দুই দশকেরও বেশি সময় আগে শুরু হওয়া একটি বিবাহবিচ্ছেদের মামলা অবশেষে শেষ হয়েছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত নারী বর্ষা গোহিল। যুক্তরাজ্যের এই আলোচিত বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় ৬.৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৮৫ কোটি রুপি) পেয়েছেন তিনি।
মামলাটি ২০০২ সালে শুরু হয়। তখন বর্ষা তার স্বামী ভদ্রেশ গোহিলের বিরুদ্ধে পরকীয়া ও অসঙ্গত আচরণের অভিযোগ এনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। তখন তাদের তিনটি সন্তান ছিল। বিচ্ছেদের সময় দুজনের মধ্যে একটি আর্থিক সমঝোতা হয়, যেখানে বর্ষা প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩.৫ কোটি রুপি) এবং পরিবারের পিউজো গাড়িটি পান।
তবে বর্ষার সন্দেহ ছিল যে, তার স্বামী তার সব সম্পদের তথ্য আদালতে প্রকাশ করেননি। সেই সন্দেহের কারণেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত আদালত তার পক্ষে রায় দেয় এবং তিনি বড় অংকের এই অর্থ পান।
বহু বছর ধরে বর্ষা গোহিলের সন্দেহের পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় যখন তার সাবেক স্বামী ভদ্রেশ গোহিল একটি বড় অর্থপাচার (মানি লন্ডারিং) তদন্তের আওতায় আসেন। এই তদন্তটি ছিল নাইজেরিয়ার সাবেক গভর্নর জেমস ইবোরির সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, ভদ্রেশ বিভিন্ন অফশোর কম্পানি ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে কোটি কোটি পাউন্ড সরিয়ে নিতে সাহায্য করেছিলেন। দীর্ঘ তদন্তের পর তিনি অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং প্রতারণার ষড়যন্ত্রের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০১১ সালে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তদন্ত চলাকালে এমন অনেক সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসে, যার মূল্য ছিল কয়েক কোটি পাউন্ড এবং যেগুলোর কথা মূল বিবাহবিচ্ছেদের মামলায় প্রকাশ করা হয়নি।
পরে প্রসিকিউটররা প্রায় ২৮ মিলিয়ন পাউন্ড জব্দ করার উদ্যোগ নেয়, যা বিভিন্ন দেশের কম্পানির মাধ্যমে গোপন রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ছিল। এই নতুন তথ্য ও গোপন সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর বর্ষা গোহিলের পুরোনো বিবাহবিচ্ছেদ চুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার প্রচেষ্টা নতুন গতি পায়।
এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালত, অর্থাৎ যুক্তরাজ্যের সর্বোচ্চ আদালতে পৌঁছায়। ২০১৫ সালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত বর্ষা গোহিলকে পুরোনো আর্থিক সমঝোতা আবার খোলার অনুমতি দেয়।
বিচারকরা বলেন, কোনো স্বামী বা স্ত্রী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের সম্পদের পুরো তথ্য গোপন করেন, তাহলে তিনি সেই গোপনীয়তার সুবিধা ভোগ করতে পারেন না। আদালতের এই রায়ের ফলে বর্ষা নতুন করে তার পাওনা দাবি করার সুযোগ পান। তবে এরপরও মামলার লড়াই শেষ হয়নি।
এর আগে বহু বছর ধরে বর্ষার সন্দেহের পক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ ছিল না। কিন্তু তার সাবেক স্বামী ভদ্রেশ গোহিল একটি বড় অর্থপাচার মামলায় জড়িয়ে পড়লে নতুন তথ্য সামনে আসে। তদন্তে দেখা যায়, তার কাছে কোটি কোটি পাউন্ড মূল্যের এমন সম্পদ ছিল, যা বিবাহবিচ্ছেদের সময় প্রকাশ করা হয়নি।
এই গোপন সম্পদের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর বর্ষার দাবি আরো শক্তিশালী হয় এবং তিনি দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম হন। শেষ পর্যন্ত আদালত তার পক্ষে রায় দেয় এবং তিনি প্রায় ৬.৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৮৫ কোটি রূপি) পান।
এই মামলায় যুক্তরাজ্যের ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিস দাবি করেছিল, জব্দ করা সম্পদের সবই অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ, তাই সেগুলো সরকার বাজেয়াপ্ত করতে পারে। কিন্তু বর্ষা গোহিলের দাবি ছিল, এই সম্পদের অন্তত একটি অংশ তাদের বৈবাহিক জীবনে বৈধ ব্যবসা থেকে অর্জিত হয়েছিল। তাই সেটিকে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সম্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
অন্যদিকে ভদ্রেশ গোহিল দাবি করেন, এসব সম্পদের মালিক তিনি নন। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের হাইকোর্টে যায়। সেখানে বিচারপতি বিচারপতি উইলিয়ামস জব্দ করা সম্পদ নিয়ে সব পক্ষের দাবি-দাওয়া পর্যালোচনা করেন।
তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান, সম্পদের একটি অংশ বৈধভাবে অর্জিত হয়েছিল এবং তা দাম্পত্য সম্পত্তির অংশ। তিনি প্রায় ৬.৬৬ মিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৮৫ কোটি রুপি) বৈধ সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং সেই অর্থ বর্ষা গোহিলকে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বিচারপতি বলেন, ভদ্রেশ গোহিলের অসততা অত্যন্ত গুরুতর ছিল এবং এর পরিণতিও ছিল বড়। তিনি আরো মন্তব্য করেন, ভদ্রেশ ছিলেন ‘সম্পূর্ণ ও সর্বব্যাপীভাবে অসৎ’। দীর্ঘ এই আইনি লড়াই সম্পর্কে বিচারপতি বলেন, ‘গোহিল’ নামটি বিভিন্ন দেশের আইনজীবী ও বিচারকদের মনে দীর্ঘদিন থাকবে, কারণ মামলাটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছে।
অবশেষে গত মাসে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের আপিল আদালত রায় দেয়, এই মামলায় আর কোনো আপিল করা যাবে না। এর ফলে প্রায় ২৪ বছর ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।




