১৯৮৯ সালে তিয়ানআনমেন স্কয়ারের হত্যাকাণ্ড নিয়ে চীন সরকারের ইতিহাস লুকোচুরি আবারও নতুন করে কৌতূহলের কেন্দ্রে আনল চীনের নতুন প্রজন্মকে। তিয়ানআনমেনের সেই ম্যসাকারের ইতিহাস রাষ্ট্রের সেন্সরের কোপে বই থেকে মুছে গেছে। তবে সেটি বেঁচে আছে গোপনে, টিকে আছে ফাইলের ভেতর, তালা দেওয়া আলমারিতে, আর কখনো কখনো ডিলিট বাটনের আশেপাশে। রাষ্ট্র যখন ভাবে, ‘এই ঘটনা মানুষ ভুলে যাক’ তখন মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্য সে পাঠ্যবই পাল্টায়, ইন্টারনেট ছেঁটে দেয়, শব্দ নিষিদ্ধ করে, ছবিকে অদৃশ্য করে। কিন্তু মুশকিল হলো, সত্য বিষয়টি বড় জেদি। তাকে যত চাপা দাও, সে তত নিত্যনতুন দরজা খুঁজে বের হয়।
১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের আন্দোলন চীনের আধুনিক ইতিহাসে এক বড় মোড়। ঘটনাটি শুরু হয়েছিল শোক দিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে এক বিশাল গণ-আন্দোলন। ১৯৮৯ সালের ১৫ এপ্রিলচীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা হু ইয়াওবাং মারা যান। তিনি দলের ভেতরে তুলনামূলক উদারপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেক ছাত্র ও তরুণ তাঁকে পরিবর্তনের আশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখত। তাঁর মৃত্যুর পর বেইজিংয়ের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে ছাত্ররা জড়ো হতে শুরু করে। প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল শ্রদ্ধা জানানো। কিন্তু রাষ্ট্রে যখন জমে থাকা অসন্তোষ থাকে, তখন শোকসভাও কখনো কখনো দাবির সভা হয়ে যায়। হয়েছিলও তাই। ছাত্রদের দাবিগুলো অযৌক্তিক বা অন্যায্য ছিল না। তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চেয়েছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চেয়েছিল। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা চেয়েছিল। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কিছুটা খোলামেলা ভাব চেয়েছিল। আন্দোলন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষও এতে যুক্ত হন। মে মাসে ছাত্রদের অনশন আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তোলে। সেই সময় সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভ চীন সফরে ছিলেন। ফলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের চোখও তখন বেইজিংয়ের দিকে ছিল।
চীনা সরকার শুরুতে দ্বিধায় থাকলেও পরে আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালের ২০ মে বেইজিংয়ে সামরিক আইন জারি করা হয়। এরপর ৩ জুন রাত থেকে ৪ জুন ভোর পর্যন্ত সেনাবাহিনী তিয়ানআনমেন স্কয়ার এবং আশপাশের এলাকায় অভিযান চালায়। ট্যাংক ও সশস্ত্র সেনা শহরে প্রবেশ করে। আন্দোলন দমন করা হয় কঠোর শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। বহু মানুষ নিহত ও আহত হন। মৃত্যুর সঠিক সংখ্যা আজও নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রে কয়েক শ থেকে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। চীনা সরকার পরে এই ঘটনার আলোচনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। মূল ভূখণ্ড চীনে তিয়ানআনমেন প্রসঙ্গ আজও অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সেন্সরে ঘেরা বিষয়।
এই নির্মম ইতিহাসের মধ্যে সবচেয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন অচেনা একজন মানুষ। পৃথিবী তাঁকে চেনে ‘ট্যাংকম্যান’ নামে। ১৯৮৯ সালের ৫ জুন দমন অভিযানের পরের দিন, বেইজিংয়ের চাংআন এভিনিউতে ট্যাংকের একটি সারি এগিয়ে যাচ্ছিল। সেই সময় সাদা শার্ট পরা এক সাধারণ মানুষ, হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে, ট্যাংকের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি নেতা ছিলেন না। তাঁর হাতে কোনো মাইক্রোফোন ছিল না। তাঁর পেছনে কোনো বাহিনী ছিল না। তিনি কোনো বড় বক্তৃতাও দেননি। তিনি শুধু দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে কখনও কখনও দাঁড়িয়ে থাকাটাই সবচেয়ে বড় কথা হয়ে যায়। ট্যাংকগুলো তাঁকে পাশ কাটাতে চাইলে তিনিও সরে গিয়ে আবার সামনে দাঁড়ান। একজন মানুষ বনাম রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানোর দৃশ্যটি ছিল অবিশ্বাস্য। ট্যাংক থেমে যায়। অল্প সময়ের জন্য হলেও এক সাধারণ নাগরিক যুদ্ধযন্ত্রের গতি আটকে দেন। তাঁর পরিচয় আজও জানা যায়নি। তাঁর পরিণতি নিয়েও নিশ্চিত তথ্য নেই।
তিয়ানআনমেন হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ইতিহাস। কিন্তু নাম না জানা সেই ট্যাংক ম্যান ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করেছেন। তিনি দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতার সামনে প্রতিবাদ সব সময় মিছিল করে আসে না। কখনও তা আসে একা, হাতে বাজারের ব্যাগ নিয়ে, রাস্তার মাঝখানে নীরবে দাঁড়িয়ে।
১৯৮৯ সালের ৩ ও ৪ জুন ‘তিয়ানআনমেন স্কয়ার হত্যাকাণ্ড’র প্রায় কোনো অস্তিত্বই নেই চীনের সরকারি ভাষায়। আর সাধারণ মানুষের স্মৃতিতেও জায়গা ক্রমশ সংকুচিত। অথচ সেই ইতিহাসই এখন নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরে আসছে বিচিত্র পথে। কখনো এক অলিম্পিক চ্যাম্পিয়নের বাবার গল্পে, কখনো লাইভস্ট্রিমের হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া পর্দায়, কখনো কোনো শিক্ষকের বন্ধ দরজার ভেতরকার নীরব পাঠে।
চীনা কর্তৃপক্ষ বহু বছর ধরে তিয়ানআনমেনের গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন ও দমন-পীড়নের স্মৃতি মুছে দিতে সচেষ্ট। এখন সেই কাজে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও। ইন্টারনেটে কোনো শব্দ, ছবি বা ইঙ্গিত যদি ৪ জুনের স্মৃতির দিকে একটু আঙুল তোলে, সঙ্গে সঙ্গে সেটি অদৃশ্য হয়ে যায়। যেন ইতিহাস নয়, চোরাবালি। তবু কৌতূহল বলে একটি জিনিস আছে, যাকে সেন্সর করা কঠিন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ফিগার স্কেটার অ্যালিসা লিউ মিলানে অলিম্পিকে স্বর্ণজয় করলে চীনা সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বাবাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। অ্যালিসার বাবা আর্থার লিউ ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। পরে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। চীনা সামাজিক মাধ্যমে কেউ তাকে বলল বিশ্বাসঘাতক, কেউ বলল সংগ্রামী বাবা। কিন্তু ফিগার স্কেটার অ্যালিসা লিউ-এর বাবাকে নিয়ে তরুণদের একটি অংশের মাথায় প্রশ্ন ঢুকে গেল ‘লোকটি আসলে কী করেছিলেন?
প্রশ্নটাই বিপজ্জনক। কারণ প্রশ্নের নিজের পা আছে। সে হাঁটতে হাঁটতে ইতিহাসের কাছে চলে যায়।
চীনের নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম রেডনোটে একজন জানতে চেয়েছিলেন, আর্থার লিউ এত বিতর্কিত কেন। উহানের ২০ বছর বয়সী এক কলেজছাত্রী অন্যদের তার অতীত খুঁজে দেখতে বলেন। পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মন্তব্যটি মুছে যায়। অথচ তিনি সরাসরি ‘৪ জুন’ কথাটিও লেখেননি। আজকাল না বলা কথারও বিপদ আছে। চীনে নীরবতারও সাবটাইটেলও পড়ে ফেলা হয়।
থ্রেডসে এক চীনা ব্যবহারকারী আর্থার লিউ সম্পর্কে পড়ে খোঁজ করতে শুরু করেন। পরে লেখেন, তিনি বিস্মিত; এত বড় একটি আন্দোলনের কথা তাঁর জানা ছিল না। এটাই সেন্সরশিপের অদ্ভুত ব্যর্থতা। যে দরজা বন্ধ করা হয়, মানুষ আগে সেই দরজাতেই কড়া নাড়ে।
বিশ্লেষকেরা বলেন, তিয়ানআনমেন নিয়ে অতিরিক্ত সেন্সরশিপ উল্টো কৌতূহল বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। প্রযুক্তি দিয়ে নজরদারি যতই নিখুঁত করা হোক, মানুষের প্রশ্ন করার অভ্যাসকে পুরোপুরি থামানো যায় না। বিশেষ করে যখন রাজনীতি ঢুকে পড়ে বিনোদনের ভেতর। একটি অলিম্পিক পদক, একটি আইসক্রিম কেক, একটি লাইভস্ট্রিম- হঠাৎ সেগুলো ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়।
চীনের পাঠ্যবইয়ে বা শ্রেণিকক্ষে এই ঘটনা প্রায় নেই। কোথাও থাকলেও তা ‘রাজনৈতিক অস্থিরতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেন ছাত্রদের প্রশ্ন ছিল না, মানুষের স্বপ্ন ছিল না, শুধু বাইরের ষড়যন্ত্র ছিল। ইতিহাসকে যখন রাষ্ট্র নিজের ভাষায় লিখতে চায়, তখন মানুষের মুখ থেকে শব্দ কেড়ে নেওয়া হয়।
তিয়ানআনমেন স্কয়ারে হত্যাকাণ্ড নিয়ে হংকং একসময় ছিল স্মরণের জায়গা। ভিক্টোরিয়া পার্কে মোমবাতি জ্বলত, মানুষ নীরবে দাঁড়াত। কিন্তু ২০২০ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইনের পর সেই পরিসরও বন্ধ হয়ে গেছে। স্মরণসভা নেই, জাদুঘর নেই, প্রকাশ্য আলোচনা নেই। যে জায়গায় শোক ছিল, সেখানে এখন দেশপ্রেমের বাজার বসে। ইতিহাসের ওপর পসরা সাজানোর এও এক অভিনব পদ্ধতি।
তবু কিছু গল্প থেকে যায়। ২০২২ সালের ৩ জুন চীনের এক কিশোরী জনপ্রিয় লাইভস্ট্রিমার লি জিয়াচির অনুষ্ঠান দেখছিল। সেখানে ট্যাংকের আকৃতির একটি আইসক্রিম কেক দেখানোর পর অনুষ্ঠানটি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কেন বন্ধ হলো? এই সামান্য প্রশ্ন থেকেই সে উত্তর খুঁজতে শুরু করে। ফায়ারওয়াল পেরিয়ে জানতে পারে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারে কথা। পরে সে জানায়, সত্য জানার পর তার দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ভেঙে পড়েছিল।
এই ভাঙন শুধু রাজনৈতিক নয়; ব্যক্তিগতও। যে রাষ্ট্রকে তুমি শৈশব থেকে একরকম চিনেছ, হঠাৎ দেখলে তার আয়নায় অন্য মুখ। তখন মানুষ শুধু ইতিহাস শেখে না, নিজেকেও নতুন করে পড়তে শুরু করে।
মলি নামের আরেক তরুণী হাইস্কুলে পড়ার সময় তিয়ানআনমেনের কথা জানতে পারেন। তার ইতিহাস শিক্ষক দরজা বন্ধ করে ঘটনাটি বলেছিলেন। দরজা বন্ধ করে ইতিহাস শেখানো এর চেয়ে করুণ দৃশ্য আর কী হতে পারে! যে সত্য শ্রেণিকক্ষে উচ্চস্বরে বলা যায় না, সে সত্য ছাত্রদের মনে আরও গভীরে গিয়ে বসে।
আজ অ্যালিসা লিউকে ঘিরে সেই ইতিহাস আবার কিছু তরুণের সামনে আসছে। তারা কী করবে? কেউ হয়তো পুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে ধরবে। কেউ হয়তো প্রশ্ন করবে। কেউ হয়তো চুপ থাকবে, কিন্তু মনে রাখবে।
রাষ্ট্র অনেক কিছু পারে। বই বদলাতে পারে, পোস্ট মুছে দিতে পারে, সার্চ ফলাফল লুকিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু মানুষের কৌতূহলকে পুরোপুরি বন্দি করা কঠিন। কারণ সত্যেরও একধরনের অভ্যাস আছে। সে কখনো খবরের ভেতর আসে, কখনো ক্রীড়ার ভেতর, কখনো কেকের আকৃতিতে, কখনো কোনো তরুণীর বিস্মিত চোখে।
তিয়ানআনমেন তাই শুধু একটি স্কয়ার নয়। এটি স্মৃতি বনাম বিস্মৃতির লড়াই। রাষ্ট্র বলছে, ‘ভুলে যাও।’ ইতিহাস বলছে, ‘একটু খুঁজে দেখো।’ আর তরুণরা ধীরে ধীরে, ফিসফিস করে হলেও সেই খোঁজ শুরু করেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে অনূদিত