প্রচলিত কার্ডের সঙ্গে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের পার্থক্য কী?
ইসলামিক ও প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো শরিয়াহ পরিপালন ও সুদভিত্তিক লেনদেন। ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড শরিয়াহসম্মত বিভিন্ন নীতি যেমন মুরাবাহা, ইজারাহ ও উজরাহ (সার্ভিস চার্জ) ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়, যা সম্পূর্ণ সুদমুক্ত। প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডে কেনাকাটা করে কিস্তিতে পরিশোধ করলে সাধারণত সুদ আরোপ করা হয়। কিন্তু ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে শরিয়াহ নীতির ওপর ভিত্তি করে লাভ বা সার্ভিস চার্জ নেওয়া হয়। পেমেন্টে বিলম্ব হলে প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডে অতিরিক্ত সুদ বা লেট পেমেন্ট চার্জ আদায় করা হয়, যা ব্যাংকের আয় হিসেবে গণ্য হয়। পক্ষান্তরে ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি আচরণকে নিরুৎসাহিত করার জন্য লেট পেমেন্ট চার্জ আদায় করা হয়, যা শুধু শরিয়াহ নির্ধারিত দাতব্য খাতে ব্যয় করা হয়। এ ছাড়া ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে কোনো গ্রাহক যেন শরিয়াহ নিষিদ্ধ পণ্য ও সেবা ক্রয় করতে না পারেন, সে জন্য কার্ড সিস্টেমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা থাকে।
সিটি ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড উজরাহ পদ্ধতিতে পরিচালিত একটি কার্ড। উজরাহ একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ পারিশ্রমিক বা সার্ভিস চার্জ। অর্থাৎ নির্ধারিত সার্ভিস চার্জের বিপরীতে আমাদের গ্রাহকরা সিটি ইসলামিকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারেন। বাংলাদেশে একমাত্র আমরাই ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড ইস্যু করে থাকি।
আপনাদের কার্ডের বিশেষত্ব কী, যা গ্রাহককে আকৃষ্ট করবে?
সিটি ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ডে প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের শরিয়াহ নিষিদ্ধ সুবিধা বাদ দিয়ে অন্য সব আধুনিক সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। গ্রাহকদের ধর্মীয় মূল্যবোধ অক্ষুণ্ন রেখে শরিয়াহসম্মত আধুনিক ব্যাংকিং সেবা উপভোগ করার জন্য আমাদের ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড অনন্য। সিটি ব্যাংক বর্তমানে দুই ধরনের ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে থাকে—সিটি ইসলামিক গোল্ড আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড ও সিটি ইসলামিক ব্লু আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড। আমাদের কার্ড দুটির বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে রয়েছে—এই কার্ডে লেনদেনে বিশেষ সুবিধার মধ্যে রয়েছে, আমেরিকান এক্সপ্রেসের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী লেনদেনের সুবিধা, প্রাইমারি গোল্ড কার্ডধারীদের জন্য প্রথম তিনটি বিদেশ ভ্রমণে ফ্রি প্রায়োরিটি পাস মেম্বারশিপ, গোল্ড কার্ডধারীদের জন্য প্রতিবছরে পাঁচটি ফ্রি লাউঞ্জ ভিজিট, রেস্তোরাঁ, ভ্রমণ, শপিং, লাইফস্টাইল, গ্রোসারি, এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সেরা সব অফার, দেশসেরা ফাইভ স্টার হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে বাই ওয়ান গেট ওয়ান অফার, মেম্বারশিপ রিওয়ার্ড পয়েন্টস; সিটি ব্যাংক, কিউ-ক্যাশ ও এনপিএসবি এটিএম বুথে ২৪ ঘণ্টা নগদ উত্তোলনের সুবিধা এবং মাসিক ফ্রি ই-স্টেটমেন্ট ও কার্ড চেকসহ আরো অনেক সুবিধা।
আপনাদের কার্ডের মাধ্যমে কী কী সেবা পাওয়া যাবে? এবার রোজা ও ঈদ উপলক্ষে আপনারা গ্রাহকদের কী সুবিধা দিচ্ছেন?
আগে উল্লিখিত সেবার পাশাপাশি এই ঈদে সিটি ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড যে অফারগুলো দিচ্ছে তার মধ্যে কয়েকটি হলো—দেশের শীর্ষস্থানীয় লাইফস্টাইল ও গ্রোসারি আউটলেটে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাশব্যাক। ৪৫০টিরও বেশি রিটেইল স্টোরে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সেভিংস, যা সারা দেশে বিস্তৃত। ১০০টিরও বেশি রেস্টুরেন্টে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সেভিংস। বিভিন্ন জনপ্রিয় অনলাইন মার্চেন্ট ও ফুড ডেলিভারিতে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত সেভিংস এবং ৪০টিরও বেশি রেস্টুরেন্টে বাই ওয়ান গেট ওয়ান ইফতার ও ডিনার অফার, যার মধ্যে রয়েছে ফাইভস্টার হোটেলের অভিজাত ডাইনিং।
গ্রাহক কিভাবে নিশ্চিত হবে এই কার্ড শরিয়াহসম্মত?
সিটি ব্যাংকে রয়েছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত শরিয়াহ স্কলারদের সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন শরিয়াহ সুপারভাইজারি কমিটি। এই কমিটির সদস্যরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডসহ সিটি ইসলামিকের প্রতিটি প্রডাক্ট ও পলিসি যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দিয়ে থাকেন। শরিয়াহসম্মত বিভিন্ন পদ্ধতি পর্যালোচনা করে এই কমিটি সিটি ব্যাংকের ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের জন্য ‘উজরাহ’ পদ্ধতিকে অনুমোদন করেছেন যার ভিত্তিতে সিটি ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড পরিচালিত হচ্ছে। তাই শরিয়াহ মেনে সুদমুক্ত লেনদেন করার জন্য গ্রাহকরা নিশ্চিন্তে সিটি ইসলামিক আমেরিকান এক্সপ্রেস কার্ড ব্যবহার করতে পারেন।
এই কার্ডে কত ধরনের ফি আছে, কিভাবে নিয়ে থাকেন?
সিটি ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডে সাধারণত যেসব ফি আরোপিত হয় তার মধ্যে রয়েছে—কার্ড ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন ফি। কার্ড ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক ফি। কার্ড হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন কার্ড ইস্যু করার জন্য ফি এবং এটিএম থেকে নগদ উত্তোলনের জন্য ফি।
গ্রাহক কার্ড ব্যবহার না করলে কিংবা আংশিক ব্যবহার করলে ফি কিভাবে নির্ধারণ হবে?
সিটি ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকরা মূলত দুই ধরনের ফি পরিশোধ করে থাকেন। প্রথমত, আমাদের গ্রাহকরা একটি বার্ষিক সাবস্ক্রিপশন ফি পরিশোধ করেন। দ্বিতীয়ত, তারা একটি নির্ধারিত মাসিক ফি বা উজরাহ প্রদান করে থাকেন। তবে কোনো গ্রাহক কার্ড ব্যবহার না করলে সংশ্লিষ্ট মাসের জন্য তাকে কোনো মাসিক ফি প্রদান করতে হয় না। আংশিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাধারণত ব্যাংক তার গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে নির্ধারিত মাসিক ফি বা উজরাহর ওপর সম্পূর্ণ নিজস্ব এখতিয়ারে আংশিক ছাড় দিয়ে থাকে।
ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের সাফল্য কেমন পাচ্ছেন, বাংলাদেশে এই কার্ডের প্রবৃদ্ধি ও সম্ভাবনা কেমন?
বাংলাদেশের ক্রেডিট কার্ড ইন্ডাস্ট্রিতে সিটি ব্যাংক বরাবরই গ্রাহকদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে। ২০২১ সালে চালু করার পর থেকেই ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডেও আমরা অত্যন্ত ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। ২০২৩ সালের শেষে আমাদের ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহকসংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৫০০ যা ৩৩ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২২ হাজারে দাঁড়িয়েছে। গ্রাহকদের ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সিটি ব্যাংকের প্রতি তাদের আস্থার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সিটি ইসলামিকের প্রতিটি কাজে পরিপূর্ণভাবে শরিয়াহ পরিপালন নিশ্চিত করা হয়েছে, যা আমাদের সফলতার অন্যতম চালিকাশক্তি।
আপনার ব্যাংকের ইসলামিক ব্যাংকিং সেবা কতটা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে?
সিটি ব্যাংকের সুশাসন, সুচিন্তা ও সুদৃঢ় আর্থিক ভিত্তি এই ব্যাংকটিকে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকে পরিণত করেছে। পাশাপাশি শরিয়াহ পরিপালনে ব্যাংকের আপসহীন অঙ্গীকার গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে সিটি ইসলামিক এরই মধ্যে দেশের ইসলামিক ব্যাংকিং খাতে একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেও ২০২৪ সালে সিটি ইসলামিকের গ্রাহকসংখ্যা ৩৪ হাজার ৫০০ বেড়েছে এবং ফান্ড আন্ডার ম্যানেজমেন্ট ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যুগোপযোগী ইসলামিক ব্যাংকিং প্রডাক্ট, উন্নত গ্রাহকসেবা এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে অগ্রণী ভূমিকার কারণে গ্রাহকদের কাছে আমাদের গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।



