সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, বন্ধুর মতো বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এমন আরো অনেক প্রত্যাশা থাকে পুলিশ বাহিনীর প্রতি। কিন্তু সেই পুলিশ সদস্যদেরই যদি জীবনের নিরাপত্তা না থাকে, স্বস্তি ও সুস্থতা না থাকে, তাহলে কী হবে? জানা যায়, অভাব-অনটনের পাশাপাশি অতিরিক্ত কাজের চাপ, বিপর্যস্ত আবাসন ব্যবস্থায় ঠিকমতো ঘুমাতে না পারাসহ নানা প্রতিকূল অবস্থা মোকাবেলা করতে হয় পুলিশ সদস্যদের। ফলে অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং এক পর্যায়ে আত্মহত্যার শিকার হন।
কালের কণ্ঠে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনসের একটি ভবনে সাইদুল ইসলাম (২১) নামের একজন কনস্টেবল আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার আগে নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া একটি ভিডিও পোস্টে তিনি পারিবারিক জটিলতাসহ হতাশার নানা চিত্র তুলে ধরেন। এ নিয়ে চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৯ জন পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সাড়ে সাত বছরে পুলিশের ৭৯ জন সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১০ জনের বেশি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁদের বড় অংশই কনস্টেবল ও এএসআই পদমর্যাদার। বছরভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০২০ সালে আত্মহত্যা করেন ১০ জন পুলিশ সদস্য। ২০২১ সালে ১১, ২০২২ সালে ছয়, ২০২৩ সালে ১৩, ২০২৪ সালে তিন এবং ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪। চলতি বছর এ পর্যন্ত অর্থাৎ সাড়ে ছয় মাসেই ৯ জনের আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে।
জানা যায়, পুলিশ সদস্যদের ১২ ঘণ্টার ডিউটি প্রায়ই বিরতি ছাড়া ১৭ থেকে ১৮ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকে। অপ্রতুল বেতনে তাঁদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যারাকগুলো এতটাই জনাকীর্ণ যে একটি কক্ষে অনেককে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। স্যানিটেশন ব্যবস্থাও অত্যন্ত নিম্নমানের। ঘুমের ব্যাঘাত হয়। বর্তমানে পুলিশে দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি সদস্য কর্মরত। ঢাকার রাজারবাগে কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ থাকলেও স্থায়ী কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নেই। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দিয়ে সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ৫৯টি জেলায় পুলিশ সদস্যদের চিকিৎসা সুবিধা থাকলেও কোথাও পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেই। এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুস্থ ও সর্বাঙ্গীণ পুলিশি ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। এই বিভাগের সদস্যরা যদি কর্মক্ষম না থাকেন, নিজেরাই ভঙ্গুর হয়ে পড়েন, তাহলে সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। আমরা মনে করি, পুলিশ সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তাঁদের আর্থিক সচ্ছলতার পাশাপাশি কর্মস্থল ও আবাসন পরিবেশ মানসম্মত হতে হবে। আমরা আর কোনো পুলিশ সদস্যের এমন দুঃখজনক পরিণতি দেখতে চাই না।

