পাঁচ বছর আগে সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে মায়ানমারে সব পক্ষ মিলিয়ে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বুধবার জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন এন্ড ইভেন্ট ডাটা প্রোজেক্ট (এসিএলইডি)।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনাবাহিনী নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং নোবেলজয়ী অং সান সু চিকে আটক করে। এর মাধ্যমে দেশটির এক দশকের গণতান্ত্রিক যাত্রার অবসান ঘটে। অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দমন করলে অনেক আন্দোলনকারী শহর ছেড়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তারা বিভিন্ন জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে।
এসিএলইডিভ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে সংঘাত-সম্পর্কিত ঘটনায় ১ লাখ ১১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সরকারিভাবে মৃতের কোনো নির্ভরযোগ্য হিসাব নেই এবং বিভিন্ন সূত্রে সংখ্যার পার্থক্য দেখা যায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মায়ানমারের এই গৃহযুদ্ধ বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাতগুলোর একটি।
রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী থেইন আয়ে নু বলেন, ‘এই কষ্ট যেন শেষই হচ্ছে না। আমি খুবই ক্ষুব্ধ, কিন্তু এখন আর জানি না কার ওপর রাগ করব। শেষ পর্যন্ত এটাকেই নিয়তি ভেবে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে হচ্ছে।’ তার স্বামী গত মাসে একটি বিমান হামলায় নিহত হন।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমার টানা পাঁচ বছর সামরিক নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের শাসনের অধীনে ছিল। সম্প্রতি অত্যন্ত সীমিত একটি নির্বাচনের পর তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে এপ্রিলে বেসামরিক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে নির্বাচনে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অনেক এলাকায় ভোট হয়নি এবং অং সান সু চির দলও কার্যত অংশ নিতে পারেনি।
গণতন্ত্রপন্থী পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনকে মিন অং হ্লাইংয়ের ক্ষমতা ধরে রাখার একটি প্রহসন বলে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো তার শান্তি আলোচনার প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। মধ্য মাগওয়ে অঞ্চলের মিত চে শহরের এক বাসিন্দা বলেন, ‘অভ্যুত্থান না হলে আজ শিশুরা স্কুলে পড়াশোনা করত।’ তার ছেলে বাড়ি ছেড়ে গণতন্ত্রপন্থী বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল এবং পরে যুদ্ধে নিহত হয়।
শোকাহত ওই বাবা বলেন, ‘আমরা ঠিকমতো বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যও করতে পারিনি। চারদিকে ভারী গোলাবর্ষণ চলছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘সে আমাদের জন্য অনেক স্মৃতি রেখে গেছে। তার জন্য আরো কিছু করতে না পারার কষ্ট সবসময় থেকে যাবে।’
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মায়ানমারে ৩৭ লাখেরও বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশজুড়ে দারিদ্র্য বাড়ছে এবং প্রতি পাঁচজনের একজন তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। সবচেয়ে বড় শহর ইয়াঙ্গুনে সহিংসতা অনেক সময় গুপ্তহত্যার রূপ নেয়। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলছে এবং সেনাবাহিনীর যুদ্ধবিমান থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিমান হামলা চালানো হচ্ছে।
সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পর মায়ানমার ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক সংঘাত-প্রবণ এলাকা। সংস্থাটি এই গৃহযুদ্ধে এক হাজার ২০০টিরও বেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে।
এসিএলইডির জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক সান মন থান্ট বলেন, ‘এই সংঘাত অত্যন্ত প্রাণঘাতী, বেসামরিক মানুষের জন্য ভয়াবহ এবং এটি দেশের প্রায় সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।’ যুদ্ধের পরিস্থিতি সময়ে সময়ে উভয় পক্ষের পক্ষেই পরিবর্তিত হয়েছে।
২০২৩ সালের শেষ দিকে বিদ্রোহীদের সমন্বিত আক্রমণে তারা বড় ধরনের সাফল্য পায় এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ের দিকে অগ্রসর হয়। তখন এমনও ধারণা করা হচ্ছিল যে, তারা ঐতিহাসিক এই শহরটি দখল করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সমর্থন পাওয়ার পর এবং বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় দুটি শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ায় সামরিক বাহিনী আবারও কৌশলগত সুবিধা ফিরে পেয়েছে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৈন্যসংকট মোকাবিলায় মায়ানমারের সামরিক সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার আইন কার্যকর করে। এর মাধ্যমে প্রায় ৫০ হাজার নাগরিককে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। একজন সাবেক বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত সেনা পালিয়ে যান এবং তিনি বলেন, ‘নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের কোনো প্রস্তুতি নেই। মনে হয় তাদের শুধু মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ২০ বছর বয়সী এক যুবক বলেন, ‘এক জায়গায় না মরলে, তারা তোমাকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়।’ মায়ানমারের এই গৃহযুদ্ধের প্রভাব দেশটির সীমান্ত পেরিয়েও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েছে এবং শরণার্থী শিবিরগুলোতে চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতে জড়িত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী হেরোইন ও মেথামফেটামিনসহ মাদক উৎপাদন ও পাচার থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে তাদের যুদ্ধের খরচ চালাচ্ছে। এ ছাড়া মায়ানমারের দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত সীমান্ত এলাকাগুলো অনলাইন প্রতারণা চক্রের বড় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। এসব প্রতারণা কার্যক্রম প্রায়ই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সুরক্ষায় পরিচালিত ঘাঁটি থেকে পরিচালিত হয় বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।





