সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে বাড়ছে মতবিরোধ। ঠিক এমন সময়ে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালানের অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। দেশটির ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ গোয়েন্দা কার্যক্রমের তীব্রতায় এখন নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরে। ফলে তেলআবিবের এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বা পাল্টা গোয়েন্দা ঝুঁকির মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে পেন্টাগন।
ইরান ও লেবানন যুদ্ধকে ঘিরে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজ বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানিয়েছে, পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) সম্প্রতি ইসরায়েলের হুমকির মাত্রা ‘উচ্চ’ থেকে ‘সংকটজনক’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আঞ্চলিক সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবেদনশীল নীতিনির্ধারণী আলোচনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গোয়েন্দা তৎপরতা
গালফ নিউজ বলছে, সাত পৃষ্ঠার একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এমন কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, ইসরায়েলের কিছু গোয়েন্দা তৎপরতা মিত্র দেশের মধ্যে সাধারণত যে মাত্রার গোয়েন্দা কার্যক্রম দেখা যায়, তার চেয়েও বেশি আক্রমণাত্মক ছিল।
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ইরান-সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের নীতিবিষয়ক প্রধান এলব্রিজ কোলবি এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাইকেল ডিমিনো সম্ভাব্য নজরদারির লক্ষ্যবস্তু হতে পারেন বলে ধারণা করা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্বেগ
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (ডিআইএ) এক পর্যালোচনায় কয়েকটি কথিত গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েলে অবস্থানরত মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মীরা তাদের ডিভাইসে যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম সফটওয়্যার শনাক্ত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া অতীতের আরো কিছু ঘটনাকে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ইসরায়েলের আক্রমণাত্মক গোয়েন্দা তৎপরতার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বর্তমান প্রশাসনের সময়ে ইসরায়েলের গোয়েন্দা কার্যক্রমের তীব্রতা ছিল ‘নিয়ন্ত্রণহীন’।
পোলার্ডকাণ্ড
এই অভিযোগ নতুন করে ১৯৮৫ সালের বহুল আলোচিত ‘জনাথন পোলার্ড’ গুপ্তচরবৃত্তি কেলেঙ্কারির স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে। মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিশ্লেষক পোলার্ড ইসরায়েলের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং পরে ৩০ বছর কারাভোগ করেন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় গুপ্তচরবৃত্তি কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এনবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুমকির মাত্রা বাড়ানো হলেও দুই দেশের মধ্যে চলমান গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এখনো বন্ধ করা হয়নি। বরং মার্কিন কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার
তবে এসব অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে হোয়াইট হাউস ও ইসরায়েল। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘পুরো প্রতিবেদনটি মিথ্যা এবং এমন একজন সূত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যার প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই।’
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসও একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইসরায়েল কোনো মার্কিন প্রতিষ্ঠান বা সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে না। আমাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়, মিত্রদের বিরুদ্ধে নয়।’
সম্পর্কের নতুন উত্তেজনা
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। ঠিক এরই মধ্যে এমন অভিযোগগুলো সামনে এসেছে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ট্রাম্প যেখানে ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতার জন্য কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেখানে নেতানিয়াহু আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ, ইরানের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত হামলা এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সম্প্রতি লেবানন ইস্যুতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তপ্ত ফোনালাপের বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও দুই নেতা একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক ইরান ও লেবানন ইস্যুতে দুই মিত্র দেশের অবস্থান যত ভিন্নমুখী হচ্ছে, গোয়েন্দাসংক্রান্ত অবিশ্বাসও ততই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন উত্তেজনার কারণ হয়ে উঠছে।