হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের সামরিক স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রবিবার চালানো এই হামলার পর দুই দেশের মধ্যে চলমান সংঘাত আরো তীব্র হয়েছে। একই সময়ে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী হরমুজ প্রণালির আশপাশে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা ঘাঁটি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) পরিচালিত ছোট দ্রুতগতির নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। হামলার কিছুক্ষণ পরই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। ইরানি কর্মকর্তারা জানান, কাছের কেশম দ্বীপেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। কেশমের গভর্নর হোসেইন আমির তেইমুরি বলেন, ১০ থেকে ১১টি ক্ষেপণাস্ত্র দ্বীপটিতে আঘাত হেনেছে। তার দাবি, সব হামলাই সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে এবং এতে কোনো বেসামরিক হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাহশাহর শহরের একটি পানি পাম্পিং স্টেশনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় একজন নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। এছাড়া হরমোজগান প্রদেশে আরেকটি হামলায় দায়িত্ব পালনরত একজন রক্ষণাবেক্ষণ কর্মী নিহত ও আরো দুইজন আহত হন। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স সিএনএনকে জানান, মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং হামলার উদ্দেশ্যে পাঠানো একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। রয়টার্সকে দেওয়া এক সংক্ষিপ্ত ফোন সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করছি।’
আরো পড়ুন
৩ বছরে ইহুদি নিরাপত্তায় ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করবে ব্রিটেন
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলাকে ‘আগ্রাসী’ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানায়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে শনিবার মাসকাটে ইরান ও ওমানের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল, তা কোনো সমঝোতায় পৌঁছায়নি। তাদের অভিযোগ, ওমানের ওপর ওয়াশিংটনের প্রকাশ্য ও গোপন চাপের কারণেই আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন দফার সামরিক অভিযান শুরু হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য যে হুমকি তৈরি হয়েছে, তা কমাতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশেই হামলা পরিচালিত হয়েছে বলে জানায় তারা। একই সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার কথাও উল্লেখ করা হয়।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরেই এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, এই জলপথে নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করার ইরানের চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য বড় হুমকি। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই নৌপথে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর প্রভাব এশিয়া থেকে ইউরোপ পর্যন্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেও পড়তে পারে। অন্যদিকে ইরান জানিয়ে দিয়েছে, তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। চলতি বছরের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল তদারকির দায়িত্বে থাকা ইরানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দেয়, অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা চলতে থাকলে কোনো জাহাজকে প্রণালি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। তারা জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার আবেদন বিবেচনা করা হবে। তবে ওয়াশিংটন এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে, হরমুজ প্রণালি ইরানের নিয়ন্ত্রণে নয় এবং সেখানে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। ইরানের হুমকি ও আগ্রাসনের মধ্যেও নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় মার্কিন বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর জানায়, তারা জর্ডানে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং ড্রোন ঘাঁটি, কুয়েতে একটি মার্কিন রাডার কেন্দ্র ও হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা, ওমানে বিমানবাহী রণতরির সহায়তা ও জ্বালানি সরবরাহ প্ল্যাটফর্ম এবং কাতারে একটি যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। ইরানের ফার্স বার্তা সংস্থা দাবি করেছে, কুয়েতে হামলার মূল লক্ষ্য ছিল মার্কিন হিমার্স ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও গোলাবারুদ সংরক্ষণাগার। অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, হামলায় তাদের উত্তরাঞ্চলের তিনটি সীমান্তকেন্দ্র এবং সমুদ্রের একটি তেল উত্তোলন প্ল্যাটফর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন কর্মী আহত হয়েছেন। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ঘটনাটিকে ‘অপরাধমূলক হামলা’ বলে উল্লেখ করেছে। কাতার জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে এক শিশুসহ তিনজন আহত হয়েছেন। দেশটি এই হামলার জন্য ইরানকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করেছে। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের সীমান্তের বাইরে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ভূপাতিত করেছে। বাহরাইনও জানিয়েছে, তারা আকাশপথে আসা হুমকি প্রতিহত করেছে। জর্ডান ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ওমান জানিয়েছে, তাদের কয়েকটি এলাকায় ড্রোন হামলা হয়েছে।
আরো পড়ুন
ইন্দোনেশিয়ায় বিয়ের অতিথিবাহী পিকআপে ২ ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১৩
নতুন করে শুরু হওয়া এই হামলা-পাল্টা হামলার কারণে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা আরো দুর্বল হয়ে পড়েছে। বৃহত্তর শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ৬০ দিনের অন্তর্বর্তী চুক্তির মাঝামাঝি সময়ে আবারও দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তার মতে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে তিনি ভবিষ্যতে আলোচনার পথ এখনও খোলা রয়েছে বলেও জানান। সংঘাত শুরুর এক দিন আগে মাসকাটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি হরমুজ প্রণালি নিয়ে বৈঠক করেন। ইরান জানায়, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমন্বয় করাই ছিল ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। পরে কাতারকে যুক্ত করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথাও জানানো হয়।
এ ছাড়া আরাঘচি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গেও ফোনে কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এসব কূটনৈতিক যোগাযোগের পরও ইরানের অবস্থান কঠোরই রয়েছে। দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এক্সে লিখেছেন, ‘একমুখী চুক্তির যুগ শেষ। আমরা আগেই বলেছিলাম, কথা রাখুন, না হলে মূল্য দিতে হবে।’ দুই পক্ষই সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। কেউই আপাতত পিছু হটার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। ফলে নতুন করে আলোচনায় ফেরার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে পড়ছে।