প্রশ্ন : আপনার জীবনে কিশোর ফুটবল লিগ বিস্তৃত জায়গাজুড়ে আছে। এই গল্পটা দিয়ে শুরু করি। আরমান : নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে ঢাকায় কিশোর লিগের একটা অন্য রকম উন্মাদনা ছিল। এটা মূলত বাচ্চাদের ফুটবল লিগ, নির্দিষ্ট মাপের বাচ্চারা খেলত। পাড়ায় ফুটবল খেলতাম সমবয়সীদের সঙ্গে। আমার বাড়ি পুরান ঢাকায়, কিন্তু এতই ছোট ছিলাম যে পাকিস্তান মাঠে খেলতে যাওয়ার সাহস হতো না। কোন বছর কিশোর লিগ খেলেছি মনে নেই, তবে এটা আমার স্বপ্নের জগৎ ছিল। আমার কাছে ফুটবলের শেষকথা ছিল এটা, এখানে খেলতে পারলেই জীবন সার্থক। আউটার স্টেডিয়ামে এটা হতো, হকি স্টেডিয়ামের পাশে তাদের অফিস ছিল। এই অফিসটাকে মনে হতো ফুটবল আয়োজনের সর্বশ্রেষ্ঠ জায়গা। আমি বোধ হয় দুই বছর খেলেছিলাম, এই লিগে আলফাজসহ আমাদের বয়সের অনেকে ফুটবল খেলেছে। বলা যায়, এই লিগ খেলার পর পর আমার ফুটবলার হওয়ার বাসনা তীব্র হয়। তবে ফুটবলার হয়ে কিসে মোক্ষলাভ হবে, কোন পর্যন্ত গেলে বড় ফুটবলার হিসেবে নাকডাক হবে- সেসব বোঝার মতো বয়সই হয়নি, অন্যদের তুলনায় ছোট ছিলাম আমি। সত্যি বললে খেলার আনন্দটা উপভোগ করেছি কিশোর লিগে। প্রশ্ন : তাহলে মা-বাবার এক রকম সম্মতি ছিল ফুটবল খেলায়। আরমান : আমার জন্মের সাত মাস পর বাবা মারা যান, মা-ই ছিলেন আমার সব। যত আবদার তাঁর কাছেই। সমবয়সীদের সঙ্গে এলাকায় সারা দিন ফুটবল খেলে বেড়াতাম, তেমন কোনো আপত্তি করতেন না মা। আমাদের এলাকায় গোলাপ ভাই নামের এক ফুটবলপাগল স্থানীয় সংগঠক ছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় খেলার জন্য তিনি খেলোয়াড়দের সংগঠিত করতেন। একদিন তিনি বললেন, আমাদের শেরপুরে খেলতে যেতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে আমি রাজি। কিন্তু তিনি বললেন, এটা অনেক দূর, এক রাত থাকতেব হবে, বাসা থেকে অনুমতি নিতে হবে। তাঁকে আশ্বস্ত করলাম নিয়ে নেব বলে। প্রশ্ন : এটা কোন সময়ের গল্প, অর্থাৎ আপনার বয়স কত তখন? আরমান : নয়-দশ বছর হবে হয়তো। তবে এটুকু মনে আছে, এলাকার পানির কলে গোসল করে আমি কাপড়চোপড় ছাড়াই দৌড়ে বাড়ি চলে যেতাম। অর্থাৎ এত ছোট ছিলাম যে আমার ভেতর তখনো ন্যাংটা থাকার লজ্জাবোধও তৈরি হয়নি। সেই সময়ে শেরপুরে ফুটবল খেলতে যাওয়ার গল্প এটা। প্রশ্ন : তারপর? আরমান : বাড়িতে বললাম, আমার শেরপুরে খেলা আছে। মা বললেন, এটা নতুন কিছু নয়। তিনিও ভেবেছিলেন শেরপুর আশপাশে কোথাও হবে। কিন্তু রাত কাটানোর কথা কিভাবে বলব! একটা হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট প্যাকেটে ভরে বাসা থেকে দৌড়ে বেরিয়ে পড়লাম রাতে ফিরব না বলে। মা আটকানোর চেষ্টা করেও পারেননি। কিন্তু খুব ভালো খেলে আমরা ফাইনালে উঠলাম, ফাইনাল খেলতে হলে আরো এক রাত শেরপুরে থাকতে হবে। মায়ের কথা ভেবে ভয় লাগছে, তার পরও থেকে গেলাম। চ্যাম্পিয়ন হলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে তৃতীয় রাতের একটা-দেড়টা। গোলাপ ভাই বাসার গলির সামনে আমাকে ছেড়ে দিলেন। এটা সরু গলি, কিছুদূর গিয়ে আবার বেঁকে গেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আমি কয়েক কদম গিয়ে ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাই। মনে হয়েছিল, গলির মাঝখানে কেউ যেন দাঁড়িয়ে আছে। বারবার এগিয়ে-পিছিয়ে যাচ্ছিলাম। একসময় ডাক শুনলাম, 'আরমান, আয়।' আমার মায়ের গলা। জিজ্ঞেস করলাম, 'এত রাতে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন?' মা বললেন, 'দুই রাত এই গলিতে তোর জন্য অপেক্ষা করে কাটিয়েছি।' মায়ের এত দুশ্চিন্তা, সেটা বোঝারও বয়স হয়নি তখন। বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন সকালে টের পেলাম মায়ের রাগ-ক্ষোভ, ঘুম ভাঙার পর দেড় ঘণ্টা ধরে মেরেছেন আমাকে। এই হলো ঢাকার বাইরে গিয়ে প্রথম ফুটবল খেলার গল্প। প্রশ্ন : কিশোর লিগ থেকে পাইওনিয়ার, তারপর তৃতীয় বিভাগ। ফুটবল খেলে প্রথম আয় কখন? আরমান : এর আগে একটু বুট পায়ে খেলার গল্পটা বলি। কিশোর লিগের পর এলাকার দলে পাইওনিয়ার খেলতে হবে। বুট পায়ে খেলতে হবে, কিন্তু বুট কেনার টাকা নেই। আমার দুলাভাই উপহার দিয়েছিলেন এক জোড়া বুট। মুশকিল হলো, প্র্যাকটিসে বুট পায়ে শটই নিতে পারি না। শঙ্কায় পড়ে গেলাম, বুট পায়ে খেলা হবে না। এই টেনশনে আমার ঘুম হয় না, পাঁচ-ছয় দিনেও আমার কোনো উন্নতি নেই। আল্লাহর কী ইচ্ছা জানি না, অষ্টম দিনে হঠাৎ আমার সব কিছুই ঠিক হয়ে গেছে। বুটে দারুণ শট হচ্ছে, বলের নিয়ন্ত্রণ থাকছে ভালোভাবে। পাইওনিয়ার লিগ খেলে বেশ নামডাক হয়েছে, সেই সুবাদে বাংলাদেশ স্পোর্টিং ক্লাব তৃতীয় বিভাগে খেলার জন্য আমাকে প্রস্তাব দিল। বিনিময়ে ২৫ হাজার টাকা দেবে। আমি খুশিতে আটখানা। ইস্কাটন সবুজ সংঘের কোচ বাবুল ভাই খুব স্নেহ করতেন আমাকে, টাকার প্রস্তাবের কথা শুনে তিনি খারিজ করে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে। তিনি বললেন সোজা ইস্কাটনে লর্ডস হোটেলে গিয়ে উঠতে। এত টাকা বাদ দিয়ে আমাকে ইস্কাটন সবুজ সংঘে খেলার কথা বলছেন এই ভদ্রলোক! মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। যা হোক, '৮৮ সালে বিনা পয়সায় শুরু করি তৃতীয় বিভাগ ফুটবল এবং চ্যাম্পিয়ন হয় ইস্কাটন। এর পরপরই ঈদ ছিল। বাসার ঠিকানায় একদিন একটা খাম পৌঁছাল, খুলে দেখি ২০০ টাকা। সবুজ সংঘের ঈদ উপহার। এই হলো ফুটবল খেলে আমার প্রথম আয়। প্রশ্ন : তখনো কী ওই ২৫ হাজার টাকার আফসোস ছিল মনে? আরমান : সবুজ সংঘে খেলতে খেলতে সেই আফসোস উধাও হয়ে গেছে। এ রকম অর্থের মায়া আমি ক্যারিয়ারে অনেকবার ত্যাগ করেছি। অর্থ ত্যাগ করে জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলাম। ওই যে গোলাপ ভাই, বাবুল ভাইদের মতো কোচ-সংগঠক অনেক ছিলেন ঢাকার ফুটবলে, যাঁরা উঠতি ফুটবলারদের সঠিক পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন। ওই ২৫ হাজার টাকার চক্করে পড়লে হয়তো বা আমার আজকের অবস্থানও তৈরি হতো না। এরপর কিন্তু বিআরটিসির মরহুম ইউসুফ ভাই আড়াই লাখ টাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেটাও বাবুল ভাই নাকচ করে দিয়েছিলেন। তখন হয়তো খারাপ লেগেছিল, তবে আখেরে লাভ হয়েছে। বড় কিছু পেতে গেলে যে ছোট মোহ ত্যাগ করতে হয়, এটা বোধ হয় তা-ই। প্রশ্ন : ইস্কাটন সবুজ সংঘ টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম বিভাগে উঠেছিল। আরমান : হ্যাঁ। দ্বিতীয় বিভাগে খেলার সময়ই ভালো খেলোয়াড় হিসেবে আমার নাম হয়ে গেল। মাঝমাঠে আমার খেলা নাকি সবার চোখে পড়েছে। তখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দলে খেলেছি কোচ হাসানুজ্জামান বাবলু ভাইয়ের অধীনে। আমার নেতৃত্বে রাজশাহীতে গিয়ে এএফসির টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আগে টানা চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাদার্স ইউনিয়ন প্রথম বিভাগে উঠেই আবাহনীকে হারিয়েছিল। আমরা এভাবে প্রথম বিভাগে উঠে সেই ব্রাদার্সকে হারিয়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলাম। মোহামেডানের বিপক্ষে লিড নিয়েও রেফারির বদান্যতায় তারা জিতে গেছে। এই দলটা তৃতীয় বিভাগ থেকে একসঙ্গে খেলছে বলেই পারস্পরিক সমন্বয়টা দুর্দান্ত ছিল। আর সবার মধ্যে ছিল সাহস। এর মধ্যে আমরা বিভিন্ন প্রীতি ম্যাচে জাতীয় দলের ফুটবলারদের সঙ্গে খেলে দুঃসাহসী হয়ে উঠেছিলাম। প্রশ্ন : আপনি ছোটবেলা থেকেই তো রাইট উইংয়ে খেলতেন। পজিশন পাল্টে কিভাবে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হয়েছেন? আরমান : এত ছোট বয়সে খেলা শুরু করেছিলাম যে আমি মাঠের পজিশনগুলোও চিনতাম না। যখন পাইওনিয়ার খেলি, তখনো চিনি না। নাম জানতাম শুধু দুই পজিশনের- রাইট উইং আর স্ট্রাইকার। পাইওনিয়ার খেলার পর কিছুদিন এলাকার ফুটবলাররা মিলে সকালে জগন্নাথ হল মাঠে প্র্যাকটিস করতাম। করাতেন মালা ভাইয়ের সহকারী কোচ সরকারজি। তাঁর আসল নাম আমি জানি না, সরকারজি নামেই ডাকতাম। তিনিই আমাকে প্রথম মাঝখানে খেলার প্র্যাকটিস করান। কোনো কারণে তাঁর মনে হয়েছিল, মাঝমাঠে খেললে আমি আরো ভালো খেলব। তবে ওই পজিশনের খেলোয়াড়ের বিশেষ কাজ কী সেটাও বুঝতাম না। কিছুদিন তাঁর কথামতো প্র্যাকটিস করেছি, ফাইনাল পাস দেওয়া শিখেছি; কিন্তু সবুজ সংঘে গিয়ে আবার রাইট উইংয়ে খেলি। সমস্যা হয়েছে মোহামেডানে যাওয়ার পর, ওই দিকে তখন সাব্বির ভাই খেলতেন। প্রশ্ন : আপনি মোহামেডানে গেলেন '৯৩ সালে। আরমান : ওই বছর আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স থেকে প্রস্তাব পাই খেলার। ইস্কাটন সবুজ সংঘের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান মেজর মান্নান আবার মোহামেডান ক্লাবের সদস্য। তাঁর কথামতো মোহামেডানে খেলব, তারা সাত লাখ টাকা দেবে এবং এই টাকার অর্ধেক আমি পাব, বাকি টাকা ইস্কাটন সবুজ সংঘের। আমি রাজি, কিন্তু ইস্কাটন আমার প্রাপ্য অর্ধেক টাকা দেয় না। কোনো টাকা না দিয়ে আমাকে বলে মোহামেডানের প্র্যাকটিসে যোগ দিতে। পরে মাত্র দেড় লাখ টাকা দিয়ে বলে, 'এবার ওদের প্র্যাকটিসে যাও।' এ নিয়ে অনেক রাগারাগি হয় ইস্কাটনের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ইস্কাটনের খেলোয়াড় আমার বন্ধু আক্কু বলল, 'এই টাকার চিন্তা বাদ দে, ভালো খেললে অনেক টাকা আসবে।' তার কথামতোই আমি মোহামেডানে খেলি। ভালো পারফরম করি, কর্মকর্তারাও ভীষণ খুশি ছিলেন। এরপর তিন ক্লাবের (আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স) জেন্টলম্যান অ্যাগ্রিমেন্টের প্রতিবাদ করে আবাহনী-মোহামেডান-ব্রাদার্স ভেঙে ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধায় খেলি। এরপর মোহামেডান, আবাহনী ও মুক্তিযোদ্ধায় খেলেছি। ২০০১ সালে আমার নেতৃত্বে আবাহনী লিগ শিরোপা জেতে। প্রশ্ন : তখন আপনি একদম অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ভূমিকায়। আরমান : ওই যে সরকারজির অবদান। তিনি আমাকে একটা ধারণা দিয়েছিলেন মাঝমাঠে কিভাবে খেলতে হয়। তারপর নিজে নিজেই উন্নতি করেছি। নির্দিষ্ট কাউকে অনুসরণও করিনি। প্রথম মোহামেডানে খেলার সময় দেখা গেছে, মাঝামাঠ ছেড়ে আমি রাইট উইংয়ে গিয়ে সাব্বির ভাইয়ের সঙ্গে খেলছি। তাতে দেখা গেছে, প্রতিপক্ষের লেফট ব্যাক ভীষণ চাপে পড়ে যেত। সাব্বির ভাইয়ের কাছ থেকে শিখেছিলাম অনেক কিছু। সত্যি বললে, নিজের অজান্তেই আমার খেলার পরিবর্তন হয়ে গেছে, মাঝমাঠের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিলাম। অজান্তে বলছি এ কারণে, ইস্কাটনের শেষ বছর থেকে পরের চার-পাঁচ বছর আমার খেলায় কিছু মিরাকল ব্যাপার ঘটেছিল। অন্যরা সেটা টের পেত না, কিন্তু আমি বুঝতাম। দেখা গেছে, খুব বাজে শট মেরেছি, সেটা বাইরে যাওয়ার কথা; কিন্তু দুর্দান্ত শট হয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। এভাবে আমার ফাইনাল পাসগুলোও খুব ভালো হয়ে যেত, সেগুলোই বেশি চোখে পড়ত মানুষের। অমি নির্দিষ্ট করে কোনো ম্যাচের কথা বলতে পারব না, তবে হরহামেশাই এ রকম হতো। এটা কিভাবে হলো তা আমি নিজে চিন্তা করেও ব্যাখ্যা খুঁজে পেতাম না, তবে অন্যদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করতাম না। এটা আল্লাহর অশেষ কৃপা। প্রশ্ন : আপনি বলতে চাইছেন, মিডফিল্ডার হওয়ার জন্য নিজেকে সেভাবে প্র্যাকটিসে তৈরি করতে হয়নি! আরমান : অন্যদের মতো প্র্যাকটিস করতাম। সেভাবে যত না শিখেছি, প্রকৃতি আমার পায়ে দিয়েছে আরো বেশি ক্ষমতা। ক্যারিয়ারের একটা সময় গেছে, আমি যা করতে চাইতাম তা হয়েছে। কখনো তার চেয়ে বেশিও হয়েছে। আমি মিডফিল্ডার হিসেবে নিজের চেষ্টায় যেটা করতাম সেটা হলো, দুই ফরোয়ার্ডের মধ্যে ভালো জনের পায়ে বল তুলে দিতাম। যেমন- মোহামেডানের নকীব আর সাব্বির ভাইয়ের মধ্যে আমি সাব্বির ভাইকে ফাইনাল পাসটা বাড়ানোর চেষ্টা করতাম। কারণ তিনি যেটা করতে পারবেন, সেটা নকীব পারবে না। আবাহনীতে যেমন রঞ্জন ছিল খুব দ্রুতগতির। আমার সৌভাগ্য, আমার ক্যারিয়ারের সব কোচই সতীর্থ ডিফেন্ডার-মিডফিল্ডারদের একটা কথা বলে দিত, তোমরা বল পেলে আরমানের পায়ে দেবে, তারপর সে কী করে দেখবে। এই থিওরিতে আবাহনীতে ইকবালের সঙ্গে আমার বোঝাপড়াটা দারুণ হয়েছিল। প্রশ্ন : জাতীয় দলে এ রকম স্ট্রাইকারকে পেয়েছেন মাঠে, যাঁর সঙ্গে খেলে খুব মজা পেতেন? আরমান : এক নম্বরে আসলাম ভাই (শেখ মোহাম্মদ আসলাম)। '৯৩ সালে মোহামেডানেও দেখেছি, তারপর জাতীয় দলেও বাজে ক্রস কিংবা অত ভালো ফাইনাল পাস না হলেও তিনি কিভাবে যেন বলে সংযোগ ঘটিয়ে ফেলতেন। তারপর জাতীয় দলে আলফাজ আমার পাসগুলো খুব ভালো বুঝত। আমার পায়ে বল থাকলে সে ভালো পজিশন নিয়ে নিত। এরপর তো আর তেমন ভালো স্ট্রাইকারও আসেনি। স্ট্রাইকারদের গুণ হলো, ডি বক্সের আশপাশে জায়গা নেবে, অনেকে সেটাই বুঝত না। মেসি যেমন বার্সেলোনায় এত গোল পায়, জাতীয় দলে পায় না। কারণ তার খেলা বোঝার মতো খেলোয়াড় নেই জাতীয় দলে। তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ ধারালো করার কাজটা করতে পারে না। কারো পায়ে বল দিয়ে মেসি জায়গা করল, কিন্তু ফিরতি বলটা আর সে পায় না। বার্সেলোনায় দেখা যায় উল্টো, সব কিছুরই কেন্দ্রবিন্দু মেসি। প্রশ্ন : এখন সারা দেশে স্ট্রাইকার সংকট চরমে। ক্লাবে তো দেশি স্ট্রাইকার খেলে না বললেই চলে। এই দুর্ভোগটা চলছে জাতীয় দলেও। আরমান : দেশে একসময় প্রকৃতি প্রদত্ত অনেক খেলোয়াড় ছিল। তারা কোচের হাতে পড়ে আরো নিখুঁত হতো। সংখ্যাটা এত বেশি ছিল যে লড়াই করে যারা বের হতো, তাদের গোল করার ক্ষমতা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না। এখন সারা পৃথিবীতে জন্মগত প্রতিভার অভাব। ব্রাজিলের মতো দেশেই এ সংকট চরমে। বিশ্বে আগে যদি ২০ জন প্রতিভা বের হতো, এখন বের হয় দুজন। তাহলে কি খেলা বন্ধ হয়ে গেছে? আধুনিক ফুটবলে নিয়মের মাধ্যমে স্ট্রাইকার বা তারকার জন্ম হয়। ফুটবলার তৈরির কত কারখানা আছে, সাত-আট বছর বয়স থেকেই ঘষামাজা চলে। তাই স্ট্রাইকার সংকটের জন্য হা-হুতাশ না করে খেলোয়াড় তৈরির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রশ্ন : ক্লাব ফুটবলে আপনার সেরা ম্যাচ কোনটি? আরমান : মোহামেডান-আবাহনীর হয়ে অনেক ভালো ম্যাচ আছে। বিশেষভাবে মনে পড়ছে '৯৬ সালের লিগের কথা। আমার গোলে আবাহনীকে হারিয়ে মোহামেডান চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। '৯৩ সালে মোহামেডানের হয়ে আরেকটা দারুণ স্মৃতি আছে ঢাকা মাঠে কোরিয়ার হুন্দাই ক্লাবের বিপক্ষে। ওই ম্যাচে আমার একটা চমৎকার ফ্রি কিক গোল আছে, যদিও শেষ পর্যন্ত ম্যাচটা হেরে গিয়েছিলাম। ইস্কাটন থেকে এসে ওই মৌসুমটা আমার খুব ভালো কেটেছে মোহামেডানে। আমার ক্যারিয়ারের খুবই উপভোগ্য একটি মৌসুম এটি। মোহামেডানের দলটাও ছিল সে রকম- ডিফেন্সে কায়সার ভাই, জুয়েল রানা, আলমগীর, পাপ্পু, মাঝমাঠে আমি, টিটু ভাই, মুরাদ নামের এক বিদেশি, সাব্বির ভাই, আসলাম ভাই, নকীবরা। ফাইনাল পাসগুলো দিয়ে উপভোগ করেছি- হয় গোল, নইলে ডিফেন্স কাঁপিয়ে দিয়েছে স্ট্রাইকাররা। সেবার দুইবার আবাহনীর কাছে হেরেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। আমার রিজার্ভ বেঞ্চে যেসব খেলোয়াড় ছিল, তারাও দুর্দান্ত খেলত। এখন সেই মানের খেলোয়াড় থাকলে অবশ্যই জাতীয় দলে খেলত। এ ছাড়া সারা দেশে ঘুরে ঘুরে নিটল-টাটা জাতীয় লিগ খেলাটা খুব উপভোগ করেছি, দুবার টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার হয়েছিলাম, আবাহনী আর মুক্তিযোদ্ধার হয়ে। প্রশ্ন : আপনি জাতীয় দলে ঢোকেন অনেক অল্প বয়সে। আরমান : '৯২ সালে আমি খেলি ইস্কাটন সবুজ সংঘে। তখনই প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপের জন্য সিনিয়র দলে খেলার সুযোগ পাই। মাঝে একবার শ্রীলঙ্কা সাফে আমাকে বাদ দিয়েছিলেন ম্যান ইয়াং ক্যাং, এ ছাড়া টানা খেলে গেছি। ক্যাং বাদ দিয়েছিলেন তাঁকে দেখে নাকি আমি থুতু ফেলেছি। কোনো কোচের সঙ্গে এমন আচরণ করব, এটা এখনো আমি ভাবতে পারি না। প্রশ্ন : সেরা ফুটবলারের ভোটটি কার বাক্সে দেবেন? আরমান : এটা খুব কঠিন আমার জন্য। কারণ সালাউদ্দিন ভাই, এনায়েত ভাই কিংবা তাঁদের আমলের কারো খেলা আমি দেখিনি। সালাউদ্দিন ভাইকে কোচ হিসেবে পেয়েছিলাম মুক্তিযোদ্ধায়। তাঁর খেলা না দেখলেও প্র্যাকটিসে পুশিং-শ্যুটিং দেখে বুঝেছিলাম কত বড় ফুটবলার ছিলেন তিনি। সবার খেলা না দেখে মতামত দেওয়াটা ঠিক হবে না। তবে আমি সাব্বির ভাইয়ের ভক্ত। প্রশ্ন : জাতীয় দলের হয়ে সেরা ম্যাচ? আরমান : মুন্না ভাইয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রথম দেশের বাইরে গিয়ে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জেতে '৯৬ সালে। মিয়ানমারে সেই রয়াল চ্যালেঞ্জ কাপের চারজাতি ফুটবলজয়ী দলে আমি খেলেছি। অংশীদার '৯৯ সালে কাঠমাণ্ডু সাফ গেমস ফুটবলের স্বর্ণজয়েরও। কিন্তু আমার ক্যারিয়ারসেরা বললে ২০০৩ সালে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। এর চেয়ে বেশি আনন্দ অন্য কোনোটাতে পাইনি। প্রতিটি ম্যাচই আমার কাছে সেরা, স্মৃতিতে এখনো উজ্জ্বল সেই ম্যাচগুলো। অবিশ্বাস্য সব গোল হয়েছে। জয়, মতিউর মুন্না আর কাঞ্চনের গোল- কোনোটারই তুলনা হয় না। আমার কাজ ছিল মাঝমাঠ থেকে পুরো দলকে চালানো, খেলা গুছিয়ে আক্রমণে ওঠা। আগে কখনো এত ওপরে-নিচে ওঠানামা করে খেলেনি বাংলাদেশ। এটা আমার দেখা বাংলাদেশ দলের সেরা পারফরমেন্স। প্রশ্ন : কিন্তু এটা আপনার ক্যারিয়ারের একদম শেষ বিকেলের সাফল্য। এর আগেই তো আপনি অবসরে চলে গিয়েছিলেন। আরমান : আমি তো অবসরই নিয়ে ফেলেছিলাম জাতীয় দল থেকে। সত্যি কথা বললে, '৯৪ সালে তিন ক্লাবের অ্যাগ্রিমেন্টের বাইরে গিয়ে আমরা যে প্রতিবাদ করেছিলাম, এটার ফল ভোগ করতে হয়েছে আমাদের পদে পদে। ক্লাব-ফেডারেশনের চক্ষুশূল হয়ে গিয়েছিলাম আমরা। বিভিন্ন সময় বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা করেও তারা শেষ পর্যন্ত পারেনি। যা হোক আমি অবসরে। লিগের পারফরমেন্স দেখে একদিন কোচ জর্জ কোটান ফোন করে আমাকে জাতীয় দলে ফেরার অনুরোধ করেন। কিন্তু আমি 'না' করে দিয়েছিলাম। তারপর আরেক দিন ফোন করে কোচ আবার অনুরোধ করেন। তখন পরিবারের সমস্যার অজুহাত দিয়েছিলাম। তিনি আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে চান। তৃতীয় ফোনে আমি 'হ্যাঁ' বলি, পরিবারের সবাই চাইছে আমি এই টুর্নামেন্টটা খেলি। জয়কে প্রথম জাতীয় দলে সুযোগ দেন কোটান। ট্রেনিং করিয়ে তিনি দলটিকে এমন একটা জায়গায় দাঁড় করিয়েছিলেন যে সবারই আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে। প্রত্যেক খেলোয়াড়ের ভেতর থেকে সেরাটা বের করার জন্য তিনি নানা রকমের কাজ করেছিলেন। নিজেদের মধ্যেই বিশ্বাস এসে গিয়েছিল যে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার সামর্থ্য আমাদের আছে। মনে আছে, ফাইনালের দিন আমরা কাঁদতে কাঁদতে মাঠে গিয়েছিলাম। হোটেলে তিনি এমন ব্রিফ করেছিলেন, যেন এই শিরোপা না জিতলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে, তাঁর কোচিং জীবনও বৃথা হয়ে যাবে। কান্নার মধ্য দিয়ে তিনি সবার ভেতর শিরোপার ক্ষুধা বাড়িয়েছিলেন। প্রশ্ন : শিরোপা জেতার পরও এই কোচকে ফিরিয়ে দিল বাংলাদেশ! আরমান : এ রকম নজির বিশ্বে কোথাও নেই। এমন শিরোপা জেতার পর কোনো কোচকে ফেডারেশন বাদ দেয় না। কেউ হয়তো পদত্যাগ করে। কিন্তু কোটান ফিরে গিয়েছিলেন বুকভরা ব্যথা নিয়ে। তিনি এ দেশের ফুটবল ও ফুটবলারদের বুঝে ফেলেছিলেন। পরিকল্পনাও দিয়েছিলেন কাজ করার। কিন্তু ফেডারেশন তাঁকে রাখেনি। অথচ ওই সময় থেকে তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ফুটবল উন্নয়নের কাজ করলে আজ এই দুরবস্থায় পড়ে না ফুটবল। এ রকম এক সফল কোচকে ফিরিয়ে দেওয়ার অভিশাপও তো থাকে। প্রশ্ন : যা-ই হোক, কোটানের বদৌলতে বাংলাদেশের বড় একটা অর্জন হয়েছে। আপনি সেরা টুর্নামেন্ট জয়ের অংশীদার হয়েছেন। খেলা ছেড়েছেন সাত বছর হয়ে গেছে। একসময়ের প্রিয় ফুটবল ছেড়ে এখন থাকতে পারেন? আরমান : এটাই নিয়ম। সারা জীবন কেউ মাঠে কাটিয়ে দিতে পারে না। আমার ফুটবল ক্যারিয়ারে সব সিদ্ধান্তই আমি একা নিয়েছি এবং কোনোটাই ভুল ছিল না। ২০০৮ সালে মুক্তিযোদ্ধায় খেলার পর পরের মৌসুমও এই দলে খেলব, এমন চিন্তা ছিল মনে মনে। কিন্তু সামগ্রিক অবস্থা দেখে আমার ভালো লাগেনি। একদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে প্র্যাকটিস শেষে মাত্র আধঘণ্টা ভেবে মনস্থির করে ফেললাম, আর ফুটবল খেলব না। আমার স্ত্রীও এটা শুনে বিস্মিত হয়েছিল, তার সঙ্গে একটু আলাপও করিনি এ ব্যাপারে। আমি এমনই। এর পরও তো আমি খারাপ নেই। ব্যবসা করছি, দুই মেয়ে এক ছেলে নিয়ে সুখেই আছি। তা ছাড়া ফুটবলকে ভালোবেসে তার প্রতিদান অনেক পেয়েছি। মা-বাবার পরে আমাকে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে এই ফুটবলই।