ইসলামী বিধি-বিধানের অন্যতম সৌন্দর্য হলো এর বহুমুখী কল্যাণ। ইবাদতগুলোর একটি দিক হলো তা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম। অন্যদিক হলো, তা সেই সমাজের কল্যাণ বয়ে আনে যেখানে মুসলমান বসবাস করে। বসনিয়ান মুসলিম চিন্তাবিদ ও রাজনীতিক আলী ইজ্জত বেগোজিভ তাঁর ‘আল ইসলামু বাইনাশ শারকি ওয়াল গারবি’ বইয়ে ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের বহুমুখী কল্যাণ তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন ইসলামের রুকনগুলো কিভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির পাশাপাশি মানবকল্যাণ নিশ্চিত করে।
ইবাদতের সামাজিক প্রভাব
ইবাদতের সামাজিক কল্যাণ ও প্রভাব বহুমুখী। যার কয়েকটি নিম্নে বর্ণনা করা হলো—
১. আত্মশুদ্ধি ও মূল্যবোধের উন্নয়ন : আত্মিক পরিশুদ্ধি ও সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ছাড়া কোনো সমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। নামাজ এই সামগ্রিক পরিশুদ্ধির নিশ্চয়তা দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তুমি নামাজ কায়েম কোরো। নিশ্চয়ই নামাজ বিরত রাখে অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে। আর আল্লাহর স্মরণই সর্বোত্তম।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)
২. চারিত্রিক স্খলন রোধ : জাকাত মানুষকে চারিত্রিক স্খলন ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আল্লাহ তাআলা জাকাতের প্রভাব সম্পর্কে বলেছেন, ‘তাদের সম্পদ থেকে সদকা গ্রহণ করবে। এর দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে এবং পরিশুদ্ধ করবে।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ১০৩)
আল্লামা সাদি (রহ.) আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তুমি তাদেরকে পাপ কাজ ও মন্দ চরিত্র থেকে পবিত্র করবে এবং তাদের ভেতর উত্তম চরিত্র ও নেককাজের উন্নয়ন ঘটাবে। ফলে তাদের ইহকালীন ও পরকালীন প্রতিদান বৃদ্ধি পাবে এবং তাদের সম্পদও বৃদ্ধি পাবে। (তাফসিরে সাদি, পৃষ্ঠা ৩৪২)
৩. পরকালীন জবাবদিহির ভয় : তাকওয়া বা আল্লাহভীতির মূল কথা হলো মানুষের ভেতর পরকালীন জবাবদিহির ভয় জাগ্রত করা। যা মানুষকে অন্যায় ও অবিচার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। আর রোজা মানুষের ভেতর আল্লাহভীতি তথা পরকালের ভয় জাগ্রত করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিহার করল না, তাঁর না খাদ্য-পানীয় পরিহারের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯০৩)
৪. বিরোধ-সংঘাত দূর করা : সেই সমাজকেই কল্যাণের ধারক বলা যায়, যার অধিবাসীরা পরস্পরের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত নয়। হজ মানুষকে বিবাদ-সংঘাত থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘হজ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে। অতঃপর যে ব্যক্তি এই মাসগুলোতে হজ করার নিয়ত করে তার জন্য হজের সময়ে স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়। তোমরা উত্তম কাজের যা কিছু করো আল্লাহ তা জানেন এবং তোমরা পাথেয়ের ব্যবস্থা কোরো এবং আত্মসংযমই শ্রেষ্ঠ পাথেয়। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা! তোমরা আমাকে ভয় কোরো।’
(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৭)
সামাজিক কল্যাণও ইবাদত
ইসলাম শুধু ইবাদতের মাধ্যমে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিত করেনি, বরং সমাজের জন্য কল্যাণমূলক কাজকে ইবাদতের মর্যাদা দান করেছে। নিম্নে এমন কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো—
১. অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া : নিজেকে প্রাধান্য দেওয়া সামাজিক অশান্তি ও বিরোধের অন্যতম কারণ। ইসলাম নিজের ওপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা দেয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩)
২. অন্যকে কষ্ট না দেওয়া : অন্যকে কথা ও কাজে কষ্ট দেওয়া মুমিনের কাজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘সে ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলমান, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। আর সেই প্রকৃত মুহাজির সে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় পরিহার করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০)
৩. সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা : শুধু নিজেকে ও নিজের ঘরবাড়ি নয়, বরং সমাজ ও চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা ইসলামের শিক্ষা। ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা-প্রশাখা রয়েছে। তার ভেতর সর্বোত্তম হলো আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এ কথা বলা এবং সর্বনিম্ন স্তর হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস সরানো। লজ্জা ঈমানের অঙ্গ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৫)
আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন।