ছোটবেলা থেকে গল্প-কবিতা লেখেন শাহনেওয়াজ। সাহিত্যসভায় নিয়মিত হাজিরা দিতেন। কিন্তু সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। শেষে ভাবলেন ছবি তুলবেন। ছবি দিয়ে কবিতা লিখবেন, বলবেন গল্প। ২০০৪ সালে ভর্তি হন ফটো আর্ট ইনস্টিটিউটে। সে বছরই কোর্সের শেষ দিকে একটি নায়কন এক্স ৫৫ ক্যামেরা কিনলেন। ইনস্টিটিউটের পরিচালক আলোকচিত্রী শোয়েব ফারুকীকে নিয়ে দেখালেন। তাঁর কাছ থেকে শিখতে থাকলেন হাতে-কলমে। তোলা ছবি নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তাঁর ছবি পূর্ণতা পাচ্ছিল। প্রকৃতির ছবি তুলতে চাইতেন বেশি। ক্যামেরা নিয়ে ঘুরেছেন গ্রামে গ্রামে। সুন্দর একটি ছবির আশায় সাগর পাড়ে বসে থেকেছেন অনেক সময়। প্রথম প্রদর্শনী ২০১১ সালে চট্টগ্রাম শিল্পকলায় একটি দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে তাঁর দুটি ছবি স্থান পায়। ঈদে মিলাদুন্নবীর শোভাযাত্রার ছবি ছিল সেগুলো। প্রথম পুরস্কার সেটি ২০১২ সাল। ইউএনএফপিএ আয়োজিত নিরাপদ মাতৃত্ব শীর্ষক প্রতিযোগিতায় তাঁর তোলা ছবি পায় বিশেষ পুরস্কার। প্রাইজ মানি পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার টাকা। প্রথম বড় পুরস্কার বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পান ২০১৩ সালে। পুরস্কার ছিল এক লাখ ২৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি ফুজি ক্যামেরা। প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার গেল বছর ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের 'ফটোশেয়ার' আয়োজন করে 'নবম বার্ষিক ফটোশেয়ার প্রতিযোগিতা'। এতে তিনি পরিবেশ ক্যাটাগরিতে প্রথম পুরস্কার লাভ করনে। প্রাইজ মানি ছিল আড়াই শ মার্কিন ডলার। প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে ছবি প্রকাশ ব্রিটেনের দ্য সানডে টাইমস তাঁর ছবি প্রকাশ করে ২০১৪ সালের জুলাইয়ে। এরপর স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ফটোগ্রাফিক মিউজিয়াম অব হিউম্যানিটিতেও তাঁর ছবি প্রকাশিত হয়েছে। আশাহি শিম্বুন স্বর্ণপদক ও অন্যান্য গত বছর বিশ্বের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক জাপানের আশাহি শিম্বুন তাঁকে স্বর্ণপদক প্রদান করে। ইয়ান পেরি স্কলারশিপ (২০১৪), অ্যালেঙ্া ফাউন্ডেশন স্টুডেন্ট গ্র্যান্ট (২০১৫), অ্যানুয়াল ফটোশেয়ার ফটো কনটেস্ট (২০১৩), তৃতীয় আন্তর্জাতিক বুরসা ফটো ফেস্টিভাল অ্যাওয়ার্ডসহ (২০১৩) ১০টির বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জন্য ছবি তুলতে আগামী জুলাই মাসে ভারতে যাচ্ছেন শাহনেওয়াজ। শাহনেওয়াজের প্রিয় তিন আলোকচিত্রী হলেন-ফটোব্যাংক গ্যালারির পরিচালক শোয়েব ফারুকী, কাউন্টার ফটো ঢাকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল হক অমি ও দৃকের শহীদুল আলম। তিনি ফটো ডকুমেন্টারি করেন। বললেন, 'এ দিয়ে ধারাবাহিকভাবে মানুষের দুঃখগাথা তুলে ধরা যায়। সুখও তুলি, তবে আমাদের দেশের মানুষের কষ্টই বেশি।' তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি প্রথম। জন্মেছেন ১৯৮৪ সালের ২৪ জুন চট্টগ্রামের গোসাইলডাঙ্গায়। তাঁর তিনটি ছবি লাইফ ফ্লাওয়ার ইন দ্য ব্যারেন ল্যান্ড ২০১২ সালে কক্সবাজার জেলার পেকুয়ায় ছবিটি তুলেছেন। স্কুল থেকে ফিরে এসে কিছু ছেলেমেয়ে বিকেলে একটি জমিতে খেলছিল। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে তারা এ জমিতেই নাড়া কুড়িয়েছিল। অন্য রকম ভাবনা পেলাম। এ ছবিই ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি থেকে গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ড পায়। স্ম্যাশ ফ্রম দ্য গ্রেভ ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রামের আনোয়ারা জেলায় ছবিটি তুলেছিলেন শাহনেওয়াজ। ইটখোলায় ইট পোড়ানোর পর সেখানে ধূলি উড়তে থাকে। সেখান থেকে ইট মাথায় করে নিয়ে আসতে গেলেও শরীরে ধুলাবালি লেগে যায়। দেখলে মনে হয়, কবর থেকে লোক উঠে আসছে। ছবিটি ২০১৪ সালে ফটোশেয়ার ফটো কনটেস্টে পরিবেশ ক্যাটাগরিতে প্রথম হয়েছিল। ছবিটি প্রদর্শিত হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে। ফলেন স্টারস চার বছর ধরে শাহনেওয়াজ খান শিশুশ্রম নিয়ে ছবি তুলছেন। এসব শিশু দ্বীপাঞ্চলের। সিরিজটি করছেন তিনি এক বছর ধরে। সিএনএনের ফিচারটিতে তাঁর ফলেন স্টারস ছাপা হয়েছে।