ভারতের সেনাবাহিনীর ৩১তম প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জেনারেল ধীরজ শেঠ। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আধুনিক একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, এই পরিকল্পনার ভিত্তি হলো তার ‘বিজয়’ (VIJAY) কাঠামো, যেখানে সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও রূপান্তরের জন্য পাঁচটি মূল দিক নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেওয়া প্রথম ভাষণে জেনারেল শেঠ বলেন, এই মুহূর্ত তাঁর জন্য 'অত্যন্ত গর্বের এবং আবেগের'। তিনি বলেন, তিনি সব সময় 'কর্তব্য, সম্মান এবং সবার আগে দেশ'- এই নীতিতে অটল থাকবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান, তাঁকে দেশের সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য। নতুন সেনাপ্রধান দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা সেনাসদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, তাঁদের সাহস ও আত্মত্যাগ আগামী প্রজন্মের সেনাদের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। জেনারেল শেঠ বলেন, বিশ্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য আরো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী এখন একটি 'যুদ্ধ-প্রস্তুত ও অভিজ্ঞ বাহিনী', তবে যুদ্ধের ধরন বদলেছে। তাই প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং সমন্বয়ের ওপর এখন বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এই লক্ষ্যেই তিনি তাঁর ‘বিজয়’ কাঠামো ঘোষণা করেন। এতে প্রতিটি অক্ষর আলাদা একটি মূল দিককে নির্দেশ করে।
ভি- সতর্কতা ও প্রস্তুতি (Vigilance and Preparedness)
তিনি বলেন, সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা এবং যেকোনো হুমকির জন্য প্রস্তুত থাকা হবে প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী সবসময় সর্বোচ্চ মাত্রার প্রস্তুত অবস্থায় থাকবে, যাতে যেকোনো নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের কার্যকর জবাব দেওয়া যায়।
আই- উদ্ভাবন ও পরিবর্তন (Innovation and Transformation)
সেনাপ্রধান জানান, সামরিক নীতি ও প্রযুক্তিতে নতুন উদ্ভাবন জরুরি। যুদ্ধের বাস্তবতা বদলাচ্ছে, তাই সেনাবাহিনীর চিন্তা, সক্ষমতা এবং পরিচালনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।
জে- যৌথ কার্যক্রম ও সমন্বয় (Jointness and Integration)
তিনি বলেন, আধুনিক যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর মধ্যে আরো ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি বেসামরিক ক্ষেত্রের সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন খাতের সমন্বিত কাজ জরুরি।
এ- আত্মনির্ভরতা (Atmanirbharata)
জেনারেল শেঠ বলেন, ভারতীয় সেনাবাহিনীকে ধীরে ধীরে দেশীয় প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য হবে নিজস্ব সমাধানের মাধ্যমে যুদ্ধ জেতা। বিদেশি সরঞ্জামের ওপর নির্ভরতা কমানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ওয়াই- যোদ্ধাই মূল শক্তি (Yodha First)
তিনি সেনাসদস্যদের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন। অগ্নিবীর থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য- সবাইকে তিনি ‘যোদ্ধা’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, প্রতিটি সেনার প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও পেশাগত মান উন্নত করা হবে তার অঙ্গীকার। একই সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত সেনা এবং শহীদ পরিবারের কল্যাণেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জেনারেল শেঠ তার পূর্বসূরি জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীসহ সাবেক সেনাপ্রধানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, তাদের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। ভাষণের শেষ দিকে তিনি বলেন, তাঁর ‘বিজয়’ কাঠামো প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত যৌথ কার্যক্রম, উদ্ভাবন ও আত্মনির্ভরতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই নীতিগুলোই সেনাবাহিনীর রূপান্তরের দিকনির্দেশনা দেবে। নিজের ও সেনাবাহিনীর জন্য স্লোগান হিসেবে তিনি বলেন, 'জয় সে বিজয়'- অর্থাৎ আহ্বান থেকে বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া। 'জয় হিন্দ, জয় ভারত' বলে তিনি তার ভাষণ শেষ করেন।






