চলতি বিশ্বকাপে ফুটবল অঙ্গনে এখন জোর গুঞ্জন, আর্জেন্টিনাকে নাকি বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে ফিফা! বিশ্বমঞ্চে রেফারিং নিয়ে তৈরি হওয়া এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে এবারই প্রথম বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন আলবিসেলেস্তেদের কোচ লিওনেল স্কালোনি। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে মেগা কোয়ার্টার ফাইনালের আগে সংবাদ সম্মেলনে এসে ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে তিনি জানান, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণেই আসলে অনেকেই আর্জেন্টিনার হার দেখতে মুখিয়ে আছেন। আর সে কারণেই ছড়ানো হচ্ছে ভিত্তিহীন সব গালগল্প।
শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৩-২ গোলের অবিশ্বাস্য জয়ের পর থেকেই মূলত রেফারিং এবং ভিএআর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। মিসরের কোচিং স্টাফ ও ফুটবল ফেডারেশন মাঠের কয়েকটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক নালিশও ঠুকেছে। এমনকি অনেকেই দাবি তুলছেন, মহাতারকা লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে টিকিয়ে রাখতেই আর্জেন্টিনাকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ মেলেনি।
এসব সমালোচনার তীরের জবাবে স্কালোনি বলেন, ‘আজ থেকে ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালেও লোকে বলেছিল আমাদের নাকি বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তাই এ ধরণের গুঞ্জন আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। আমার যতদূর মনে পড়ে, আর্জেন্টিনা সবসময়ই বিশ্বমঞ্চে আলোড়ন সৃষ্টি করা দলগুলোর একটি। প্রতিপক্ষ বা একদল মানুষ কখনোই চাইবে না অন্য কোনো দল জিতুক, এটাই তো স্বাভাবিক।’
ভিএআর সিদ্ধান্তে মিসরের একটি গোল বাতিল হওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে আর্জেন্টাইন বস বলেন, ‘বিশ্বকাপের আসর শুরুর আগেই রেফারিরা সব নিয়মের ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। সেই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনেই মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়গুলো তিলকে তাল করে দেখা হয়, কিন্তু এই আধুনিক ফুটবলে পক্ষপাতিত্বের সুযোগ এখন একেবারেই কম।’
সংবাদ সম্মেলনে লিওনেল মেসির সাম্প্রতিক সময়ের পেনাল্টি মিসের খরা নিয়েও প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় স্কালোনিকে। দলের প্রাণভোমরার প্রতি অগাধ বিশ্বাস রেখে কোচ বলেন, ‘লিও যদি পেনাল্টি নিতে চায়, তবে সে ই নেবে। আমাদের দলে পেনাল্টি নেওয়ার মতো অন্য খেলোয়াড়ও আছে, তবে মেসি নিজে নিতে চাইলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার অধিকার কেবল তারই।’
চলতি বিশ্বকাপে মেসি তার নেওয়া দুটি পেনাল্টিই মিস করেছেন। এমনকি ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নেওয়া শেষ সাতটি পেনাল্টির মধ্যে মাত্র চারটিতে জালের দেখা পেয়েছেন তিনি। তবুও স্কালোনির মতে, মেসির ক্যারিয়ারের বিশাল অর্জন ও সাম্প্রতিক দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে।
মাঠে পজিশন পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও মেসিকে কোনো শৃঙ্খলে বাঁধেননি স্কালোনি। মিসরের বিপক্ষে সেই ৩-২ গোলের থ্রিলারে ম্যাচের শেষদিকে ডানপ্রান্তে সরে গিয়ে আক্রমণ তৈরি করেছিলেন মেসি, যা দলের জন্য দারুণ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে স্কালোনি বলেন, ‘এখন সে মাঠের বেশিরভাগ সময় মাঝমাঠে কাটায়, তবে পুরো দল আসলে খেলে তার গতিবিধি লক্ষ করে। খেলার স্বাভাবিক ছন্দেই এমনটা হয়েছে এবং দলও বুঝতে পেরেছে যে সে ওই দিক থেকে কতটা বিপজ্জনক আক্রমণ তৈরি করতে সক্ষম।’
উল্লেখ্য, মিসরের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে একটি দুর্দান্ত অ্যাসিস্ট করার পাশাপাশি দলের সমতাসূচক গোলটিও এসেছিল খুদে জাদুকরের পা থেকে। চলতি টুর্নামেন্টে ৪১০ মিনিট মাঠে কাটিয়ে ইতিমধ্যেই ১৫টি সুবর্ণ সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ৮টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট নিজের ঝুলিতে পুরেছেন মেসি। এমনকি শেষ দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে তার গোল সংখ্যা এখন ১৫ এবং অ্যাসিস্ট ৪টি।
৩৯ বছর বয়সেও মেসির ফিটনেস নিয়ে বিন্দুমাত্র শঙ্কা দেখছেন না স্কালোনি। আলবিসেলেস্তেদের কোচ বলেন, ‘লিও আগের মতোই মাঠে দৌড়ায়। খুব বেশি বা কম নয়। পার্থক্য হলো, এখন ওর প্রতিটি পদক্ষেপ ও মুভমেন্ট আগের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর ও ধারালো।’
মেসির পাশাপাশি দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স নিয়েও বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্কালোনি। কোয়ার্টার ফাইনালের আগে শিষ্যদের আত্মবিশ্বাসের পারদ বাড়িয়ে তিনি যোগ করেন, ‘কেপ ভার্দের বিপক্ষে আমরা জয়ের যোগ্য দল হিসেবেই জিতেছি, যদিও ম্যাচটি ১২০ মিনিট পর্যন্ত গড়িয়েছিল। আর মিসরের বিপক্ষে আমরা আরও গোছানো ফুটবল খেলেছি। আমরা অনেক সুযোগ তৈরি করতে পেরেছি এবং আমাদের ভুলও ছিল যৎসামান্য।’





