কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, অন্টারিওর উইন্ডসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানের ডেট্রয়েটকে যুক্ত করা নতুন গর্ডি হাও সেতু থেকে আদায় হওয়া টোলের অর্থ শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভাগ করবে না কানাডা। তিনি জানান, সেতু নির্মাণে কানাডার করা পুরো বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার পরই টোল আয়ের ভাগাভাগি শুরু হবে।
প্রায় ৪৭০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুর উদ্বোধন ঘিরে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। দুই দেশের অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। একই সময়ে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নতুন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি কানাডার দাবানল মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিবিদ সমালোচনা করছেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ২৭ জুলাই উদ্বোধনের জন্য নির্ধারিত গর্ডি হাও সেতু চালু নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য 'অনেক ভালো একটি চুক্তি' নিশ্চিত করেছেন। এরপর কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেন, আগে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এই সেতু থেকে কোনো আয় পেত না, এখন দেশটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ পাবে। এ নিয়ে কানাডার বিরোধী রাজনীতিবিদরা প্রধানমন্ত্রী কার্নির সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রকে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়েছে। তবে বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কার্নি বলেন, মিশিগানের সঙ্গে করা মূল চুক্তিতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
আরো পড়ুন
কঙ্গোর রেইনফরেস্টে নতুন প্রজাতির বানরের সন্ধান বিজ্ঞানীদের
কার্নি বলেন, ২০১২ সালের চুক্তি অনুযায়ী, সেতুর নির্মাণ খরচ পুরোপুরি বহন করেছে কানাডা। তাই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত টোল থেকে আসা পুরো আয় পাওয়ার অধিকার কানাডার রয়েছে। তিনি বলেন, 'সব ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত টোলের আয় ভাগাভাগি হবে না।' কার্নি জানান, সেতুর পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং তুষার পরিষ্কারের খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রথম ১৫ বছর কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র নিট আয় ভাগ করবে। তিনি বলেন, 'এসব খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রথম কয়েক বছরে নিট আয় খুব বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই।'তার মতে, যখন আয় ভাগাভাগি শুরু হবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অংশের অর্থও আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করা হবে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া নতুন সমঝোতার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন—এমন দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, গত সপ্তাহে একটি সমঝোতা হয়েছে। ওই সমঝোতা অনুযায়ী, টোল থেকে পাওয়া লাভের ৫০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র পাবে। সূত্রগুলো আরো জানায়, বর্তমান টোলের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব এলে যুক্তরাষ্ট্র তা আটকে দেওয়ার ক্ষমতা পাবে।
এদিকে কানাডার উত্তর অন্টারিওতে চলমান দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য-পশ্চিম থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিশিগানের রিপাবলিকান নেতারা প্রধানমন্ত্রী কার্নির সমালোচনা করেছেন। মিশিগানের প্রতিনিধি জ্যাক বার্গম্যান, জন জেমস, লিসা ম্যাকক্লেইন এবং জন মূলেনার অভিযোগ করেন, বন ব্যবস্থাপনা, আগুন ছড়ানোর ঝুঁকি কমানো এবং পরিকল্পিতভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা হয়নি। তারা আরো অভিযোগ করেন, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনার বিরুদ্ধেও যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দাবানল নিয়ে সমালোচনার জবাবে কার্নি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখা উচিত। তিনি বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন বড় কারণ। কার্নি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা দরকার। এই দায়িত্ব সবার। সত্যিই সবার। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রও রয়েছে।'
কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিষয়ক অধ্যাপক ফেন হ্যাম্পসন মনে করেন, গর্ডি হাও সেতুর চুক্তি কানাডার জন্য একটি সাফল্য। তিনি বলেন, যখন টোল আয় ভাগাভাগির পর্যায় আসবে, তখন ভাগ করার মতো খুব বেশি অর্থ নাও থাকতে পারে। কারণ এর আগেই কানাডা নিজের বিনিয়োগের অর্থ তুলে নিতে পারবে। হ্যাম্পসনের মতে, ট্রাম্প যদি মনে করেন তিনি কানাডাকে ছাড় দিতে বাধ্য করেছেন, সেটিও কানাডার জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। তিনি বলেন, ট্রাম্পকে মনে করতে দেওয়াই ভালো যে তিনি জিতেছেন। না হলে তিনি প্রতিশোধমূলক অবস্থান নিতে পারেন।' তবে কানাডার বিরোধী কনজারভেটিভ দলের সংসদ সদস্য শুভালয় মজুমদার এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। গত সপ্তাহে সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি চুক্তিটিকে 'ভয়াবহ চুক্তি' বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, কানাডার জনগণের পুরো চুক্তি দেখার অধিকার রয়েছে। পাশাপাশি সেতু নির্মাণের খরচ, আর্থিক হিসাব এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কী কী সুবিধা দেওয়া হয়েছে—সেসব বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করা উচিত।