বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন আইন ও চুক্তি গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ইউএনএফসিসি, কিয়োটো প্রটোকল, প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্ট উল্লেখযোগ্য। এই চুক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হলো গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন হ্রাস এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপকরণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে কার্বন বিজনেসের মাধ্যমে পরিবেশ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি গুরুতর বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, ঘনবসতি এবং ভৌগোলিক ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মুখোমুখি। এই প্রেক্ষাপটে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের বিকল্প নেই। সাম্প্রতিক সময়ে ‘কার্বন ট্রেডিং’ বা কার্বন মার্কেট একটি নতুন সম্ভাবনা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একসঙ্গে অর্জন করা সম্ভব। বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মতো উদ্যোগগুলো বাংলাদেশের জন্য এই খাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সবকিছুই মানবসভ্যতার টেকসই উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে কার্বন ট্রেডিং বা কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, এই খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে—বিশেষ করে বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের পরিমিত প্রয়োগের মাধ্যমে।
বনায়ন কার্বন শোষণের একটি কার্যকর প্রাকৃতিক উপায়। গাছপালা বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে এবং তা তাদের দেহে সংরক্ষণ করে। ফলে বনায়ন ও পুনর্বনায়ন কার্যক্রম কার্বন নির্গমন হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে উপকূলীয় অঞ্চল, চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকায় বৃহৎ পরিসরে বনায়নের সুযোগ রয়েছে। সামাজিক বনায়ন ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রির মাধ্যমে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা সম্ভব, অন্যদিকে কার্বন ক্রেডিট তৈরি করে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির মাধ্যমে অর্থনৈতিক লাভ অর্জন করা যেতে পারে। বাংলাদেশে সামাজিক বনায়ন এরই মধ্যে সফল হয়েছে। এখন এটিকে কার্বন বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা কার্বন ক্রেডিট তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
কৃষিতে কম পানি ব্যবহার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল। বিশেষ করে ধান চাষে অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি স্বল্প নির্গমন প্রযুক্তি। এটি মিথেন নির্গমন কমায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনে সহায়ক। এডব্লিউডি পদ্ধতি প্রয়োগ করলে পানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি মিথেন গ্যাসের নির্গমন হ্রাস পায়। মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে বোরো ধান চাষে এই পদ্ধতি ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে তা পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই লাভজনক হবে। কম নির্গমন মানেই কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ, যা ভবিষ্যতে কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস হতে পারে।
নাইট্রোজেন সারের পরিমিত ব্যবহার কার্বন বিজনেসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আইপিসিসি অনুযায়ী নাইট্রোজেন নির্গমন কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে নাইট্রাস অক্সাইড গ্যাস নির্গত হয়, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস। বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তি; যেমন—লিফ কালার চার্ট (এলসিসি), ইউরিয়া ডিপ প্লেসমেন্ট (ইউডিপি) এবং প্রিসিশন ফার্টিলাইজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সারের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব। এর ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ কমে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ হ্রাস পায় এবং কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার (সিএসএ) কার্বন হ্রাস ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক, যা কার্বন বাজার কৃষকদের অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করতে পারে। অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ও সাসটেইনেবল রাইস প্রোডাকশন পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য কার্বন ক্রেডিট তৈরি করতে সক্ষম। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) প্রতিবেদন অনুযায়ী কৃষি, বন ও ভূমি ব্যবহার খাত (এএফওএলইউ) বৈশ্বিক কার্বন হ্রাসে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।
কার্বন বিজনেস মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশ যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে পারে বা কার্বন শোষণ বাড়াতে পারে, তাহলে তারা ‘কার্বন ক্রেডিট’ অর্জন করে। এই ক্রেডিট আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা যায়। একেকটি কার্বন ক্রেডিট এক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নির্গমন হ্রাসকে নির্দেশ করে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবী কার্বন বাজার (ভলান্টারি কার্বন মার্কেট) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই প্রক্রিয়াকে সমর্থন করছে। বাংলাদেশের জন্য এই খাতের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। দেশের বৃহৎ কৃষিভিত্তিক জনগোষ্ঠী, জলবায়ু অভিযোজনমূলক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ—সবকিছু মিলিয়ে কার্বন বিজনেস দ্রুত বিকাশ লাভ করতে পারে। এরই মধ্যে ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার ক্লাইমেট এবং প্রসপারিটি প্ল্যানের মতো উদ্যোগ এই খাতে ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে; যেমন—কার্বন
নিরূপণ ও যাচাইকরণ (এমআরভি) ব্যবস্থার দুর্বলতা, কৃষক পর্যায়ে সচেতনতার অভাব এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ঘাটতি।
এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কার্বন বাজার নীতিমালা প্রণয়ন, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করা, কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সব শেষে বলা যায়, বনায়ন, কম পানি ব্যবহার এবং নাইট্রোজেন সারের দক্ষ ব্যবস্থাপনা শুধু পরিবেশ সুরক্ষায় নয়, বরং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কার্বন বিজনেস দেশের কৃষি, পরিবেশ এবং অর্থনীতিতে একটি টেকসই ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগটি কার্বন ট্রেডিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এবং এটি থেকে বছরে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত কার্বন ক্রেডিট আয়ের সুযোগ রয়েছে। এই উদ্যোগ সরাসরি যে ভূমিকাগুলো রাখবে—
কার্বন শোষণ ও ক্রেডিট তৈরি : গাছ বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। রোপণ করা গাছগুলো বড় হলে তা বিশাল পরিমাণ কার্বন সিংক তৈরি করবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে কার্বন ক্রেডিট হিসেবে বিক্রি করা সম্ভব হবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, সফলভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বার্ষিক প্রায় এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারবে, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে। এর ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে পারবে। তবে এই উদ্যোগ থেকে পুরোপুরি কার্বন ট্রেডিংয়ের সুবিধা পেতে হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের স্থানগুলোর নিবন্ধন এবং যথাযথ মেজারমেন্ট, রিপোর্টিং, ভেরিফিকেশন (এমআরভি) সিস্টেম গড়ে তোলা প্রয়োজন। তবে আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো হলো, বাংলাদেশের এমআরভি সিস্টেম অত্যন্ত দুর্বল। আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে প্রবেশের প্রক্রিয়াটি জটিল। কৃষকদের সংগঠিত করা অনেক কঠিন। দেশে এজাতীয় নীতিমালার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে।
আমাদের করণীয় হলো জাতীয় কার্বন ট্রেডিং নীতিমালা প্রণয়ন। এমআরভি সিস্টেমের উন্নয়ন (ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার) এবং দেশের জন্য তা প্রয়োগযোগ্য করা। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতা গ্রহণ করা। পাইলট প্রকল্প চালু করা এবং কৃষকদের জন্য ইনসেনটিভ ও প্রশিক্ষণ প্রদান। এ জন্য বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য কার্বন বিজনেস একটি নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ, যা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। কার্বন বিজনেস শুধু একটি পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। প্যারিস অ্যাগ্রিমেন্টের আলোকে কৃষি খাতে কার্বন ক্রেডিট উন্নয়ন করলে তা শুধু পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। সঠিক নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে কার্বন বাজারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। বনায়ন, পানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং সারের সুষম ব্যবহার—এই তিনটি পদক্ষেপ একযোগে বাস্তবায়ন করা গেলে তা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্বন বিজনেসে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে এবং টেকসই উন্নয়নের পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
লেখক : মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট




১৮ জুলাইয়ের পরে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রথমে আমি অন্য গণমাধ্যমের বিশেষ ব্যবস্থার ইন্টারনেট সুবিধা ব্যবহার করে খবর পাঠানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। পরে সেই ব্যান্ডউইথও সংকুচিত করে দিলে ছবি বা ভিডিও কিছুই পাঠানো যাচ্ছিল না। তখন আমি সরাসরি মোবাইল ফোনে এখান থেকে জার্মানিতে ৪৯ টাকা মিনিটে কল করে সংবাদ দিচ্ছিলাম এবং বন শহরের অফিসে বসে দিনরাত জার্মানিতে কর্মরত সাংবাদিক মারুফ মল্লিক তা লিখে নিচ্ছিলেন। সেই সময় হাসপাতাল থেকে ডেথ রেজিস্টার গায়েব করা হচ্ছিল, পোস্টমর্টেম ছাড়া লাশ ফেরত দেওয়া হচ্ছিল, সঠিক মৃত্যুর সংখ্যা লুকানো হচ্ছিল। এমনকি পুলিশেরও কিছু সদস্য জনরোষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।