ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক অঞ্চলে জ্বালানি রেশনিং চালু করা হয়েছে এবং গ্যাস স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন স্বীকার করেছেন, জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা রয়েছে, তবে তিনি এটিকে সাময়িক বলে দাবি করেছেন।
তবে অনেক গাড়িচালক বলছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ। বিভিন্ন এলাকায় মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব এবার সরাসরি সাধারণ রুশ নাগরিকদের জীবনে পড়তে শুরু করেছে।
মার্চের শেষ দিক থেকে রাশিয়া ও রাশিয়ার দখলে থাকা ক্রিমিয়ায় তেল শোধনাগার, ডিপো, টার্মিনাল এবং অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেন ৫০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে বলে এপির হিসাব থেকে জানা গেছে। অনেক ক্ষেত্রে একই স্থাপনায় একাধিকবার হামলা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, কৃষ্ণ সাগর উপকূলের তুয়াপসে তেল শোধনাগারটিতে মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ে চারবার হামলা চালানো হয়। এসব হামলার প্রভাবে রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এনার্জি ইন্টেলিজেন্সের বিশ্লেষক গ্যারি পিচের মতে, জুন মাসে রাশিয়া দৈনিক ৩৯ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল জ্বালানিতে রূপান্তর করেছে, যা এক বছর আগের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম এবং দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তিনি বলেন, ‘এই বিভ্রাটগুলো অস্বাভাবিক।’
ইউক্রেনের হামলার প্রভাবে রাশিয়ার গ্যাসোলিন উৎপাদনও কমে গেছে। জুন মাসে দেশটির গ্যাসোলিন উৎপাদন ১৭ শতাংশ কমে দৈনিক ৮ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা এক বছর আগে ছিল ১০ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল। এই উৎপাদন দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্রো-অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ক্রিস ওয়েফার বলেন, রাশিয়ার তেল শোধনাগার সক্ষমতার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বর্তমানে অচল রয়েছে।
তিনি জানান, শোধনাগারগুলো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ না করায় বিভিন্ন সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়েছে। ওয়েফারের মতে, কৃষি ও ফসল কাটার মৌসুম শুরু হওয়ায় জ্বালানির চাহিদা বাড়ছে, ফলে এই সংকট রাশিয়ার অর্থনীতির জন্য আরো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে ইউক্রেন বলছে, এসব হামলার লক্ষ্য হলো রাশিয়ার সামরিক সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল করা এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা কমিয়ে আনা। ইউক্রেন বিশেষভাবে ক্রিমিয়াকে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।
২০১৪ সালে রাশিয়া ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া দখল করে নিলেও অধিকাংশ দেশ এই দখলকে স্বীকৃতি দেয় না। চলতি বছরের শুরুতে ইউক্রেনের হামলায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় মে মাসে ক্রিমিয়ায় জ্বালানি রেশনিং চালু করতে বাধ্য হয় মস্কো-সমর্থিত কর্তৃপক্ষ। কয়েক সপ্তাহ পর সাধারণ মানুষের কাছে জ্বালানি বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে সেভাস্তোপোল শহরে সীমিত পরিসরে জ্বালানি বিক্রি আবার শুরু করা হয়।
ইউক্রেন সম্প্রতি রাশিয়ার দুটি বৃহত্তম শহর মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গে বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা ক্রেমলিনের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩ জুন সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি তেল টার্মিনালে হামলার পর আকাশে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ১৮ জুন মস্কোর উপকণ্ঠে একটি তেল শোধনাগারেও হামলা হয়, যেখানে আগুন থেকে তৈরি কালো ধোঁয়া দূর থেকে দেখা যায়।
জুনের শেষ দিকে রাশিয়ার অর্ধেকের বেশি অঞ্চলে জ্বালানি রেশনিংয়ের খবর পাওয়া যায়। কোথাও গ্যাস স্টেশনগুলোতে জ্বালানি কেনার সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও সরাসরি বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রুশ কর্মকর্তারা সংকটের জন্য আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনাকে দায়ী করেছেন এবং জনগণকে শুধু প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি কেনার আহ্বান জানিয়েছেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার গ্যাসোলিন ও বিমান জ্বালানির রপ্তানি সীমিত করেছে। ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানান, কয়েকটি দেশের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে। তার মতে, বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা কমানোর লক্ষ্যেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এই ঘাটতি রাশিয়ার সেইসব দূরবর্তী অঞ্চলেও পৌঁছেছে যেখানে ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় কোনো শোধনাগার আক্রান্ত হয়নি। যেমন সাইবেরিয়া।