মানবজাতি আর কতদিন পৃথিবীতে টিকে থাকবে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তৈরি একটি বিতর্কিত গাণিতিক তত্ত্ব আবারও আলোচনায় এসেছে। এর জেরে বিজ্ঞান ও দর্শনের একটি পুরোনো বিতর্ক নতুন করে সামনে এসেছে। প্রশ্নটি হলো, মানুষের বিলুপ্তি কি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক কাছাকাছি?
সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য মেট্রো' এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে। প্রতিবেদনে 'ডুমসডে আর্গুমেন্ট' নামে পরিচিত একটি তত্ত্বের কথা বলা হয়েছে। এটি এমন একটি গাণিতিক ও সম্ভাবনাভিত্তিক ধারণা, যা মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি পরিসংখ্যানগত ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি কোনো নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং সম্ভাবনার ভিত্তিতে তৈরি একটি তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। তাই এটি নিয়ে এখনো বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের মধ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। ‘ডুমসডে আর্গুমেন্ট’ তত্ত্বের ভিত্তি হলো 'কোপার্নিকান নীতি'। এই নীতিতে বলা হয়, মহাবিশ্বে বা ইতিহাসে মানুষের অবস্থান বিশেষ বা ব্যতিক্রমী নয়। অর্থাৎ আমরা এমন কোনো অনন্য সময়ে বাস করছি—এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। এই ধারণা প্রথম দেন জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্র্যান্ডন কার্টার। পরে মহাবিশ্ববিজ্ঞানী জে. রিচার্ড গট তত্ত্বটিকে আরো বিস্তৃত করেন। তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যদি ধরা হয় অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে জন্ম নেওয়া সব মানুষের মধ্যে আপনি একজন এলোমেলো ব্যক্তি, তাহলে পরিসংখ্যানগতভাবে ধরে নেওয়া কঠিন হয়ে যায় যে মানবজাতির সামনে এখনো খুব দীর্ঘ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তবে এই তত্ত্বে কোথাও বলা হয় না যে পৃথিবী কবে ধ্বংস হবে বা কী কারণে মানবজাতির বিলুপ্তি ঘটবে। এটি শুধু সম্ভাবনার ভিত্তিতে একটি হিসাব তুলে ধরে।
ডুমসডে আর্গুমেন্ট নিয়ে বিজ্ঞানীরা একমত হতে পারেননি। যারা এই তত্ত্বকে সমর্থন করেন, তাদের মতে এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যদ্বাণী নয়। বরং অনিশ্চয়তা ও সম্ভাবনা নিয়ে চিন্তা করার একটি ভিন্নধর্মী গাণিতিক পদ্ধতি। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই তত্ত্ব খুব বেশি সরল কিছু ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাই শুধু এই হিসাব দিয়ে মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, মানুষের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, সামাজিক পরিবর্তন এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এই তত্ত্ব বিবেচনায় নেয় না। দ্য মেট্রোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ, নতুন মহামারির আশঙ্কা এবং পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই কারণেই ডুমসডে আর্গুমেন্ট আবারও মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে এসেছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, মানবজাতি কি এমন এক সময়ে পৌঁছেছে, যখন আগে কখনো দেখা যায়নি—এমন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে?
গবেষকদের মতে, বর্তমানে এমন কোনো বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত মডেল নেই, যা নির্দিষ্ট করে বলতে পারে মানবজাতির বিলুপ্তি কবে ঘটবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাণিতিক মডেল ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু বাস্তব ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। তাই গবেষকেরা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনুমান করার পরিবর্তে বাস্তব ঝুঁকি কমানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে নতুন সংক্রামক রোগের বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের অবনতি, পারমাণবিক সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডুমসডে আর্গুমেন্ট এখনো বিতর্কিত একটি তত্ত্ব। কারণ এটি বাস্তব প্রমাণের চেয়ে সম্ভাবনার ওপর বেশি নির্ভর করে। কিছু দার্শনিক এটিকে চিন্তার খোরাক জোগানো একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক ধারণা হিসেবে দেখেন। আবার অন্যদের মতে, বাস্তবে মানবজাতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতা এই তত্ত্বের খুবই সীমিত। তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত। মানবজাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো উত্তর নেই। তারপরও ডুমসডে আর্গুমেন্ট বারবার আলোচনায় ফিরে আসে। কারণ এটি মানুষের সবচেয়ে পুরোনো এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি সামনে নিয়ে আসে—মানবজাতির শেষ কি একদিন হবেই? আর যদি হয়, তবে সেই সময় কি আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি কাছাকাছি?




