আবদুল হাকিম
বোমা ওদের চলন্ত ট্রাকের ওপর গিয়ে পড়ে
- প্রাপ্ত খেতাব : বীরপ্রতীক
স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা

যুদ্ধজয়ের যাত্রা : মার্চ থেকে ডিসেম্বর
সালেক খোকন

একাত্তরের ২৫ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের দেওয়া আগুনের লেলিহান শিখা যখন রাতকে গ্রাস করছিল, তখনই শুরু হয় বাঙালির স্বাধীনতাযুদ্ধের মহাযাত্রা। মার্চ থেকে ডিসেম্বর, গ্রাম থেকে শহর, নদী থেকে সীমান্ত—সবখানে ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধের আগুন। মার্চের অন্ধকার থেকে ডিসেম্বরে বিজয়ের আলোয় পৌঁছানোর পথটিই আমাদের সংগ্রাম ও গর্বের ইতিহাস, যেখানে বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকার অধিকার আদায়ের পেছনে বাঙালির অপরিমেয় ত্যাগ আর সংগ্রামের ইতিহাস গ্রথিত রয়েছে। স্বাধীনতার এই যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা আর প্রামাণ্যে, যা একাত্তরে বাঙালির গৌরব ও বেদনার ইতিহাসকেই মূর্ত করে
মার্চ ১৯৭১ : পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ডাক
২৫ মার্চ ১৯৭১। ঢাকায় এক রাতের অভিযানে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। সেই রাতকে স্বাধীন বাংলাদেশে কালরাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ওই রাতের সেনা অভিযানের সাংকেতিক নাম বা কোড নেম দিয়েছিল ‘অপারেশন সার্চলাইট’, যার পরিকল্পনা হয়েছিল তারও এক সপ্তাহ আগে, ১৮ মার্চ। উদ্দেশ্য রাজনৈতিক সমঝোতা ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান চালিয়ে পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
ওই রাতে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয় ঢাকাজুড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইপিআর সদর দপ্তর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ছিল প্রধান লক্ষ্যস্থল। পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধও হয় সেখানে। সাড়ে তিন ঘণ্টার যুদ্ধে রাজারবাগের বাঙালি পুলিশ সদস্যরা সামান্য থ্রি-নট-থ্রি নিয়ে প্রাণপণে লড়েছিলেন ভারী অস্ত্রের পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। সেই রাতে শহীদ হন বহু বাঙালি পুলিশ সদস্য। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকায় ২৫ থেকে ২৯ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করেছিল এক লাখ বাঙালিকে।
ওই রাতে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল হল আর রোকেয়া হলেও গণহত্যা চালায়। যুদ্ধোত্তর কালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৯৫ জন শহীদের তালিকা করলেও বিভিন্ন তথ্য বলছে, ওই রাতে সেখানে আড়াই শ থেকে তিন শ জনকে হত্যা করা হয়েছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওয়্যারলেসের সংলাপেও হত্যার এমন সংখ্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। জগন্নাথ হলে হত্যার শিকার হন চারজন শিক্ষক, ৩৬ জন ছাত্র এবং ২১ জন কর্মচারী ও অতিথি। ইকবাল হলে ওরা ১১ জন ছাত্রকে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এরপর রোকেয়া হলে আগুন ধরিয়ে দিলে ছাত্রীরা হল থেকে দৌড়ে বের হয়ে আসেন। তখন মেশিনগান দিয়ে অবিরাম তাঁদের গুলি করা হয়।
ওই রাতেই গ্রেপ্তার করা হয় শেখ মুজিবুর রহমানকে। তার আগেই তিনি স্বাধীনতা ঘোষণার শেষ বার্তা দিয়ে যান। একাত্তরে তখনো সশস্ত্র সংগঠন তৈরি হয়নি। তার আগেই শব্দসৈনিকদের ১০ জনের একটি দল ২৬ মার্চ স্বতঃস্ফূর্তভাবে চট্টগ্রামের কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনে গিয়ে স্বাধীন বাংলা (বিপ্লবী) বেতার কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ৩০ মার্চ পর্যন্ত ওই কেন্দ্রের প্রচার চলে চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে। সেদিনই ট্রান্সমিটার ভবনে পাকিস্তানি বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়। এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি ডিসমেন্টাল করে তাঁরা চলে যান পটিয়ায়। ৩ এপ্রিল থেকে স্বাধীন বাংলা (বিপ্লবী) বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান আবারও শুরু হয় রামগড় সীমান্তবর্তী মুক্তাঞ্চলে, যা চলে ২৫ মে ১৯৭১ পর্যন্ত। এসব তথ্যের বিস্তারিত রয়েছে বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ বইয়ে।
সেই বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, অনুষ্ঠান বিভাগে ছিলেন বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, আবদুল্লাহ-আল-ফারুক, মুস্তফা আনোয়ার ও কাজী হাবিবউদ্দীন আহমদ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন।
সীমিত জনবল আর সামর্থ্যের মধ্যেও যুদ্ধের দিনগুলোতে টানা সম্প্রচার চালু রেখেছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দসৈনিকরা, যা দেশের আপামর মানুষকে স্বাধীনতার পথে উৎসাহ, সাহস ও আশা জুগিয়েছিল।

এপ্রিল ১৯৭১ : রক্তে ভেজা মাটিতে মুজিবনগর সরকারের শপথ
এপ্রিলের শুরুতে দেশের নানা অংশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশের বাঙালি সদস্য ও ছাত্র-জনতা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরে জেলা শহরগুলো দখলে নেয় পাকিস্তানি সেনারা। অতঃপর তারা বাঙালি নিধনে নামে। অনেক জেলায় বিহারিরাও এই নিধনে অংশ নেয়।
বিহারিদের নৃশংসতার একটি ঘটনার কথা জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মুরাদ হোসেন। রেলওয়েতে বাবার চাকরির সুবাদে তাঁরা থাকতেন সৈয়দপুরে, আতিয়ার কলোনির এল-৭৬-বি নম্বর কোয়ার্টারে। তাঁর মা সুফিয়া খাতুনকে সেখানেই নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
তিনি বললেন, “তারিখটা ১৪ এপ্রিল। মেইন রোডের পাশেই ছিল আমাদের কোয়ার্টার। সেনাসহ বিহারিদের একটি সশস্ত্র দল এসে ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে থাকে। আম্মা রেহালে রেখে কোরআন শরিফ পড়ছিলেন। সামনের দরজা ভেঙে ওরা ঘরের ভেতরে যখন ঢোকে, তখন তিনি কোরআন শরিফ বুকে জড়িয়ে ধরে বসে থাকেন। আম্মাকে ওরা কোপ দিয়ে দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। রক্তে ভেসে যায় পুরো ঘর। আল্লাহর কালাম কোরআন শরিফও মাটিতে পড়ে রক্তে ভিজে যায়। পরে আম্মার লাশ পাকিস্তানি আর্মিরা ট্রাকে তুলে নিয়ে যায়। ওই কোরআন শরিফটাই আম্মার শেষ স্মৃতি, যার পাতায় পাতায় রয়েছে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ।”
দেশের ভেতর যখন পাকিস্তানি সেনা ও তার দোসররা হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তখন স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলতে থাকে ভারতে। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশ সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করে, যাকে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান বলে ধরে নেওয়া হয়। ওই দিন সত্তরের নির্বাচনে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত পাকিস্তানের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যরা ভারতের পশ্চিমবঙ্গে মিলিত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারও গঠন করেন।
তাঁরা পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন। আরো সিদ্ধান্ত হয়, সৈয়দ নজরুল ইসলাম হবেন উপরাষ্ট্রপতি, যিনি শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন আর তাজউদ্দীন আহমদ যুদ্ধকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন।
মন্ত্রিসভার সদস্য হন এম মনসুর আলী (অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প), এ এইচ এম কামারুজ্জামান (স্বরাষ্ট্র, সরবরাহ, ত্রাণ, পুনর্বাসন ও কৃষি) এবং খন্দকার মোশতাক আহমদ (পররাষ্ট্র, আইন ও সংসদ)।
জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী প্রবাসী সরকারের মুক্তিবাহিনীর প্রধান ও মেজর জেনারেল আবদুর রব চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। এইচ টি ইমাম মন্ত্রিপরিষদসচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। গঠিত সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানটি হয় ১৭ এপ্রিল, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায়, রক্তভেজা বাংলাদেশের মাটিতে। পরে ইতিহাসের হাত ধরে বৈদ্যনাথতলা হয়ে যায় মুজিবনগর।
এর পরই ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে তৈরি হতে থাকে ইয়ুথ ক্যাম্প। বাছাই করা তরুণদের পাঠানো হয় প্রশিক্ষণে। ভারত সরকারের সহযোগিতায় বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতে থাকে শত শত তরুণ।

মে ১৯৭১ : স্বাধীনতার পথে দামাল ছেলেদের লড়াইয়ের প্রস্তুতি
গ্রেপ্তারের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য ছিল না তখন। ফলে পাকিস্তানি সামরিক সরকার হয়তো শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছে—এমন শঙ্কাও ছিল। কিন্তু ৫ মে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আকবর খান করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত ও সুস্থ আছেন। সামরিক আইন অনুসারে তাঁর বিচারকাজ শিগগিরই শুরু হবে।”
মে মাসেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটায়, খুলনার ডুমুরিয়া থানার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগরে। সাতক্ষীরা-খুলনার মধ্যবর্তী এলাকার একটি বড় বাজার ছিল এটি। খুলনাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে হাজার হাজার মানুষ এই পথেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছিল। ফলে চুকনগর বাজারে ১৯ মে পর্যন্ত ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। হিন্দুদের ঢল নেমেছে চুকনগরে—এমন খবর আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও শান্তি কমিটির সদস্য গোলাম হোসেন এবং ভদ্রা নদীর খেয়াঘাটের ইজারাদার শামসুদ্দিন খাঁ নামের এক বিহারি গোপনে পৌঁছে দেয় সাতক্ষীরায় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে।
২০ মে সকালে সেনারা হানা দেয় চুকনগরে। প্রথমে তারা মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় চিকন আলী মোড়ল ও সুরেন্দ্রনাথ কুণ্ডুকে গুলি করে হত্যা করে। এরপর পাতখোলা বাজারে ঢুকে নিরীহ মানুষদের সারিতে দাঁড় করিয়ে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়।
তাদের একটি দল পাতখোলা বিল থেকে চাঁদনী ফুটবল মাঠ, চুকনগর স্কুল, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া, ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর তীরে আগত মানুষের ওপর গুলি চালায়। ফলে ভদ্রা নদীর জল রক্তবর্ণ ধারণ করে।
চার মাইলব্যাপী এই নৃশংসতায় শহীদদের প্রকৃত সংখ্যা আজও অজানা। তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও গবেষকরা মনে করেন, ওই দিন চুকনগরে প্রায় ১২ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। (তথ্যসূত্র : ‘চুকনগর গণহত্যা’, মুনতাসীর মামুন; ‘৭১-এর গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ’, ডা. এম এ হাসান)

জুন ১৯৭১ : হিট অ্যান্ড রানে গেরিলা অপারেশন ও জনযুদ্ধের প্রস্তুতি
ঢাকার ভেতরে প্রথম একটি অপারেশন করেন মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল আলম (বীরপ্রতীক), মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া (বীরবিক্রম), বাদল, স্বপন ও জিয়া।
‘হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হিট অ্যান্ড রান’ নামের ওই অপারেশনের আদ্যোপান্ত শুনি বীরপ্রতীক হাবিবুল আলমের মুখে। তাঁর ভাষায়, “খবর ছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক টিম ও ইউএনএইচসিআরের প্রধান প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান এসে উঠবেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে।
৯ জুন ১৯৭১। সিদ্ধেশ্বরীতে বাদল ভাইয়ের বাড়ি থেকে শাহবাগে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের দিকে যাই মাগরিবের ঠিক আগে। হোটেলের সামনে আসতেই হঠাৎ সাইরেন বাজার শব্দ পাই। দেখি পুলিশের এসকর্ট গাড়ি ময়মনসিংহ রোড হয়ে আসছে। একটি বা দুটো সাদা শেভ্রোলেট গাড়ি নজরে এলো। বুঝে যাই, ওই গাড়িতেই রয়েছেন বিশ্বব্যাংকের অতিথিরা। গাড়িগুলো আমাদের পাশ দিয়েই হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ঢোকে।
মেইন রোডে হোটেলের ছোট গেটে এসে থামে আমাদের গাড়ি। বাদল ভাইকে বললাম, আপনি গাড়ি স্টার্ট করেই রাখেন। জিয়া, মায়া ও আমার কাছে গ্রেনেড। আমি গ্রেনেডের পিন খুলতেই দেখি, জিয়া তার হাতের একটি গ্রেনেড ছুড়ে মেরেছে। সাদা শেভ্রোলেট গাড়িটি উল্টে গেল। আমি দ্বিতীয় গ্রেনেড আর মায়া ছুড়ল তৃতীয় গ্রেনেডটি। এর মধ্যে জিয়া তার দ্বিতীয় গ্রেনেডটি সদরুদ্দিনের গাড়ির ওপরে ছুড়ে দেয়।
গ্রেনেডটি গাড়ির পাশের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকেই বিস্ফোরিত হয়। ওই অপারেশনের কারণেই পরে প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান ও তাঁর টিম ভয়ে দ্রুত করাচি ফিরে যায়। ঢাকায় যে শান্তি নেই—এই ধারণাটা তৈরি করি আমরা।”
অন্যদিকে বাঙালি নিধনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আরো সক্রিয়ভাবে সহযোগিতায় ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে শান্তি কমিটি ও তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। ২১ জুন ১৯৭১, পাকিস্তানের লাহোরে ফাতেমা জিন্নাহ রোডে অবস্থিত জামায়াত অফিসে কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দেন পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছাড়া দেশকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষা করার অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থা ছিল না।” (দৈনিক সংগ্রাম, ২২ জুন ১৯৭১)
২২ জুন করাচির এক হোটেলে আয়োজিত সাংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেন, “পাকিস্তানের আদর্শ গোটা জাতির জন্য পথনির্দেশক এবং একমাত্র ইসলামই দেশের দুই অংশকে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ রাখতে পারে।”
তিনি পিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন বলেও জানান। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৩ জুন ১৯৭১)
এদিকে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি একাত্তরে আরেকটি সশস্ত্র বাহিনীও গড়ে তোলা হয়। বাহিনীটিকে প্রথমে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স, সংক্ষেপে বিএলএফ বলা হলেও পরবর্তীকালে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে সেটির নামকরণ হয় মুজিব বাহিনী। মূলত দেশ থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রায় ১০ হাজার সদস্য নিয়েই ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল এস এস উবানের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গঠিত হয় এই বাহিনী। একাত্তরে সম্মুখযুদ্ধ ছাড়াও ছোটখাটো বহু অপারেশন করেছেন এই বাহিনীর যোদ্ধারা। শহীদ আর আহতও হয়েছেন অনেকে।

জুলাই ১৯৭১ : সশস্ত্র লড়াইয়ের পাশাপাশি ফুটবল পায়ে আরেক যুদ্ধ
পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ প্রতিহত ও পাল্টা আক্রমণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে প্রতি সেক্টরে একজন সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করে বাংলাদেশের প্রথম সরকার। সেনাবাহিনীতে থাকা বাঙালি অফিসার, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন, এমন সিনিয়র ও অভিজ্ঞ সামরিক অফিসারদেরই ১১টি সেক্টরের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১১ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত কলকাতায় ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের প্রথম সরকারের সদর দপ্তরে মন্ত্রিপরিষদ, সেক্টর কমান্ডারস এবং ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে এক সম্মেলনে বাংলাদেশ বাহিনীর নেতৃত্ব, প্রশিক্ষণ, অভিযান, প্রশাসন ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
একাত্তরে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে ‘জেড ফোর্স’ নামে পরিচিত একটি বাহিনীর প্রথম ব্রিগেডটি ফার্স্ট, থার্ড ও এইট ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নিয়ে গঠিত হয় জুলাই মাসেই। এই ফোর্সের নাম রাখা হয় জিয়ার নামের আদ্যক্ষর দিয়ে। এর পরই তাদের এসিড টেস্ট হয় ফার্স্ট বেঙ্গল কামালপুর বিওপি, থার্ড বেঙ্গল বাহাদুরাবাদ ঘাট আর এইট বেঙ্গল নকশি বিওপি অপারেশনে।
পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোর শহরের মানুষ। বাল্টিমোর সমুদ্রবন্দর থেকে অস্ত্র নিচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের যুদ্ধজাহাজ ‘পদ্মা’। ১৪ জুলাই ১৯৭১, একদল শ্রমিক ও স্থানীয় জনসাধারণ যুদ্ধজাহাজে অস্ত্র তুলতে বাধা দেয়। এ ছাড়া কোয়ার্কাস নামের একটি দল কতকগুলো ডিঙিনৌকা নিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে পাকিস্তানের কার্গো জাহাজের গতিপথও বন্ধ রাখে। ‘রক্তমাখা টাকা নেব না’—এমন স্লোগান দিয়ে বন্দর শ্রমিকরা পাকিস্তানি জাহাজে মালপত্র তোলা থেকে বিরত থাকেন।
বাংলার জনপদ যখন রক্তাক্ত, ঠিক তখনই একদল ফুটবল যোদ্ধা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি আর তহবিল গড়তে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফুটবল ম্যাচ খেলার উদ্যোগ নেন। গড়ে তোলা হয় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’।
ফুটবল পায়ে একাত্তরের ওই যুদ্ধের কথা বলেছিলেন দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেল। জীবদ্দশায় প্রথম ম্যাচের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন এভাবে : “প্রথম ম্যাচ হয় নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগর মাঠে, ২৫ জুলাই ১৯৭১ তারিখে। প্রতিপক্ষ ছিল নদীয়া একাদশ। লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে আমরা মাঠ প্রদক্ষিণ করব, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইব এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে খেলা শুরু করব—এমনটাই ছিল পরিকল্পনা। কিন্তু বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে তখনো স্বীকৃতি দেয়নি ভারত। ফলে পতাকা ওড়ানো এবং জাতীয় সংগীত বাজানো নিয়ে আইনি জটিলতা দেখা দেয়। পরিকল্পনার কথা শুনে নদীয়া জেলার তৎকালীন জেলা প্রশাসক ডি কে বোস শুধু বললেন, ‘আমার চাকরি থাকবে না।’ আমরাও বেঁকে বসি। পরে ডিসি সাহেব সাহস করেই অনুমতি দিলেন। প্রথম জাতীয় পতাকা উড়িয়ে এবং জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে খেলা শুরু হয়। এটাই হলো ইতিহাস।”
সারা ভারতে মোট ১৬টি ম্যাচ খেলে এই দলটি। প্রাপ্ত গেটমানি, অনুদানসহ মুজিবনগর সরকারের মুক্তিযোদ্ধা তহবিলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মোট ১৬ লাখ ৩৩ হাজার রুপি জমা দিয়েছিল।
আগস্ট ১৯৭১ : জলে-স্থলে আক্রমণে পাকিস্তান কুপোকাত
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের বিশ্বদূত। একাত্তরের ১ আগস্ট লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে তাঁর নেতৃত্বেই এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগার থেকে শেখ মুজিবের মুক্তির দাবিতে ১৩০ জন ব্রিটিশ এমপির স্বাক্ষরিত একটি আবেদন প্রথম পাঠ করে শোনানো হয় সমাবেশে।
এদিকে ভারতে মানবেতর জীবন যাপন করছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যাওয়া এক কোটি শরণার্থী। তাদের জন্য কিছু করতে উদ্যোগী হন পণ্ডিত রবিশঙ্কর।
তিনি তখন ক্যালিফোর্নিয়ায়। একটি চ্যারিটি কনসার্টের পরিকল্পনার কথা জানান তাঁর দীর্ঘদিনের বন্ধু বিটলস খ্যাত গায়ক জর্জ হ্যারিসনকে। একাত্তরের ১ আগস্ট নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামের ওই চ্যারিটি শোর আয়োজন করেন রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসন।
বব ডিলান, জর্জ হ্যারিসন, রিঙ্গো স্টারদের পাশাপাশি ওই কনসার্টে মঞ্চে ছিলেন উপমহাদেশীয় ধ্রুপদি সংগীতের সব দিকপাল—রবিশঙ্কর, আল্লা রাখা খান, আকবর আলী খান, কমলা চক্রবর্তীও। ওই দিন প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের সামনে জর্জ হ্যারিসন গেয়ে ওঠেন ‘বাংলাদেশ’ গানটি।
১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে দেশের দুটি সমুদ্রবন্দর—চট্টগ্রাম ও মোংলা এবং দুটি নদীবন্দর—চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জে (দাউদকান্দি ফেরিঘাটসহ) হামলা চালায় গেরিলারা। একযোগে একই সময়ে পরিচালিত আত্মঘাতী ওই অভিযানের নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। ওই অপারেশনে পাকিস্তান বাহিনীর ২৬টি সমরাস্ত্র ও পণ্যবাহী জাহাজ এবং গানবোট ডুবিয়ে দেওয়া হয়। সমন্বিত ওই আক্রমণে মুষড়ে পড়ে পাকিস্তান বাহিনী।
এ সময় ঢাকার গেরিলারা ‘অপারেশন ফ্লাইং ফ্ল্যাগস’ নামের অভিনব একটি অপারেশন পরিচালনা করেন। ঢাকায় অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য।
এ নিয়ে গেরিলা হাবিবুল আলম এভাবে বললেন— “পরিকল্পনা অনুসারে সদরঘাট ও নিউমার্কেট থেকে সবুজ লুঙ্গি, লাল রঙের সালু কাপড় এবং হলুদ রঙের কাপড় কিনে আনি। এরপর আমার তিন বোন আসমা, রেশমা ও শাহনাজ, অন্যদিকে শাহাদত চৌধুরীর বোন মরিয়ম, ডানা ও ঝিমলিকে দিয়ে পতাকা বানানো হয়। ১৩ আগস্ট সন্ধ্যা এবং ১৪ আগস্ট সকালের ভেতর ঢাকার বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ওই পতাকা ও গ্যাস বেলুনগুলো পৌঁছে দেওয়া হয়।
১৪ আগস্ট ১৯৭১, শনিবার। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনারা ব্যস্ত ছিল স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে। ঠিক তখনই, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার ভেতর বিভিন্ন জায়গা থেকে বেলুনের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়া হয় সব পতাকা। ওই দিন শত শত লাল-সবুজ পতাকা উড়েছে ঢাকার আকাশে।”
সেপ্টেম্বর ১৯৭১ : মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে দিশাহারা পাকিস্তানি আর্মি
একাত্তরে স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক বাহিনীগুলোও বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসব বাহিনীর মধ্যে টাঙ্গাইলের কাদেরিয়া বাহিনী, সিরাজগঞ্জের লতিফ মির্জা বাহিনী, ঝিনাইদহের আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরের হেমায়েত বাহিনী, বরিশালের কুদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী এবং ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী ও আফতাব বাহিনী, শিবপুরের মান্নান বাহিনী, আত্রাইয়ের ওহিদুর বাহিনী উল্লেখযোগ্য।
ওই সময় যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই পাকিস্তানের নারকীয় হত্যাকাণ্ড সমর্থন করেননি। কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ তেমনই একজন। একাত্তরের সেপ্টেম্বরে কলকাতায় আসেন গিন্সবার্গ। যশোর রোডসংলগ্ন বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেন তিনি। শরণার্থীদের কষ্টকর জীবন দেখে তাঁর হৃদয় কেঁদে ওঠে। এরপর নিউইয়র্কে ফিরে গিয়ে তিনি লেখেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ শিরোনামে তাঁর অমর কবিতাটি, যাতে বাংলাদেশের নির্যাতিত মানুষের কথাই তুলে ধরা হয়েছে।
স্বাধীনতাযুদ্ধে অস্ত্রহাতে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছেন নারী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি, তারামন বিবি, শিরিন বানু মিতিল, আশালতা বৈদ্য প্রমুখ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গোবরা ক্যাম্পটি শুধু নারীদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যই চালু করা হয়। সেপ্টেম্বরে শুরু হয় ৯ নম্বর সেক্টরে নারীদের একটি গ্রুপের ট্রেনিং। ট্রেনিংয়ে অংশ নেন রমা রানী দাস। আরো কয়েকজন নারী যোদ্ধার নাম উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বিথিকা বিশ্বাস, হাসি, মিনতি, কনক প্রভা মণ্ডল, সমীরণ, হরিমন বিশ্বাস, রুনু দাস প্রমুখ ছিলেন। ট্রেনিং চলে টাকিতে, ইছামতী নদীর পারে। যশোর ক্যান্টনমেন্টের সুবেদার মেজর মাজেদুল হক সাহেব ছিলেন ট্রেনার। রাইফেল, গ্রেনেড, এক্সপ্লোসিভ, স্পাইং করা ছিল ট্রেনিংয়ের মূল বিষয়।”
এ ছাড়া ভারতের শরণার্থীশিবিরে ডাক্তার, নার্স ও স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন অসংখ্য নারী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবেও অংশ নিয়েছেন নারী শিল্পীরা। অনেকেই গান গেয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তা জমা দিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিলে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণে পুরোপুরি একটি জনযুদ্ধ। সেপ্টেম্বর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা, সাধারণ মানুষ, সাহসী নারী ও কিশোরদের ঐক্যবদ্ধ আক্রমণে দিশাহারা হতে থাকে পাকিস্তানি সেনারা।
অক্টোবর ১৯৭১ : গেরিলা আক্রমণ আর আন্তর্জাতিক চাপে পাকিস্তান
পাকিস্তানি সেনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত ক্রমেই জোরালো হতে থাকে। ৮ অক্টোবর মস্কোতে সোভিয়েত ছাত্র-শিক্ষকরা এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায় ১০০ দেশের প্রতিনিধি বাংলাদেশ ইস্যুতে বক্তব্য দেন। তাঁদের মধ্যে ৫০টি দেশই বাংলাদেশ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
ভ্যাটিকানের পোপ জন পলের আহ্বানে অক্টোবরেই রোমের বিভিন্ন গির্জায় বাংলাদেশের জন্য বিশেষ প্রার্থনাসভার আয়োজনের পাশাপাশি উপবাস পালন করা হয়। শরণার্থীদের জন্য সংগ্রহ করা হয় অর্থ সহযোগিতাও।
এদিকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক কোটি বাঙালিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়ে ওই দেশের ইন্দিরা গান্ধী সরকারের ওপর। ভারতের কিছু রাজ্যের মানুষ এতে নাখোশ হয়। শরণার্থীদের ফিরিয়ে দিতে আর মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য না করতে নানাভাবে তারা সরকারকে চাপ দিতে থাকে।
ওই সময়ই পরিকল্পনা হয়, বাংলাদেশ থেকে দিল্লি পর্যন্ত ‘বিশ্ববিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ আয়োজনের। এতে অংশ নেন বিভিন্ন জেলা থেকে আগত বাংলাদেশের ৩৮ জন শিক্ষিত যুবক। ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায়, মুজিবের মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন স্মারকলিপি প্রদান, পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক গণহত্যা ও হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা তুলে ধরে স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয় জনমত গড়ে তোলাই ছিল এর উদ্দেশ্য।
১৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয়ে পদযাত্রাটি চলে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত। এভাবে চৌদ্দ শ মাইল হেঁটে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পক্ষে ভারতীয় তথা বিশ্বজনমত গড়তে ‘বিশ্ববিবেক জাগরণ পদযাত্রা’ দলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এদিকে ১৩ অক্টোবর গেরিলাদের এক অপারেশন চিন্তায় ফেলে দেয় পাকিস্তানি সামরিক সরকারকে। পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর আবদুল মোনেম খান ওরফে মোনায়েম খাঁকে ঢাকার বনানীতে কঠোর নিরাপত্তার আবরণ ভেদ করে বাড়িতে ঢুকে হত্যা করেন ঢাকার গেরিলা বীরপ্রতীক আনোয়ার ও বীরপ্রতীক মোজাম্মেল। ওই অপারেশনে সহযোগিতা করেছিলেন শাহজাহান ও মোখলেস। দুজনই কাজ করতেন মোনায়েম খাঁর বাসায়।
এই হত্যার খবরে তৎকালীন মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর নেতারা এবং ডা. এ এম মালিকের মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের মনোবল দারুণভাবে ভেঙে পড়ে। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে সাবেক গভর্নরের শেষকৃত্যেও উপস্থিত হননি অনেক নেতা।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মুসলমান হয়েও পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররা রমজান মাসেও তাদের বর্বরোচিত গণহত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, লুণ্ঠন ও ধর্ষণ অব্যাহত রেখেছিল। তবু অক্টোবর থেকেই সীমান্তবর্তী এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপগুলোর সরাসরি সশস্ত্র আক্রমণ এবং দেশের অভ্যন্তরে মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা গেরিলাদের আক্রমণে দিশাহারা হতে থাকে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের দোসররা।
নভেম্বর ১৯৭১ : স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া
সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচিত এমপিএ আর এমএনএরা মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে চলে যান মুক্তাঞ্চল ও ভারতে। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা তখন ফন্দি আঁটে। নির্বাচিত সব এমএনএ ও এমপিএর পদ শূন্য ঘোষণা করে আসনগুলোতে উপনির্বাচনের গোপন প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই পরিকল্পনার খবর জেনে যান ঢাকার গেরিলারা। ফলে একাত্তরের ১ নভেম্বর তাঁরা মোমিনবাগে পাকিস্তানের ইলেকশন কমিশন অফিসে বিস্ফোরণ ঘটান।
সাদেক হোসেন খোকার (ঢাকার সাবেক মেয়র) নেতৃত্বে ওই অপারেশনে অংশ নেন মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল হক নান্টু, লস্কর, সুফি আর হেদায়েত। বিল্ডিংয়ে ঢুকে এক্সপ্লোসিভ ফিট করে তাঁরা বিস্ফোরণ ঘটান। এতে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় ইলেকশন কমিশন অফিসের কাগজপত্র।
একই দিন ঢাকায় কাকরাইল পেট্রল পাম্প উড়িয়ে দেয় তৌফিকুর রহমানসহ গেরিলাদের আরেকটি দল। ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রকাশ্যে বোমা বিস্ফোরণের এমন ঘটনায় পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ক্রমে ভেঙে পড়ে।
আবার এই মাসেই রণাঙ্গনে আহত হন মুক্তিবাহিনীর কয়েকজন কমান্ডারও। কামালপুর ছিল পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ঘাঁটি। ১৪ নভেম্বর সেখানে আক্রমণের সময় সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবু তাহের (বীর-উত্তম) অ্যান্টিপারসোনাল মাইনের আঘাতে বাঁ পা হারান।
২৮ নভেম্বর ভোরে জেড ফোর্সের তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা সিলেট অঞ্চলে রাধানগর কমপ্লেক্সের ছোটখেল এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের পাল্টা আক্রমণের মুখে পড়েন। এ সময় তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর শাফায়াত জামিল (বীরবিক্রম) গুলিবিদ্ধ হন।
তবে ওই সময় পাকিস্তানি সেনারা তাদের নিয়মিত বাহিনীর ঝুঁকি কমাতে যে রাজাকার বাহিনী গঠন করেছিল, তা-ও প্রায় ভেঙে পড়ে। সারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় মুক্তিবাহিনীর কাছে রাজাকাররা অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করতে থাকে। এতে তাদের প্রতি পাকিস্তানি সেনাদের বিশ্বাস ও নির্ভরতা নষ্ট হয়। ফলে তাদের আত্মসমর্পণ ঠেকাতে রাজাকারদের এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করতে শুরু করে।
২১ নভেম্বর ১৯৭১। চূড়ান্ত যুদ্ধের পরিকল্পনায় মুজিবনগর সরকার ও ভারত সরকারের সার্বিক সম্মতিতে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ড মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে একটি ‘যৌথ বাহিনী’ গঠিত হয়। যৌথ বাহিনীর অধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার এক সামরিক নির্দেশনায় সমগ্র বাংলাদেশকে চারটি যুদ্ধ সেক্টরে বিভক্ত করে উভয় দেশের যুদ্ধরত ইউনিটগুলোকে সমন্বয় করা হয়।
বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর সদর দপ্তরও একইভাবে একটি নির্দেশনা জারি করে। ২১ নভেম্বর যৌথ বাহিনী প্রথম যশোরের চৌগাছায় অবস্থানরত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটিতে ত্রিমুখী আক্রমণ পরিচালনা করে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘ব্যাটল অব চৌগাছা’ নামে অভিহিত হয়ে আছে।
ওইদিনই বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী সম্মিলিতভাবে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের সূচনা করে। এটি মুক্তিযুদ্ধকালীন চলমান অন্যান্য যুদ্ধের জন্য নতুন মাইলফলক হিসেবেও বিবেচিত হয়। এ কারণেই বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ২১ নভেম্বর দিনটিকে প্রতিবছর সাড়ম্বরে ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।
ডিসেম্বর ১৯৭১ : বাংলাদেশের বিজয় ও পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। রাত ১২টার পর প্রথমবারের মতো বিমান হামলা করেন বাঙালি পাইলটরা। ভারতীয় এয়ার ফোর্সের সহযোগিতায় পরিচালিত ওই অপারেশনকে বলা হয় কিলো ফ্লাইট। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুক্তিবাহিনীর বিমান উইংয়ের অবিশ্বাস্য এক যুদ্ধাভিযানের ইতিহাস।
দুঃসাহসিক ওই অভিযানে প্রায় পৌনে ৯ ঘণ্টা ফ্লাইংয়ে ছিলেন পাইলটরা। ইতিহাসে এটা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ মিলিটারি অপারেশন। ওই অপারেশনের ফলে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর তেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে সারা দেশে পাকিস্তানি বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে।
৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারত। তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তারবার্তার মাধ্যমে স্বীকৃতি মেলে ভুটানের কাছ থেকে। ভারতের স্বীকৃতি ওই সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ‘ভারত-পাকিস্তান’ যুদ্ধের সমালোচনা থেকে অনেকটাই মুক্তি দেয়। এর ফলে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী প্রতিটি সীমান্ত দিয়ে একযোগে একের পর এক এলাকা মুক্ত করে ঢাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে।
একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে পারমাণবিক যুদ্ধের হুমকি দিতেও দ্বিধা করেনি। সপ্তম নৌবহর হিসেবে পরিচিত মার্কিন নৌবহরে ছিল ৯টি জাহাজ। ডিসেম্বর মাসের ১৪ তারিখে পূর্ব পাকিস্তান অভিমুখে ওই রণতরি ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করে। কিন্তু তার আগেই সেখানে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১২ থেকে ১৫টি রণতরি পাঠায়। তাদের রণতরিতে গাইডেড মিসাইল এবং পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিনও ছিল।
এদিকে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের এদেশীয় দোসররাও হত্যাযজ্ঞের নতুন মিশন নিয়ে নামে। তারা তালিকা করে হত্যা করে দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের। মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী।
ডিসেম্বরের ১৪ তারিখের মধ্যে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর গভর্নর হাউস থেকে রাও ফরমান আলীর একটি ডায়েরি পাওয়া যায়। সেখানে অনেক নিহত ও নিখোঁজ বুদ্ধিজীবীর নাম লেখা ছিল।
ডিসেম্বরে ঢাকার চারদিকে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা দেখে ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি বুঝে যান, তাঁদের পতন আসন্ন। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব। এরপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের হেডকোয়ার্টার্সে চলে আত্মসমর্পণের দলিল তৈরির বৈঠক।
বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন নিয়াজি। দলিলে পাকিস্তানি নৌ-পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার ভাইস মার্শাল প্যাট্রিক ডেসমন্ড কালাঘানও স্বাক্ষর করেন।
আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ (উপপ্রধান সেনাপতি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। ভারতের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন ভারতীয় চতুর্থ কোরের কমান্ডার লে. জেনারেল সগত সিং, পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরিচাঁদ দেওয়ান ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব। (তথ্যসূত্র : ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’, লে. জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব; ‘নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল’, সিদ্দিক সালিক)।
সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রস্তুতি সম্পন্ন

সাক্ষাৎকার : ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু
জিয়াউর রহমানের ঘোষণা বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা যাবে না
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু কালের কণ্ঠকে বিশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে তাঁর দপ্তরে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মাহমুদুল হাসান

কালের কণ্ঠ : ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিভাবে শুরু হলো এবং কিভাবে বাংলাদেশের জন্ম হলো?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : এটি লম্বা ইতিহাস। ছোট করে যদি বলি, ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আগে মানুষ হতাশায় ভুগছিল, যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল, তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বা তারা মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা মানুষের মধ্যে সাহসের জোগান দিল, তারা মনে করল এবার মুক্তিযুদ্ধ হবে। যুদ্ধে বাঙালি সেনারা নেমে গেছে, তাই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার মোকাবেলা করা সম্ভব হবে বলে মানুষের মনে আশার সঞ্চার হয়।
কালের কণ্ঠ : আপনি কি স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছিলেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা আমি নিজের কানে শুনেছি। সেই ঘোষণা শুনেই উদ্বেলিত হয়েছি।
কালের কণ্ঠ : তখন সময়টা কয়টা ছিল?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি যখন শুনি তখন ২৬ মার্চ আনুমানিক সকাল ১০টা। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে আশাহত মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হলো। তারা মনে করল, এবার মুক্তিযুদ্ধটা হবে। বাঙালি সেনারা যুদ্ধে নেমে গেছে। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালি মোকাবেলা করতে পারবে কি না এ নিয়ে হতাশা ছিল। কিন্তু তখন জিয়াউর রহমানের ঘোষণা মানুষকে ঘুরিয়ে দিল, আশার সঞ্চার করল। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা এ জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ, দল-মত-নির্বিশেষে গোটা বাঙালি জাতি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ, কামার-কুমার ও কৃষকের সন্তানরা।
কালের কণ্ঠ : বিগত আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি করেছে। বিএনপি সরকার জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেবে কি?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি আগেই বলেছি, এটি কোনো দলের যুদ্ধ ছিল না। এটি ছিল জনযুদ্ধ। আর বিএনপি আওয়ামী লীগের মতো বিশ্বাস করে না। মুক্তিযুদ্ধকে নিজের দলীয় যুদ্ধ বানানো, মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা দাবি বিএনপি কখনোই করে না। তবে ইতিহাস যদি লিখতে হয় জিয়াউর রহমানের এই ঘোষণা বাদ দিয়ে ইতিহাস লেখা যাবে না। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণাই মানুষকে ঘুরিয়ে দিয়েছিল। হতাশাগ্রস্ত মানুষকে আলোর দিশা দেখিয়েছিল। জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনে আমার মধ্যেও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল, সেটাই আমি বললাম। কারো নাম বাদ দিয়ে ইতিহাস লেখা যাবে না।
কালের কণ্ঠ : নতুন প্রজন্মের কাছে আপনাদের সরকার কিভাবে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরবে?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : আমি মনে করি, বিএনপির উচিত বা আমাদের সবার উচিত সঠিক ইতিহাসটা তুলে ধরা। আমাদের প্রজন্ম মরে গেলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আর কেউ কথা বলার থাকবে না। আমি নিরপেক্ষ মুক্তিযুদ্ধের কথা বলছি। সেখানে যে ব্যক্তি যুদ্ধটা শুরু করলেন তাঁর নাম বাদ দিয়ে ইতিহাস শুরু করা যাবে না। হ্যাঁ, একটি আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। সেই আন্দোলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন, মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান, সোহরাওয়ার্দী ছিলেন, আরো অনেকে ছিলেন। এই আন্দোলনটা ত্বরান্বিত হয়েছিল মুক্তিযুুদ্ধে। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিলেন জিয়াউর রহমান।
কালের কণ্ঠ : স্বাধীনতার ৫৫ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন কী? অসম্পূর্ণই বা রয়ে গেল কী?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : হাসিনা মুক্তিযুদ্ধকে তরুণ প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এটা হলো ৫৫ বছরে সবচেয়ে বড় ক্ষতিকর একটা অধ্যায়। আজকে যদি হাসিনা মুক্তিযুদ্ধকে সর্বজনীন রাখতেন, যার যার অবদান তার তার মূল্যায়ন করতেন...! আজকে আমার খুব কষ্ট হয়, যখন দেখি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্ক হয়। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বাজে কথা বলে। তারা আবার জনগণের কাছে যায়, বলে ভোট দেন। এটা আমাদের জন্য খুবই কষ্টের এবং এ নিয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এত মানুষের জীবনের বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধ করেছি, ক্ষমতার ভাগ চাইনি।
কালের কণ্ঠ : একাত্তর আর চব্বিশ কিভাবে দেখেন?
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু : একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ আর চব্বিশ এক নয়। স্বাধীনতার যুদ্ধ আমাদের একটি পতাকা দিয়েছে, একটি দেশ—বাংলাদেশ দিয়েছে। আমাদের জাতির পরিচয় দিয়েছে। আর চব্বিশ তো আমাদের পরিচয় দেয়নি। এটি স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি দিয়েছে।
