একজন সাধারণ নাগরিকের জীবনে সংসদ কতটা উপস্থিত? তিনি যখন বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল বা সবজির দাম নিয়ে চিন্তিত হন, তখন সংসদ কি তাঁর উদ্বেগের ভাষা হয়ে ওঠে? যখন একজন তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকেন, তখন সংসদ কি তাঁর হতাশাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে উচ্চারণ করে? যখন একজন কৃষক উৎপাদন খরচের সঙ্গে বাজারদরের অসম লড়াইয়ে পরাজিত হন, যখন একজন শ্রমিক মজুরি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে প্রতিদিন নতুন হিসাব কষেন, যখন কোনো পরিবার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সঞ্চয় হারায়—তখন জাতীয় সংসদ কি সত্যি তাঁদের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে?
গণতন্ত্রে সংসদ হলো জনগণের প্রতিনিধিত্বের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা—এই তিনটি দায়িত্ব সংসদের মূলভিত্তি। কিন্তু একটি সংসদ শুধু তখনই জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে, যখন সেখানে জনগণের বাস্তব জীবন, উদ্বেগ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রশ্নের প্রতিফলন ঘটে। শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলেই জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় না; প্রতিনিধিত্বের প্রকৃত মান নির্ভর করে সংসদ কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে এবং কতটা কার্যকরভাবে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখতে পারে তার ওপর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বরাবরই বেশি। স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণেতারা একটি প্রতিনিধিত্বশীল, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় রাজনীতির নানা সীমাবদ্ধতা সেই স্বপ্নকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কখনো সংসদ কার্যকর বিরোধী দলের অভাবে দুর্বল হয়েছে, কখনো দলীয় আনুগত্যের কারণে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশ সংকুচিত হয়েছে, আবার কখনো রাজনৈতিক সংঘাত সংসদকে জনগণের সমস্যা সমাধানের জায়গা না বানিয়ে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের মঞ্চে পরিণত করেছে।
সংসদের শক্তি শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, বিতর্কের মানে। একটি গণতান্ত্রিক সংসদে সরকারপক্ষ সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে, কিন্তু বিরোধী মতকে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে পারে না। কারণ গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো—সংখ্যাগরিষ্ঠতা সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু সংখ্যালঘু মত দিতে পারে, প্রশ্ন তুলতে পারে। সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু সরকারের সমালোচনা করা নয়; বিকল্প নীতি, বিকল্প বাজেট, বিকল্প উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং জনগণের বিকল্প রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা। কিন্তু সংসদ যদি শুধু সংখ্যার খেলায় পরিণত হয়, তাহলে জনগণের প্রতিনিধিত্বের জায়গা সংকুচিত হয়। তখন আইন পাস হয়, বাজেট অনুমোদিত হয়, নীতি গ্রহণ করা হয়, কিন্তু জনগণের জীবনে সেই সিদ্ধান্তের কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে পর্যাপ্ত বিতর্ক হয় না। সংসদীয় গণতন্ত্রের মূলশক্তি হলো প্রশ্ন। সংসদে যত বেশি তথ্যভিত্তিক প্রশ্ন হবে, তত বেশি সরকারকে জবাব দিতে হবে। আর সরকার যত বেশি জবাব দেবে, তত বেশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বাড়বে।
এখানে সংসদীয় কমিটির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে সংসদীয় কমিটিগুলো সরকারের নীতি ও ব্যয়ের ওপর গভীর নজরদারি করে। সরকারি হিসাব, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম, বড় প্রকল্প, জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা—বিভিন্ন বিষয়ে কমিটি বিস্তারিত তদন্ত করতে পারে। কিন্তু কমিটি যদি দলীয় আনুগত্যের কাছে নতি স্বীকার করে, তাহলে তার নজরদারি কার্যকারিতা হারায়।
একটি শক্তিশালী সংসদে সংসদ সদস্যরা শুধু নিজেদের দলের বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন না, তাঁরা জনগণের পক্ষ থেকে প্রশ্ন করেন। তাঁদের প্রশ্নে সরকারের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে, কিন্তু সেই অস্বস্তিই গণতন্ত্রের প্রাণ। কারণ জবাবদিহি সব সময় আরামদায়ক নয়।
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির একটি বড় দুর্বলতা হলো, সংসদ সদস্যের ভূমিকা অনেক সময় দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। ভোটাররা একজন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেন, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর স্বাধীন রাজনৈতিক ভূমিকা কতটা থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একজন সংসদ সদস্য যদি নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের সমস্যা নিয়ে সংসদে কথা বলতে চান, কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো মত প্রকাশ করতে না পারেন, তাহলে তাঁর প্রতিনিধিত্বের স্বাধীনতা কতটা থাকে?
এখানে একটি ভারসাম্যের প্রশ্ন রয়েছে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা প্রয়োজন। কিন্তু দলীয় শৃঙ্খলা যদি প্রতিটি বিষয়ে অন্ধ আনুগত্যে পরিণত হয়, তাহলে সংসদ সদস্যের সাংবিধানিক ভূমিকা দুর্বল হয়। সংসদ সদস্য শুধু দলের প্রতিনিধি নন, তিনি রাষ্ট্রের আইন প্রণেতা এবং জনগণের প্রতিনিধি। এই দুই ভূমিকার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না হলে সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংসদে জনগণের কণ্ঠস্বর পৌঁছাতে হলে নির্বাচনী রাজনীতিতেও পরিবর্তন দরকার। অর্থ, প্রভাব, দলীয় আনুগত্য ও ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যদি প্রার্থী হওয়ার প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে, তাহলে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ কমে যায়। নির্বাচনে ব্যয়ের সীমা থাকলেও বাস্তবে তা কতটা মানা হয়, প্রার্থীদের অর্থের উৎস কতটা স্বচ্ছ, তাঁদের সম্পদের হিসাব কতটা যাচাই করা হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত সংসদের প্রতিনিধিত্বের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
একজন সংসদ সদস্যের নির্বাচনী এলাকার সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে প্রতিনিধিত্ব দুর্বল হয়। সংসদ সদস্যদের নিয়মিত জনশুনানি, নির্বাচনী এলাকার সমস্যা নিয়ে প্রকাশ্য প্রতিবেদন এবং জনগণের মতামত গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা উচিত। জনগণের সঙ্গে প্রতিনিধির সম্পর্ক শুধু নির্বাচনের সময়কার হওয়া উচিত নয়।
সংসদকে আরো কার্যকর করতে প্রযুক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। সংসদীয় কার্যক্রমের তথ্য সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্যভাবে প্রকাশ করা, ভোটাভুটিতে সংসদ সদস্যের অবস্থান জানানো, সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন জনগণের সামনে উন্মুক্ত করা এবং আইন প্রণয়নের আগে নাগরিক মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে সংসদীয় গণতন্ত্রের সঙ্গে নাগরিকদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হবে। তবে সংসদকে দুর্বল করার সবচেয়ে বড় কারণ রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা। সরকার যদি বিরোধী দলকে শত্রু মনে করে এবং বিরোধী দল যদি সরকারকে রাষ্ট্রের শত্রু মনে করে, তাহলে সংসদ কখনোই সুস্থ বিতর্কের জায়গা হতে পারে না।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার পালাবদল অনেক সময় নীতির পরিবর্তনের চেয়ে প্রতিশোধের চেহারা ধারণ করে। ক্ষমতায় থাকা দল বিরোধী দলে গেলে যে অধিকার দাবি করে, ক্ষমতায় ফিরে সেই একই অধিকার অন্যদের দিতে অনিচ্ছুক হয়। এই দ্বৈত মানসিকতা সংসদীয় গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। সংসদকে সত্যিকার অর্থে জনগণের কণ্ঠস্বর করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে এমন নিয়মে একমত হতে হবে, যা ক্ষমতায় থাকলেও এবং বিরোধী দলে থাকলেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
সব শেষে প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে—সংসদ কি সত্যি জনগণের কণ্ঠস্বর? এর উত্তর এককথায় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা কঠিন। সংসদ জনগণের কণ্ঠস্বর হওয়ার সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, কিন্তু বাস্তবে সে কণ্ঠ কতটা শোনা যায়, তা নির্ভর করে নির্বাচনের মান, রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্র, সংসদ সদস্যদের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা এবং সরকারের জবাবদিহির ওপর।
সংসদে যদি জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে গভীর আলোচনা হয়, বেকার তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়ে কার্যকর নীতি তৈরি হয়, কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ন্যায্য দাম নিয়ে সরকারকে জবাব দিতে হয়, দুর্নীতির অভিযোগে মন্ত্রী ও আমলাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রকে ব্যাখ্যা দিতে হয়—তাহলেই সংসদ সত্যিকারের জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠবে।
একটি সংসদ তখনই সফল, যখন তার বিতর্কের শব্দ সংসদ ভবনের দেয়াল পেরিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে। যখন একজন দিনমজুর মনে করেন, তাঁর কষ্টের কথা কেউ বলছেন; একজন বেকার তরুণ মনে করেন, তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র চিন্তা করছে; একজন কৃষক মনে করেন, তাঁর ঘামের মূল্য নিয়ে আইন প্রণেতারা প্রশ্ন তুলছেন—তখনই সংসদ জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্রের শেষ বিচার তাই সংসদ ভবনের জাঁকজমকে নয়, জনগণের জীবনে। সংসদে কত আইন পাস হলো, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, কত মানুষের জীবন বদলাল? কত অন্যায় থামল? কত দুর্নীতির জবাবদিহি হলো? কত সাধারণ মানুষের কথা ক্ষমতার টেবিলে পৌঁছল? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে—আমাদের সংসদ শুধু জনগণের নামে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠান, নাকি সত্যি জনগণের কণ্ঠস্বর।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট



তার আগে ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন আইনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী অন্তর্ভুক্ত থাকার পরও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর চার কম্পানি সেনা চেয়ে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে চিঠি দেয় কমিশন। কিন্তু কমিশনের ওই চাহিদা পূরণ হয়নি। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এ টি এম শামসুল হুদা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ পরিস্থিতির জন্য সরকারের অসহযোগিতা ও অমনোযোগিতাকে দায়ী করেন। সরকারের বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘনেরও অভিযোগ ওঠে। কারণ সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদে বলা আছে, 


বিশ্ব-মাতানো উৎসব শেষ। ফুটবলের মালা ছিঁড়ে খসে পড়েছে আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, আফসোস, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অখেলোয়াড়সুলভ মনোভাব, সুবিধা দেওয়া এবং অসুবিধা সৃষ্টি, সর্বোপরি বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব ইত্যাদি। ফুটবলের জাদুর সেই টান টান উত্তেজনা এখন আর নেই। এখন চলছে স্মৃতি রোমন্থনের পালা। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানো। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসে