ফুটবল বিশ্বকাপের সময় এলেই বাংলাদেশ এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। এই রূপান্তরের কোনো অর্থনৈতিক বা যৌক্তিক সমীকরণ নেই। ভৌগোলিক মানচিত্রে যে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের অবস্থান এ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, যাদের ভাষা আমাদের চেনা নয়, যাদের কৃষ্টি-কালচারের সঙ্গে আমাদের রোজকার জীবনের বিন্দুমাত্র সংযোগ নেই—তাদের জয়-পরাজয়ে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃত্স্পন্দন থমকে যায়। বাংলাদেশ ফুটবল দল ফিফা র্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে, কখনো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়নি। অথচ বিশ্বকাপের এক মাস এ দেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা দেখলে কোনো বিদেশির পক্ষে আন্দাজ করাই অসম্ভব যে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের কোনো দলই নেই। বিশ্বের আর কোথাও কোনো ভিনদেশি দলকে নিয়ে এমন সর্বগ্রাসী আবেগ, এমন নিঃশর্ত উন্মাদনা আর পাড়া-মহল্লায় তর্কের ঝড় ওঠার নজির মেলা ভার। এই যে নিজের দেশকে ছাপিয়ে অন্য দেশের পতাকাকে বুকে টেনে নেওয়া, টাকা খরচ করে ছাদে বিশালাকার পতাকা ওড়ানো কিংবা দল হেরে গেলে ভাত না খেয়ে ঘরে বসে থাকা—এ কি শুধুই বিনোদন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের বাঙালি সমাজের গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য?
এই বিস্ময়কর ফুটবল সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক ধারাবাহিক বিবর্তনে, যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের সঙ্গে দল পছন্দের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন বাকি দলগুলোর আগেই তারা বাংলাদেশে এক ধরনের প্রাথমিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে সে সময় মানুষের ঘরে ঘরে টিভির সংখ্যা ছিল ভীষণ কম। এর ওপর সত্তরের দশকের শুরুতে ভয়াবহ বন্যা আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই ভালো লাগাটা সবার মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার বা প্রাতিষ্ঠানিক জনপ্রিয়তা পাওয়ার সুযোগ পায়নি। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। সেবার অবশ্য বিজয়ী হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। এরপর ১৯৭৮ সালে যখন আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন সাদা-কালো টিভির হাত ধরে তারা এ দেশের মানুষের নজরে আসে, তখনো বাংলাদেশে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিল সীমিত। ফলে উন্মাদনাটা নির্দিষ্ট কিছু গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
আসল বিস্ফোরণটা ঘটল আশির দশকে, যা বাংলাদেশের সমাজ ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক বড় সন্ধিক্ষণ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সময় রঙিন টিভির আগমন ফুটবলকে এ দেশে এক অভূতপূর্ব তুঙ্গে নিয়ে যায়। মেক্সিকো বিশ্বকাপ যখন এ দেশের ড্রয়িংরুমে রঙিন পর্দায় হাজির হলো, ঠিক তখনই বাঙালি তার ফুটবল ঈশ্বরকে খুঁজে পেল—তিনি ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। সেবার আর্জেন্টিনার এই বিশ্বজয় ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকেও এ দেশের মানুষের হৃদয়ে সমান জনপ্রিয় দলে পরিণত করে। ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার এই নতুন উন্মাদনা আগে থেকে সুপ্ত থাকা ব্রাজিল ও পেলে প্রীতিকে এক চিরন্তন প্রতিপক্ষ হিসেবে জাগিয়ে তোলে এবং ফুটবল-ভাবনা সমাজে প্রায় সমভাগে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ব্রাজিলের পাসিং নৈপুণ্য আর খেলার শৈল্পিক ধরন তো ছিলই, পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে ফুটবলের জাদুকর কালো মানিক পেলের ওপর লেখা প্রবন্ধটি শিশুদের মনে শৈশব থেকেই লাতিন ফুটবলের প্রতি এক গভীর মোহ তৈরি করে দিয়েছিল। ফলে ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশের সমাজ অবচেতনেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে—একদল ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের ভক্ত, অন্য দল ম্যারাডোনার অতিমানবীয় জাদুর অনুসারী। এই যে শৈশবের ভালো লাগা আর স্মৃতির মেলবন্ধন, তা-ই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আজকের এই মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
তবে এই আবেগের গভীরতা শুধু খেলার মাঠের নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক অবদমিত রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাঙালি জাতি হিসেবে দীর্ঘকাল উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে বন্দি ছিল। শোষণ, বঞ্চনা আর অধিকার আদায়ের লড়াই আমাদের ইতিহাসের অংশ। ফলে অবচেতনেই মানুষ শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে ভালোবাসে। আশির দশকে যখন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ফুটবল এ দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে, তখন বাঙালি আসলে ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের নান্দনিক লড়াইয়ের মাঝে নিজেদেরই এক ধরনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার সেই একক লড়াই কিংবা ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় প্রতিশোধ—বাঙালির কাছে তা শুধু খেলা ছিল না, তা ছিল শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এক পরম বিজয়। বাংলাদেশের মানুষ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির চেয়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে বেশি। কারণ উভয়ের ইতিহাস ও যন্ত্রণার গল্পটা একই সুতায় গাঁথা। ম্যারাডোনা বা পেলের সেই খাটো গড়ন, দারিদ্র্য জয় করে বিশ্বজয়ের গল্প আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তাই লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ছন্দোময় নান্দনিক ফুটবল পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের কাছে এক অদৃশ্য যুদ্ধজয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ সমাজের আরেকটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক গোত্রবাদ বা এক ধরনের যৌথ আবেগ। আমাদের সমাজে মানুষ একা বাঁচতে চায় না, সে সব সময় কোনো না কোনো দলের অংশ হতে চায়। রাজনীতি হোক বা পাড়ার ক্লাব—বাঙালি নিজের একটি দলগত পরিচয় খুঁজতে ভালোবাসে। ফুটবল বিশ্বকাপ আমাদের এই দলগত পরিচয় প্রকাশের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এনে দেয়। যখন একজন মানুষ তার বাড়ির ছাদে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ায়, তখন সে আসলে সমাজকে বার্তা দেয় যে সে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ। এই পতাকা উড়ানো বা জার্সি পরা শুধু একটি দলকে সমর্থন করা নয়, এটি হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব ও আবেগকে দৃশ্যমান করার এক আকুল প্রয়াস। এক অদ্ভুত সুন্দর কৌতুকও এ সমাজে দেখা যায়; কখনো কখনো সাধারণ মানুষ চট করে এমন সব দেশের পতাকা কিনে বসে, যেমন—হন্ডুরাস বা আইসল্যান্ড, যাদের নামও হয়তো তারা আগে শোনেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই অদ্ভুত সমর্থন কখনো কখনো এত দূর গড়ায় যে সেই সুদূর হন্ডুরাসের মানুষও অভিভূত হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করা শুরু করে। এই যে সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এক অদ্ভুত আত্মিক যোগাযোগ, তা শুধু বাঙালির এই অকৃত্রিম ও শর্তহীন আবেগের কারণেই সম্ভব।
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই উন্মাদনা কি তবে শুধুই এক ধরনের পলায়নপর মানসিকতা? আমাদের দেশের নিজস্ব ফুটবলের যখন এই জরাজীর্ণ দশা, তখন অন্য দেশের জন্য এই প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কি এক ধরনের হীনম্মন্যতা নয়? কিন্তু গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এটি হীনম্মন্যতা নয়, বরং এটি হলো বিনোদনের চরম সংকটগ্রস্ত একটি সমাজে আনন্দের এক পাক্ষিক উৎসব। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যখন বিনোদনের সুযোগ সীমিত, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা যখন মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে, তখন বিশ্বকাপ ফুটবল আসে এক পশলা মেঘের মতো। এই এক মাস মানুষ তার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে একটি সম্পূর্ণ অচেনা দেশের জয়ে আনন্দে মেতে উঠতে পারে, আবার পরাজয়ে কাঁদতে পারে। এই কান্না বা হাসি মানুষকে তার বাস্তব জীবনের জাঁতাকল থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। এটি এক ধরনের সামষ্টিক থেরাপি, যা পুরো সমাজকে একসঙ্গে হাসায় এবং কাঁদায়। তবে এই ভিনদেশি দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা কিন্তু নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র খাটো করে না। এ দেশের সাধারণ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয়—যদি কখনো বাংলাদেশ ফুটবল দল বিশ্বকাপে খেলে এবং প্রতিপক্ষ যদি হয় আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল, তবে তারা কাকে সমর্থন করবে? উত্তর আসে দ্বিধাহীন চিত্তে—বাংলাদেশ। আমাদের ক্রিকেট দল যখন বিশ্বমঞ্চে লড়ে, তখন এই পুরো দেশ এক রঙে, অর্থাৎ লাল-সবুজে একাকার হয়ে যায়। সেখানে কোনো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার অস্তিত্ব থাকে না। সুতরাং এই বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা, তা দেশপ্রেমের অভাব নয়, বরং তা হলো খেলাধুলার প্রতি বাঙালির এক চিরন্তন, আদিম এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।
যেদিন বাংলাদেশ সত্যি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, সেদিন হয়তো পাড়া-মহল্লায় এই ভিনদেশি পতাকাগুলোর মেলা আর দেখা যাবে না। সেদিন দেশজুড়ে উড়বে শুধু একটিই পতাকা—আমাদের লাল-সবুজ। কিন্তু যত দিন না সেই স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, তত দিন বাঙালি এই লাতিন আমেরিকার বা ফ্রান্স, জার্মানি বা অন্য কোনো দেশের ফুটবল জাদুকরদের পায়েই সঁপে দেবে তার সব আবেগ, আর প্রতি চার বছর পর বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়ে প্রমাণ করবে—ফুটবল আসলেই কোনো সীমানা মানে না, আর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এই বাংলাদেশ।
লেখক : নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়



এই ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী অর্জনের কৃতিত্ব কোনো একক নেতা বা সংগঠনের নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের, যারা মিছিল করেছে, প্রতিবাদ করেছে, প্রার্থনা করেছে, কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে, সত্য ছড়িয়েছে কিংবা শুধু ভয়কে 

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সংঘটিত ভূমিধসের ঘটনাগুলোর প্রায় ৮৩ শতাংশই ঘটে থাকে বর্ষাকালীন মৌসুমে জুন থেকে আগস্ট মাসের অতিবৃষ্টির সময়। গত এক দশকের বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্যানুযায়ী, বছরভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। যেমন