• ই-পেপার

বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত ‘ট্রান্সপারেন্ট সোলার উইন্ডো’

  • ড. এম মেসবাহউদ্দিন সরকার

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়

দেশব্যাপী বন্যার আশঙ্কা ক্রমেই বাড়ছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং দেশের অভ্যন্তরে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টিপাতের কারণে উত্তর, উত্তর-পূর্ব, মধ্য-উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বহু নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও নওগাঁর কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এবং আরো কয়েকটি নদী অববাহিকার চর ও নিচু জমি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা, কুশিয়ারা ও সোমেশ্বরী নদীর পানি উদ্বেগজনক অবস্থায় থাকায় হাওর, বিল ও নদীর তীরবর্তী ফসলি জমিতে পানি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আত্রাই নদীর পানি বৃদ্ধিতে নওগাঁর পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার কিছু জেলায়ও নতুন করে প্লাবন দেখা দিতে পারে। তিস্তা, দুধকুমার ও ধরলার পরিস্থিতি আপাতত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও উজানে নতুন করে ভারি বৃষ্টি হলে তা দ্রুত বদলে যেতে পারে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বৃদ্ধির আশঙ্কাও রয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য এলাকার উজানে ভারি বৃষ্টি হলে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হতে পারে। সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো সর্বত্র ভয়াবহ নয়, তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে প্লাবনের বিস্তৃতি বাড়তে পারে এবং কৃষিজমি, গ্রামীণ অবকাঠামো ও মাঠে থাকা ফসলের ওপর চাপ তীব্র হতে পারে।

বন্যার হুমকিতে ফসল ও উত্তরণে করণীয়বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো বন্যার হুমকি এমন সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অনেক এলাকায় আউশ ধানে শীষ বের হওয়া, ফুল আসা বা দানা ভরার পর্যায়ে রয়েছে। এসব পর্যায়ে ধানগাছ কয়েক দিন পানির নিচে থাকলে সালোকসংশ্লেষণ ব্যাহত হয়, পরাগায়ণ ও দানা গঠন কমে যায় এবং গাছ হেলে পড়তে পারে। প্রবল স্রোত থাকলে ধানগাছ উপড়ে যাওয়া বা কাদা-পলির নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কাও থাকে। পানি দ্রুত নেমে গেলেও অপুষ্ট দানা, চিটা বৃদ্ধি এবং ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। যেসব জমির আউশ ধান প্রায় পরিপক্ব, সেখানে সুযোগ থাকলে দ্রুত কাটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে অপরিপক্ব ধান তাড়াহুড়া করে কাটলে ফলন ও চালের গুণমান উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জমির অবস্থা, ধানের পরিপক্বতা এবং সম্ভাব্য প্লাবনের সময় বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

একই সময়ে রোপা আমন মৌসুমের প্রধান কার্যক্রম চলছে। বেশির ভাগ এলাকায় বীজতলা তৈরি শেষ হয়েছে। কোথাও চারা তোলা হচ্ছে, আবার কোথাও সদ্য চারা রোপণ করা হয়েছে। বীজতলা দীর্ঘ সময় ডুবে থাকলে চারা পচে যেতে বা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সদ্য রোপণ করা চারা স্রোতে ভেসে যেতে কিংবা কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়তে পারে। এতে কৃষককে পুনরায় জমি তৈরি, চারা সংগ্রহ ও রোপণ করতে হবে। পর্যাপ্ত চারা না পাওয়া গেলে রোপণ বিলম্বিত হবে এবং তাতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় আমনের লক্ষ্যমাত্রাভিত্তিক আবাদও ব্যাহত হতে পারে।

এই ঝুঁকি মোকাবেলায় উঁচু ও নিরাপদ স্থানে বিকল্প বীজতলা তৈরি করা প্রয়োজন। বিলম্বিত রোপণের উপযোগী আলোকসংবেদী জাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। কমিউনিটি বা সমবায় ভিত্তিক বীজতলা স্থাপন করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের মধ্যে দ্রুত চারা বিতরণ সম্ভব হবে। অতিরিক্ত চারা সংরক্ষণ, প্রয়োজনে ভাসমান বীজতলা তৈরি এবং দেরিতে রোপণযোগ্য আমন জাতের বীজ প্রস্তুত রাখাও জরুরি।

বন্যা বা জলাবদ্ধতার কারণে মূল জমিতে রোপণ বিলম্বিত হলে বোলান বা দ্বিরোপণ পদ্ধতি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। এই পদ্ধতিতে প্রথমে বীজতলার চারা তুলে উঁচু ও নিরাপদ স্থানে ঘন করে সাময়িকভাবে রোপণ করা হয়। পরে পানি নামার পর মূল জমি প্রস্তুত হলে সেই চারা আবার তুলে চূড়ান্ত জমিতে রোপণ করা হয়। এতে চারা অতিবয়স্ক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিলম্বিত পরিস্থিতিতেও আমন আবাদ ধরে রাখা সম্ভব হয়। তবে জাত নির্বাচন, চারার বয়স এবং প্রথম ও দ্বিতীয় রোপণের সময় ঠিক রাখার জন্য স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

পানি নেমে যাওয়ার পর জমির প্রকৃতি ও চারার প্রাপ্যতা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলে নতুন করে বীজ বোনা এবং সুস্থ চারা থাকলে বিলম্ব না করে রোপণ করা দরকার। যেখানে চারা আংশিক নষ্ট হয়েছে, সেখানে পুরো জমি পুনরায় রোপণ না করে সুস্থ গুচ্ছ থেকে চারা ভাগ করে ফাঁকা স্থানে বসানো যেতে পারে। এতে চারা ও শ্রমদুই-ই সাশ্রয় হবে।

জলি বা গভীর পানির আমন ধান স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা পানির সঙ্গে কিছুটা খাপ খাইয়ে নিতে পারে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে পানির গভীরতা দ্রুত বেড়ে গেলে কচি গাছ সম্পূর্ণ ডুবে যেতে বা স্রোতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার পানি দ্রুত নেমে গেলে লম্বা ও দুর্বল গাছ মাটিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে গভীর পানির ধানের ক্ষেত্রেও পানির গভীরতা, বৃদ্ধির গতি, স্রোত ও স্থায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বন্যা অভিযোজনের জন্য স্থানীয়ভাবে উপযোগী গভীর পানির ধানের জাত সংরক্ষণ, মূল্যায়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পাট কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় পাট চাষও ঝুঁকিতে রয়েছে। জমিতে অতিরিক্ত পানি থাকলে পাট কাটা, আঁটি বাঁধা এবং মাঠ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রবল স্রোতে কাটা বা না কাটা পাট ভেসে যেতে পারে। জাগ দেওয়ার জন্য উপযুক্ত ও নিরাপদ স্থান পাওয়া কঠিন হলে আঁশের গুণমান নষ্ট হতে পারে। শুকানো ও পরিবহনে সমস্যা হলে কৃষক ন্যায্য বাজারমূল্য থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। পাট কাটার উপযোগী হলে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, উঁচু জায়গায় আঁটি সংরক্ষণ এবং সম্ভব হলে নিয়ন্ত্রিত জাগপদ্ধতি অনুসরণ করা উচিত।

তিলসহ অন্যান্য জলাবদ্ধতা সংবেদনশীল ফসল অল্প সময়ের জলাবদ্ধতায়ই গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়ে। তিলের গোড়ায় পানি জমলে শিকড়ের শ্বাসক্রিয়া ব্যাহত হয়, গাছ হলুদ হয়ে যায় এবং দ্রুত মারা যেতে পারে। কাউন ও অন্যান্য ক্ষুদ্র দানাশস্যও দীর্ঘ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। মরিচ, বেগুন, ঢেঁড়স, লাউ, কুমড়া এবং বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন শাক-সবজির জমিতে পানি জমলে শিকড় পচা, ছত্রাকজনিত রোগ ও গাছ মারা যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এসব ফসলের ক্ষতি হলে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দামও বাড়তে পারে।

তাই নিচু জমির নালা পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনমতো ছোট নিষ্কাশন নালা কাটা এবং মাচা বা উঁচু বেডের ফসল রক্ষায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। পানি নেমে গেলে গাছের গোড়া থেকে কাদা সরিয়ে মাটিতে বাতাস চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেশি সার প্রয়োগ না করে গাছকে কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সময় দেওয়া উচিত। পরে গাছের অবস্থা বুঝে পরিমিত সার এবং প্রয়োজনীয় রোগ-বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে।

কলা ও আখ তুলনামূলকভাবে বড় ফসল হলেও বন্যার স্রোত, দীর্ঘ জলাবদ্ধতা এবং নরম মাটিতে শিকড়ের ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে হেলে পড়তে বা উপড়ে যেতে পারে। পানি নেমে যাওয়ার পরও শিকড় পচা ও রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে। হেলে পড়া কলাগাছকে খুঁটি দিয়ে বেঁধে রাখা, ভাঙা ও রোগাক্রান্ত অংশ সরিয়ে ফেলা এবং আখের জমি থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলের ভুট্টা, চিনাবাদাম, শাক-সবজি ও পশুখাদ্যের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত বীজ ও পুনর্বাসন সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

বন্যার প্রভাব শুধু মাঠের ফসলে সীমাবদ্ধ থাকে না। কৃষকের ঘরে রাখা বীজ, সার, বালাইনাশক, কৃষিযন্ত্র ও সংরক্ষিত খাদ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গ্রামীণ রাস্তা ও বাজার প্লাবিত হলে কৃষিপণ্য পরিবহন ও বিপণন ব্যাহত হয়। গবাদি পশুর খাদ্যসংকট, হাঁস-মুরগির খামারের ক্ষতি এবং পুকুর বা ঘের থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই বীজ, সার, খাদ্য ও কৃষিযন্ত্র উঁচু ও শুকনা স্থানে সরিয়ে নেওয়া, পশুর জন্য শুকনা খাদ্য ও নিরাপদ আশ্রয় রাখা এবং পুকুর ও ঘেরে জাল বা অস্থায়ী বাঁধের ব্যবস্থা করা জরুরি।

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনেও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ক্ষয়ক্ষতির দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব তৈরি করে অঞ্চল ও ফসল ভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে। কৃষকের হাতে সময়মতো বীজ, চারা, সার, নগদ সহায়তা ও স্বল্পসুদে ঋণ পৌঁছানো না গেলে পরবর্তী মৌসুমও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ক্ষতিগ্রস্ত আমন জমিতে পরিস্থিতি অনুযায়ী পুনরায় রোপণ, বিলম্বে রোপণযোগ্য ধান কিংবা পানি নেমে গেলে আগাম রবি ফসলের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। বালু জমা জমি, ভাঙা আইল ও ক্ষতিগ্রস্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা পুনরুদ্ধারেও সরকারি সহায়তা জরুরি।

সব মিলিয়ে বর্তমান বন্যা এখনো সর্বত্র বিপর্যয়কর রূপ নেয়নি, কিন্তু কৃষির জন্য এটি একটি গুরুতর সতর্কসংকেত। ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে পানির গভীরতা, স্রোতের তীব্রতা, প্লাবনের স্থায়িত্ব এবং ফসলের বৃদ্ধি পর্যায়ের ওপর। তাই শুধু পানি নেমে যাওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগাম প্রস্তুতি, মাঠভিত্তিক পরামর্শ, বিকল্প বীজতলা, বোলানপদ্ধতির প্রয়োগ, দ্রুত পানি নিষ্কাশন, নিরাপদ ফসল সংগ্রহ এবং সময়োপযোগী পুনর্বাসন পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা দরকার। সঠিক সময়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ফসলের ক্ষতি অনেকাংশে সীমিত রাখা এবং কৃষকের পরবর্তী উৎপাদনচক্র সচল রাখা সম্ভব হবে।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব অ্যাগ্রিকালচার

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

ড. মো. ম‌সিউর রহমান

বৈশ্বিক কার্বন মার্কেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের সুযোগ

বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন আইন ও চুক্তি গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ইউএনএফসিসি, কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে কার্বন বিজনেসের মাধ্যমে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, ঘনবসতি এবং ভৌগোলিক ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কার্বন ট্রেডিং’ বা কার্বন মার্কেট একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জন্য এই খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুই মানবসভ্যতার টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, এই খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে—বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মাধ্যমে।

বনায়ন কার্বন শোষণের একটি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং তা তাদের দেহে সংরক্ষণ করে। ফলে বনায়ন ও পুনর্বনায়ন কার্যক্রম কার্বন নির্গমন হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃহৎ পরিসরে বনায়নের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক বনায়ন ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন এরই মধ্যে সফল হয়েছে। এখন এটিকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা কার্বন ক্রেডিট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

কৃষিতে কম পানি ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিশেষ করে ধান চাষে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্বল্প নির্গমন প্রযুক্তি। এটি মিথেন নির্গমন কমায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনে সহায়ক। এডব্লিউডি পদ্ধতি প্রয়োগ করলে পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি মিথেন গ্যাসের নির্গমন হ্রাস পায়। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে বোরো ধান চাষে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। কম নির্গমন মানেই কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হতে পারে।

নাইট্রোজেন সারের পরিমিত ব্যবহার কার্বন বিজনেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আইপিসিসি অনুযায়ী নাইট্রোজেন নির্গমন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি; যেমন—লিফ কালার চার্ট (এলসিসি), ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) এবং প্রিসিশন ফার্টিলাইজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সারের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ হ্রাস পায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার (সিএসএ) কার্বন হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক, যা কার্বন বাজার কৃষকদের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করতে পারে। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও সাসটেইনেবল রাইস প্রোডাকশন পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য কার্বন ক্রেডিট তৈরি করতে সক্ষম। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী কৃষি, বন ও ভূমি ব্যবহার খাত (এএফওএলইউ) বৈশ্বিক কার্বন হ্রাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।

কার্বন বিজনেস মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে বা কার্বন শোষণ বাড়াতে পারে, তাহলে তারা ‘কার্বন ক্রেডিট’ অর্জন করে। এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। একেকটি কার্বন ক্রেডিট এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হ্রাসকে নির্দেশ করে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজার (ভলান্টারি কার্বন মার্কেট) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশের জন্য এই খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বৃহৎ কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী, জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে কার্বন বিজনেস দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার ক্লাইমেট এবং প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো উদ্যোগ এই খাতে ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে; যেমন—কার্বন

নিরূপণ ও যাচাইকরণ (এমআরভি) ব্যবস্থার দুর্বলতা, কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি।

এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কার্বন বাজার নীতিমালা প্রণয়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

সব শেষে বলা যায়, বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন বিজনেস দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগটি কার্বন ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং এটি থেকে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয়ের সুযোগ রয়েছে। এই উদ্যোগ সরাসরি যে ভূমিকাগুলো রাখবে—

কার্বন শোষণ ও ক্রেডিট তৈরি : গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। রোপণ করা গাছগুলো বড় হলে তা বিশাল পরিমাণ কার্বন সিংক তৈরি করবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সফলভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে এই উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের স্থানগুলোর নিবন্ধন এবং যথাযথ মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং, ভেরিফিকেশন (এমআরভি) সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো, বাংলাদেশের এমআরভি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি জটিল। কৃষকদের সংগঠিত করা অনেক কঠিন। দেশে এজাতীয় নীতিমালার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।

আমাদের করণীয় হলো জাতীয় কার্বন ট্রেডিং নীতিমালা প্রণয়ন। এমআরভি সিস্টেমের উন্নয়ন (ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার) এবং দেশের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য করা। এ ক্ষেত্রে  আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গ্রহণ করা। পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং কৃষকদের জন্য ইনসেনটিভ ও প্রশিক্ষণ প্রদান। এ জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। কার্বন বিজনেস শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের আলোকে কৃষি খাতে কার্বন ক্রেডিট উন্নয়ন করলে তা শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সঠিক নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কার্বন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং সারের সুষম ব্যবহার—এই তিনটি পদক্ষেপ একযোগে বাস্তবায়ন করা গেলে তা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বন বিজনেসে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

 

লেখক : মুখ‌্য বৈজ্ঞা‌নিক কর্মকর্তা, উদ‌্যানতত্ত্ব গ‌বেষণা কেন্দ্র, বাংলা‌দেশ কৃ‌ষি গ‌বেষণা ইন‌স্টি‌টিউট

 

পাকিস্তানের গৃহবিবাদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা

ড. ফরিদুল আলম

পাকিস্তানের গৃহবিবাদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা

সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পাকিস্তান নিজেকে অনেকটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন। তাঁরা বাইরের সংকট মোকাবেলা করছেন যখন, তখন নিজেদের ঘর পুড়ছে। দেশটির সবচেয়ে বড় প্রদেশ, মোট আয়তনের প্রায় ৪৪ শতাংশ এলাকা নিয়ে বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র মুদ্রা, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা এবং প্রশাসনিক কাঠামো সৃষ্টি করেছে বলে ঘোষণা দিয়েছে। মোট ৫ লাখ সশস্ত্র যোদ্ধা তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলেও দাবি করে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে তারা পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করবে বলে জানিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী নেতারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার নজির টেনে তাঁদের ঘোষিত নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির বৈধতার পক্ষে যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। 

উত্তাল বেলুচিস্তানের এই অস্থিরতায় বাড়তি প্রণোদনা হিসেবে রয়েছে দেশটির উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ খাইবারপাখতুনখোয়া। দুর্গম, পাহাড়ি উপত্যকা, জটিল ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং সেই সঙ্গে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই পাকিস্তানের গৃহবিবাদ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সুরক্ষায় বৈষম্য অঞ্চলটির জনতাকে ক্রমেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ফুঁসিয়ে তুলেছে। এই অঞ্চলটির সবচেয়ে কৌশলগত ‘খাইবার গিরিপথ’ ভারতীয় উপমহাদেশ এবং মধ্য এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের সবচেয়ে সহজ ও সরু একটি পথ, যা অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে দেশটির জন্য অনেক সম্ভাবনাময় হতে পারত, অথচ এটি এখন আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের বর্তমান অবনতিশীল সম্পর্কের কারণে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) জন্য বরাবরের একটি সহজ যাতায়াতের পথ হিসেবে খাইবারপাখতুনখোয়াসহ বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে বাড়তি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রসদ হিসেবে নিজেদের ব্যবহার করতে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তানের বিদ্রোহ নতুন করে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা শঙ্কা তৈরি করেছে। এটি শুধু এ কারণে নয় যে বেলুচিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধের ডাক দিয়েছে। এটি বরং এ কারণেই নিরাপত্তা শঙ্কার জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক যে দিনে দিনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে টিটিপির তৎপরতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তি সঞ্চয় করেছে। এর নেপথ্যের কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের জানা দরকার কী কারণে এবং কিভাবে এই শক্তি তারা অর্জন করতে সক্ষম হলো। এখানে বেলুচিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মূল সমস্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, খাইবারপাখতুনখোয়ার মতোই বেলুচিস্তানের মানুষও একইভাবে কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক বৈষম্যের শিকার। অথচ পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনীতির জন্য বেলুচিস্তান হচ্ছে সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি। একদিকে পাকিস্তানের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েদার বন্দর, যা বেলুচিস্তানে, আরব সাগরের উপকূলে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) এবং চীন সরকারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত প্রকল্প; অন্যদিকে এই প্রদেশটিতে রয়েছে মূল্যবান হীরা, সোনা, রুপা, তামা, গ্যাস ও কয়লার মতো মূল্যবান খনিজ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। পাকিস্তানের মোট সীমান্তের ৪৪ শতাংশজুড়ে বেলুচিস্তানের আয়তন এবং জনসংখ্যার বিবেচনায় সবচেয়ে ছোট (মাত্র এক কোটি ৫০ লাখ) প্রদেশ হওয়া সত্ত্বেও সরকারের অব্যাহত বৈষম্যমূলক নীতির ফলে আজকের এই ফুঁসে ওঠা।

তবে এখানে প্রাসঙ্গিকভাবে একটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে, আর সেটি হচ্ছে এই ফুঁসে ওঠার কারণ কতটা স্বতঃস্ফূর্ত আর কতটা বাইরের উসকানি এখানে কাজ করেছে। আমাদের এর আগে এটিও জানা দরকার যে বেলুচিস্তানের সঙ্গে ইরান ও আফগানিস্তানের সীমান্ত রয়েছে এবং ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তানের মধ্যকার চাবাহার বন্দর ওমান সাগরের তীরে ভারত ও ইরানের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, যার মাধ্যমে মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সহজতর হয়েছে। গোয়েদার বন্দরকে এড়িয়ে এই পথে বাণিজ্যের ফলে পণ্য পরিবহনে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ সময়ের সাশ্রয় হয়। সুতরাং এই বিবেচনায় ইরান সংগত কারণেই চাইবে না বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে পাকিস্তানকে চটিয়ে চাবাহার বন্দরের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে। বাকি রইল ভারত। এ ক্ষেত্রেও একই যুক্তি। তবে এখানে একটি কথা থেকে যায়, আর সেটি হচ্ছে ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর থেকে ভারতের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক রয়েছে। আবার টিটিপি আফগান তালেবানেরই মদদপুষ্ট গোষ্ঠী। সুতরাং ভারতের দিক থেকে হয়তো বেলুচ বিদ্রোহীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করা হচ্ছে না, তবে পরোক্ষ সহযোগিতার বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এখানে আরেকটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হচ্ছে, এই অঞ্চলে বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্রমেই চীনের আধিপত্য বৃদ্ধির প্রচেষ্টা লক্ষণীয় হচ্ছে, যা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের জন্য বেশ দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে থাকতে পারে। বেলুচিস্তানের গোয়েদার বন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০০২ সালে, প্রথমবার পরীক্ষামূলক বাণিজ্য জাহাজ চলাচল করে ২০০৮ সালে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এটির উদ্বোধন হয় ২০১৬ সালে। বর্তমানে এটি ৪০ বছর মেয়াদে চায়না ওভারসিজ হোল্ডিং লিমিটেড কর্তৃক পরিচালিত হচ্ছে। এর পর থেকে এটি হরমুজ প্রণালি ও মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে চীনের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার যোগাযোগের পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সিপিইসি ও বিআরআইয়ের আওতায় বেলুচিস্তানের খনিগুলোতে কাজ করছে বিভিন্ন চীনা কম্পানি এবং কয়েক হাজার চীনের নাগরিক, যেখানে চীনের কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্ন হামলায় বেশ কিছু চীনা নাগরিক সেখানে নিহত হয়েছে। সংগত কারণেই চীনের চাওয়া থাকবে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। সুতরাং সংগত কারণেই প্রশ্ন আসতে পারে, এই অস্থিতিশীলতা কার জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে আনতে পারে?

এই অঞ্চলে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার সংঘাত ঐতিহাসিক। তবে স্পর্শকাতর কাশ্মীরের কারণে দুই দেশই বড় ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলতে চায়, বিশেষ করে তারা উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হওয়ার পর থেকে। তবে ভারতের অভ্যন্তরে বেশ কিছু নাশকতার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটি কর্তৃক বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নানা মন্তব্য উচ্চারিত হয়েছে। কয়েক বছর আগে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ভারতের নিরাপত্তা খর্ব হলে পাকিস্তানের দুর্বল স্থানে আঘাত করার হুঁশিয়ারিও দিয়েছিলেন। তার পরও ইরানের সঙ্গে চাবাহার বন্দরের সুবিধার কারণে এবং সাম্প্রতিক সময়ে শুরু হওয়া চীন-ভারত সুসম্পর্কের আলোচনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের সরাসরি সমর্থন দেওয়া থেকে বিরত থাকবে, এটিই অনুমান করা যায়।

এমতাবস্থায় বেলুচিস্তানের বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা তাদের স্বপ্নকে কতটুকু বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবে, সেটি নিয়ে রয়েছে অনেক ধরনের আইনি এবং আন্তর্জাতিক গোলকধাঁধা। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ববিষয়ক ১৯৩৩ সালের মন্টিভিডিও কনভেনশন অনুযায়ী, একটি দেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নিতে হলে তাকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী, নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষমতা থাকতে হবে। পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপত্তা পরিষদের সব স্থায়ী সদস্যের সম্মতি এবং সাধারণ পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন থাকার বিষয়টি। এ সবকিছুই বেলুচিস্তানের বর্তমান বাস্তবতায় একপ্রকার অসম্ভব বিষয়।

সংগত কারণেই এখন প্রশ্ন আসবে, এই সংকট তাহলে পাকিস্তানের জন্য কী ধরনের ভবিষ্যৎ নির্ণয় করতে যাচ্ছে? এর উত্তরে এটিই বলা যায়, এটি পাকিস্তান সরকারকেই নির্ধারণ করতে হবে। সমস্যাগুলোর সূচনা থেকে আজ পর্যন্ত এসবের সমাধানে রাজনৈতিক প্রচেষ্টার চেয়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। একই সঙ্গে এটিও দৃশ্যমান হয়েছে, রাজনৈতিক সরকারের চেয়ে সামরিক বাহিনীর অধিক হস্তক্ষেপ এই সংকট আরো বৃদ্ধি করেছে। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি স্বাধীনতার পর থেকে একটি উল্লেখযোগ্য সময় সরাসরি সামরিক শাসক দ্বারা পরিচালিত হয়েছে। দেড় যুগের বেশি সময় ধরে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও কার্যত পুরোপুরি সামরিক হস্তক্ষেপের বাইরে যেতে পারেনি দেশটি। বেলুচিস্তান ও খাইবারপাখতুনখোয়া পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের এপিঠ-ওপিঠ। এর যেকোনো একটির পরিস্থিতির অবনতি অন্যটির সংকটকেও বাড়িয়ে তুলবে। সমস্যা আসলে গোড়ায়, সরকার যতক্ষণ না সামরিক হস্তক্ষেপের বাইরে গিয়ে সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিকভাবে এটি সমাধানে মনোনিবেশ করতে পারবে, সমাধান ততই জটিল হতে থাকবে।

 

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ডেপুটি কমিশনার কেন জেলা প্রশাসক

নির্মল চক্রবর্তী

ডেপুটি কমিশনার কেন জেলা প্রশাসক

একটি জেলার সর্বোচ্চ অধিকর্তা হচ্ছেন জেলা প্রশাসক, যাঁকে আমরা ডিসি বলে অভিহিত করি। দেশের ৬৪ জেলায়  প্রশাসনিক  প্রধান  হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই সরকারি কর্মকর্তাকে ডিসি সম্বোধনের যৌক্তিকতা কতটুকু, তা আবার নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। ইংরেজি পদনাম এই ডিসি হচ্ছে ডেপুটি কমিশনার-এর সংক্ষেপ। অথচ বাংলায় বলা হচ্ছে জেলা প্রশাসক, যা দেশের কোনো আইন-বিধিতে  নেই। তবে এর যৌক্তিকতা অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সরকারি কর্মচারীদের জন্য পদবির পরিভাষা শীর্ষক প্রকাশনার ৬২ নম্বর পৃষ্ঠায়  ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা পরিভাষা করা হয়েছে  জেলা প্রশাসক। কিন্তু একই পৃষ্ঠায় ডেপুটি কমিশনার অব ট্যাক্সেস-এর বাংলা পদনাম করা হয়েছে উপকর কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার অব কাস্টমসকে বলা হয়েছে উপকর কমিশনার, কাস্টমস, ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশকে বলা হয়েছে উপপুলিশ কমিশনার। এই অনুসন্ধানেও ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা পদনাম জেলা প্রশাসক শব্দটি অমীমাংসিতই রয়ে যায়।

এখন সময় এসেছে সুদীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই অমীমাংসিত শব্দটিতে একটা মীমাংসায় আসার। কারণ কোনো অমীমাংসিত পথে হাঁটা মানেই একটি ভুল পথে পরিচালিত হওয়া। আর ভুল পথে থাকা মানেই ইচ্ছাকৃত শুদ্ধতার পথ পরিহার করা, যা কোনোমতেই একটি ভালো প্রশাসননীতি হতে পারে না। অর্থাৎ ভুলে যাদের জীবন গড়া প্রচলিত বাক্যটির মতোই একটি জগদ্দল পাথর বয়ে বেড়ানো। তাই এই সংস্কারটিকে এখন জরুরি বলেই মনে করি।  

প্রসঙ্গত, একটু পেছন ফিরে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, ২০২৪ সালের ডিসি সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদসচিব মাহবুব হোসেন ব্রিফিংয়ে এলে তাঁকে এই প্রশ্নটির মুখে পড়তে হয়।  সেদিনও তিনি  জেলা প্রশাসক পদনামটির আইনি ভিত্তি সম্পর্কে জবাব দিতে পারেননি। তাঁর পাশে সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিব মিলিয়ে উপস্থিত অন্তত আটজন কর্মকর্তাও এ বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেননি। এক পর্যায়ে মন্ত্রিপরিষদসচিব বলেন,  এটি যাঁরা করেছেন, তাঁদের কাছে জেনে নিতে পারেন। এভাবে দায়সারা জবাব দিয়ে তিনি সেদিন বিষয়টি এড়িয়ে যান।

তাহলে এখন সেই বাংলা অনুবাদের দিকেই দৃষ্টি দেওয়া যাক। এখানেও দেখা যায়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলা ভাষা বাস্তবায়ন কোষের (বাবাকো) যাঁরা সরকারি কর্মচারীদের পদবির পরিভাষা ২০১৮ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁরাও বিষয়টি পরিষ্কার করেননি। তবে সেখান থেকে একটি কথা পাওয়া গেছে, তা হচ্ছেওপরের নির্দেশে জেলা প্রশাসক করা হয়েছে। কিন্তু এটি সঠিক অনুবাদ নয়। মজার বিষয় হচ্ছে, ডেপুটি কমিশনার-এর ঊর্ধ্বতন হিসেবে বিভাগীয় প্রশাসনে যিনি দায়িত্ব পালন করেন, তাঁর পদবি কমিশনার, বাংলা পরিভাষায় যা কমিশনারই রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সেখানে কমিশনারকে বিভাগীয় প্রশাসক বলা হয়নি।

আবার এরপর জেলা প্রশাসক সম্মেলন ২০২৫ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও এর মীমাংসিত উত্তর দিতে পারেননি মন্ত্রিপরিষদসচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ। তিনি স্বীকারও করলেন, আইন-বিধিতে জেলা প্রশাসক শব্দটি নেই। অবশ্য জেলা প্রশাসক শব্দটি নিয়ে কঠিন মন্তব্য করেছিলেন সাবেক সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। তিনি বলেছিলেন, জোর যার মুল্লুক তার নীতি ঔপনিবেশিক আমল থেকে প্রয়োগ হচ্ছে। বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে সেটি রয়ে গেছে। ডিসিদের  জেলা প্রশাসক পদবি বহাল রাখা তারই ধারাবাহিকতা। প্রশাসক শব্দের মাধ্যমে একটি মাতবরি বা মোড়লিপনার ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা। এই পদনামটি পরিবর্তন হওয়া উচিত।

এ কথাটি স্পষ্ট যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শাসক বা প্রশাসক হন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। সংবিধানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক শাসনের ভার প্রদানের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের প্রশাসনিক ইউনিটগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধির নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। দেশের প্রশাসনিক ইউনিটগুলোর অন্যতমউপজেলা, জেলা ও বিভাগ। আজ বাস্তবতা হচ্ছে, এর কোনোটিই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ গঠন করা হলেও কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানকে আলংকারিক করে রাখা হয়েছে।

একসময় ডিসি ছিলেন, পরে সচিব হিসেবে অবসর নেন এমন একজন এ কে এম আব্দুল আওয়াল মজুমদারের ভাষ্য ছিল—‘ডেপুটি কমিশনার-এর বাংলা কোনোভাবেই  জেলা প্রশাসক হতে পারে না। তবে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলা পরিভাষা হিসেবে জেলা প্রশাসক ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে আরেকটি প্রশ্নের উদ্ভব হয়, তা হচ্ছেবিভিন্ন জেলার ওয়েবসাইটগুলোতে ঢুকলে দেখা যায়, ডিসিরা তাঁদের পরিচয় লিখেছেন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। প্রশ্ন হচ্ছে, জেলা প্রশাসক শব্দদ্বয় যদি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট-এর বাংলা পরিভাষা হবে, তাহলে একই বিষয় দুইবার করে লেখার কী দরকার।

 

আমরা সাধারণত দেখতে পাই, ডিসিদের জেলায় তিন ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়। ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কমিশনার। অর্থাৎ রাজস্ব আদায়, বিচারসংক্রান্ত এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজের সমন্বয়। প্রথম ও দ্বিতীয় দায়িত্বটি ২০০ বছরের বেশি সময় আগের, যা ব্রিটিশ কম্পানি শাসনামলের। শেষোক্ত দায়িত্বটি যোগ হয়েছে পাকিস্তান আমলে। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণ হলে ডিসিরা শুধু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির দায়িত্বে থাকেন, অথচ তা-ও সংবিধান সম্মত নয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতের রায় এখনো অপেক্ষমাণ। আর এসব নানা প্রশ্নের মধ্য দিয়ে জেলা প্রশাসক পদনামটিই ব্যবহার হয়ে চলেছে। কেন পদনামটির যথার্থ সংস্কারটি হচ্ছে না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বিড়ালের গলায়  ঘণ্টা পরাবেন এমন কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই এরূপ বলেছেনএমন সংস্কারমূলক কাজের জন্য যে মানদণ্ডের কর্মচারী প্রয়োজন, প্রশাসনে তেমন ব্যক্তিদের দেখা যায় না।

ফিবছরের মতো এ বছরও মে-তে অনুষ্ঠিত হয়েছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলন। ডিসি সম্মেলনে প্রতিবছরই বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব ওঠে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সম্মেলনের প্রথম দিনে তাঁদের পক্ষ থেকে ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৯০ ধারার অধীনে বিচারিক ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দাবি ওঠে। ডিসি সম্মেলনে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখাসহ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। এ জন্য জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা বাড়াতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯০(১)(এ)(বি)(সি) (ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়ার ক্ষমতা) ধারায় ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজন। সম্মেলনে মুক্ত আলোচনায় একাধিক বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসি বলেন, বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর ডিসির বিচারিক ক্ষমতা কমলেও শান্তি-শৃঙ্খলা ও অপরাধ দমনে এখনো অনেক করণীয় আছে। অপরাধ দমন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় জেলা পুলিশকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখার নির্দেশ আছে। জেলার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ দমনে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দায়ী। গুলিবর্ষণের তাৎক্ষণিক রিপোর্ট জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত সরকারকে অবহিত করে থাকেন। গুলিবর্ষণ-পরবর্তী প্রশাসনিক তদন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পরিচালনার নির্দেশ রয়েছে। এ জন্য ১৯০ ধারার ক্ষমতার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রস্তাব নাকচ করে দেন। তিনি ডিসিদের বলে দেন, এ বিষয়ে আদালতে মামলা চলমান। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।

একটি জেলায় ডিসিই হচ্ছেন সর্বেসর্বা। বাংলাদেশ ৬৪ জেলার দেশ। বলা যায়, ৬৪ জন ডিসির ওপর থাকে পুরো দেশটির ভার। এবারের ডিসি সম্মেলনে কিভাবে অনৈতিক চাপ ও দলীয় প্রভাব থেকে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডকে দূরে রাখা যায়, এই বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়। ডিসিরা জানান, জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই উন্নয়ন ও জনসেবা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে হবে; তবে অবৈধ তদবির, প্রভাব বিস্তার ও অন্যায্য সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি বন্ধ না হলে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হবে। এবারের সম্মেলনে জেলা প্রশাসকরা ৪৯৮টি প্রস্তাব পেশ করেন। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মাঠপ্রশাসনে ভালোভাবে কাজ করতে ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছেপ্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণপূর্বক প্রতিরোধ ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসকরা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় তারা নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা ডিসি সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও প্রস্তাব শুনে সমাধানের উপায় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জেলা প্রশাসকরা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা নিঃসন্দেহে সবার কাছেই অনুমেয়। জেলা প্রশাসকরা নিজেদের দাবিদাওয়া বলেন, আদায়ও করেন। অন্যদিকে সরকারও জেলা প্রশাসকদের দিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করে। কিন্তু পদনামটির ভুলের আর পরিবর্তন হয় না। আর এক ভুলের শরীর বেয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে হাজারো ভুল। তাই এবার এই ভুলের একটা সুরাহা হওয়া উচিত।

তথ্য মতে, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য ২৬টি সংস্কার কমিশন বা কমিটি গঠন করা হলেও বাংলাদেশে এখনো গতানুগতিক জনপ্রশাসন ব্যবস্থা বহাল রয়েছে। ফলে এর ফাঁক গলিয়ে জনপ্রশাসনে মেধা ও দক্ষতার গুরুত্ব অনেকটা হ্রাস পেয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগ-পদায়ন ও পদোন্নতিতে মেধা ও দক্ষতার স্থান নিয়েছে দলীয় আনুগত্য ও চাটুকারিতা। এবার এর অবসান হওয়া উচিত। পদনামটির সঠিক ও গ্রহণযোগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই হোক তার সূচনা। 

লেখক : কবি ও সাংবাদিক