেগ আর উচ্ছ্বাস। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল অসময়ে বিদায় নেওয়ায় ভক্ত ও সমর্থকদের মন ভেঙেছে। তবে এটি তো ঠিক, ব্রাজিল কেন এগিয়ে আসতে পারল নাএটি যারা ফুটবল বোঝে, তারা বুঝতে পেরেছে। ফুটবল তো মাঠে খেলেই জিততে হবে। ভাগ্যিস, আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। এতে দেশে ফুটবলের উন্মাদনা ও আনন্দ রংহীন হয়নি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা স্পেনের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। এমনটি কেন হয়েছিল? আর্জেন্টিনার খেলা দেখে মনে হয়নি যে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলছে জেতার জন্য। ভাবা যায়, আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটে একটি শটও করতে পারেনি স্পেনের গোলপোস্টে। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল ম্যাচ? বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল খেলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম হয়েছে। এখন কত কিছুই না শোনা যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, লাতিনের ঘর থেকে ট্রফি ইউরোপে আবার চলে গেছে। অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনের বছরের জন্য।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো দল প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে স্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে এর আগে আর কখনো শিরোপা জেতেনি, সদ্যঃসমাপ্ত ২৩তম বিশ্বকাপের ফাইনালে যেভাবে জিতেছে স্পেন। পরাজিত দল বিজয়ী দলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল খেলা! স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন পুরো খেলায় ছিলেন ফুরফুরে অবস্থায়। তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে আট খেলায় সিমনকে ফাঁকি দিয়ে মাত্র একটি বল জালে ঢুকেছে। সিমন এবার পুরস্কার পেয়েছেন গোল্ডেন গ্লাভ

এবারের সেমিফাইনালে যে চারটি দেশ উঠে এসেছে, এই চারটি ফিফার র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে। এই চারটির মধ্যে তিনটি ইউরোপ এবং একটি লাতিন আমেরিকান। বিশ্বকাপের সঙ্গে তো কোনো কিছুর তুলনা চলে না। দুনিয়াজুড়ে আর্জেন্টিনার ভক্ত ও সমর্থক স্পেনের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি, এটিই বাস্তবতা। সবাই আশা করেছিল, ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি শক্ত লড়াই উপভোগ করবে। হ্যাঁ, ফুটবলের দর্শনে উভয় দলের মধ্যে মাঠের লড়াইয়ে অবশ্যই পার্থক্য আছে। এর পরও তো বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে দুটি সেরা দেশের ফুটবল রোমাঞ্চ ছড়ানোর লড়াই। এই দুই দেশের ফুটবলের গল্প ভিন্ন ধরনের হলেও সব সময় ভক্ত ও সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছে। মাঠে আর্জেন্টিনা দলের দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং পুরোপুরি বিবর্ণ চেহারা দেখে ভক্ত ও সমর্থকরা ভীষণভাবে হতাশ হয়েছে। ফুটবলে অনুভূতির বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব পায়। শুধু মাঠের খেলাই সব নয়, আবেগের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা চেয়েছিল ট্রফি রিটেইন করতে। খেলোয়াড়রা মেসির বিদায়লগ্নে তাঁর হাতে আরেকবার বিশ্বকাপ তুলে দিতে চেয়েছিলেন। মাঠে কিন্তু সেই দৃঢ়তা, চেতনা, আত্মবিশ্বাস কিছুই ছিল না। মাঠে পরাজিত দলটি পাত্তাই পায়নি। প্রতিপক্ষ মেসিকে আটকে ফেলায় তিনি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন।

ফুটবলের ট্যাকটিশিয়ানরা এখন অনেক বেশি মাথা ঘামান মাঠে এবং মাঠের বাইরের খেলায়। ফুটবল তো অনেক আগেই সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। পায়ের খেলায় মাথার গুরুত্ব ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। সহজ-সরল ফুটবলকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছেন চিন্তাশীল মানুষরা। আসলে একজনের পক্ষে তো বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব নয়। দলীয় শক্তি ছাড়া উপায় নেই। ফুটবলীয় দর্শনে একতা এবং সবাই মিলে লড়াই সবচেয়ে বেশি কার্যকর, মাঠে এটি দেখিয়ে দিয়েছে স্পেন। তারা সবাই মিলে ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। গ্রুপ ম্যাচে দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম খেলায় সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরেছে। এরপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফিতে চুমু এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছে ৩৬ বছর অপেক্ষার পর। স্পেন কিভাবে এবার ফাইনালে এসেছে আর আর্জেন্টিনা কিভাবে এসেছে, এই বিষয়টি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে উত্তর মিলবে।

ফুটবল ইতিহাসে লেখা থাকবে ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেন ফাইনালে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে ট্রফি জিতেছে। একমাত্র গোলটি করেছেন স্পেনের ফেরান তোরেস। তবে বিশ্বের যে কয়েক শ কোটি মানুষ সময়ের ব্যবধানে এই খেলা দেখেছে, তারা অস্বীকার করতে পারবে না যে খেলার ধারায় আর্জেন্টিনা যদি আরো অনেক বেশি গোলে পরাজিত হতো, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। আর্জেন্টিনা পারেনি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার সম্মান দিতে।

দেশে আমরা সাধারণ মানুষ সবাই মিলেমিশে অনেক আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে প্রতিদিন খেলা দেখেছি। সদ্যঃসমাপ্ত বিশ্বকাপ চলাকালীন দিনগুলোতে মিডিয়ায় দেখেছি ফুটবল পণ্ডিত আর বিশেষজ্ঞদের ছড়াছড়ি। দেশে এত ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে খেলাটি করুণভাবে ধুঁকছে। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা লক্ষ করেছি, ফুটবলের জন্য যে ভালোবাসা দেখেছিএই আগ্রহ যদি দেশের ফুটবল উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হতো, তাহলে দেশের ফুটবল উপকৃত হতো। সময় যত গড়াচ্ছে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডের নতুন নতুন দেশের খেলার সম্ভাবনা বাড়ছে। অতএব, ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে হাওয়া বুঝে দেশের ফুটবল পণ্ডিতদের কেউ কেউ তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। জানি না, এ ক্ষেত্রে মিডিয়ার কোনো হিসাব ছিল কি না। ফুটবলের চেহারা ও চরিত্র বোঝা মুশকিল। খেলাটি মজা ও রহস্য করতে ভালোবাসে। ফুটবলকে বিধাতা ছাড়া কেউ চিনতে পারেনি। এই খেলা কাউকে অনেক দিয়েও আবার শেষ সময়ে কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না। পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেও শূন্য হাতে বিদায় নিলেন। কেপ ভার্দের অপরিচিত গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে হিরো হয়ে গেছেন। নিজেই বলেছেন, আমি রাস্তায় রান্না করতাম আর আমার দরজার বাইরে বসে খেতাম। আর এখন আমি যখন ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাই মানুষ পাগল হয়ে যায়। এটিই বিশ্বকাপের জাদু।

১৯৯৮ সালের পর এবার বিশ্বকাপে খেলেছে নরওয়ে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর্লিং হালান্ড বলেছেন, পৃথিবীর মানচিত্রে নরওয়েকে যেভাবে আমরা চেনাতে পেরেছি, সেটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যাচ্ছে।

জয় হোক বিশ্বকাপের আবেদনের। জিতুক ফুটবল।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি : বিশ্বমন্দা ও খাদ্যসংকট কি অনিবার্য | কালের কণ্ঠ