• ই-পেপার

পাল্টাপাল্টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন ও রাশিয়া

ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হচ্ছে রবিবার

অনলাইন ডেস্ক
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হচ্ছে রবিবার
সংগৃহীত ছবি

উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক (মেমোরেন্ডাম) আগামী রবিবারের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হতে পারে। একটি পশ্চিমা সূত্র জানিয়েছেন, সম্ভাব্য চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হিসেবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভার নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির ভাষা এখনো চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তবে ইরান তার অবস্থানে অনড় রয়েছে যে, সমঝোতার অংশ হিসেবে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নয়, লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। যেখানে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে।

সূত্রটি জানায়, শনিবারের মধ্যে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। যাতে রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ আনুষ্ঠানিকভাবে এতে স্বাক্ষর করতে পারেন।

সমঝোতার আগাম বার্তা ট্রাম্পের

এর আগে স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা অর্জিত হয়েছে এবং সে কারণেই তিনি নতুন সামরিক হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছেন।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি দুর্দান্ত সমাধান করেছি।’

তবে ইরানি কর্মকর্তাদের বর্ণনা অনুযায়ী, চুক্তির খসড়ায় তেহরানের দীর্ঘদিনের বেশ কয়েকটি দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দকৃত বিলিয়ন ডলারের সম্পদ মুক্ত করা এবং লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও সম্পদ মুক্তির প্রস্তাব

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, খসড়া চুক্তিতে ইরানের তেল খাতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা বিপুল অর্থ ছাড়ের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এছাড়া পারমাণবিক ইস্যু আপাতত ভবিষ্যৎ আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। 

তবে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে। তবে তেহরান বরাবরই বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের মেহর সংবাদ সংস্থা জানায়, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছাকাছি থেকে সামরিক উপস্থিতি কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং দেশটির যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পরিকল্পনা উপস্থাপনের বিষয়েও সম্মত হয়েছে।

ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া

সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শুক্রবার বিশ্ব শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা যায় এবং অপরিশোধিত তেলের দামও কমতে শুরু করে। ইউরোপীয় লেনদেনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ শতাংশের বেশি কমে যায়।

ট্রাম্প বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত হবে। যা ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার পর তেহরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া

তবে সম্ভাব্য চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, যা ইসরায়েলের জন্য গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেও চলমান শান্তি আলোচনায় সরাসরি অংশ নিচ্ছে না।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য কোনো সমঝোতা স্মারকের পক্ষভুক্ত নয় ইসরায়েল।

উত্তেজনা চলমান

সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।

একই সময়ে ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দেশটির বাহিনী একটি তেলবাহী জাহাজের চলাচল আটকে দিয়েছে এবং এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমছে নাকি কৌশল বদলাচ্ছে?

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা কমছে নাকি কৌশল বদলাচ্ছে?
ছবি : রয়টার্স।

ইরানের সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার ভাষায়, ইরানের সাধারণ মানুষ একটি দমনমূলক শাসনের অধীনে বসবাস করছে।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের জনগণ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, কারণ তারা কঠোর দমন-পীড়ন ও অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনীর ভয়ে থাকে।

ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসে প্রচারিত এক ফোন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ইরানি জনগণের প্রতি আমার বার্তা হলো, তারা ভীত। তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই, কিন্তু অন্য পক্ষের হাতে অস্ত্র আছে। তারা সমাবেশ করলে গুলিবিদ্ধ হয়।’

১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর থেকে ইরানের সরকার ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন ও সিরিয়ায় তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। তারা বলে, এটি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। এসব হামলায় সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি অবকাঠামো ও বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

ইরানের দাবি, তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে আরো বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন, যার মধ্যে খার্গ দ্বীপ ও এর তেল স্থাপনা দখলের কথাও ছিল। অন্যদিকে তিনি আলোচনার জন্যও সময় দিয়েছেন।

ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এবার তিনি সত্যিই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, যাতে চলমান সংঘাত কমানো বা বন্ধ করা যায়। তিনি বলেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরের সময় ও স্থান শিগগিরই ঘোষণা করা হবে।’ সম্ভাব্য স্থান হিসেবে তিনি ইউরোপের কথা উল্লেখ করেন।

ট্রাম্প আরো দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা দেশটির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং অনুমোদনও পেয়েছে। এ কারণে তিনি ওই রাতে ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা ও বোমাবর্ষণ স্থগিত করেছেন।

ট্রাম্পের এসব মন্তব্যের পর শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যায় এবং তেলের দাম কমে যায়। তবে শুক্রবার ইরান জানায়, যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দাবি করেছিলেন, কয়েক দিনের মধ্যেই একটি চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে।

ইরানি জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় ট্রাম্প বলেন, তিনি সেতু, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা এড়াতে চান, কারণ এতে সাধারণ মানুষ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ব্রায়ান কিলমিডকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি চাইলে এক মিনিটের মধ্যেই তা করতে পারি। কিন্তু আমি তা করতে চাই না, কারণ একবার এমন হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বে।’

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে একাধিক দফা হামলা চালিয়েছে। পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যার ফলে অঞ্চলটি তেল বিক্রি থেকে বিপুল আয় হারিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, আলোচনা অগ্রগতি না হলে আরো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে ইরান কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। একই সময়ে দুই পক্ষের মধ্যে পর্দার আড়ালেও আলোচনা চলেছে।

ইরানের সরকার ও জনগণের মধ্যে পার্থক্য

ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ইরানের সরকার ও সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে। তিনি এর আগেও বলেছিলেন, যদি ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে, তবে তা দেশটির জনগণের অসন্তোষ ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে হতে পারে, সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোর দমন-পীড়ন চালায়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এর আগে এ ধরনের ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন।

ট্রাম্পের সমালোচক এবং কিছু ইরানি বিরোধী নেতা মনে করেন, অবকাঠামোতে হামলার পরিবর্তে ইরানের শাসকগোষ্ঠী ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আরো সরাসরি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

কেউ কেউ সাধারণ নাগরিকদের সহায়তা বা অস্ত্র দেওয়ার পক্ষেও মত দিয়েছেন। তবে আলোচনা চলার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা ও অবস্থানের ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অন্য সমালোচকরা।

এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী একটি গোপন অভিযানের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ২০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করেছে।

এসব জাহাজে বহন করা অপরিশোধিত তেলের মূল্য ছিল প্রায় ৭.৮ থেকে ৯ বিলিয়ন ডলার। তার দাবি, এই অভিযানের মাধ্যমে জাহাজগুলোকে ইরানের সম্ভাব্য বাধা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করা হয়েছে।

অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকার পরিবহন 

ট্রাম্প দাবি করেছেন, গোপন এক মার্কিন অভিযানে ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল প্রণালি দিয়ে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানি রাডার সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করা হয়। এরপর মার্কিন সামরিক বাহিনী এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো আলো ছাড়াই গভীর রাতে ট্যাংকার ট্রানজিট সমর্থন করেছিল।

ট্রাম্প বিশেষভাবে এমন একটি অভিযানের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ২২টি তেলবাহী জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা করা হয়েছিল। তার দাবি, এই প্রচেষ্টার ফলে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। তার মতে, তেলের দাম যেখানে প্রতি ব্যারেল ২৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারত, সেখানে তা প্রায় ৮৫ ডলারে সীমাবদ্ধ ছিল।

তবে ট্রাম্পের এই দাবির স্বাধীন কোনো যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (পেন্টাগন) ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারাও প্রকাশ্যে এসব তথ্য বা সংখ্যার সত্যতা নিশ্চিত করেননি।

বেলফাস্টে পুরনো ইতিহাসের ‘নতুন রূপ’, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সংখ্যালঘুরা

অনলাইন ডেস্ক
বেলফাস্টে পুরনো ইতিহাসের ‘নতুন রূপ’, আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে সংখ্যালঘুরা
সংগৃহীত ছবি

উত্তর আয়ারল্যান্ডের দীর্ঘ সংঘাতময় ইতিহাসের পরও সমাজে বিভাজনের বিভিন্ন রূপ এখনও বিদ্যমান। রাজধানী বেলফাস্টে সাম্প্রতিক সহিংসতা অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, বেলফাস্টে অভিবাসী বলে ধারণা করা ব্যক্তিদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে । মুখোশধারী কয়েকটি দল শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাণ্ডব চালানোর পর অনেক পরিবার ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। 

সহিংসতার সূত্রপাত

গত মঙ্গলবার ছুরিকাঘাতের ঘটনায় একজন সুদানি নাগরিকের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। পরে ওই রাতেই বেলফাস্টের কয়েকটি এলাকায় মুখোশধারী একটি দল ঘুরে ঘুরে বাড়ি ও গাড়িতে আগুন দেয়। একই সঙ্গে জাতিগত সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পরদিন বুধবারও বিচ্ছিন্নভাবে অনেক সহিংসতার ঘটনা ঘটে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্রিটিশ সরকারের উত্তর আয়ারল্যান্ডবিষয়ক মন্ত্রী হিলারি বেন এসব হামলাকে ‘বর্ণবাদী সন্ত্রাসী তৎপরতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

যুদ্ধ থেকে পালিয়ে এসেও নিরাপত্তাহীন

২০১৬ সালে সুদান থেকে শরণার্থী হিসেবে উত্তর আয়ারল্যান্ডে যান তওয়াসুল মোহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘অনেক নারী ও শিশু ভয়াবহ মানসিক চাপে রয়েছে। আমরা সন্তানদের ঘরেই রাখছি। এসব ঘটনার পর থেকে আমি আমার সন্তানদের স্কুলে পাঠাইনি।’

তার মতে, যেসব মানুষ যুদ্ধ ও সংঘাত থেকে বাঁচতে নিজেদের দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন, তাদের জন্য এই পরিস্থিতি পুরোনো দুঃসহ স্মৃতিকে আবারও ফিরিয়ে এনেছে।

ওই দেশে অবস্থান নিয়ে আবাসন সংকট বা স্বাস্থ্যসেবার সংকট তৈরি করিনি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অভিবাসীরা কোনো সমস্যা নয়। আমরা সবাই এই সমাজের অংশ হতে চাই এবং এর উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই।’

১

বার্তা সংস্থা আলজাজিরা বলছে, সুদান থেকে আসা তিন সন্তানের মা জেইনাব। তার বাড়ির কাছে পূর্ব বেলফাস্টে সহিংসতা শুরু হয়। এ অবস্থায় আতঙ্কিত হয়ে পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে তিনি একটি এনজিও—আনাকা উইমেনস কালেকটিভের সহায়তা চান।

শেষ মেষ অন্য অনেক বর্ণবাদী হামলার শিকার মানুষের মতো তিনিও একটি আইরিশ পরিবারের আশ্রয় পান এবং বর্তমানে বেলফাস্টের বাইরে নিরাপদ স্থানে অবস্থান করছেন।

জেইনাব বলেন, ‘এখানে আমরা অনুভব করেছি যে এখানে সবাই বিদেশিদের অপছন্দ করে না। এখনও ভালো মানুষ আছে—যারা আমাদের ভালোবাসে, নিজেদের ঘর আমাদের জন্য খুলে দিয়েছে। তারা আমাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ভাগ করে নিয়েছে। দুর্বল মুহূর্তে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং আমাদের আশ্রয় দিয়েছে।’

কর্মস্থলে হয়রানি

সরকারি খাতের শ্রমিক ইউনিয়ন ইউনিসনের আঞ্চলিক সচিব প্যাট্রিসিয়া ম্যাককিওন জানান, সহিংসতার আশঙ্কায় অন্তত ৩০টি পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে।

তার অভিযোগ, কিছু এলাকায় স্বঘোষিত পাহারাদার দল রাস্তায় মানুষের পরিচয় যাচাই করছে। বিশেষ করে হাসপাতালের বাইরে কর্মীদের থামিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাওয়া, ভিডিও ধারণ করা এবং অনুসরণ করার ঘটনা ঘটছে।

2

তিনি বলেন, ‘গত রাতে শহরের পূর্বাঞ্চলের একটি বড় হাসপাতালে চার মুখোশধারী ব্যক্তি এক নার্সকে ধাওয়া করেছে। এসব ঘটনা সাধারণ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।’

সংকটের মধ্যেও মানবিকতা

তবে সহিংসতার মধ্যেও অনেক সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিন বছর আগে ভারত থেকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে আসা রুচিরা রঙ্গপ্রসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য রান্না করা খাবার সরবরাহের ঘোষণা দিলে ব্যাপক সাড়া পান।

তিনি জানান, ৩০ জনেরও বেশি স্বেচ্ছাসেবক খাদ্য বিতরণে সহযোগিতা করেছেন। গত বুধবার কয়েক ডজন খাদ্য প্যাকেট ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

রুচিরা বলেন, মানুষ ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে। কিন্তু খাবার একটি মৌলিক প্রয়োজন, বিশেষ করে পুষ্টিকর ঘরে তৈরি খাবার। তাই আমি ভেবেছি, রান্না করে মানুষকে সাহায্য করি।’

‘ঘৃণা ছড়ানো লোকেরা সংখ্যালঘু’

বেলফাস্ট ইসলামিক সেন্টারের নির্বাহী কমিটির সদস্য কাশিফ আকরাম বলেন, ‘সাম্প্রতিক সহিংসতা হৃদয়বিদারক হলেও এটি পুরো বেলফাস্টের চিত্র নয়।’

জন্মসূত্রে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা আকরাম বলেন, ‘বেলফাস্টে অনেক ভালো মানুষ আছেন। যারা এখন ঘৃণা ছড়াচ্ছে, তারা সংখ্যায় খুবই কম। প্রকৃতপক্ষে তারাই সংখ্যালঘু।’

প্রসঙ্গত, উত্তর আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ ও রক্তাক্ত সংঘাত ‘দ্য ট্রাবল্‌স’ নামে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকের শেষ থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৮ সালের ‘গুড ফ্রাইডে’ চুক্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।

মূলত যুক্তরাজ্যে থাকা বা না থাকা নিয়ে আয়ারল্যান্ডের এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের দুটি প্রধান গোষ্ঠীর মধ্যে এই বিরোধ ছিল। তারা মধ্যে ইউনিয়নবাদী বা প্রোটেস্ট্যান্ট- যারা নিজেদের ব্রিটিশ মনে করে এবং যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবে থাকতে চেয়েছিল। অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী বা ক্যাথলিক- যারা আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সাথে যুক্ত হয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড গঠন করতে চেয়েছিল।

প্রায় তিন দশক ধরে চলা এই সংঘর্ষে আধা-সামরিক বাহিনী, পুলিশ এবং ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মধ্যে নিয়মিত বোমা হামলা, হত্যাকাণ্ড ও সংঘাত হয়েছে। এতে সাড়ে ৩ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। সবশেষ ১৯৯৮ সালের গুড ফ্রাইডে চুক্তির ফলে উভয় পক্ষ অস্ত্র সমর্পণ করে এবং ক্ষমতা ভাগাভাগির সরকার গঠিত হয়।

ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের ধাক্কা

অনলাইন ডেস্ক
ব্রিটিশ অর্থনীতিতে ইরান যুদ্ধের ধাক্কা
সংগৃহীত ছবি

ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি সংকুচিত হয়েছে।

দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ওএনএস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য থেকে এ চিত্র উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা

ওএনএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ০.১ শতাংশ কমেছে। এর আগে মার্চ মাসে অর্থনীতি ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানের পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে।

অর্থনৈতিক তথ্য প্রকাশের পর ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী র‍্যাচেল রিভস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুরুর আগে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল এবং মূল্যস্ফীতি কমছিল।’

তিনি আরো বলেন, ‘এটি এমন একটি যুদ্ধ নয়, যা আমরা চেয়েছিলাম বা যাতে আমরা অংশ নিয়েছি। কিন্তু এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়বে।’

অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি যুক্তরাজ্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে নতুন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাজ্যে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। যা দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার নীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে এবং বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আগামী মাসগুলোতে অনেকটাই নির্ভর করবে জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।