• ই-পেপার

মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ : বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অবদান

  • লে. কর্নেল ওয়াসিউদ্দীন আহমেদ, পিএসসি

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

সুমিত বণিক

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বাংলাদেশের মানুষের কাছে বন্যা নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বৃহত্তর চট্টগ্রামের বিভিন্ন জেলা ও তিন পার্বত্য জেলায় ভয়াবহ বন্যা এবং অতি সম্প্রতি ভোলা, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে আসা পানির ক্রমাগত বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রধান নদীগুলোর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়াসার্বিক পরিস্থিতি আমাদের স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ ফল এখন আমাদের ঘরের দরজায়। কোথাও পাহাড়ি ঢল, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী নদীভাঙন, আবার কোথাও আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবন-জীবিকাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। পানি নেমে যাওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে মানুষ কাদা, ক্ষুধা, রোগ-ব্যাধি ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় পানি নেমে গেলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখন স্পষ্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে। বসতঘর ধ্বংস, কৃষিজমি নষ্ট, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং জীবিকা হারানোর মতো সমস্যা বহু পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম চললেও মাঠ পর্যায়ে সমন্বয়ের অভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টার (এসওডি) এবং ন্যাশনাল প্ল্যান ফর ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট (২০২১-২০২৫) দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, জরুরি সাড়া এবং পুনর্বাসনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কার্যক্রম এখনো দুর্যোগের পরে সক্রিয় হয়। দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানো, প্রস্তুতি গ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) এরই মধ্যে উন্নত হাইড্রোলজিক্যাল মডেল, স্যাটেলাইট তথ্য এবং আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার করে আগাম বন্যা পূর্বাভাস দিচ্ছে। এমনকি ১০ দিনের সম্ভাব্য পূর্বাভাসও প্রকাশ করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেএই তথ্য কি শেষ পর্যন্ত ইউনিয়ন পর্যায়ের কৃষক, জেলে বা পাহাড়ি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছাচ্ছে? অনেক ক্ষেত্রেই উত্তরটি নেতিবাচক। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বিত পরিকল্পনার ঘাটতি এখনো স্পষ্ট। ফলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও অনেক এলাকায় আগাম প্রস্তুতি যথাসময়ে নেওয়া যায় না।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানদুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে আরো শক্তিশালী সমন্বয় প্রয়োজন। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে নিয়মিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ, প্রস্তুতি সভা এবং যৌথ কর্মপরিকল্পনা চালু করা গেলে বন্যার ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

বন্যার সময় উদ্ধার কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃত সংকট শুরু হয় পানি নেমে যাওয়ার পর। তখন মানুষের প্রয়োজন হয় নিরাপদ বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি পুনরুদ্ধার, শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখা এবং জীবিকা ফিরিয়ে আনার সুযোগ। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থার ত্রাণ কার্যক্রম অনেক সময় বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। ফলে কেউ একাধিকবার সহায়তা পায়, আবার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ সহায়তার বাইরে থেকে যায়।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য একটি জাতীয় সমন্বিত ডিজিটাল ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসন তথ্যভাণ্ডার (ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিকভারি ডেটা বেইস) গড়ে তোলা সময়ের দাবি। প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে একটি ইউনিক আইডি দেওয়া হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, মোবাইল অ্যাপ কিংবা তথ্যসেবা কেন্দ্রযেখান থেকেই তথ্য নিবন্ধন করা হোক না কেন, সব তথ্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটা বেইসে সংরক্ষিত থাকবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন পরিবার কী ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে, কারা ত্রাণ পেয়েছে, কারা এখনো সহায়তা পায়নি, কোথায় ঘর নির্মাণ প্রয়োজন, কোথায় কৃষি পুনর্বাসন জরুরিসবকিছু তাৎক্ষণিকভাবে জানা যাবে। ফলে একই পরিবারের কাছে বারবার ত্রাণ পৌঁছানো এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাদ পড়ার মতো সমস্যা অনেকাংশে কমে আসবে।

জলবায়ু সংকট : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনকে শুধু ত্রাণ বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। একজন কৃষকের জমিতে উৎপাদন ফিরিয়ে আনা, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর আয়ের উৎস পুনর্গঠন, একজন জেলের জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করাসবকিছুকে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

পুনর্বাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা। বন্যায় ঘরবাড়ি হারানো, দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা মানুষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক সহায়তা, নারী ও শিশুর সুরক্ষা এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো আরো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি। বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান (বিসিসিএসএপি) ২১০০ এবং ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যান (এনএপি) ২০২৩-২০৫০ জলবায়ুসহনশীল উন্নয়ন, টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, নদী ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এখন প্রয়োজন এসব নীতিমালাকে মাঠ পর্যায়ের বাস্তব কর্মসূচিতে রূপান্তর করা। নদীভাঙনপ্রবণ ও পাহাড়ধস ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা, জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার, টেকসই বাঁধ নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ব্যবস্থাপনাএসব উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে বন্যার ক্ষতি কমাতে সহায়তা করবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ অপরিহার্য। ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, যুবসমাজ এবং কমিউনিটি সংগঠনগুলোকে প্রশিক্ষিত করে একটি কার্যকর স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ দুর্যোগের প্রথম প্রতিক্রিয়া অনেক সময় স্থানীয় মানুষই দিয়ে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্থানীয় যে কমিটিগুলো রয়েছে, সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অকার্যকর এবং বেশির ভাগ মানুষ নিষ্ক্রিয়। বাংলাদেশ অতীতে বহু দুর্যোগ মোকাবেলায় বিশ্বের প্রশংসা অর্জন করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় শুধু দুর্যোগ মোকাবেলা যথেষ্ট নয়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো এবং জলবায়ুসহনশীল উন্নয়ন।

আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু ত্রাণের ট্রাক নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা; শুধু সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত; শুধু পুনর্বাসন নয়, প্রয়োজন দুর্যোগের আগেই প্রস্তুতি। বাংলাদেশকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি জলবায়ুসহনশীল রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে এখনই একটি জাতীয় সমন্বিত বন্যা-পূর্ব প্রস্তুতি ও বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করতে হবে; যেখানে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী এবং স্থানীয় জনগণ একই তথ্যভাণ্ডারের আওতায় কাজ করবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যা হয়তো পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্যকর সমন্বয়ের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ, বৈষম্য ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো অবশ্যই সম্ভব। এটিই হওয়া উচিত আগামী দিনের বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নতুন দর্শন।

লেখক : জনস্বাস্থ্যকর্মী ও প্রশিক্ষক

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

ইকরামউজ্জমান

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করে

৩৯ দিন ধরে চলা ফুটবলের গল্প বলা শেষ হয়েছে। ৪৮টি দেশের ১০৪টি খেলায় ৩০৮টি গোলের ঘটনাবহুল অসাধারণ ফুটবল উৎসব সাঙ্গ হয়েছে। ফুটবল শুধু মাঠে চিত্তাকর্ষক হয়নি, মানুষের হৃৎপিণ্ড নিয়ে ইচ্ছামতো খেলেছে গোলকপিণ্ডটি। ফিফা ফুটবলকেন্দ্রিক ব্যবসায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে এবার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ফিফার বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জনে বেজায় খুশি ফিফার সব সদস্য দেশ। এরই মধ্যে উয়েফার পক্ষ থেকে অনুদান বাড়িয়ে দেওয়ার দাবি উঠেছে। দাবি উঠেছে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং অন্য মহাদেশগুলো থেকেও। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ঘিরে প্রচুর বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠলেও এই সুইস ব্যক্তিত্ব কিন্তু নির্ভার। তাঁকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার জন্য প্রায় ২০০ দেশ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। ফিফার প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর পুনরায় নির্বাচিত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার।

এরই মধ্যে জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বলেছেন, ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপে ৬৪ দলের অংশ নেওয়ার বিষয়টি আমরা অবশ্যই বিশ্বকাপ শেষে পর্যালোচনা করব। বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখার সুযোগ সব দলকেই দেওয়া উচিত। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন মহাদেশের যেসব দেশ এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলার সুযোগ পায়নি, তারা এখন উত্তেজনায় ভুগছে। এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডে খেলেছে ৮৪টি দেশ। চূড়ান্ত রাউন্ডে ৬৪টি দেশের অংশগ্রহণ মানে আরো বেশ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন মহাদেশ থেকে খেলার সুযোগ বাড়বে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অবস্থা তো বেল পাকলে কাকের কী। বিশাল মানবসম্পদের কী মারাত্মক অপচয়। আমাদের তো আবার সবাই মিলে লক্ষ্য নির্ধারণ করে সেখানে পৌঁছার ইচ্ছাশক্তি নেই। আমরা কবে জেগে উঠব। আত্মপ্রচারের পরিবর্তে দেশ ও ক্লাব ফুটবল নিয়ে ভাবব?

৩২ থেকে ৪৮ দেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের পর রব উঠেছিল, বিশ্বকাপে চূড়ান্ত রাউন্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ঝুলে পড়বে। বাস্তবতায় ২৩তম বিশ্বকাপে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ফুটবল দুনিয়া তো আর সেই ২০ বছর আগের অবস্থায় নেই। দেশে দেশে ফুটবলে যে সংস্কার সাধন হয়েছে, এটি শুধু ইতিবাচক নয়, অনন্যও বটে। ফুটবল নিয়ে এখন গবেষণাগারে নিয়মিত গবেষণা চলে।

ফুটবল অনেক দিয়েও অনেককে বঞ্চিত করেবিশ্ব-মাতানো উৎসব শেষ। ফুটবলের মালা ছিঁড়ে খসে পড়েছে আনন্দ, বেদনা, দুঃখ, আফসোস, পক্ষপাতিত্ব, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অখেলোয়াড়সুলভ মনোভাব, সুবিধা দেওয়া এবং অসুবিধা সৃষ্টি, সর্বোপরি বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রভাব ইত্যাদি। ফুটবলের জাদুর সেই টান টান উত্তেজনা এখন আর নেই। এখন চলছে স্মৃতি রোমন্থনের পালা। প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানো। চার বছর পর পর বিশ্বকাপ আসেমানুষ জাতিকে আবদ্ধ করে ফেলে একটা মোহের মধ্যে। ফুটবলের মধ্যে আছে আশ্চর্য একটি সম্মোহনী শক্তি, যা মানুষকে আচ্ছন্ন করে সহজেই।

দেশ ফুটবলের অসিলায় অনেক কিছুই ভুলে মেতে উঠেছে। কোনো ভূমিকা নেই বিশ্বকাপের কম্পিটিশনের সঙ্গে। শুধু খেলার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ বা অন্যের সাফল্যের ভাগীদার হওয়ার পাশাপাশি নিজ ব্যর্থতাকে ভুলে থাকার জন্য এত মাতামাতি! দেশে ২৩তম বিশ্বকাপের উন্মাদনায় ১২-১৩ জন তরুণের প্রাণ গেছে। প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী দুই শর বেশি মানুষ দল সমর্থনকে কেন্দ্র করে মারামারিতে আহত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বাসাবাড়িতে হামলা করা হয়েছে। অথচ বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে অসময়ে ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে যারা দেশে ফিরে গেছে, তাদের দেশে এর প্রতিবাদে হিংসাত্মক ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছেআর সেই ক্ষোভে মূল্যবান প্রাণ ঝরেছেএমন খবর আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বদৌলতে চোখে পড়েনি। এটি কি ফুটবলের সমস্যা, না মানসিক অসুস্থতা? অসচেতনতা ও অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে সাধারণ ফুটবল অনুরাগীদের মনন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলকে ঘিরে। মেসি আর নেইমার নিয়ে ছিল সব আবেগ আর উচ্ছ্বাস। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল অসময়ে বিদায় নেওয়ায় ভক্ত ও সমর্থকদের মন ভেঙেছে। তবে এটি তো ঠিক, ব্রাজিল কেন এগিয়ে আসতে পারল নাএটি যারা ফুটবল বোঝে, তারা বুঝতে পেরেছে। ফুটবল তো মাঠে খেলেই জিততে হবে। ভাগ্যিস, আর্জেন্টিনা ফাইনাল পর্যন্ত গেছে। এতে দেশে ফুটবলের উন্মাদনা ও আনন্দ রংহীন হয়নি। ফাইনালে আর্জেন্টিনা স্পেনের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। এমনটি কেন হয়েছিল? আর্জেন্টিনার খেলা দেখে মনে হয়নি যে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলছে জেতার জন্য। ভাবা যায়, আর্জেন্টিনা ৯০ মিনিটে একটি শটও করতে পারেনি স্পেনের গোলপোস্টে। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল ম্যাচ? বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ফাইনাল খেলা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম হয়েছে। এখন কত কিছুই না শোনা যাচ্ছে। বাস্তবতা হলো, লাতিনের ঘর থেকে ট্রফি ইউরোপে আবার চলে গেছে। অপেক্ষা করতে হবে ২০৩০ সালে বিশ্বকাপের শতবর্ষ উদযাপনের বছরের জন্য।

শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ফাইনালে কোনো দল প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে স্পষ্ট প্রাধান্য বিস্তার করে এর আগে আর কখনো শিরোপা জেতেনি, সদ্যঃসমাপ্ত ২৩তম বিশ্বকাপের ফাইনালে যেভাবে জিতেছে স্পেন। পরাজিত দল বিজয়ী দলের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। বিশ্বকাপে এটি কোন ধরনের ফাইনাল খেলা! স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন পুরো খেলায় ছিলেন ফুরফুরে অবস্থায়। তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়নি। পুরো টুর্নামেন্টে আট খেলায় সিমনকে ফাঁকি দিয়ে মাত্র একটি বল জালে ঢুকেছে। সিমন এবার পুরস্কার পেয়েছেন গোল্ডেন গ্লাভ

এবারের সেমিফাইনালে যে চারটি দেশ উঠে এসেছে, এই চারটি ফিফার র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষে। এই চারটির মধ্যে তিনটি ইউরোপ এবং একটি লাতিন আমেরিকান। বিশ্বকাপের সঙ্গে তো কোনো কিছুর তুলনা চলে না। দুনিয়াজুড়ে আর্জেন্টিনার ভক্ত ও সমর্থক স্পেনের তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি, এটিই বাস্তবতা। সবাই আশা করেছিল, ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি শক্ত লড়াই উপভোগ করবে। হ্যাঁ, ফুটবলের দর্শনে উভয় দলের মধ্যে মাঠের লড়াইয়ে অবশ্যই পার্থক্য আছে। এর পরও তো বিশ্ব ফুটবল মঞ্চে দুটি সেরা দেশের ফুটবল রোমাঞ্চ ছড়ানোর লড়াই। এই দুই দেশের ফুটবলের গল্প ভিন্ন ধরনের হলেও সব সময় ভক্ত ও সমর্থকদের আকৃষ্ট করেছে। মাঠে আর্জেন্টিনা দলের দুর্বলতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং পুরোপুরি বিবর্ণ চেহারা দেখে ভক্ত ও সমর্থকরা ভীষণভাবে হতাশ হয়েছে। ফুটবলে অনুভূতির বিষয়টি সব সময় গুরুত্ব পায়। শুধু মাঠের খেলাই সব নয়, আবেগের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আর্জেন্টিনা চেয়েছিল ট্রফি রিটেইন করতে। খেলোয়াড়রা মেসির বিদায়লগ্নে তাঁর হাতে আরেকবার বিশ্বকাপ তুলে দিতে চেয়েছিলেন। মাঠে কিন্তু সেই দৃঢ়তা, চেতনা, আত্মবিশ্বাস কিছুই ছিল না। মাঠে পরাজিত দলটি পাত্তাই পায়নি। প্রতিপক্ষ মেসিকে আটকে ফেলায় তিনি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছিলেন।

ফুটবলের ট্যাকটিশিয়ানরা এখন অনেক বেশি মাথা ঘামান মাঠে এবং মাঠের বাইরের খেলায়। ফুটবল তো অনেক আগেই সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। পায়ের খেলায় মাথার গুরুত্ব ভীষণভাবে বেড়ে গেছে। সহজ-সরল ফুটবলকে দুর্ভেদ্য করে তুলেছেন চিন্তাশীল মানুষরা। আসলে একজনের পক্ষে তো বিশ্বকাপ জয় করা সম্ভব নয়। দলীয় শক্তি ছাড়া উপায় নেই। ফুটবলীয় দর্শনে একতা এবং সবাই মিলে লড়াই সবচেয়ে বেশি কার্যকর, মাঠে এটি দেখিয়ে দিয়েছে স্পেন। তারা সবাই মিলে ধীরে ধীরে খোলস ছেড়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। গ্রুপ ম্যাচে দুর্বল কেপ ভার্দের বিপক্ষে ড্র করেছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা প্রথম খেলায় সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরেছে। এরপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে আর্জেন্টিনা এবং শেষ পর্যন্ত ট্রফিতে চুমু এঁকে দিতে সক্ষম হয়েছে ৩৬ বছর অপেক্ষার পর। স্পেন কিভাবে এবার ফাইনালে এসেছে আর আর্জেন্টিনা কিভাবে এসেছে, এই বিষয়টি নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলে উত্তর মিলবে।

ফুটবল ইতিহাসে লেখা থাকবে ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেন ফাইনালে ১-০ গোলে আর্জেন্টিনাকে পরাজিত করে ট্রফি জিতেছে। একমাত্র গোলটি করেছেন স্পেনের ফেরান তোরেস। তবে বিশ্বের যে কয়েক শ কোটি মানুষ সময়ের ব্যবধানে এই খেলা দেখেছে, তারা অস্বীকার করতে পারবে না যে খেলার ধারায় আর্জেন্টিনা যদি আরো অনেক বেশি গোলে পরাজিত হতো, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। আর্জেন্টিনা পারেনি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার সম্মান দিতে।

দেশে আমরা সাধারণ মানুষ সবাই মিলেমিশে অনেক আবেগ, ভালোবাসা নিয়ে প্রতিদিন খেলা দেখেছি। সদ্যঃসমাপ্ত বিশ্বকাপ চলাকালীন দিনগুলোতে মিডিয়ায় দেখেছি ফুটবল পণ্ডিত আর বিশেষজ্ঞদের ছড়াছড়ি। দেশে এত ফুটবল পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে খেলাটি করুণভাবে ধুঁকছে। বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে যে উন্মাদনা লক্ষ করেছি, ফুটবলের জন্য যে ভালোবাসা দেখেছিএই আগ্রহ যদি দেশের ফুটবল উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব হতো, তাহলে দেশের ফুটবল উপকৃত হতো। সময় যত গড়াচ্ছে, বিশ্বকাপের চূড়ান্ত রাউন্ডের নতুন নতুন দেশের খেলার সম্ভাবনা বাড়ছে। অতএব, ঘুম থেকে জেগে উঠতে হবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল চলাকালে হাওয়া বুঝে দেশের ফুটবল পণ্ডিতদের কেউ কেউ তাঁদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। জানি না, এ ক্ষেত্রে মিডিয়ার কোনো হিসাব ছিল কি না। ফুটবলের চেহারা ও চরিত্র বোঝা মুশকিল। খেলাটি মজা ও রহস্য করতে ভালোবাসে। ফুটবলকে বিধাতা ছাড়া কেউ চিনতে পারেনি। এই খেলা কাউকে অনেক দিয়েও আবার শেষ সময়ে কেড়ে নিতে দ্বিধা করে না। পর্তুগালের ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেও শূন্য হাতে বিদায় নিলেন। কেপ ভার্দের অপরিচিত গোলরক্ষক ভোজিনিয়া এবারই প্রথম বিশ্বকাপে খেলতে এসে হিরো হয়ে গেছেন। নিজেই বলেছেন, আমি রাস্তায় রান্না করতাম আর আমার দরজার বাইরে বসে খেতাম। আর এখন আমি যখন ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাই মানুষ পাগল হয়ে যায়। এটিই বিশ্বকাপের জাদু।

১৯৯৮ সালের পর এবার বিশ্বকাপে খেলেছে নরওয়ে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আর্লিং হালান্ড বলেছেন, পৃথিবীর মানচিত্রে নরওয়েকে যেভাবে আমরা চেনাতে পেরেছি, সেটিই আমাকে সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যাচ্ছে।

জয় হোক বিশ্বকাপের আবেদনের। জিতুক ফুটবল।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন। প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’

ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’

বর্তমান বিশ্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সংকট এবং বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিশ্বকে বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজতে বাধ্য করেছে। এত দিন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান মাধ্যম ছিল ভবনের ছাদে স্থাপিত প্রচলিত সোলার প্যানেল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কম্পানি স্বচ্ছ সোলার গ্লাস বা ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তি উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই প্রযুক্তিতে ভবন, অফিস, শপিং মল, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিমানবন্দর, এমনকি ব্যক্তিগত বাড়ির কাচের জানালাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস পরিণত হতে পারে। বিশেষ ধরনের স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক  আবরণ কাচের ওপর প্রয়োগ করা হয়, যা সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) ও অবলোহিত (ইনফ্রারেড) রশ্মি শোষণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে এবং বরাবরের মতো দৃশ্যমান সূর্যের আলোকে ওই কাচের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে দেয়। ফলে ঘরের ভেতরে প্রাকৃতিক আলো প্রবেশে কোনো উল্লেখযোগ্য বাধা সৃষ্টি হয় না। প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় এই প্রযুক্তি স্থাপনে আলাদা জায়গার প্রয়োজন হয় না, নান্দনিকতাও বজায় থাকে। ফলে ভবিষ্যতের স্মার্ট সিটি নির্মাণে এই প্রযুক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। উল্লেখ্য, সূর্যালোক মূলত তিনটি ভাগে বিভক্তদৃশ্যমান আলো, অতিবেগুনি রশ্মি এবং অবলোহিত রশ্মি। আমাদের চোখ শুধু দৃশ্যমান আলো দেখতে পায়। কিন্তু সোলার উইন্ডো অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মিকে শোষণ করতে পারে। ফলে কাচটি দেখতে পুরোপুরি স্বচ্ছ হয়। প্রচলিত সোলার প্যানেলের মতো এটি ভবনের সৌন্দর্য নষ্ট করে না, বরং সৌন্দর্য বাড়ায়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’স্বচ্ছ সোলার গ্লাসের কার্যপদ্ধতি প্রচলিত সৌর প্যানেলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হলেও মূলনীতি একই। সাধারণ সোলার প্যানেলে দৃশ্যমান সূর্যালোক সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোতে এমন বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা মানুষের চোখে দৃশ্যমান আলোর বেশির ভাগ অংশ কাচের মধ্য দিয়ে যেতে দেয় এবং একই সঙ্গে অতিবেগুনি ও অবলোহিত রশ্মি সংগ্রহ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জানালার চারপাশে স্থাপিত সূক্ষ্ম পরিবাহী স্তরের মাধ্যমে ভবনের বিদ্যুত্ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করা বা জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডেও সরবরাহ করা সম্ভব। ভবনের বাইরের দেয়াল বা কাচের সম্মুখভাগ যদি পুরোপুরি এই প্রযুক্তিতে তৈরি হয়, তাহলে একটি বহুতল ভবন প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। একই সঙ্গে এই কাচ সূর্যের অতিরিক্ত তাপ প্রবেশ কমিয়ে ভবনের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করবে। ফলে এয়ারকন্ডিশনার ব্যবহারের প্রয়োজন কমবে এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। বর্তমানে গবেষকরা এই প্রযুক্তির দক্ষতা বা রূপান্তর হার আরো বাড়ানোর জন্য নতুন উপাদান, বিশেষ করে পেরোভস্কাইট এবং উন্নত স্বচ্ছ ফটোভোল্টাইক উপকরণ নিয়ে গবেষণা করছেন। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, অর্থনৈতিক এবং ব্যবহারবান্ধব। প্রচলিত সোলার প্যানেল বসানোর জন্য আলাদা ছাদ বা খোলা জায়গা দরকার হয়, কিন্তু স্বচ্ছ সোলার গ্লাসে সেই সমস্যা নেই। উপরন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো ধোঁয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড বা শব্দদূষণ সৃষ্টি হয় না। ফলে পরিবেশ রক্ষা এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং শহরাঞ্চলে বহুতল কাচের ভবনের সংখ্যাও বাড়ছে। তাই ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো প্রযুক্তিতে শহরের আধুনিক ভবন, শিল্প-কারখানা, শপিং মল, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি ভবন নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি বড় অংশ নিজেরাই উৎপাদন করতে পারবে। একই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে গাড়ি, বাস, ট্রেন, জাহাজ এবং বিমানেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এতে যানবাহনের জানালা থেকেই বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়ে ব্যাটারি চার্জ করা, আলো, এয়ারকন্ডিশনিং, সেন্সর ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র পরিচালনা করা যাবে। একইভাবে ট্রেন বা মেট্রো রেলের জানালায়, এমনকি বর্তমানে সারা বাংলাদেশে সয়লাব ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারের ওপর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভ্যন্তরীণ আলো, তথ্য প্রদর্শন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরিচালনার জন্য সহায়ক বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে। কৃষি খাতেও গ্রিনহাউসের কাচে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে। ফলে জমির দ্বৈত ব্যবহারও নিশ্চিত হবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রযুক্তি বিশেষ সম্ভাবনাময়। কারণ প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশে বছরে দীর্ঘ সময় সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা এই প্রযুক্তির জন্য একটি বড় সুবিধা। বাস্তবায়ন  করতে পারলে এটি শুধু একটি জানালা নয়, বরং একটি ক্ষুদ্র বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। এতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস পাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমবে।

প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন এবং এখনো গবেষণা ও উন্নয়নের পথে রয়েছে। তবু জ্বালানিব্যবস্থায় এটি এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে এবং এর ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। বাংলাদেশ যদি সময়োপযোগী নীতি গ্রহণ করে, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ায় এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের অসংখ্য ভবন ও যানবাহন নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম হবে। এর মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলার পথে বাংলাদেশ আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারবে। তবে এসব সাফল্য পেতে হলে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। যেমনবর্তমানে প্রযুক্তিটির উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি এবং দক্ষতা প্রচলিত উচ্চ ক্ষমতার সোলার প্যানেলের তুলনায় এখনো কম। এ ছাড়া দেশে এই প্রযুক্তি উৎপাদনের শিল্প, দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষণাগার এবং মানসম্মত স্থাপনা ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে গবেষণা ও বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে দেশেই স্বচ্ছ সোলার গ্লাস উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে। নতুন নির্মিত সরকারি ও বেসরকারি ভবনে এই প্রযুক্তি ব্যবহারে করছাড়, সহজ ঋণ ও প্রণোদনা দিলে এর প্রসার আরো দ্রুত ঘটবে। পাশাপাশি দেশীয় প্রকৌশলী ও শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়ে গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোও জরুরি।

অবশ্য প্রচলিত সোলার প্যানেলের তুলনায় ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর খরচ প্রায় দুই থেকে চার গুণ বেশি। এতে অর্গানিক সেমিকন্ডাক্টর বা পেরোভস্কাইট প্রযুক্তির মতো উন্নত উপাদান ব্যবহার করায় খরচ বেশি হয়। এ ছাড়া স্বচ্ছ হওয়ার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতাও প্রচলিত প্যানেলের তুলনায় বেশ কম। আবার প্রচলিত প্যানেলের কর্মদক্ষতা যেখানে ১৫ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে, সেখানে ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডোর কর্মদক্ষতা মাত্র ৫ থেকে ১৫ শতাংশ হয়। তবু ভবনের কাচ বা জানালাগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহার করার জন্য প্রযুক্তিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে এবং ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে এর উৎপাদন খরচ ও দাম কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

লেখক : অধ্যাপক ও আইটি গবেষক, আইআইটি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

দেশব্যাপী বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্য-উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বহু নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নওগাঁর কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি নদী অববাহিকার চর ও নিচু জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি উদ্বেগজনক অবস্থায় থাকায় হাওর, বিল ও নদীর তীরবর্তী ফসলি জমিতে পানি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধিতে নওগাঁর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কিছু জেলায়ও নতুন করে প্লাবন দেখা দিতে পারে। তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলার পরিস্থিতি আপাতত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও উজানে নতুন করে ভারি বৃষ্টি হলে তা দ্রুত বদলে যেতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার উজানে ভারি বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো সর্বত্র ভয়াবহ নয়, তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে প্লাবনের বিস্তৃতি বাড়তে পারে এবং কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও মাঠে থাকা ফসলের ওপর চাপ তীব্র হতে পারে।

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বন্যার হুমকি এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অনেক এলাকায় আউশ ধানে শীষ বের হওয়া, ফুল আসা বা দানা ভরার পর্যায়ে রয়েছে। এসব পর্যায়ে ধানগাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়, পরাগায়ণ ও দানা গঠন কমে যায় এবং গাছ হেলে পড়তে পারে। প্রবল স্রোত থাকলে ধানগাছ উপড়ে যাওয়া বা কাদা-পলির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কাও থাকে। পানি দ্রুত নেমে গেলেও অপুষ্ট দানা, চিটা বৃদ্ধি এবং ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যেসব জমির আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব, সেখানে সুযোগ থাকলে দ্রুত কাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে অপরিপক্ব ধান তাড়াহুড়া করে কাটলে ফলন ও চালের গুণমান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জমির অবস্থা, ধানের পরিপক্বতা এবং সম্ভাব্য প্লাবনের সময় বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

একই সময়ে রোপা আমন মৌসুমের প্রধান কার্যক্রম চলছে। বেশির ভাগ এলাকায় বীজতলা তৈরি শেষ হয়েছে। কোথাও চারা তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য চারা রোপণ করা হয়েছে। বীজতলা দীর্ঘ সময় ডুবে থাকলে চারা পচে যেতে বা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সদ্য রোপণ করা চারা স্রোতে ভেসে যেতে কিংবা কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়তে পারে। এতে কৃষককে পুনরায় জমি তৈরি, চারা সংগ্রহ ও রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত চারা না পাওয়া গেলে রোপণ বিলম্বিত হবে এবং তাতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আমনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক আবাদও ব্যাহত হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবেলায় উঁচু ও নিরাপদ স্থানে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা প্রয়োজন। বিলম্বিত রোপণের উপযোগী আলোকসংবেদী জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কমিউনিটি বা সমবায় ভিত্তিক বীজতলা স্থাপন করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে দ্রুত চারা বিতরণ সম্ভব হবে। অতিরিক্ত চারা সংরক্ষণ, প্রয়োজনে ভাসমান বীজতলা তৈরি এবং দেরিতে রোপণযোগ্য আমন জাতের বীজ প্রস্তুত রাখাও জরুরি।

বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে মূল জমিতে রোপণ বিলম্বিত হলে বোলান বা দ্বিরোপণ পদ্ধতি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বীজতলার চারা তুলে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে ঘন করে সাময়িকভাবে রোপণ করা হয়। পরে পানি নামার পর মূল জমি প্রস্তুত হলে সেই চারা আবার তুলে চূড়ান্ত জমিতে রোপণ করা হয়। এতে চারা অতিবয়স্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিলম্বিত পরিস্থিতিতেও আমন আবাদ ধরে রাখা সম্ভব হয়। তবে জাত নির্বাচন, চারার বয়স এবং প্রথম ও দ্বিতীয় রোপণের সময় ঠিক রাখার জন্য স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পানি নেমে যাওয়ার পর জমির প্রকৃতি ও চারার প্রাপ্যতা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে বীজ বোনা এবং সুস্থ চারা থাকলে বিলম্ব না করে রোপণ করা দরকার। যেখানে চারা আংশিক নষ্ট হয়েছে, সেখানে পুরো জমি পুনরায় রোপণ না করে সুস্থ গুচ্ছ থেকে চারা ভাগ করে ফাঁকা স্থানে বসানো যেতে পারে। এতে চারা ও শ্রমদুই-ই সাশ্রয় হবে।

জলি বা গভীর পানির আমন ধান স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পানির সঙ্গে কিছুটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে গেলে কচি গাছ সম্পূর্ণ ডুবে যেতে বা স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পানি দ্রুত নেমে গেলে লম্বা ও দুর্বল গাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে গভীর পানির ধানের ক্ষেত্রেও পানির গভীরতা, বৃদ্ধির গতি, স্রোত ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বন্যা অভিযোজনের জন্য স্থানীয়ভাবে উপযোগী গভীর পানির ধানের জাত সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পাট কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় পাট চাষও ঝুঁকিতে রয়েছে। জমিতে অতিরিক্ত পানি থাকলে পাট কাটা, আঁটি বাঁধা এবং মাঠ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে কাটা বা না কাটা পাট ভেসে যেতে পারে। জাগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থান পাওয়া কঠিন হলে আঁশের গুণমান নষ্ট হতে পারে। শুকানো ও পরিবহনে সমস্যা হলে কৃষক ন্যায্য বাজারমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। পাট কাটার উপযোগী হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উঁচু জায়গায় আঁটি সংরক্ষণ এবং সম্ভব হলে নিয়ন্ত্রিত জাগপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

তিলসহ অন্যান্য জলাবদ্ধতা সংবেদনশীল ফসল অল্প সময়ের জলাবদ্ধতায়ই গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে। তিলের গোড়ায় পানি জমলে শিকড়ের শ্বাসক্রিয়া ব্যাহত হয়, গাছ হলুদ হয়ে যায় এবং দ্রুত মারা যেতে পারে। কাউন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দানাশস্যও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কুমড়া এবং বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির জমিতে পানি জমলে শিকড় পচা, ছত্রাকজনিত রোগ ও গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এসব ফসলের ক্ষতি হলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দামও বাড়তে পারে।

তাই নিচু জমির নালা পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনমতো ছোট নিষ্কাশন নালা কাটা এবং মাচা বা উঁচু বেডের ফসল রক্ষায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পানি নেমে গেলে গাছের গোড়া থেকে কাদা সরিয়ে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেশি সার প্রয়োগ না করে গাছকে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সময় দেওয়া উচিত। পরে গাছের অবস্থা বুঝে পরিমিত সার এবং প্রয়োজনীয় রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।

কলা ও আখ তুলনামূলকভাবে বড় ফসল হলেও বন্যার স্রোত, দীর্ঘ জলাবদ্ধতা এবং নরম মাটিতে শিকড়ের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হেলে পড়তে বা উপড়ে যেতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পরও শিকড় পচা ও রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। হেলে পড়া কলাগাছকে খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখা, ভাঙা ও রোগাক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা এবং আখের জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলের ভুট্টা, চিনাবাদাম, শাক-সবজি ও পশুখাদ্যের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বীজ ও পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

বন্যার প্রভাব শুধু মাঠের ফসলে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষকের ঘরে রাখা বীজ, সার, বালাইনাশক, কৃষিযন্ত্র ও সংরক্ষিত খাদ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্রামীণ রাস্তা ও বাজার প্লাবিত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বিপণন ব্যাহত হয়। গবাদি পশুর খাদ্যসংকট, হাঁস-মুরগির খামারের ক্ষতি এবং পুকুর বা ঘের থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই বীজ, সার, খাদ্য ও কৃষিযন্ত্র উঁচু ও শুকনা স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পশুর জন্য শুকনা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় রাখা এবং পুকুর ও ঘেরে জাল বা অস্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব তৈরি করে অঞ্চল ও ফসল ভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো বীজ, চারা, সার, নগদ সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণ পৌঁছানো না গেলে পরবর্তী মৌসুমও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত আমন জমিতে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুনরায় রোপণ, বিলম্বে রোপণযোগ্য ধান কিংবা পানি নেমে গেলে আগাম রবি ফসলের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বালু জমা জমি, ভাঙা আইল ও ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও সরকারি সহায়তা জরুরি।

সব মিলিয়ে বর্তমান বন্যা এখনো সর্বত্র বিপর্যয়কর রূপ নেয়নি, কিন্তু কৃষির জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে পানির গভীরতা, স্রোতের তীব্রতা, প্লাবনের স্থায়িত্ব এবং ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ের ওপর। তাই শুধু পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগাম প্রস্তুতি, মাঠভিত্তিক পরামর্শ, বিকল্প বীজতলা, বোলানপদ্ধতির প্রয়োগ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন, নিরাপদ ফসল সংগ্রহ এবং সময়োপযোগী পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা দরকার। সঠিক সময়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ফসলের ক্ষতি অনেকাংশে সীমিত রাখা এবং কৃষকের পরবর্তী উৎপাদনচক্র সচল রাখা সম্ভব হবে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচার

মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ : বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর অবদান | কালের কণ্ঠ