‘এটা কি (বিশ্বকাপ) ফাইনাল?’ খেলা চলাকালে রেফারি নিকোলা রিজ্জোলিকে জিজ্ঞেস করলেন ক্রিস্টোফ ক্রেমার। রিজ্জোলি ভাবলেন, ক্রেমার তাঁর সঙ্গে মজা করছেন। তাই প্রশ্নটা আবার শুনতে চাইলেন।
ক্রেমার আরেকটু জোর গলায় বললেন, ‘আমি জানতে চাইছি এটা কি ফাইনাল, নাকি অন্য কোনো ম্যাচ?’ এবার রিজ্জোলির এক কথায় উত্তর, ‘হ্যাঁ।’ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ক্রেমার বললেন, ‘আপনাকে ধন্যবাদ। এটা জানা আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
ক্রেমার আবার খেলা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু ইতালিয়ান রেফারি রিজ্জোলি ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জার্মান ডাগ আউটে বিষয়টি জানালেন। ফিজিওরা এসে ক্রেমারকে নিয়ে গেলেন মাঠের বাইরে।
ব্যস, ২৩ বছর বয়সে জার্মানির ২৩ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে খেলতে নামা ক্রেমারের বিশ্বকাপ ফাইনাল সেখানেই শেষ! ম্যাচের তখন আধাঘণ্টা পেরিয়েছে।
কোন ফাইনালের কথা বলা হচ্ছে জানেন? ১৩ জুলাই ২০১৪, মারাকানা স্টেডিয়াম, রিও ডি জেনিইরো, আর্জেন্টিনা-জার্মানি বিশ্বকাপ ফাইনাল।
সেই রাতে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে কপাল পুড়েছিল মেসি-মাসচেরানোদের। ১১৩ মিনিটে মারিও গোটজের গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চতুর্থবারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি। ৩১ মিনিটে ক্রেমারের বদলি নামা আন্দ্রে শুর্লের ক্রস থেকেই গোলটা করেছিলেন গোটজে।
তা, ফাইনালের রাতে ক্রেমারের কী এমন হয়েছিল যে রেফারির কথায় তাঁকে তুলে নিতে বাধ্য হন জার্মান কোচ ইওয়াখিম ল্যোফ? চিকিৎসকরা জানান, ক্রেমার খেলা চলাকালে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন! মাঠে থাকলেও তিনি কিছুই মনে করতে পারছিলেন না।
ম্যাচের ১৭ মিনিটে আর্জেন্টাইন সেন্টার ব্যাক এজেকিয়েল গারাইয়ের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে মাথায় আঘাত পান ক্রেমার। এরপর মাঠে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসাও করা হয়। ফিজিওরা ভেবেছিলেন ক্রেমার ঠিক আছেন; তাই খেলা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি পান। পরে বোঝা যায়, তিনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।
মারাকানায় ফাইনালের রাতে শুরুর একাদশে ক্রেমারের থাকার কথাই ছিল না। ম্যাচ শুরুর মিনিট কয়েক আগে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার সামি খেদিরা চোটে পড়লে ক্রেমারকে কোচ ল্যোফ জানিয়ে দেন, ‘প্রস্তুত হও, তুমি খেলতে নামছ।’
ক্রেমার তাঁর ক্যারিয়ারজুড়ে খেলেছেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে। তাঁকেই কিনা শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে নিতে হয়েছে বাড়তি দায়িত্ব। মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ফরোয়ার্ডদের বলের জোগান দেওয়া তো আর যেনতেন কাজ নয়! কাজটা ক্রেমারকে করতে হয়েছে সেই সময়ের রিয়াল মাদ্রিদ তারকা খেদিরার জায়গায়; সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার হিসেবে।
ক্রেমার ফাইনালে পুরোটা সময় খেলতে পারেননি ঠিকই; কিন্তু স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলার পরও দেশের প্রতি তাঁর নিবেদন সত্যিই ব্যতিক্রমী এক ঘটনা হয়ে আছে।
বিশ্বকাপ জয়ের পরদিনই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে ফাইনালের রাতের বর্ণনা দেন ক্রেমার, ‘আমি ম্যাচের খুব বেশি ঘটনা মনে করতে পারি না। প্রথমার্ধের কিছুই আমার মনে নেই। মাঠ ছাড়ার পর কিভাবে ড্রেসিংরুমে পৌঁছলাম, সেটাও মনে নেই। আমার মনে হয়েছে, ম্যাচটি দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু হয়েছে।’
কয়েক দশক ধরে জার্মানির বিশ্বকাপ স্কোয়াড মানেই বায়ার্ন মিউনিখ ও বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের খেলোয়াড়দের আধিক্য। তাই বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট ক্লাবের ফুটবলার হিসেবে ইওয়াখিম ল্যোফের নজর কাড়া ক্রেমারের জন্য মোটেও সহজ ছিল না।
জার্মানির সোলিঙ্গেন শহরের প্রথম ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপ দলে জায়গা পান ক্রেমার। পরে হন সেই শহরের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র বিশ্বজয়ী। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পেশাদার ক্যারিয়ারে তিনি একটিই শিরোপা জিতেছেন—বিশ্বকাপ। অথচ সেদিনের স্মৃতি তাঁর খুব বেশি মনে নেই!
২০১৬ সালের পর জার্মানি জাতীয় দলে আর কখনো ডাক পড়েনি ক্রিস্টোফ ক্রেমারের। ক্লাব ফুটবল খেলেছেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত। সেই বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখেই ১১ মৌসুম কাটিয়ে চুক্তির মেয়াদ পূর্ণ করেন। এরপর অন্য কোনো ক্লাব তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখায়নি। ফলে গত বছরের জুনে অবসরের ঘোষণা দেন।
বর্তমানে ৩৫ বছর বয়সী ক্রেমার কাজ করছেন ফুটবল বিশ্লেষক ও ধারাভাষ্যকার হিসেবে। উপস্থাপনা করছেন পডকাস্টেও। এই সুযোগে একটা বইও লিখে ফেলেছেন, জার্মান ভাষায় যার নাম ডাস লেবেন ফিং ইম জোমার আন (বাংলা অর্থ জীবন শুরু হয়েছিল গ্রীষ্মকালে)।
বিশ্বকাপজয়ী অনেকেই নিজেদের কিংবদন্তির কাতারে নিয়ে গেছেন, অনেকে পারেননি। অনেকের নাম বিশ্বফুটবল মনে রাখেনি। ক্রিস্টোফ ক্রেমারের নাম সেই তালিকায় উঠতে পারত। কিন্তু ওঠেনি ওই একটি ঘটনার কারণে—স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেও তিনি যে বিশ্বজয়ী! বরুসিয়া মনশেনগ্লাডবাখের ভাষায়, ‘যে শিরোপা (ক্রেমারকে) অমরত্ব এনে দিয়েছে।’




