kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

জীবন ঘুমায়, মৃত্যু জাগায়

মোস্তফা মামুন

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জীবন ঘুমায়, মৃত্যু জাগায়

ক্যাম্পাসে মাঝেমধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। দুর্ঘটনা বলতে মৃত্যু। কিন্তু সত্যি বললে, প্রতি রাতেই এমন মৃত্যুতুল্য পরিস্থিতি চলতে থাকে হলে হলে। ও বেয়াদবি করেছে, ধরে আনো। ও বিরোধী পক্ষ, পেটাও। শিবির করে মনে হয়, মারো। এই তো দেশের ছাত্ররাজনীতি আর ক্যাম্পাসের নিত্যদিনের ছবি।

তা নিয়ে কেউ গা করে না, মোটামুটি মেনে নেওয়া একটা বিষয়। গোলমাল ঘটে যায় মাত্রা ছাড়িয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনাটা গড়িয়ে গেলে। তখন পুরো দেশ উন্মাতাল। সেটা সামাল দেওয়ার কিছু কৌশলও রপ্ত করে নিয়েছে আমাদের প্রশাসন। কয়েকজনকে ধরো। সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক, তার ছাড় নেই জাতীয় কথাবার্তা। অনুপ্রবেশকারীর গল্পও শোনা যায়। ব্যস, পরিস্থিতি শান্ত। সবাই ঘরে ফেরে। হলে ফেরে ছাত্ররা। সেই হলে, যেখানে আবারও সেই জীবন। সেই নিপীড়ন।

এই যে বিস্ফোরণটা খুনের পর ঘটে, সাধারণ নির্যাতনের ক্ষেত্রে এই প্রতিবাদ হয় না। সম্ভবও না। কিন্তু কিছু আওয়াজ তো তোলা যায়। একবার হলের রাজনৈতিক ছাত্রদের নিপীড়ন নিয়ে আলোচনাটা তুলেছিলাম। কথোপকথনটা হলো এ রকম—‘খুন বা মৃত্যু না হলে আন্দোলনে সাধারণ ছাত্রদের পাওয়া যায় না।’

‘কেন?’

‘ভয় পায়। রাজনীতির ছেলেরা সংগঠিত। ওদের সঙ্গে প্রশাসন আছে। ওরা আন্দোলন করলে চিনে রাখবে। পরে ব্যবস্থা নেবে।’

তার মানে সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত হতে মৃত্যুর দরকার পড়ে। আসলে আমাদের সব কিছুর জন্য মৃত্যুর দরকার পড়ে। লাশ না হলে এই দেশে এখন আর কিছুই হতে চায় না। জীবনের জন্য মৃত্যুর এমন প্রয়োজনীয়তা পৃথিবীর আর কোনো দেশে, কোনো কালে ছিল কি না জানি না।

মৃত্যুর পর যে প্রতিবাদটা হয় সেটা মূলত মৃত্যুর বিচারের। এটাও একভাবে দেখলে অত্যন্ত হাস্যকর। খুন হয়েছে, বিচার হতে হবে, এ তো সভ্য সমাজের ন্যূনতম মাপকাঠি। কিন্তু সেটাও লড়াই করে আদায় করতে হয়। আর সরকারও বিচারের আশ্বাস দেওয়াটাকে এমন বড় করে দেখায়, যেন এর মাধ্যমে বিরাট একটা কৃতিত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে।

বিচার যে হয় না, সেটা পুরো বোধ হয় ঠিক নয়। দেশের প্রক্রিয়া অনুযায়ী অনেক দিন ধরে চলতে থাকে। মাস-বছর ঘোরে। ঘুরতেই থাকে। সন্তান বা ভাই হারানো পরিবারগুলো শুরুতে সমগ্র সিস্টেমের যে সমর্থন পায়, সময়ে সেটা আর থাকে না। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজেদের কাজকর্ম নিয়ে। অন্যদিকে আক্রান্ত পক্ষ যেহেতু তুলনামূলক শক্তিশালী, কাজেই শুরুর জনরোষটা কেটে গেলে আবার ওরা সংগঠিত। পরিবার-পরিজনদের পরের লড়াইটা হয় একাকী। আর ওদের যত না পাওয়ার থাকে, এর চেয়ে বেশি হারানোর থাকে আসামিপক্ষের। মরিয়া চেষ্টায় ওরা সঙ্গে পায় সরকারি প্রশাসনের সমর্থন। বিচারব্যবস্থার ফাঁকটা বেরিয়ে যায়। তাই শেষ পর্যন্ত বিচার হলেও সে রকম দৃষ্টান্তমূলক আর সে রকম কিছু হয় না। কিন্তু যদি সুষ্ঠু বিচার হতোও তাতেও কি অবস্থা বদলাত?

জাভেদ ভাই বলল, ‘বদলাত না।’

‘কেন? বিচার হলে তো ভয় তৈরি হতো।’

‘প্রথমত, ঘটনার সময় যে আবেগ-উত্তেজনা থাকে বিচার যখন শেষ হয়, পাঁচ-সাত বছর পর, তত দিনে উত্তেজনা মিইয়ে আসে। ফলে সে রকম প্রতিক্রিয়া আর হয় না। তত দিনে সমাজ বাস্তবতা বদলে যায়, নতুন ধরনের ঘটনায় নতুন রকমের মেরুকরণ।’

‘তাহলে বিচার হবে না?’

‘বিচার হতে হবে। কিন্তু বিচার বিচার করে আমরা পুরো বিষয়টা বিচারমুখী করে ফেলাতে মূলে আর যাওয়া হয় না।’

‘আমরা আসলে কী চাই? চাই যেন এ রকম মৃত্যু না হয়। এ রকম মৃত্যু তখনই বন্ধ হবে, যখন এ রকম রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে হলে নির্যাতন-নিপীড়নের সংস্কৃতি বন্ধ হবে। এ রকম চলতে থাকলে এই মৃত্যু কোনো বিচার দিয়ে রোধ করা সম্ভব না। বিচার হতে হবে, কিন্তু বিচারই একমাত্র দাবি হওয়া উচিত নয়। বিচারের সঙ্গে সঙ্গে এই অপচর্চা বন্ধের দাবিও হওয়া উচিত।’

‘দাবি তো উঠে এসেছে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের।’

‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবি আগেও উঠেছে। কিন্তু আগে ভাবো সামাজিক অবক্ষয়ের কথা। ভাবো, দেশের সর্বোচ্চ মেধাবীদের বিদ্যাপীঠে কয়েকজন মেধাবী ছাত্র এতক্ষণ ধরে তাদেরই একজন সতীর্থকে পেটাল। রাজনীতির হিসাব বাদ দিয়ে মানুষের জায়গায় আসো। এমন নৃশংসতা পেশাদার খুনিদের ক্ষেত্রেও বিরল। জিনিসটা তাহলে এই জায়গায় গেল কিভাবে? আমাদের তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে আমাদের ধারণা প্রযুক্তির সুবাদে ওরা অনেক আধুনিক। ওদের ভালো-মন্দ ওরা খুব ভালো বোঝে। এই ভাবনা ভেবে আমরা ঠিক ওদের দিক থেকে অভিভাবকত্বের দৃষ্টিটা সরিয়ে নিয়েছি। ওদিকে পরিবার এবং সমাজে চলতে থাকা নীতিহীনতা তাদের অনৈতিকতায় উৎসাহ জোগায়। অভিভাবকরা ওদের সমঝে চলেন, ওরা চলে নিজেদের মতো। আর এই দিকনির্দেশনাহীন বল্গাহীনতা ওদের মানবিক বোধ থেকে এত দূরে সরিয়ে নিয়ে গেছে যে ভাবা যায়, একজন সতীর্থকে এমন নৃশংসভাবে পেটানোর পর ওরা খেলা দেখতে চলে যায় নির্বিকারভাবে।’

‘তা বুঝলাম, কিন্তু রাজনীতির সমীকরণটা তুমি বাদ দিতে পার না। যারা মেরেছে ওরা রাজনীতির শক্তির জোরেই মেরেছে।’

‘ঠিক এই অবক্ষয়ের জায়গাটায় মূল প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে রাজনীতি। একে এরা নতুন ধরনের মানসিকতার, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূত্রে পাওয়া সুযোগে জীবনমানের উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর। এই এককেন্দ্রিক মানসিকতার মধ্যে যারা যোগ দিয়েছে, রাজনীতিতে ওরা পেয়ে যায় যা খুশি তা করার শক্তি। মানবিক বোধ নেই। রাজনৈতিক শক্তি আছে। এদের কাছে মনুষ্যত্ব আশা করা যায় না।’

জাভেদ ভাই থামে। ওর কথা ধরে, যদি ছাত্ররাজনীতি করা তরুণদের কাছে মনুষ্যত্ব আশা না করা যায়, তাহলে এই ছাত্ররাজনীতির দরকারটা কী? ১৯৪৭-১৯৫২ এসবকে এখন অচল রেকর্ড মনে হয়। বর্তমান বাস্তবতায় এদের পোষার কোনো মানেই হয় না, যখন সরকারে থেকে অপকর্ম করে, বিপদের সময় বীরের মতো হাওয়া হয়ে যায়। দলের কোনো কাজে লাগে না, সমাজের কোনো কাজে লাগে না। খুন করে। সতীর্থকে পেটায়। এ কোন রাজনীতি! যে রাজনীতি নিজের বন্ধুদের ভালোবাসতে শেখায় না, নিজের প্রতিষ্ঠানকে রক্তরঞ্জিত করতে উৎসাহ দেয়, সেই রাজনীতির আসলে কোনো দরকারই নেই।

এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছে। সরকার বলছে, এটাও বিরাট একটা কৃতিত্ব। নিজের দলের অপরাধীকেও ওরা ক্ষমা করে না। ভালো; কিন্তু নিজের দলে থেকে যে এরা অপরাধ করেছিল এর কী হবে! এদের বিচার বা বহিষ্কার করাকেই সমাধান মনে করলে তো অপরাধ চলতেই থাকবে। অপরাধ কমানো বা থামানোর জন্য দরকার হলো দলের মধ্যে যেন অপরাধ করার সুযোগ না থাকে। সেই সুযোগ বন্ধ করতে হবে। অপরাধ করল, বের করলাম এবং হাত ধুয়ে ফেললাম—না, দিন দিন এটা ছেলেভোলানো গল্প হয়ে যাচ্ছে। এই দায় দলকে নিতে হবে। দলকে শুদ্ধ করতে হবে। ব্যক্তিকে বদলে নয়। সংস্কৃতি বদলে। চর্চা বদলে।

কিন্তু সেসব তো আর হওয়ার নয়। কিন্তু আন্দোলন-প্রতিবাদ খুব হচ্ছে। আগের দিন পুলিশকে ছাত্ররা বাধ্য করেছে সিসিটিভি ফুটেজ দেখাতে। পরদিন ভিসি এসে তো এমন তোপের মুখে পড়লেন যে ছাত্ররা তাঁর কোনো কথাই শুনতে রাজি নন।

এই বিদ্রোহ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ইশ! যে ছয় ঘণ্টা ওকে পেটানো হলো কিংবা প্রতি রাতে যখন টর্চার সেলে মারধর চলে, তখন যদি এর হাজার ভাগের এক ভাগও প্রতিবাদ হতো, তাহলেই...

সেই কথাটা আবার মনে পড়ে। আমাদের সব কিছুর জন্যই আসলে লাশ লাগে। জীবন আমাদের ঘুম পাড়িয়ে রাখে। মৃত্যু আমাদের জাগায়।

লেখক : সাংবাদিক, কথাসাহিত্যিক

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা