kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ কার্তিক ১৪২৭। ২৭ অক্টোবর ২০২০। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও শিশু-মাতৃ মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ অর্জন

ডা. মুনিরা বেগম

২৬ মার্চ, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশ। এ দেশের জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু ছিল উন্নতির অন্তরায়। কিন্তু সরকারের কিছু আন্তরিক চেষ্টা এবং এ ক্ষেত্রে নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীদের ঐকান্তিক শ্রমে সমাধান হচ্ছে এই সমস্যার। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, টিকাদানে অভূতপূর্ব অর্জন—সবই সরকারের ও জনগণের কৃতিত্ব। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ যেসব সূচকে পিছিয়ে ছিল, ২০১০ সালের পর তা অনেকখানি এগিয়েছে।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান সরকারের অন্যতম সাফল্য হচ্ছে শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা। শিশুমৃত্যুর হার কমানোর অর্জনে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২১ সেপ্টেম্বর ২০১০ জাতিসংঘ পুরস্কার লাভ করেন। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ এই সরকারের সাফল্যের মুকুটে অন্যতম পালক।

প্রথমেই আসি শিশুমৃত্যু রোধের কথায়। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৭.১, এক বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ২৫.১ এবং পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩২। এই অর্জনে সরকারের কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ আছে। নবজাতক মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে জন্মের সময় শ্বাস গ্রহণে সমস্যা ২৩ শতাংশ, কম ওজনের শিশু ২৮ শতাংশ, সংক্রমণ ৩৬ শতাংশ। কম জন্ম-ওজনের শিশুকে তার স্বাভাবিক জন্ম-ওজন লাভ করাতে বুকের দুধ পান এবং ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সের শিশুর পরিপূরক খাবারের ওপর জোর দিয়েছে সরকার। নবজাতকের শ্বাস গ্রহণে সমস্যা কমাতে ‘হেল্পিং বেবিজ ব্রিদ’ নামের একটি কর্মসূচি উপজেলা হাসপাতাল থেকে শুরু করে প্রতিটি হাসপাতালের শিশু বিভাগে চালু আছে। পাশাপাশি নবজাতক ইউনিটে ইনকিউবেটর ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি মজুদ আছে। সংক্রমণ কমাতে মা ও শিশুকে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় টিটেনাসের টিকা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া কম জন্ম-ওজনের শিশু যাতে মায়ের সংস্পর্শে তাপমাত্রা ও বুকের দুধ পায়, সে জন্য প্রতিটি উপজেলা ও জেলা হাসপাতালে ‘ক্যাঙ্গারু মাদার কেয়ার’ নামে একটি সেবা চালু হয়েছে। এই কর্মসূচিতে সহায়তা দিচ্ছে ইউনিসেফ।

টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায়—এমন একটি সফল কর্মসূচির নাম হচ্ছে ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি)। এই কর্মসূচির আওতায় ১০টি রোগের বিরুদ্ধে ছয়টি টিকা দেওয়া হয় ০ থেকে ২৩ মাস বয়সী শিশুদের। এ কর্মসূচিতে সহায়তা করছে অেঠও—অর্থাত্ গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনেশন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন। এ কর্মসূচিতে যে রোগগুলোর টিকা দেওয়া হচ্ছে তা হলো—যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস-বি, হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি, হাম, রুবেলা, পোলিও ও নিউমোনিয়া। এ কর্মসূচির বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয়ভাবে টিকার হার ৯৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং বিভাগীয় পর্যায়ে ৯০ শতাংশে উন্নীতকরণ। এ ছাড়া সরকার রোগ নির্মূল ও শিশুমৃত্যু রোধে নির্দিষ্ট সময় পর পর সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি করে থাকে। বলা যায়, স্বাধীন বাংলাদেশে শতভাগ সফল কর্মসূচির নাম ইপিআই। এ সাফল্যের কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের মার্চে বাংলাদেশকে পোলিও নির্মূল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ভ্যাকসিন হিরো’র অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। পাশাপাশি এ কর্মসূচির আওতায় ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননক্ষম নারীদেরও টিটি টিকার পাঁচটি ডোজ দেওয়া হচ্ছে।

এবার আসা যাক মাতৃমৃত্যুর কথায়। ২০১৯ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি হাজার জীবিতজন্মে ১.৭৩, যা ১৯৯০ সালে প্রতি হাজার জীবিতজন্মে প্রায় ৬ ছিল। এই মাতৃমৃত্যুর হার কমে আসার পেছনে অনেকগুলো ধাপ আছে। প্রথমেই আসি গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের স্বাস্থ্য প্রসঙ্গে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম—গর্ভকালীন ও প্রসব-পরবর্তী সেবা কমপক্ষে চারবার নিতে হবে। সরকারের কমিউনিটি ক্লিনিক, পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, উপজেলা হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, মাতৃ ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র, মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কেন্দ্রে এই সেবা বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়।  মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোতে জরুরি প্রসূতিসেবার লক্ষ্যে স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা ও অবেদনবিদ্যায় চিকিত্সকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা ইউনিসেফ ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহায়তায় সরকার পরিচালনা করে থাকে। মাতৃস্বাস্থ্যসেবা সব সময় চালু থাকছে। গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের কী কী করণীয় এবং তাদের পুষ্টি পরামর্শ বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দেওয়া সরকারি কেন্দ্রগুলোর একটি বড় কাজ।

২০১৮ সালের বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১৩ লাখ ৭৬ হাজার ৭০৮। জন্মহার প্রায় শতকরা ১.০৫। যেখানে ১৯৯০ সালে একজন প্রজননক্ষম বিবাহিত নারী পাঁচটি শিশু জন্ম দিতেন, সেখানে ২০১৫ সালে তা ২.৩-এ নেমে আসে। এটি জন্মনিয়ন্ত্রণের একটি বড় সাফল্য। স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে। তাদের প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে সচেতন করা সম্ভব হচ্ছে। মাধ্যমিক স্কুল পর্যায়ের পাঠক্রমেও প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এর সবই বর্তমান সরকারের সাফল্যের গল্প। এতে অবদান রয়েছে গণমানুষের সহযোগী মনোভাবেরও। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে অনেক দূর।

 

লেখক : প্রজনন ও শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক

কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগ, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ

মন্তব্য