প্রতিবছরই বর্ষা আসে, বর্ষা যায়। কিন্তু যায় না রাজধানী ঢাকাবাসীর দুর্ভোগ। অল্প বৃষ্টিতেও নগরের অব্যবস্থাপনার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সড়কে জলাবদ্ধতা, গণপরিবহনের সংকট, আশ্রয় নেওয়ার মতো যাত্রীছাউনির অভাব, ভাঙাচোরা ও কাদাময় ফুটপাত—সব মিলিয়ে বর্ষা যেন রাজধানীবাসীর জন্য প্রতিবছরের পুনরাবৃত্ত এক দুর্ভোগের নাম।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ জুলাই থেকে সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও বঙ্গোপসাগরের নিম্নচাপের প্রভাবে রাজধানীতে দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। গতকাল রবিবারও ছিল একই চিত্র। জীবিকার তাগিদে বৃষ্টির মধ্যেই নগরবাসীকে ঘর থেকে বের হতে হয়েছে। তবে পথে নেমেই তাদের পড়তে হয়েছে একের পর এক ভোগান্তিতে। সড়কের জমা পানি মাড়িয়ে বাসে ওঠা-নামা, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা আর গাদাগাদি করে যাতায়াত যেন নগরজীবনের অবধারিত বাস্তবতা।
গতকাল সকাল থেকে রাজধানীর মিরপুর, কারওয়ান বাজার, প্রগতি সরণিসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কর্মজীবী মানুষ ছাতা হাতে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আশপাশের দোকানের ছাউনির নিচে। কারণ অনেক স্থানে যাত্রীছাউনি নেই। যেখানে আছে, সেগুলোর অনেকটাই হকার, চা ও সিগারেটের দোকানের দখলে। ফলে বৃষ্টির সময় যাত্রীদের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকে না। কোনো মতে দাঁড়ালেও বৃষ্টির পানি থেকে রেহাই মেলে না।
বৃষ্টি শুরু হলেই গণপরিবহন সংকট আরো প্রকট হয়ে ওঠে। বাস সড়কে কম নামে। ফলে যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বাস এলেও সড়কের মাঝখানে কিংবা জমে থাকা পানির মধ্যেই থামে। বাধ্য হয়ে যাত্রীদের কাদাপানি মাড়িয়ে বাসে ওঠা-নামা করতে হয়। বাসের ভেতরেও নেই স্বস্তি। অনেক বাসের জানালা ভাঙা থাকায় বৃষ্টির পানি ভেতরে ঢুকে যাত্রীদের ভিজিয়ে দেয়। ভেজা আসন, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতার মধ্যেই দীর্ঘ সময় যাতায়াত করতে হয়। কোথাও কোথাও তীব্র যানজট সেই দুর্ভোগকে আরো বাড়িয়ে তোলে।
বৃষ্টির দিনে ফুটপাত দিয়ে হাঁটাও আরেক ‘যুদ্ধ’। রাজধানীর অনেক ফুটপাতই ভাঙাচোরা। কোথাও পানি জমে থাকে, কোথাও দোকানের মালপত্র, হকারের স্টল কিংবা নির্মাণসামগ্রী পথচারীদের চলাচলের জায়গা দখল করে রেখেছে। অনেককেই সড়কে নেমে হাঁটতে হয়। অনেক সময় চলন্ত যানবাহনের নোংরা পানি গায়ে লাগে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা। শিশুদের স্কুলে নেওয়া কিংবা কর্মজীবী নারীদের অফিসে পৌঁছাতে বারবার কাদাপানি মাড়াতে হয়। মিরপুর-১১ নম্বরে বাসের জন্য অপেক্ষারত যাত্রী নুর ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি দুর্ভোগ সৃষ্টি করে না, দুর্ভোগের কারণ এই শহরের অব্যবস্থাপনা। বাস নেই, দাঁড়ানোর জায়গা নেই, হাঁটার মতো ফুটপাত নেই। ড্রেনগুলো ঠিকমতো কাজ করে না। এসব সমস্যার সমাধান না হলে প্রতিবছরই বৃষ্টি হবে, আর মানুষ একই ভোগান্তিতে পড়বে।’
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘যেহেতু বৃষ্টিতে বের হতে হয়, সেহেতু আমার পরামর্শ থাকবে যতটা সম্ভব দ্রুত শরীর মুছে ফেলা। চলাচলে রেইনকোট ব্যবহার সবচেয়ে কার্যকর। অন্যথায় শ্বাসকষ্ট, এজমাসহ নানা সমস্যায় ভুগতে হতে পারে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘বৃষ্টির পানিকে আমরা সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে পারিনি; বরং সেটিকে ভোগান্তির কারণ বানিয়েছি। শুধু কৃত্রিম ড্রেন নির্মাণ করে এ সমস্যার সমাধান হবে না। নগরকে এমনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটিতে শোষিত হয়, খাল-জলাশয়ে পৌঁছাতে পারে। বর্ষা মৌসুমে অপ্রয়োজনীয় সড়ক খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ রাখা এবং কার্যকর, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।’