‘এই রাষ্ট্র তার সন্তানদের বুলেট উপহার দিচ্ছে’—আমি শুধু সত্যটি লিখেছিলাম। এটিই ছিল আমার অপরাধ। তিন ঘণ্টা ধরে আমাকে পেটানো হয়েছে। সেই পিটুনির দাগ আমি আজও বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনো মাঝে মাঝে কোমরে- হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হয়।
সাংবাদিকতাকে আপনি নিছক একটি চাকরি হিসেবে দেখতে পারবেন না। আপনি সাদাকে সাদা বলবেন, কালোকে কালো বলবেন, অন্যায়কে অন্যায় বলবেন এবং সাংবাদিকতা হবে সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর। যখন গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর রুদ্ধ হয়, তখন গণমাধ্যম হয় সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা।
আমি জার্মানভিত্তিক দ্য মিরর এশিয়ার ঢাকা ব্যুরোতে কর্মরত ছিলাম, যার কারণে আমার অফিসের ওপর সরাসরি সেন্সরশিপ আরোপ করা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। কারণ এটি জার্মানির বন শহর থেকে প্রকাশিত হতো। ফলে এই খবরগুলো জার্মানি থেকে ‘অ্যাজ ইট ইজ’ পাবলিশ করা যেত, যেটি অনেকেই সাহস করে ছাপতে পারেননি।
১৫ জুলাইয়ের পর, যখন বাংলাদেশের কালো পিচঢালা রাজপথ আমার দেশের সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক কর্মীদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখনো কিন্তু আমাদের হাতে কলম ছিল, চোখে দৃষ্টি ছিল, আমাদের ক্যামেরায় লেন্স ছিল, ব্যাটারিও ছিল। কিন্তু আমরা অনেকেই তা দেখাতে পারিনি। আমি সেটুকু দেখানোর চেষ্টা করেছি। যাঁরা করেননি, তাঁদের বিষয়টি আলোচনা করব না। কারণ এমন মানুষদের নিয়ে সময় নষ্ট করতে চাই না।
১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এই খবরগুলো যখন দ্য মিরর এশিয়ার রেফারেন্সে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশ হতে থাকে, তখন ইউরোপ-আমেরিকার বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম ওই নিউজ প্রকাশ করে। শিক্ষার্থীদের গণহারে হত্যার এই সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে শেখ হাসিনা মেট্রো রেল পরিদর্শনে গিয়ে বলেন, ‘যারা বিদেশে তথ্য পাচার করছে, তাদের চিহ্নিত করেছি, শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।’
২৫ জুলাই ২০২৪, বৃহস্পতিবার, আমি, কাদের গণি চৌধুরী (সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ওই সময়ের সদস্যসচিব), সাংবাদিক আমিরুল ইসলাম কাগজী, ডিইউজের সহসভাপতি রাশেদুল ইসলামসহ আমরা প্রতিদিন প্রেস ক্লাবের সামনে এই হত্যার প্রতিবাদে সমাবেশ করেছি, বক্তব্য দিয়েছি। রাত ১১টার দিকে আমি মগবাজারে আমার বাসায় ফিরি। আমার সাত বছর বয়সী ছোট সন্তান সাঈফ খুবই অসুস্থ, তার গলায় অপারেশন হয়েছে। বড় ছেলে সাঈম তখন ক্লাস নাইনে পড়ে। আমি আমার স্ত্রী ইতীকে বলি, আমার বন্ধু মেহের কায়সার রানার কাছে কিছু টাকা রাখা আছে—‘আমি সেফ জায়গায় চলে যাব’। ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে আমি ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যাব—ওই সময়েই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) আমাকে ফোন করেন ওই সময়ের পরিস্থিতি জানার জন্য। এর কিছুক্ষণ আগে অবশ্য বেইলি রোডে রানার বাসার ছাদে বসে বিএনপির ওই সময়কার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ২৯ মিনিট নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং আন্দোলন যাতে বন্ধ না হয়, সেই নির্দেশনা দেন। আমার ফোন থেকে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সহসম্পাদক ডা. পারভেজ রেজা কাকনও আহতদের চিকিৎসাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন এবং তারেক রহমানের নির্দেশনা গ্রহণ করেন।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা জরুরি যে ১৮ জুলাই শেখ হাসিনা ছাত্রদের দাবি মেনে নেন, ছাত্ররা ক্যাম্পাস এবং হল খুলে দিতে বলে, আন্দোলন যখন প্রায় শেষ, ঠিক তখনই তারেক রহমান নির্দেশ দেন পদধারী নেতারা যাতে সামনে না পড়ে, কর্মীদের নেতৃত্বের নির্দেশ দিতে বলেন। ততক্ষণে আন্দোলন ছাত্রদের হাতছাড়া হয়ে গণ-আন্দোলন হিসেবে পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ে।
১০ জুলাই থেকে প্রতিদিনই তারেক রহমান আমাকে বলেছিলেন, দুই ঘণ্টা পর পর আমি যেন পরিস্থিতি উনাকে অবহিত করি। নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মোবাইলের ব্যালান্স সংকটে পড়ে যাই। বন্ধু সাইফুর রহমান আসাদ সেগুনবাগিচা এলাকায় একা একা আন্দোলনের নানা দিক নিয়ে কৌশলে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন এবং ছাত্র-জনতাকে রাস্তা ছাড়তে নিষেধ করছিলেন। আসাদকে বললাম, মোবাইলে ব্যালান্স কই পাব। সে আমাকে ১৫ হাজার টাকা লোডের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই টাকা দিয়েই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির শীর্ষ নেতাকে অবহিত করি সার্বিক পরিস্থিতি। সেই আলাপ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ট্র্যাক করে ফেলে। এর পর থেকেই তারা আমাকে সন্দেহ করতে থাকে এই নাশকতার পরিকল্পনাকারী হিসেবে।
হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়া হয়। বাইরে থেকে বলা হয়, ‘ইন্টারনেটের ওয়াই-ফাই ঠিক করতে এসেছি।’ এই অজুহাতে দরজা খুলতেই ১৫-১৬ জন সাদা পোশাকধারী লোক ঘরে ঢুকে পড়ে। আমার অসুস্থ ছোট সন্তান ও বড় ছেলের সামনে তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এমন অশ্লীল ও জঘন্য ভাষা—কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। তারা সবাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সদস্য—বিসিএস ক্যাডার, কমিশনড অফিসার, বিভিন্ন বাহিনীর মিশ্রণ। আমার স্ত্রীকেও তারা এমন ভাষায় গালি দেয়, যা আমরা সবচেয়ে তিক্ত পরিস্থিতিতেও কোনো নারীকে বলি না। আমার ছেলেকেও তারা তুলে নিতে চায়।
আমি অনুরোধ করি, ‘আমাকে নিয়ে যান, আমাকে যা খুশি করেন, কিন্তু আমার পরিবারকে স্পর্শ করবেন না, প্লিজ।’ পরে তারা আমাকে গাড়িতে তোলে। চোখ বেঁধে, দুই হাত পেছনে বেঁধে, হাতকড়া পরিয়ে, মাথায় একটি কালো টুপি পরিয়ে দেয়। আমি নিজেই বহুবার এই টুপির সংবাদ করেছি।
আমি বললাম, ‘আমি তো কোনো সন্ত্রাসী না, আমাকে কেন এভাবে নিচ্ছেন?’ তখন পেছন থেকে একটি শক্ত কিছু দিয়ে—সম্ভবত লাঠি বা শটগানের বাঁট—আমার ঘাড়ের পেছনে ১৫ থেকে ২০ বার আঘাত করা হয়। আমার মনে হচ্ছিল চোখ বেরিয়ে আসবে, দাঁত খসে যাবে। আমি একপ্রকার অচেতন হয়ে যাই। তারপর তারা আমার পাঁজরের পেছনে বেশ কয়েকবার বক্সিংয়ের মতো আঘাত করে। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তখনই বুঝে যাই—এদের সঙ্গে তর্ক করে লাভ নেই, চুপ থাকাই ভালো।
দুই ঘণ্টা এভাবে ঘোরানোর পর তারা আমাকে কোথায় যেন নিয়ে যায়। চোখ ও হাত বাঁধা। একটি ঘরে ঢুকিয়ে রেখে কেউ কিছু বলে না, শুধু ঘোরাঘুরি করে। হঠাৎ একজন এসে বলে—‘আসেন।’ তখনো চোখ বাঁধা। দুজন আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে দুই হাত বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়—শুধু বৃদ্ধাঙ্গুলির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। সেই রাতটি আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ রাত। পুরো রাত ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আমাকে মানসিক ও শারীরিকভাবে চাপে রাখা হয়, যেন জোর করে কোনো স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়। অথচ যেদিন মেট্রো রেলে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, সেদিন আমি ছিলাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি প্রতিবেদন তৈরি করতে। বহু সহকর্মী ছিলেন, রেজিস্টার খাতা ও প্রবেশ-প্রস্থান লগে আমার নাম আছে। তবু আমাকে সেই মামলার প্রধান আসামি বানানো হয়। পরদিন আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। আমি একা নই। এই ‘জুলাই স্মৃতি’ বহু সাংবাদিক ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরের জন্যই এক আতঙ্কের নাম। জুলাই মাসজুড়েই সাংবাদিকসমাজ ছিল আতঙ্কে। পাঁচ সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন, দুই শতাধিক আহত, আর অসংখ্য গুম, গ্রেপ্তার, মিথ্যা মামলা হয়েছে।
আমাকে যেভাবে মধ্যরাতে তুলে নেওয়া হলো, আমার স্ত্রী-সন্তানের চোখের সামনে যেভাবে অসম্মান করা হলো, তা শুধু ব্যক্তি সাঈদ খানের ওপর নয়, সাংবাদিকতা, মত প্রকাশ, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বর্বরতার নগ্ন প্রকাশ। সেদিন আমি অনুভব করেছি—১৫ বছর সাত মাস ধরে শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট শাসনে রাজনৈতিক কর্মীরা যেসব ভয়াবহ নির্যাতনের মুখোমুখি হয়েছেন, আমি তার এক ক্ষুদ্র ঝলক মাত্র দেখেছি।
শুধু রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে বা ভিন্নমত পোষণ করলেই একটি রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ধরে নিয়ে যায়, দিনের পর দিন বন্দি করে রাখে, নির্মম-নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং অবর্ণনীয় নির্যাতনে হত্যা করে, তারপর নিথর দেহটি পর্যন্ত গুম করে ফেলে! এই বর্বরতা থেকে রাষ্ট্র কী আনন্দ পায়?
রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি—এতটা নিষ্ঠুর কিভাবে হতে পারেন? কোথায় তাঁদের হৃদয়? যাঁরা এই ভয়াবহ অপরাধের সঙ্গে জড়িত—শেখ হাসিনা, তাঁর নির্দেশনাধীন পুলিশ, র্যাব এবং সাদা পোশাকের নানা বাহিনীর নির্দয় পাষণ্ড সদস্যরা—তাঁরা কি একটিবারও ভেবেছেন, যাকে তুলে নিয়েছে, হত্যা করছে, সে-ও কোনো বাবার সন্তান, কোনো মায়ের বুকের ধন, কোনো স্ত্রীর স্বামী কিংবা বোনের ভাই। তাঁদের অন্তরে কি একটুও মানবিক অনুভূতি অবশিষ্ট ছিল না?
আয়নাঘরের ইতিহাস আমাদের সামনে এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যেখানে প্রতিটি গুম, প্রতিটি নিষ্ঠুরতা আর প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে মানবতা বারবার হেরে গেছে রাষ্ট্রীয় পাশবিকতার কাছে। এই ভয়ংকর ইতিহাসের শিক্ষা থেকে কি বর্তমান সরকার ও তার নিরাপত্তা বাহিনী কোনো শিক্ষা নেবে, নাকি আগের মতোই নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই পথে হাঁটছেন না বা কখনোই হাঁটবেন না—এ বিশ্বাসও আমাদের আছে।
দেশের মানুষ কত আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানিয়েছিল। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর এ দেশের প্রতিটি মানুষ নতুন এক আশায় বুক বেঁধেছে। তারা ভেবেছে, এবার সবাই মিলিয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত দেশ গড়ে তুলব, যেখানে কোনো বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট, খুন-ধর্ষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন থাকবে না, জনগণ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। কিন্তু ৫ আগস্টের পর থেকে দেশ আবারও এবং ধর্মীয় মৌলবাদী ফ্যাসিজমের কবলে পড়ে। দাবিদাওয়া আদায়ের নামে বা বাকস্বাধীনতা বা অধিকারের নামে হামলা-মামলা, মব, সন্ত্রাস, গুম, হত্যা ও দমন-পীড়নের চক্রে ফিরে যায়, যা জন-আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, আয় ও বেতন বৃদ্ধি, নিরাপদ খাদ্য-পানি, পরিবেশ রক্ষা—কোনোটিরই উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রত্যাশা পূরণে সফল হয়নি।
বিএনপি সরকারের প্রথম পাঁচ মাসে একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রশাসনকে রাজনৈতিক চাপমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সরকার। একইভাবে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ক্ষেত্রেও একটি নিয়ন্ত্রিত ও জবাবদিহিমূলক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রশাসনিক কার্যকারিতার সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রয়াস দীর্ঘ মেয়াদে সফল হলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
রাষ্ট্র ও রাজনীতি পুনর্গঠনের ৩১ দফা রূপরেখা, ভিশন ২০৩০ এবং নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের কাজ দৃশ্যমানভাবে চালিয়ে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। জনগণের হারানো গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ক পুনঃস্থাপন—এই তিনটি লক্ষ্য আজকের রাজনীতির মূল চ্যালেঞ্জ। অর্থাৎ জনগণকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, প্রশাসনকে জবাবদিহিমূলক করা, বিচারব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করা এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতি এবং একটি জাতিরাষ্ট্র নির্মাণের কাজ আরো গুরুত্ব দিয়ে অগ্রসর করা প্রয়োজন। অর্থাৎ যা ছিল মহান স্বাধীনতা, নব্বই ও চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মূল দর্শন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই চব্বিশ কারো কাছে ক্ষমতার সিঁড়ি, কারো কাছে রাজনৈতিক কলঙ্ক মোচনের হাতিয়ার, আবার কারো কাছে শুধুই ক্ষমতার পালাবদল। কিন্তু আমার কাছে চব্বিশ মানে—পুনরায় বেঁচে ফেরা, আমার দুই সন্তানের কাছে বাবাকে ফিরে পাওয়া, আমার মা-বাবার কাছে সন্তানের ফিরে আসা, আমার স্ত্রীর বিধবা না হওয়া। দেশবাসীর কাছে স্বাধীনতার মূল লক্ষ্যে পৌঁছানোর শেষ সুযোগটি হাতে পাওয়া।
লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, কালের কণ্ঠ




বাংলাদেশের প্রধান ফসল ধান। তিনটি প্রধান ধানের মধ্যে দুটিই উৎপাদিত হয় বর্ষাকালে। এ মৌসুমে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়। আর বোরো ধানের চাষ হয় শীতকালে। মোট ধান উৎপাদনের দিক থেকে আউশের অবস্থান তৃতীয়, শতকরা আট ভাগ। আমন ধানের শরিকানা ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ধানের শতকরা ৪৬ ভাগ উৎপাদিত হয় বর্ষা মৌসুমে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বোরো ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো। ফলে আউশ ও আমন ধানের উৎপাদন তুলনামূলকভাবে হ্রাস পাচ্ছিল। এখন অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা ও উৎপাদন খরচের কারণে বোরো ধানের প্রতি কৃষকের নিরবচ্ছিন্ন আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পাচ্ছে। আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। এই দুটি ধানের ক্ষেত্রে উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবন এবং কৃষক পর্যায়ে তা সম্প্রসারণের ফলে একরপ্রতি ফলনও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, বর্ষায় ঘন ঘন বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমে খরার কারণে অনেক সময় ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হন এই দুটি ধানের উৎপাদনকারী কৃষকরা।