• ই-পেপার

একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম বিকাশ ও অবলুপ্তি

  • আবদুল মান্নান

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

ড. সুজিত কুমার দত্ত

গ্লোবাল সাউথের উত্থান ও বৈশ্বিক মেরুকরণের নতুন বাস্তবতা

বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকেন্দ্রিক পশ্চিমা নেতৃত্ব প্রাধান্য বিস্তার করলেও একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই বাস্তবতা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলো যাদের সম্মিলিতভাবে গ্লোবাল সাউথ বলা হয় ক্রমশ বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি নতুন ধরনের মেরুকরণ বা বহুমেরু শক্তি-ভারসাম্যের বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপকেও প্রভাবিত করছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো অর্থনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। গত দুই দশকে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, ব্রাজিল, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় অংশই এই উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলো থেকে আসছে। একসময় বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ মূলত জি৭-ভুক্ত উন্নত দেশগুলোর হাতে থাকলেও এখন উদীয়মান অর্থনীতিগুলো বৈশ্বিক উৎপাদন, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে।

এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিকল্প আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকাশ। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ পর্যাপ্ত নয়। ফলে ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের মতো বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সহযোগিতামূলক কাঠামো গুরুত্ব অর্জন করছে। এসব উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্লোবাল সাউথের উত্থানের দ্বিতীয় প্রধান চালিকাশক্তি হলো ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রতিযোগিতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপটে গ্লোবাল সাউথের অনেক দেশ আর কোনো একক শক্তির সঙ্গে নিঃশর্তভাবে অবস্থান নিতে আগ্রহী নয়। বরং তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এই প্রবণতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি বা কৌশলগত স্বাধীনতার ধারণাকে আরো শক্তিশালী করেছে। অর্থাৎ উন্নয়নশীল দেশগুলো এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পক্ষ বেছে নেওয়ার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম নতুন গুরুত্ব অর্জন করেছে। এসব জোট পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প নয়, বরং একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ ও বহুমেরু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্রিকসের সম্প্রসারণ এবং উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র গড়ে উঠছে। ফলে বিশ্বরাজনীতি আর একক পরাশক্তির নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং একাধিক আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির সমন্বয়ে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো ঐতিহাসিক রূপান্তর এবং ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের দাবি। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণী ফোরামে অধিক প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার প্রতিফলন; কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কার এনে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কণ্ঠস্বরকে আরো কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি।

একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকারজনিত বৈষম্য দূর করার প্রশ্নেও সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি স্থানান্তর, খাদ্য নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে তারা ন্যায্য হিস্যার দাবি করছে। উন্নত দেশগুলোর ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা, জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রশ্নও এখন গ্লোবাল সাউথের কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তবে গ্লোবাল সাউথের এই উত্থান চ্যালেঞ্জমুক্ত নয়। এর অন্যতম কারণ হলো অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। গ্লোবাল সাউথ কোনো একক রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোট নয়; বরং এটি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অগ্রাধিকারসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলোর একটি বিস্তৃত সমষ্টি। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে ভারত, চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা কিংবা অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য ও প্রতিযোগিতা বিদ্যমান। একই সঙ্গে অনেক দেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, সুশাসন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় ভিন্নতা থাকায় অভিন্ন অবস্থান গ্রহণ সব সময় সহজ হয় না।

অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি এখনো গ্লোবাল সাউথের বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক দেশ এখনো উচ্চ প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নত অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতা নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে এসেছে। একদিকে বহুমুখী কূটনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য বৈচিত্র্য এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে; অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা, অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই নতুন বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা অর্জন করতে পারে।

সব মিলিয়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো আজ আর শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয় নয়; তারা বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বরাজনীতি ধীরে ধীরে এক মেরু থেকে বহু মেরু ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে ক্ষমতা, প্রভাব ও নেতৃত্ব আরো বিস্তৃতভাবে বণ্টিত হবে। এই পরিবর্তন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় গ্লোবাল সাউথের ভূমিকা শুধু সংখ্যাগত নয়; বরং ন্যায্যতা, অন্তর্ভুক্তি এবং ভারসাম্যপূর্ণ বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তা ক্রমেই আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, হংকং রিসার্চ সেন্টার ফর এশিয়ান স্টাডিজ-বাংলাদেশ সেন্টার

ভোটের ইতিহাস সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় ফিরছে ইসি

কাজী হাফিজ

ভোটের ইতিহাস সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় ফিরছে ইসি

নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন তৈরি করতে যাচ্ছে। কমিশনের ভাষায় এটি হবে বিস্তারিত বিশ্লেষণাত্মক এবং পরিসংখ্যান প্রতিবেদন। এরই মধ্যে একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞকে এ বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ সম্পর্কে  বলা যায়, আমাদের নির্বাচনী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে লিপিবদ্ধ হতে যাচ্ছে। এতে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিভিন্ন পরিসংখ্যানের সঙ্গে প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে আসতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনব্যবস্থা কিভাবে ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছিল তার চিত্র, যা আগের তিন নির্বাচন কমিশন সংরক্ষণ করতে চায়নি।

দলীয় সরকারের অধীনে ২০১৮ সালের একাদশ এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কোনো পরিসংখ্যান প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশনে নেই। ২০১৪ সালে একপক্ষীয় ও  প্রায় বিনা ভোটের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও তাতে ওই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, অনিয়ম ও সরকারি হস্তক্ষেপ সম্পর্কে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। এতে নির্বাচন বর্জনকারী বিরোধী দলগুলোর যৌক্তিক আন্দোলনকেই অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়। এ ছাড়া বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলুপ্ত হওয়ার পর নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ নির্বাচনে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল অনেক এবং আন্তর্জাতিক মহলেও আগ্রহ ছিল ব্যাপক। এ আগ্রহের সমর্থনে এই তথ্য দেওয়া হয় যে, বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের  চারজন পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন। প্রতিবেদনটির মুখবন্ধের শুরুতেই বলা হয়, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে এ নির্বাচন সম্পন্ন করে। নির্বাচন কমিশন ওই সময় প্রথমে ইউএনডিপির এসইএমবি প্রজেক্টের মাধ্যমে এ প্রতিবেদন ছাপতে চাইলে ইউএনডিপি রাজি হয়নি। পরে কমিশন নিজেদের (সরকারি) খরচে এর মুদ্রণের কাজ শেষ করে।

ভোটের ইতিহাস সংরক্ষণের ধারাবাহিকতায় ফিরছে ইসিনির্বাচন  বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, সংসদ নির্বাচনসহ যেকোনো নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন নির্বাচনী ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যেকোনো কর্মযজ্ঞের পরিসংখ্যান একই কর্মের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি অপরিহার্য অংশ। এটি প্রকাশ না করাটা দুঃখজনক। এক ধরনের দায়িত্বহীনতাও বটে। বিশেষ করে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়াটা বা প্রকাশের ন্যূনতম উদ্যোগ না নেওয়াটা নির্বাচনের নামে প্রহসনকে আড়াল করার অপচেষ্টারই নামান্তর।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া সব জাতীয় নির্বাচনেই আগের সব নির্বাচন কমিশন পরিসংখ্যান প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসেছে। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির প্রতিশ্রুতি অনুসারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয় এবং স্বল্পকালীন এই সংসদের মাধ্যমে বিরোধী দলগুলোর দাবি অনুসারে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই বছরের ৩০ মার্চ রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন এবং প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করেন।

নির্বাচন কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদনটি সবচেয়ে তথ্যসমৃদ্ধ। এর উপক্রমণিকায় পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির অধীনে একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন,  ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সেই ব্যবস্থা রহিত, পরবর্তীকালে ১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে অন্যান্য বিধানাবলির সঙ্গে জনগণের মৌলিক মানবাধিকার বলবৎকরণ এবং রাষ্ট্রপতি শাসনব্যবস্থার অধীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৩০০ সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন সংসদ সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ব্যবস্থা প্রবর্তিত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচন ও নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ৩০০টি সাধারণ আসনের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ২০৭টি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি এবং অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কে কয়টি আসন পায় সেই তথ্য তুলে ধরা হয়।

এরপর ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুঃখজনকভাবে নিহত হওয়ার পর উপ-রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে কার্যভার গ্রহণ এবং ওই বছরের ১৫ নভেম্বর  অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিচারপতি আবদুস সাত্তারের রাষ্ট্রপতি হওয়ার ঘটনাক্রমও এতে বর্ণনা করা হয়।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দেশে সামরিক আইন জারির মাধ্যমে জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তে বাধ্য করা এবং এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিষয়টিও পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে উঠে আসে। এতে ১৯৮৬ সালের ৭ মে জাতীয় সংসদের তৃতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, সে নির্বাচনে বিএনপিপ্রধান বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয়  জোট  অংশ না নিলেও জামায়াতসহ আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটের নির্বাচনে অংশগ্রহণ, সেই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ পরের বছরের ৬ ডিসেম্বর ভেঙে দেওয়াএসব তথ্যও সন্নিবেশিত হয়। উল্লেখ করা হয়,  ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত ব্যর্থ সংসদ নির্বাচনের কথা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনের ফলাফল দেশের রাজনৈতিক মহলে বিশেষ কোনো প্রভাব বিস্তার করিতে পারে নাই। বরং লে. জে. হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের পতনের লক্ষ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ, ছাত্রসমাজ ও সমাজের বিভিন্নস্তরের এবং বিভিন্ন পেশার লোকজন হরতাল ও বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ফলে ১৯৯০ সালের ১৪ অক্টোবর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এরপর  দেশে জরুরি অবস্থা জারি, গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সে নির্বাচনের বিস্তারিত পরিসংখ্যান ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ছিল দেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে নেওয়া, গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা ও সেই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস ধরে নানা উদ্যোগ।

১৫ বছরের আওয়ামী শাসনামলের তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি যে কতটা ভয়াবহ ছিল তা সম্প্রতি নতুন করে উঠে আসে হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে। গত ১৪ জানুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছাড়াও ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে একটি বড় ধরনের অনিয়মের বিষয় উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, ২০০৮ সালে একটি নির্দিষ্ট দলকে নির্বাচনে জিতিয়ে আনার উদ্দেশ্যে সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। ৩০০ আসনের মধ্যে টার্গেট করে ১৩৩টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ আসনে শাসকদলের (আওয়ামী লীগ) সুবিধা নিশ্চিত করতে বিরোধী (বিএনপি) সমর্থিত এলাকাগুলো ভাগ করা হয় এবং ভোটার সমতা অস্বাভাবিকভাবে পরিবর্তন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে পরের তিনটি নির্বাচন সম্পর্কে বলা হয়, বাংলাদেশে গত এক দশকে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) ছিল মূলত জনগণের ভোটাধিকার ভূলুণ্ঠিত করার এক সুপরিকল্পিত নীলনকশা। ২০১৪ সালে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন ছিল সম্পূর্ণ সাজানো ও সুপরিকল্পিত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার মিশন গ্রহণ করে। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল তাদের এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বুঝতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ২০১৮ সালে ৮০% কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করে রাখা হয়। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০%-এর বেশি হয়ে যায়। ২০২৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ডামি প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করার অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, তিনটি নির্বাচনের অভিনব পরিকল্পনা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ সেল গঠন করা হয়, যা নির্বাচন সেল নামে পরিচিতি লাভ করে।

২০১৪-২৪ পর্যন্ত সময়কালে নির্বাচনব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে মূলত প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময়ে কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই হয়ে উঠে নির্বাচন পরিচালনার মূলশক্তি।

লেখক : কালের কণ্ঠের উপসম্পাদক

ও নির্বাচন বিশ্লেষক

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

এস এম সৈকত

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

আমরা জলবায়ু সংকট নিয়ে প্রতিদিন কথা বলছি। সংবাদে দেখছি, কোথাও দাবদাহে মানুষ মারা যাচ্ছে অথবা কোথাও বন্যায় জনপদ ভেসে যাচ্ছে। ইউরোপের সাম্প্রতিক দাবদাহে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই তীব্র গরম এখন আর ব্যতিক্রম নয়, এটি নতুন বাস্তবতা। এল নিনোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা, খাদ্য উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে। প্রশ্ন হলো, আমরা এসব ঘটনাকে শুধু খবর হিসেবে নেব, নাকি ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা হিসেবে বুঝব?

আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হলো, আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তনকে অনেকাংশে পরিবেশগত বিষয় হিসেবে দেখিযেন এটি গাছপালা, নদী, সমুদ্র বা বরফ গলার গল্প। অথচ বাস্তবতা হলো, জলবায়ু সংকট এখন টিকে থাকার প্রশ্ন। এটি আর শুধু প্রকৃতির সংকট নয়, এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, খাদ্য, অর্থনীতি এবং নিরাপত্তার সংকট। একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যাক। আকাশে মেঘ আছে, বৃষ্টি হতে পারেএটি জেনেও আপনি ছাতা ছাড়া বের হলেন। কিছুক্ষণ পর বৃষ্টি এলো, আপনি ভিজে গেলেন। আমরা একে হয়তো দুর্ভাগ্য বলি। কিন্তু এটি আসলে আমাদের প্রস্তুতির অভাব। জলবায়ু সংকটের ক্ষেত্রেও আমরা আজ ঠিক এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা জানি, তাপপ্রবাহ বাড়বে, বন্যা হবে, নদী ভাঙবে, খাদ্যের দাম বাড়বে, ডেঙ্গু ছড়াবে, শহরে জলাবদ্ধতা হবে। কিন্তু তবু আমাদের আচরণ, আমাদের পরিকল্পনা, এমনকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনেও সেই প্রস্তুতির ছাপ খুব কম।

এটি কি শুধু ভাগ্যের দোষ, নাকি আমাদের অপ্রস্তুতির ফল? ঠিক এখানেই আসে জলবায়ু সাক্ষরতার প্রশ্ন। আমরা কি সত্যি জানি তীব্র গরমের সময় কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়? আমরা কি জানি বন্যার ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় জরুরি প্রস্তুতি কী হওয়া উচিত? আমরা কি জানি দূষিত পানি কী ধরনের রোগ ছড়াতে পারে? আমরা কি জানি বর্জ্যের অব্যবস্থাপনা কিভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ায়? আমরা কি বুঝি একটি দাবদাহ শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, বরং একটি জনস্বাস্থ্যের জন্যও জরুরি অবস্থা? যদি এসবের উত্তর আমাদের কাছে পরিষ্কার না হয়, তাহলে আমরা শুধু জলবায়ু ঝুঁকিতে নই, আমরা তথ্যগতভাবেও ঝুঁকিতে আছি।

বাংলাদেশের মতো দেশে এই প্রশ্ন আরো গুরুত্বপূর্ণ। গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের সবচেয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় এক কোটি ৯০ লাখ মানুষ জলবায়ুজনিত কারণে দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতের সামাজিক ও নগর বাস্তবতার একটি বড় সংকেত। কারণ নদীভাঙা, ভূমিহীন এই মানুষগুলো কোথায় যাবে? উত্তর খুবই সহজশহরে। কিন্তু ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে যখন শহরকে ক্লাইমেট স্মার্ট করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তখন জলবায়ুসচেতন নাগরিক ছাড়া তা কিভাবে সম্ভব? একই প্ল্যানে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে অভিযোজনের জন্য ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি প্রয়োজন। গভীরভাবে ভাবলে, এই সংখ্যা শুধু অর্থের হিসাব নয়, এটি আমাদের ঝুঁকির গভীরতার প্রতিফলন।

আমরা এরই মধ্যে দেখেছি, ঢাকার মতো শহরগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক চাপের মুখে ক্রমেই আরো অরক্ষিত হয়ে উঠছে। বস্তির বিস্তার ঘটছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে, অতিরিক্ত গরমে শ্রমঘণ্টা কমছে, আর জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ ও মৃত্যু উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের বাস্তব সংকটে রূপ নিয়েছে। এই বাস্তবতায় জলবায়ু অভিযোজন এখন আর শুধু নীতিনির্ধারকদের একার কাজ নয়, এটি এখন ঘরবাড়িতে আলোচনার বিষয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ ও চর্চার বিষয়, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সংস্কৃতির অংশ এবং নাগরিক জীবনের বাস্তবতা। আমরা যদি শিশুদের তীব্র গরমে কিভাবে নিরাপদ থাকতে হয় তা শেখাতে না পারি, তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে। একজন শিক্ষক যদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে মৌলিক ধারণাই না রাখেন, তাহলে তাঁর শিক্ষার্থীরাও ঝুঁকি মোকাবেলার দক্ষতা অর্জন করতে পারবে না। অফিস-আদালতের কর্মীরা যদি তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবেলার উপায় কিংবা বিশুদ্ধ পানির নিরাপত্তা সম্পর্কে না জানেন, তাহলে তাঁরাও ঝুঁকির মুখে পড়বেন। একজন রিকশাচালক, একজন নির্মাণ শ্রমিক, পথের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য জলবায়ু সাক্ষরতা আর কোনো উচ্চাভিলাষী বিষয় নয়, এটি এখন বেঁচে থাকার হাতিয়ার। চলতি সময়েই আমরা দেখছি অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ধস এবং এমনকি অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায়ও আকস্মিক বন্যার ঘটনা। বার্তাটি স্পষ্টজলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এখন আর দূরের কোনো আশঙ্কা নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা।

জলবায়ু সাক্ষরতা : এখন টিকে থাকার প্রশ্ন

আমাদের সবচেয়ে বড় ঘাটতি সচেতন প্রস্তুতির ক্ষেত্রে। আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তন জনিত অভিযোজনকে মূলধারায় আনতে পারিনি। আমাদের স্কুলে-কলেজে এ বিষয়গুলো এখনো অনেকাংশে উপেক্ষিত, আর একই কারণে বেশির ভাগ মানুষের ধারণা, এটি তাদের জীবনের বিষয়ও নয়। আমাদের বেশির ভাগ অফিস-আদালতে জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত প্রস্তুতির কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। আমাদের নগরে জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা তৈরির কাঠামো এখনো দুর্বল। এমনকি পরিবারেও এসব আলোচনা খুব সীমিত। অথচ অভিযোজন শুরু হয় সচেতনতা দিয়ে। মানুষ যদি না জানে কী ধরনের বিপত্তি আসছে, তাহলে তারা প্রস্তুত হবে কিভাবে? আর প্রস্তুতি না থাকলে টিকে থাকার সক্ষমতা তৈরি হবে কোথা থেকে? বিশ্বের অনেক দেশ এই বাস্তবতাকে অনেক আগেই বুঝেছে। জাপানে দুর্যোগ প্রস্তুতি শুধু সরকারের কাজ নয়, এটি সামাজিক সংস্কৃতির অংশ। স্কুলের শিশু থেকে অফিসকর্মীসবাই জানে জরুরি অবস্থায় কী করতে হবে। ২০০৩ সালের প্রাণঘাতী দাবদাহের পর ফ্রান্সসহ ইউরোপের অনেক দেশ হিট অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে। কারণ তারা বুঝেছে, গরম শুধু আবহাওয়ার বিষয় নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের সংকট। নেদারল্যান্ডস বন্যাকে শুধু ঠেকানোর চেষ্টা করেনি, তারা শহরকে পানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নতুনভাবে পরিকল্পনা করেছে। অর্থাৎ বিশ্ব এখন ঝুঁকির সঙ্গে বাঁচতে শিখছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি শিখছি?

সমস্যা সব সময় নীতির ঘাটতিতে থাকে না। বাংলাদেশের ন্যাশনাল অ্যাডাপ্টেশন প্ল্যানে (২০২৩-২০৫০) এরই মধ্যে ১১৩টি অগ্রাধিকারমূলক অভিযোজন উদ্যোগ নির্ধারণ করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য জলবায়ুসংশ্লিষ্ট বাজেটকাঠামোও তৈরি হয়েছে এবং প্রতিবছর সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব রাখা হচ্ছে। অর্থাৎ পরিকল্পনাও আছে, সম্পদ বরাদ্দের ব্যবস্থাও আছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এই নীতিগুলোর বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, নারী, তরুণ এবং নাগরিক সমাজ কতটা কার্যকরভাবে যুক্ত হচ্ছে? এখানেই নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ পরামর্শ গ্রহণ আর জনগণের প্রকৃত মালিকানা এক বিষয় নয়। মানুষ কি শুধু মতামত দিয়েছে, নাকি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অংশীদারও হয়েছে? এখন এই প্রশ্নটি গুরুত্বের সঙ্গে করার সময় এসেছে।

অন্যদিকে আমরা প্রায়ই জলবায়ু সহনশীলতা বলতে অবকাঠামো; যেমনবাঁধ, ড্রেন, আশ্রয়কেন্দ্র, সবুজায়ন তৈরি বুঝি। এগুলো অবশ্যই দরকার। কিন্তু সহনশীল জনপদ শুধু কংক্রিট দিয়ে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় জ্ঞান দিয়ে, অভ্যাস দিয়ে, মানুষের মধ্যে ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা দিয়ে, আর সম্মিলিত দায়বদ্ধতা দিয়ে। আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েআমরা কি জলবায়ুবিষয়ক আলাপকে শুধু সেমিনার, কনফারেন্স কিংবা আনুষ্ঠানিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখব, নাকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘরবাড়ি, কর্মক্ষেত্র এবং রাজপথের আলোচনায় নিয়ে যাব? কারণ জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের সংকট নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই বাস্তবতার ভাষা শিখছি, নাকি বিপর্যয়ই আমাদের তা শিখিয়ে দেবে?

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, সিরাক-বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক নীতি বিশ্লেষক

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়

ড. ফরিদুল আলম

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়

ইরানকে পরমাণু কর্মসূচির বাইরে রাখা নিয়ে যে যুদ্ধের শুরুটা হয়েছিল, এই পর্যায়ে এটা এসে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দাবি ও পাল্টা দাবি কেন্দ্রিক নতুন সংঘাতে। গত ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যকার স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি ভেস্তে যায় হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে ইরানের হামলা এবং পরবর্তীকালে ইরানের ১৭০টি স্থাপনা লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় এবং সেই হামলার জবাবে কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে পরিচালিত ইরানের পাল্টা হামলার মধ্য দিয়ে। সর্বশেষ ইরান আবারও গ্রিসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনারবাহী জাহাজে হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কমপক্ষে ১৪০টি স্থানে বিমান হামলা চালায়। এর জবাবে আগের ঘোষণা অনুযায়ী ইরান পাল্টা হামলা চালায় মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি দেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায়। এসব হামলায় তারা জর্দান, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার, রাডার ব্যবস্থাপনা, বিমানবাহী রণতরির সহায়তা ও জ্বালানি স্থাপন কেন্দ্র, মার্কিন পঞ্চম নৌবহর এবং যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধন করতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে একতরফা চুক্তির যুগ এখানেই শেষ এবং সেই সঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়ে দিয়েছে যে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন হস্তক্ষেপ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।

পরিস্থিতি বলে দিচ্ছে যে হরমুজ নিয়ে এই সংঘাত এখন পুরোটাই ইরানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাঝে কিছুটা স্বস্তি বিরাজ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিশ্চয়তা সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উত্তেজনার কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে বিশ্বের তেল এবং পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ এই রুটটি ঘিরে নতুন সৃষ্ট এই অনিশ্চয়তা যুদ্ধের নতুন যে অধ্যায়ের সূচনা করল। শিগগিরই মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনাপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এটি বন্ধ হওয়ার লক্ষণ খুবই সীমিত। ইরানে কঠোর হামলা এবং প্রয়োজনে বেসামরিক স্থানে ব্যাপক হামলা চালানো হবে মর্মে অতীতের মতো ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ ঘোষণার পর নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, তা এখন আরো ছড়িয়ে পড়ছে।

এরই মধ্যে নতুন করে কথার বোমা ফাটিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি জানিয়েছেন যে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে ইরান। যদিও এটি নিয়ে তিনি সরাসরি ইসরায়েলি কোনো সূত্রকে উদ্ধৃত করেননি, বরং মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের কথা বলতে চেয়েছেন, তবে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে যে ইসরায়েলের গোয়েন্দারা এ ধরনের তথ্য সরবরাহ করেছে ট্রাম্পকে। তারা জানিয়েছে যে ইরানের কিলিং টার্গেটের এক নম্বরে ট্রাম্পের নাম রয়েছে। এটি নিয়ে তিনি যে কিছুটা চিন্তিত, সেটি তাঁর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়েই পরিষ্কার হয়েছে। আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে নতুন করে অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও প্রয়োজনে ইরানে হামলার জন্য আরো অস্ত্র প্রস্তুত করা হয়েছে বলা জানা গেছে। এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে ট্রাম্পের পক্ষ থেকে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় একযোগে এক হাজারের বেশি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার নির্দেশ দিয়ে রাখা হয়েছে।  এখানে উল্লেখ্য যে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে টানা ৪০ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মজুদকৃত অস্ত্রের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হয়েছিল। আর সেটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিতে যেতে ট্রাম্পের একটি কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছিল। এখন এই সময়ের মধ্যে তাঁরা আবারও নতুন অস্ত্র উৎপাদন করে নিজেদের ইরানের বিরুদ্ধে আক্রমণে অনেকটাই সক্ষম করে তুলেছেন। সেই অর্থে এই সাময়িক বিরতিটিকে যুদ্ধের একটি অন্যতম কৌশল হিসেবে দেখা যেতে পারে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন অধ্যায়গত ১৭ জুন ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটিকে মেনে নেয়নি ইসরায়েল। সেই সঙ্গে ইরানের চাওয়াকে মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে বাধ্য করা হয় লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতিতে যেতে। যে যুদ্ধটি ইসরায়েলের অনেক পরিকল্পনা এবং চেষ্টার ফল, সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। একই সঙ্গে সাময়িক যুদ্ধবিরতির এই পথ ধরে যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, সেটি হবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে একটি আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া পরোক্ষ স্বীকারোক্তি। বিষয়গুলো ইসরায়েলের জন্য গভীর ভাবনার। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যিনি ট্রাম্পকে এত দিন ধরে ইরানকে তাঁদের অভিন্ন শত্রু বলে যে ধারণা দিয়ে এসেছেন, সেই ইরান এর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার পাবে, ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য নতুন এক বাস্তবতার সৃষ্টি হবে, যার আলোকে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে হয়তো ইরানকেই তাদের জন্য রক্ষাকবচ হিসেবে মেনে নেবেএসবই ইসরায়েলের জন্য একটি দুঃসংবাদ। এটি তাদের বিস্তৃত ভূখণ্ডের দাবিকেই শুধু খাটো করবে না, তাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকেও চ্যালেঞ্জ করে বসবে।

এই সবকিছু মাথায় নিয়ে ইসরায়েল নতুন করে ছক কষতে থাকে, যার অন্যতম ফল হচ্ছে ট্রাম্পকে এটি বিশ্বাস করানো যে তাঁর জীবন সংশয়ে আছে। রাজনীতিতে অনেকটাই অপরিণত ট্রাম্প খুব সহজেই এটি বিশ্বাস করে ফেলেছেন। নতুন করে ইরানে আরো বৃহত্তর পরিসরে হামলার কথা ভাবছেন, এমনকি ইরানের অস্তিত্ব ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছেন। যেকোনো রাজনীতিবিদের জন্যই যুদ্ধের মতো বড় সিদ্ধান্তে গেলে নিজের প্রাণ সংশয়ের কথা মাথায় নিয়েই তা করতে হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে এই যুদ্ধের প্রায় পুরোটা সময়ই স্বয়ং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বাংকারের ভেতর আত্মগোপনে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের হত্যা করা হয়েছে। এটি নিয়ে যদি ইরান প্রতিশোধপরায়ণ হয়, তাহলে কি সেটি খুব আশ্চর্যের বিষয় হবে? মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের কড়া নিরাপত্তা জালের ভেতর থেকে ট্রাম্প হয়তো ভেবেছেন, তাঁর জন্য কোনো রকম হুমকি প্রযোজ্য নয়।      

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পাদিত সমঝোতা স্মারক, যার ওপর ভিত্তি করে দুই পক্ষের মধ্যে পরবর্তী ৬০ দিন আরো অধিকতর আলোচনার মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা, এই স্মারকটি অকার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত দুই পক্ষ আবারও যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় উপনীত হলো। এর ফলে এর আগে ইরানের সম্পদ ছাড়, হরমুজ প্রণালি থেকে মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের যে ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছিল, এর কোনো কিছুই আর রইল না। বিষয়টি দুশ্চিন্তার হলেও ইরানের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সে রকম উদ্বেগ প্রদর্শন করা হয়নি, উপরন্তু ভবিষ্যতে যেকোনো মার্কিন হামলার সমুচিত জবাবের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে এই আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরুর আহবান জানিয়েছে। ইরানের কোনো রকম প্রতিক্রিয়ার আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন যে ইরান আবারও আলোচনা শুরুর জন্য অনুনয় করছে এবং তিনি এতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছে ইরান। আমরা এর আগেও দেখেছি, একটি চুক্তির জন্য ইরান মরিয়া হয়ে আছে’—এ ধরনের কথা বলেছিলেন ট্রাম্প। পরবর্তী সময়ে দেখা গেল যুক্তরাষ্ট্র একটি যুদ্ধবিরতির স্বার্থে অনেকটা ছাড় দিয়েই ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে উপনীত হলো।

চুক্তি স্বাক্ষরের মাত্র তিন সপ্তাহের কাছাকাছি সময়ে এসে এই চুক্তিটি বাতিল করার যে ঘোষণা ট্রাম্প দিলেন, এর পেছনে ইসরায়েলের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষণীয়। যদিও এটিও বলা হচ্ছে যে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে যে বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেটি ইরানের কিছু বিদ্রোহী গোষ্ঠী দ্বারা সম্পাদিত, এর পেছনে ইরানের শাসকদের কোনো সবুজ সংকেত ছিল না। এখানে এটি বলা যেতে পারে যে ইসরায়েল রাষ্ট্র যেমন চাইছে না, ইরানের ভেতর প্রতিশোধকামী কিছু গোষ্ঠীও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিটিকে মেনে নিতে চাইছে না। এখানেই সংকটের মূল বিষয়টি নিহিত। এ ক্ষেত্রে এই ভুল-বোঝাবুঝি নিরসনে দুই পক্ষের বার্তাবাহকের মাধ্যমে আলোচনা পরিত্যাগ করে সরাসরি কথা বলা উচিত। এই আলোচনায় প্রয়োজনে পাকিস্তান ও কাতারের মতো দেশের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ একে অন্যের কাছে নিজেদের সদিচ্ছার বিষয়গুলো এবং কোথায় কোথায় সীমাবদ্ধতাগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারে। মনে রাখা দরকার যে যুদ্ধটি যদি আবারও পুরো মাত্রায় শুরু হয়, তাহলে এর মধ্য দিয়ে কার্যত কোনো পক্ষেরই বিজয়ী হওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না, বরং উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো ইরানের খুব সহজ নিশানায় পরিণত হয়ে ক্ষতির পাল্লা তাদের জন্যই ভারী হবে। অন্যদিকে ইরানের অবকাঠামোর ক্ষতিসহ ব্যাপক সংখ্যায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা থেকে যাবে। সুতরাং যুদ্ধের নতুন এই অধ্যায় থেকে বের হয়ে নতুন করে পুরোদমে সরাসরি আলোচনা শুরু করাটাই হবে সময়ের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 

একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম বিকাশ ও অবলুপ্তি | কালের কণ্ঠ