স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনবিধিতে বড় পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ লক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় দ্বৈত নাগরিকত্ব, ঋণখেলাপি, ঋণের জামিনদার, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগ দাখিল হলে অভিযুক্তরা যেন নির্বাচনে অংশ না নিতে পারেন, স্থানীয় সরকার আইনে এমন বিধান করতে চায় কমিশন। এ ছাড়া আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনীকে যুক্ত করা ও নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে কেবল বিচার বিভাগের কর্মকর্তারা যেন থাকেন, সেই সুপারিশ করতে যাচ্ছে ইসি। গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
ইসির একটি সূত্র জানায়, আজ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনবিধির পর্যালোচনা সংক্রান্তে কমিশন সভা অনুষ্ঠিত হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী বিধিমালা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে কোন কোন বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। এ ছাড়া সভায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আচরণবিধি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মঙ্গলবার (আজ) কমিশন সভায় স্থানীয় সরকারের আইনবিধিসংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করে ফেলব। এসব নিয়ে অনেক দিন থেকে কাজ করা হচ্ছে। আইনবিধি সংস্কারের সুপারিশ চূড়ান্ত করে দ্রুতই আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এটা সময়ের ব্যাপার। সে জন্য, আচরণ বিধিমালার আগে আমরা এটা চূড়ান্ত করতে চাই। আচরণ বিধিমালাও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে আছে। দ্রুতই সব ঠিক করা হবে।’
কমিশন সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) অভিযোগ গ্রহণ অভিযুক্তরা প্রার্থী হতে পারবেন না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০সি ধারায় এটি উল্লেখ রয়েছে। তবে এই বিধান স্থানীয় সরকার আইনে যুক্ত করা হয়নি। কমিশন এই বিধানটি যুক্ত করতে চাচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গ্রহণ হলে কেউ মেয়র, চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর বা সদস্য পদে নির্বাচন করতে পারবেন না। তবে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি বা খালাস পেলে সেই অযোগ্যতা আর থাকবে না। শাস্তি পেলে নির্বাচনে অযোগ্য থাকতে হবে আজীবন। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইনে (আরপিও) এই বিধান যুক্ত করা হয়েছিল।
সূত্র জানায়, কমিশন মনে করে, যারা অন্য দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে, তারা এ দেশের জনপ্রতিনিধি হওয়ার উপযুক্ত নন। এ ছাড়া সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না। ওই কারণ দেখিয়ে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁরা যাতে প্রার্থী হতে না পারেন, ওই বিধান যুক্ত করতে সরকারকে সুপারিশ করতে যাচ্ছে ইসি।
এ ছাড়া স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সার্বক্ষণিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার চিন্তা করছে কমিশন। এ জন্য প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সংক্রান্ত স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের ধারা ২৩(১), স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইনের ধারা ১৯(ঙ), স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইনের ধারা ৯(ঙ), উপজেলা পরিষদ আইনের ধারা ৮(ঙ) এবং জেলা পরিষদ আইনের ধারা ৬(ঙ) এ সংশোধনী প্রয়োজন হবে। এতে ‘প্রজাতন্ত্রের পরিষদের বা কোনো সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষের কর্মে কোনো লাভজনক পদে বা কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন’ শব্দগুলো যুক্ত করার প্রস্তাব করার পরিকল্পনা নিয়েছে ইসি। এই সংশোধনী এলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত লাখ শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার আইনগুলোতে নির্বাচনের সময় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংজ্ঞায় রাখার প্রস্তাব করা হবে। যেন প্রয়োজন পড়লে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড ও আনসারের মতো তাঁদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
তিনি আরো বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপিসংক্রান্ত আইনে অনেক অস্পষ্টতা রয়েছে। অতীতে আইনের মারপ্যাঁচে সংসদ নির্বাচনে ঋণখেলাপিরাও প্রার্থী হতে পেরেছেন। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের আইনে স্পষ্ট করে বলা আছে ঋণগ্রহীতা ও জামিনদারের কথা। সুতরাং স্থানীয় নির্বাচনে ঋণখেলাপির সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি বা জামিনদার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। এ ব্যাপারে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট। নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের প্রতিনিধি থাকেন। আমরা প্রস্তাব করেছি, এখানে শুধু বিচার বিভাগের একজন বিচারক থাকবেন।’
নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে এই কমিশনার বলেন, ‘আমরা অক্টোবরে নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। প্রথমে ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার ভোট হবে। বন্যাসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে।
এদিকে ইসির ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের রোডম্যাপে উল্লেখ রয়েছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের আগে ২৮৯টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছরে তিন হাজার ৯৮১টি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১১০টি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মামলা, সীমানা-জটিলতাসহ নানা কারণে দীর্ঘদিন ধরে ১০৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হয়নি। দেশে মোট ইউনিয়ন পরিষদ চার হাজার ৫৮০টি। এর মধ্যে চলতি বছরেই তিন হাজার ৯৮১টি নির্বাচন উপযোগী হবে। বাকিগুলো ২০২৭ ও ২০২৮ সালের দিকে নির্বাচন উপযোগী হবে।

