• ই-পেপার

কোরআন-হাদিসে মানুষের চেহারা প্রসঙ্গ

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৮১

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

 আর তিনি মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী, মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারী, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের শাস্তি দেবেন। অমঙ্গল চক্র তাদের জন্য, আল্লাহ তাদের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন এবং তাদের অভিশাপ করেছেন। তিনি তাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন, তা কত নিকৃষ্ট আবাস! আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর বাহিনীগুলো আল্লাহরই এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।

(সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৬-৭)

আয়াতগুলোতে মুশরিক ও মুনাফিকদের পরিণতি বর্ণনা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১.    হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মুনাফিকরা খুশি হয়েছিল। তারা এটাকে মুসলমানের পরাজয় ও দুর্দিনের সূচনা মনে করেছিল।

২.    মুনাফিকদের সবচেয়ে বড় মন্দ ধারণা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিরা আর কখনো মদিনায় ফিরতে পারবে না। মুশরিকদের হাতে মুসলিম বাহিনী ধ্বংস হয়ে যাবে।

৩.    দুনিয়ায় মুশরিক ও মুনাফিকদের শাস্তি হলো বন্দিত্ব ও মৃত্যুদণ্ড এবং পরকালে তাদের শাস্তি হলো জাহান্নাম।

৪.    কারো মতে, আয়াতে বর্ণিত অমঙ্গল চক্র দ্বারা উদ্দেশ্য ধারাবাহিক পরাজয় ও মন্দ পরিণতি।

৫.    আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর বাহিনী দ্বারা আসমানে ফেরেশতা ও জমিনে মুমিনরা উদ্দেশ্য। (তাফসিরে কুরতুবি : ১৯/৩০২)

দুর্যোগকাল

গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো নিষেধ

মুফতি মুহাম্মদ মর্তুজা
গুজব ও আতঙ্ক ছড়ানো নিষেধ

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য যেকোনো দুর্যোগের সময় ধৈর্য ধারণের পাশাপাশি মানুষের সবচেয়ে বড় করণীয় হলো সঠিক তথ্য নিশ্চিত করা, পারস্পরিক সহযোগিতা করা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করে মানসিকভাবে স্থির থেকে পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এমন সংকটের সময়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পুরনো ছবি, ভিন্ন দেশের ভিডিও বা মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের বন্যা নিয়েও এমন কিছু বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেক প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বন্যার নয়।

ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা করা অনৈতিকই কাজ। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে দেশে ও প্রবাসে থাকা মানুষের বিভিন্ন ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেউ আবার অতি দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক বিষয়। পাশাপাশি বাজার পরিস্থিতি, রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য মুমিনের বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে, নিম্নে সে রকম করণীয় তুলে ধরা হলো

যাচাই ছাড়া কোনো খবর প্রচার না করা : দুর্যোগকালে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বহু ধরনের হৃদয়স্পর্শী ছবি ছড়িয়ে পড়ে; এগুলোর তথ্যসূত্রের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে বিশ্বাস করা বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, হে ঈমানদাররা, যদি কোনো ফাসিক তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তাহলে তোমরা তা যাচাই করে নাও। এ আশঙ্কায় যে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো জাতিকে আক্রমণ করে বসবে, ফলে তোমরা তোমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।

(সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ৬)

এই আয়াতের নির্দেশনা শুধু সংবাদমাধ্যমের জন্য নয়; বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট শেয়ারকারী প্রত্যেক মুসলমানের জন্যও প্রযোজ্য। যাচাই-বাছাই ছাড়া যেকোনো সংবাদ প্রচার ও শেয়ার ব্যক্তিকে মানুষের সামনে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করতে পারে। রাসুল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তাই বলে বেড়ায়। (মুসলিম, হাদিস : ৭)

তাই কোনো আতঙ্কের সংবাদ এলেই তা শেয়ার করার জন্য হুমড়ি না খেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় তা যাচাইয়ের চেষ্টা করতে হবে। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে অভিজ্ঞ কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ থাকলে, তার থেকে প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করা যেতে পারে। যাচাই করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে তথ্যটি পাঠানো যেতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে করণীয়র ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যখন তাদের নিকট নিরাপত্তার কিংবা ভয়ের কোনো সংবাদ আসে তখন তারা তা রটিয়ে দেয়। যদি তারা তা রাসুলের কিংবা তাদের মধ্যে যারা ক্ষমতার অধিকারী তাদের গোচরে আনত, তবে তাদের মধ্য থেকে তথ্যানুসন্ধানীরা প্রকৃত তথ্য জেনে নিত। যদি তোমাদের প্রতি আল্লাহর দয়া ও করুণা না থাকত, তবে তোমাদের অল্পসংখ্যক ছাড়া সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।

(সুরা : নিসা, আয়াত : ৮৩)

আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করা : ইচ্ছাকৃতভাবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা ও বিভ্রান্তি ছড়ানো ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ কাজ। এগুলো মূলত মুনাফিকদের স্বভাব ছিল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যদি মুনাফিকরা এবং যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে তারা ও শহরে মিথ্যা সংবাদ প্রচারকারীরা বিরত না হয়, তবে আমি অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে তোমাকে ক্ষমতাবান করে দেব।

(সুরা : আহজাব, আয়াত : ৬০)

কারো কারো মনে হতে পারে, মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ত্রাণ সংগ্রহ বা সচেতনতা তৈরির জন্য অতিরঞ্জিত বা ভুয়া ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো, ইসলামে এ ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ মিথ্যা কল্যাণ বয়ে আনে না, বরং বিভ্রান্তি বাড়ায়। রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা মিথ্যাচার বর্জন করো। কেননা মিথ্যা পাপাচারের দিকে ধাবিত করে এবং পাপাচার জাহান্নামে নিয়ে যায়।

(আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৮৯)

অতএব, সংকটের সময়ে একজন মুসলমানের দায়িত্ব হলো গুজব ও আতঙ্ক না ছড়িয়ে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করা। তথ্য শেয়ার করার আগে নিশ্চিতভাবে যাচাই করা। মানুষকে সঠিক তথ্য দিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো সুযোগ থাকলে তা দেওয়া, অন্যথায় চুপ থাকা। সাধ্যমতো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করা, সামর্থ্য না থাকলে কমপক্ষে তাদের জন্য দোয়া করা।

যুদ্ধের ভয়াবহতা

‘আমরা সুদানের হারানো প্রজন্ম’

আবরার আবদুল্লাহ
‘আমরা সুদানের হারানো প্রজন্ম’

আল ফাশের শহর অবরোধ করার পর পিতা নিহত ফলে সুদান ছেড়ে পালিয়ে যান ইসলাম ইবরাহিম। তখন তাঁর মনে হয়েছিল তিনি যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়েছেন। ২০ বছর বয়সী (নারী) ইসলাম ফার্মাসির শিক্ষার্থী। তিনি তাঁর মা ও ছয় বোনকে নিয়ে প্রতিবেশী দেশ মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে (সিএআরে) পালিয়ে আসেন। ফলে তাঁর লেখাপড়াও অসম্পন্ন থেকে যায়। তিনি এখন করসি শরণার্থীশিবিরে বসবাস করেন এবং সুদান থেকে সদ্য পালিয়ে আসা নারী ও কন্যাশিশুদের সাহায্য করেন। একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে তিনি তাদের সাহায্য করেন। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে পালিয়ে এলেও তিনি মানসিক যন্ত্রণা ও চাপ মুক্ত হতে পারছেন না।

ইসলাম ইবরাহিমের চাচারা শরণার্থীশিবিরে এসে তাদের সুদানে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। যেন তাঁর মা মরহুম বাবার সম্পত্তির বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে পারেন। কিন্তু ইসলাম দেশে ফিরতে চান শুধু তাঁর লেখাপড়া সম্পন্ন করতে; বাবার উত্তরাধিকার লাভের জন্য নয়। ইসলামের ঘটনার ভেতর সুদানের পুরো একটি প্রজন্মের আকুতি প্রতিধ্বনিত হয়, যারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত এবং তা উদ্ধারের চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আলজাজিরা গত কিছু দিনে করসি শরণার্থীশিবিরের ৩০ জনের বেশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে। তারা সংঘাতের কারণে নিজেদের থমকে যাওয়া জীবনের কথা বলেছে। সংঘাতের কারণে তাদের পরিবার উদ্বাস্তু হয়েছে, স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে এবং জীবনকে চরম অনিশ্চয়তার ভেতর ফেলে দিয়েছে। তাদের অনেকের শঙ্কা তারা হয়তো কখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারবে না। তাদের বেশির ভাগের বয়স বিশের কোটায় এবং তারা দারফুরের সীমান্তবর্তী আমদাফোকের বাসিন্দা। প্রথম তাদের অনেকেই ভেবেছিল তারা হয়তো কিছুদিনের ভেতর বাড়ি ফিরতে পারবে, কিন্তু দিন দিন তাদের স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে। তাদের এই অভিজ্ঞতা যুদ্ধের কারণে সুদানের শিক্ষা খাতে তৈরি হওয়া বৈষম্যও তুলে ধরে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর মিলিশিয়া বাহিনী নিয়ন্ত্রিত দারফুর ও অন্যান্য অঞ্চলের লাখ লাখ স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারছে না। তিন বছরের বেশি সময় তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃত কোনো পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বিপরীতে সেনাবাহিনী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরদারের অধীনে থাকা এলাকায় শিক্ষার্থীরা ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ে ফিরছে এবং তারা পরীক্ষায়ও অংশগ্রহণ করছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সহায়তায় কয়েক ডজন সুদানি শরণার্থী বাঙ্গুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। দীর্ঘদিন শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর তাদের জন্য আবার পড়াশোনায় ফিরে আসার আশা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরা তাদের জন্য মোটেও সহজ নয়। আরবি মাধ্যমে স্কুলজীবন শেষ করা এসব শিক্ষার্থীকে এখন ফরাসি ভাষায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন সম্পূর্ণ নতুন একটি ভাষা শিখতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার চাপও সামলাতে হচ্ছে। তাদের অনেকেই বলছেন, ভাষা শেখার জন্য অতিরিক্ত সময়, আর্থিক সংকট এবং বাস্তুচ্যুত জীবনের মানসিক চাপসব মিলিয়ে মনে হচ্ছে জীবনের এমন কিছু মূল্যবান বছর হারিয়ে যাচ্ছে, যা আর কখনোই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।

তাঁদেরই একজন বাদেরেলদ্দিয়ান ইসা জানান, তাঁর পরিবার সুদান ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, কারণ তাঁর বাবা আমদাফোকের একজন ইমাম ছিলেন। মসজিদের খুতবায় র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের (আরএসএফ) সমালোচনা করায় তাঁরা ওই বাহিনীর নির্যাতনের শিকার হন। বাদেরেলদ্দিয়ান বলেন, তাঁর বাবার ধর্মীয় অবস্থান পুরো পরিবারকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিল।

করসি শরণার্থীশিবিরজুড়ে এই হারানোর অনুভূতি বিভিন্নভাবে সবার জীবনকে স্পর্শ করেছে। যে শিক্ষার্থীরা একসময় ফার্মাসিস্ট, বিচারক, প্রকৌশলী, শিক্ষক কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তাঁরা এখন নির্বাসিত জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করছেন। নতুন ভাষা শিখছেন, অপরিচিত শিক্ষাব্যবস্থায় আবার পড়াশোনা শুরু করার চেষ্টা করছেন এবং একই সঙ্গে সুদানে আটকে থাকা স্বজনদের নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। এই তরুণ সুদানিদের কাছে শিক্ষা এখন শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি একই সঙ্গে আশ্রয় এবং প্রতিরোধের প্রতীক। যুদ্ধবিধ্বস্ত জীবনের ভাঙা টুকরাগুলো আবার নতুন করে জোড়া লাগানোর এক নাজুক কিন্তু দৃঢ় প্রচেষ্টা। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে তাঁদের একজন আহমেদ বলেন, আমরাই সুদানের হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম। এই যুদ্ধে আমরা সবকিছু হারিয়েছি।           আলজাজিরা অবলম্বনে

প্রাথমিক যুগের বিখ্যাত তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র

আলেমা হাবিবা আক্তার
প্রাথমিক যুগের বিখ্যাত তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর মধ্যে সবাই কোরআনের ধারক ও বাহক ছিলেন। কোরআনের ব্যাপারে তাঁদের সাধারণ দক্ষতা ও গ্রহণ যোগ্যতা ছিল। তবু তাঁদের ভেতর কেউ কেউ তাফসির শাস্ত্রে অগ্রগামী ছিলেন। ইমাম সুয়ুতি (রহ.) বলেন, সাহাবিদের ভেতর নিম্নোক্ত ব্যক্তিরা তাফসির শাস্ত্রের দক্ষতার জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তাঁরা হলেন১. আবু বকর সিদ্দিক (রা.), ২. উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.), ৩. উসমান ইবনে আফফান (রা.), ৪. আলী ইবনে আবি তালিব (রা.), ৫. আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), ৬. আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), ৭. উবাই বিন কাআব (রা.), ৮. জায়েদ বিন সাবিত (রা.), ৯. আবু মুসা আশআরি (রা.), ১০. আবদুল্লাহ বিন জোবায়ের (রা.)। (ভূমিকা, আল ওয়াসিত ফি তাফসিরিল কোরআনিল মাজিদ, পৃষ্ঠা-৮)

 

তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র

সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ভেতর যাঁরা অগ্রগামী ছিলেন তাঁদের কেন্দ্র করে ইসলামী খিলাফতের বিভিন্ন শহরে একাধিক মাদরাসাতুত তাফসির (তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র) গড়ে উঠেছিল। তার ভেতর সবচেয়ে বিখ্যাত তিনটি শিক্ষা কেন্দ্রের পরিচয় তুলে ধরা হলো

১. তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র, মক্কা : যেসব সাহাবি তাফসির শাস্ত্রে অগ্রগামী ছিলেন তাঁদের অন্যতম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আপনি তাঁকে দ্বিনের গভীর জ্ঞান ও কোরআনের তাফসির শিক্ষা দিন। (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস : ৬৩০৪)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উপস্থিতির কারণে মক্কা তাফসির শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তাঁর নিকট যাঁরা তাফসির শিখেছিলেন তাঁদের ভেতর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন মুজাহিদ, সাঈদ ইবনে জুবায়ের, ইবনে আব্বাস (রা.)-এর আজাদকৃত দাস ইকরামা, আতা ইবনে আবি রাবাহ ও তাউস ইবনে কায়সান (রহ.) প্রমুখ। এঁদের ভেতর মুজাহিদ (রহ.) সবচেয়ে অগ্রগামী ছিলেন। তিনি ইবনে আব্বাস (রা.)-এর কাছে তিনবার সম্পূর্ণ কোরআনের পাঠ গ্রহণ করেছিলেন।

২. তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র, ইরাক : আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ছিলেন বিশিষ্ট ফকিহ ও তাফসিরবিদ। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য ও কোরআন মুখস্থকরণে অগ্রগামী ছিলেন। নবীজি (সা.) তাঁর কাছ থেকে কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করতেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তাঁকে ইরাকে দ্বিন শেখানের জন্য পাঠান। তিনি ইরাকবাসীকে বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের ব্যাপারে নিজের ওপর তোমাদের প্রাধান্য দিলাম। (আত-তাফসির ওয়াল মুফাসসিরুন : ২/২০)

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) ইরাকের কুফায় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং মানুষকে কোরআন, হাদিস ও ফিকহের পাঠদান করেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের ভেতর বিখ্যাত কয়েকজন হলেন আলকামা বিন কায়েস, আসওয়াদ বিন ইয়াজিদ, মাসরুক, মুররা আল হামদানি, হাসান বসরি, আমের শাবি, কাতাদা (রহ.) প্রমুখ।

৩. তাফসির শিক্ষা কেন্দ্র, মদিনা : মদিনায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একাধিক সাহাবি বসবাস করতেন। তাঁদের কাছ থেকে মানুষ কোরআনের জ্ঞান অর্জন করত। মদিনায় অবস্থানকারী সাহাবিদের ভেতর এই বিষয়ে উবাই বিন কাআব (রা.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেননা তিনি ছিলেন একজন কাতিবে ওহি (ওহি লেখক) এবং তাঁকে সাইয়িদুল কুররা (কারিদের নেতা) বলা হতো। মদিনা কেন্দ্রে পাঠ গ্রহণকারীদের ভেতর বিখ্যাত কয়েকজন হলেন জায়েদ বিন আসলাম, মুহাম্মদ বিন কাআব, আবুল আলিয়া (রহ.) প্রমুখ।

(প্রবন্ধ : আত-তাফসির ফি আসরিস সাহাবাতি)

হে আল্লাহ! আপনি জান্নাতে তাঁদের মর্যাদাকে উচ্চ করুন। আমিন।

 

কোরআন-হাদিসে মানুষের চেহারা প্রসঙ্গ | কালের কণ্ঠ