খ্যাতিমান বাবার সন্তানদের এমনিতেও বিড়ম্বনার শেষ নেই। তা-ও আবার যদি তাদের জন্মদাতার জগতে হাতেখড়ি হয়ে যায়, তাহলে তো কোনো কথাই নেই! বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে কত দূর যেতে পারবে তারা, তা নিয়েও চর্চা শুরু হয়ে যায়।
এই যেমন ধরুন লিওনেল মেসির ছেলেদের কথাই। তারা একটু-আধটু ফুটবল খেলা শুরু করতে না করতেই এমন প্রশ্ন উচ্চারিত হতে শুরু করেছে যে বাবার মতো বিশ্ব কাঁপানো ফুটবলার তারা হতে পারবে তো? কিংবা এদের কেউ একজন?
বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাবার দেখানো পথ ধরে সন্তানের খেলোয়াড় হওয়ার নজিরও কম নেই। তবে পিতার খেলোয়াড়ি কীর্তির গৌরব-সৌরভের ধারেকাছে যাওয়ার উদাহরণও সামান্যই। পরিসংখ্যান ঘাঁটলে বরং বিখ্যাত খেলোয়াড়ের ছেলের বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হতে না পারার ব্যর্থতার গল্পই শোনা যায় বেশি।
উল্টো নানা বিদ্রুপে কতশত সন্তানকে যে নাজেহাল হতে হয়েছে! বাবার নাম ডোবানোর অভিযোগেও শেষ হয়ে গেছে কত সন্তানের ক্যারিয়ার। মেসির ছেলেরা এখনো বেশ ছোট বলে সেই ঝুঁকি আপাতত নেই। অবশ্য বাবা মেসি বলেই এখন থেকে মানুষের কৌতূহলী চোখ দিব্যি খুঁজে নিচ্ছে তাদের। ফুটবলপিপাসুরা অনুসরণ করতে শুরু করে দিয়েছেন মেসির তিন ছেলে—থিয়াগো, মাতেও ও চিরোকে।
বয়সভিত্তিক পর্যায়ে তারা এখন মনের আনন্দে ফুটবলে মজে আছে। তাই বলে বাবার তরফ থেকে ফুটবলারই হতে হবে, নেই এমন কোনো চাপও। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীর চাওয়া এতটুকুই, ‘ওরা যা করে আনন্দ পায়, আমি চাই সেটাই ওরা করুক।’ অবশ্য ছেলেদের আয়নায় নিজের শৈশব-কৈশোর দেখে ফেলার স্বীকারোক্তিও আছে মেসির কথায়, ‘ফুটবলটা ওরা খুব ভালোবাসে। যখন যেখানে সুযোগ মিলে যায়, ওরা একটা ছোট মাঠ আর ফুটবল খুঁজে নিয়ে মেতে ওঠে।’ তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে থিয়াগোরা তাই চোখের আড়াল নয় একটুও।
মেসির ছেলেদের জন্ম বাবার ‘সেকেন্ড হোম’ হিসেবে পরিচিত বার্সেলোনায়। বড় ছেলে থিয়াগো দুনিয়ার আলো দেখে ২০১২ সালের ২ নভেম্বর। তিন বছর পর ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মেসি-আন্তোনেলা রোকুজ্জোর ঘর আলো করে আসে মাতেও। ছোট ছেলে চিরোর আগমন ২০১৮ সালের ১০ মার্চ। বাবার মতোই বার্সেলোনা-পিএসজি ঘুরে এখন তাদের ঠিকানা ইন্টার মায়ামি। এখন তারা খেলছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাবটির বয়সভিত্তিক দলের হয়ে।
থিয়াগো বাদে অন্য দুজন নিজ নিজ বয়সশ্রেণির দলকে নেতৃত্বও দিচ্ছে। ছোট ভাইদের সঙ্গে পজিশনেও অমিল থিয়াগোর। মাতেও-চিরো ফরোয়ার্ড হলেও মায়ামির অনূর্ধ্ব-১৪ দলের মাঝমাঠের প্রাণ তাদের বড় ভাই। শান্ত-চিন্তাশীল চরিত্রের থিয়াগোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই তো গত বছর ড্রিমস কাপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মায়ামির অনূর্ধ্ব-১৩ একাডেমি দল। তবে জার্সিতে মিল আছে তিন ভাইয়েরই। বাবার মতো তিনজনই ‘নাম্বার টেন’।
অবশ্য কিছু অমিলের কথা না বললেই নয়। বাবা বাঁ পায়ে বিশ্ব জয় করলেও ছেলেরা সবাই খেলে ডান পায়ে। মেজো ছেলে মাতেও খেলে অনূর্ধ্ব-১২ দলে। বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে গোল করার সহজাত ক্ষমতা দিয়ে এরই মধ্যে সে নজর কেড়েছে। আছে এক ম্যাচে ৫ গোল করার রেকর্ডও! বল নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া এবং একক প্রচেষ্টায় গোল বের করার পাশাপাশি ফ্রি কিকেও নিজের দক্ষতার জানান দিয়েছে মাতেও। চিরো অবশ্য বড় দুই ভাইয়ের তুলনায় আরো বিধ্বংসী ও আক্রমণাত্মক। বল পায়ে গতি, প্রাণশক্তি এবং নিঁখুত শটে পারদর্শী। তার ফ্রি কিকগুলো কখনো কখনো করায় মেসিকেও। চিরোর মাঝে তাই অনেকেই দেখতে শুরু করেছেন ‘ডান পায়ের মেসি’কে। সর্বশেষ অ্যাডিডাস চ্যাম্পিয়নস কাপে মায়ামির অনূর্ধ্ব-৮ দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার নেপথ্যে ছিল মেসির ছোট ছেলের পারফরম্যান্সই।
টুর্নামেন্টের মোস্ট ভ্যালুয়েবল খেলোয়াড় হওয়া চিরো সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও নিজের করে নেয়। পুরস্কার নেয় বাবার একসময়কার বার্সেলোনা সতীর্থ জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের কাছ থেকে। সুইডিশ কিংবদন্তি শুধু পুরস্কারই দেননি, চিরোর ভবিষ্যৎও যেন দেখে ফেলেছেন। সে জন্যই চিরোকে নাম দিয়েছেন ‘মিনিয়েচার মেসি’। এসি মিলান-পিএসজির সাবেক স্ট্রাইকার আরো বলেছেন, ‘ছোট মেসিকে দেখতে চাইলে আপনাকে চিরো মেসির খেলা দেখতেই হবে। ওকে পুরস্কার দিতে পেরে আমিই বরং আনন্দিত। এই ছেলে ভবিষ্যতে অনেক দূর যাবে।’
ইব্রাহিমোভিচের কথা তো শুনলেন। এবার না হয় ওদের নিয়ে বাবার মূল্যায়নও শোনা যাক, ‘থিয়াগো শান্ত ও চিন্তাশীল একজন মিডফিল্ডার। মাতেও ফরোয়ার্ড। ও গোল করতে পছন্দ করে। খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ছেলে। ও আমার মতোই হারতে জানে না, হারতে পছন্দও করে না। চিরো তো আরো বিস্ফোরক। সবাইকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পছন্দ করে।’ নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলার অপেক্ষায় থাকা মেসি কি তাহলে ছেলেদের নিয়েও স্বপ্নের আঁকিবুঁকি খেলতে শুরু করে দিয়েছেন? ফুটবল মাঠেই দেখছেন তাঁর অনাগত উত্তরাধিকার?




