ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নির্মাণ কর্মসূচি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জার্মানি ও ফ্রান্স। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মতবিরোধ ও অচলাবস্থার কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় দুই দেশের শীর্ষ নেতারা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত সপ্তাহে মন্টিনিগ্রোতে অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন-পশ্চিম বলকান সম্মেলনের ফাঁকে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। জার্মান কর্মকর্তারা মনে করেন, প্রকল্পে জড়িত অস্ত্র ও মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েক মাস ধরে চলা অচলাবস্থা নিরসনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যায়নি।
আরো পড়ুন
ফিলিপাইনে ভূমিকম্পে নিহত বেড়ে ৩৫, বাস্তুচ্যুত হাজারো পরিবার
এর পরিপ্রেক্ষিতে ফ্রিডরিখ মার্জ ম্যাক্রোঁকে যৌথ যুদ্ধবিমান নির্মাণ পরিকল্পনা নিয়ে আর না এগোনোর পরামর্শ দেন।
ম্যাক্রোঁর কার্যালয় জানিয়েছে, দুই নেতা দীর্ঘ সময় ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং জার্মানি ও স্পেনের প্রতিনিধিত্বকারী ইউরোপীয় মহাকাশ প্রতিষ্ঠান এয়ারবাস এবং ফ্রান্সের দাসো অ্যাভিয়েশনের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
প্রকল্পটির সমাপ্তি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকি নিয়ে সতর্ক করছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপকে নিজেদের সামরিক সক্ষমতা জোরদারের জন্য চাপ বাড়াচ্ছে।
আরো পড়ুন
রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনে নিহত ৩
২০১৭ সালে সাবেক জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকল্পটি শুরু করেছিলেন ম্যাক্রোঁ। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এ উদ্যোগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে এ বিষয়ে ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, প্রকল্প বাতিল হলেও ফ্রান্স-জার্মানির প্রতিরক্ষা সহযোগিতা উভয় দেশ এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের এই প্রকল্পের অংশীদার ছিল স্পেনও। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির ব্যর্থতা ইউরোপের সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
আরো পড়ুন
ট্রাম্পের আরোপ করা ১ লাখ ডলারের এইচ-১বি ভিসা ফি অবৈধ ঘোষণা মার্কিন আদালতের
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল একটি ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করা, যা ড্রোন ও অত্যাধুনিক ‘কমব্যাট ক্লাউড’ প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। তবে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, মেধাস্বত্ব এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব নিয়ে এয়ারবাস ও দাসোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলছিল।
একটি ইউরোপীয় সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের মূল যুদ্ধবিমান অংশ বাতিল হলেও ‘ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম (এফসিএএস)’ নামের আওতায় কিছু প্রযুক্তি উন্নয়ন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এর মধ্যে নিরাপদ যোগাযোগভিত্তিক ‘কমব্যাট ক্লাউড’ ব্যবস্থাও রয়েছে।
জার্মানির প্রভাবশালী শ্রমিক ইউনিয়ন আইজি মেটাল প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির উপ-চেয়ারম্যান ইয়ুর্গেন কার্নার বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট ছিল যে দাসো ও এয়ারবাস সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে কাজ করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত জার্মানির বিমান শিল্প ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে প্রয়োজনীয় ছিল।
আরো পড়ুন
দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকে পিকআপের ধাক্কা, নিহত ৪
এদিকে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকরা বলেন, প্রকল্পটির ব্যর্থতা ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সহযোগিতার জন্য একটি বড় ধাক্কা।
আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএস-এর সামরিক বিমান বিশেষজ্ঞ ডগলাস ব্যারি বলেন, এটি ওয়াশিংটন কিংবা মস্কো—কোনো পক্ষের কাছেই ইতিবাচক বার্তা নয়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ফ্রান্সিস টুসা বলেছেন, প্রকল্পটি গত তিন বছর ধরেই কার্যত জীবনরক্ষাকারী ব্যবস্থার ওপর টিকে ছিল।
অন্যদিকে চ্যান্সেলর মার্জ প্রকাশ্যেই প্রশ্ন তুলেছেন, জার্মান বিমানবাহিনীর জন্য মানবচালিত ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান আদৌ প্রয়োজন কি না। তিনি আরো বলেছেন, জার্মানির এমন কোনো পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমানের প্রয়োজন নেই, যা বিমানবাহী রণতরীতে অবতরণ করতে পারে।
সূত্র : রয়টার্স