১৯৮৬ সালের মেক্সিকো ফিফা বিশ্বকাপ কেবল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আসরই ছিল না, ওটা ছিল এমন এক মহাজাগতিক মঞ্চ, যেখানে জন্ম নিয়েছিল এক অমর উপাখ্যান। বিগত ৬০ বছরের ফুটবল ইতিহাসে বিশ্বমঞ্চে আর কোনো একক ফুটবলার ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার মতো এতটা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে পারেননি। ‘এল ডিয়েগো’ সেবার আর্জেন্টিনাকে যেভাবে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ফুটবলীয় ব্যাকরণ ছাপিয়ে ছুঁয়েছিল ঈশ্বরের স্বর্গীয় সীমানা!
ম্যারাডোনা মেক্সিকোর মাটিতে পা রেখেছিলেন যেন এক ‘বিধাতার মনোনীত পুরুষ’ হিসেবে। ইতালিয়ান সেরি-আ লিগে তিনি ততদিনে বড় তারকা, কিন্তু কার্লোস বিলার্দোর অধীনে আর্জেন্টিনা দল মেক্সিকো এসেছিল একরাশ সমালোচনা আর সন্দেহ সঙ্গী করে।
বিশ্বকাপের আগের প্রস্তুতিটা ছিল তুমুল অশান্ত। ফ্রান্স আর নরওয়ের কাছে হার, দলের ভেতরের থমথমে পরিবেশ। কিন্তু ইসরাইলের বিরুদ্ধে শেষ প্রীতি ম্যাচে ডিয়েগোর জোড়া গোল যেন সব মেঘ কেটে যাওয়ার এক পূর্বাভাস ছিল। ওটা ছিল বিশেষ কিছু একটা আসতে চলেছে এমন এক অবিনাশী সংকেত!
এস্তাদিও অলিম্পিকো ইউনিভার্সিটারিও স্টেডিয়ামের তপ্ত রোদে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে শুরু হলো আর্জেন্টিনার শিরোপার মিশন। ওটা ফুটবল ম্যাচ ছিল না, ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক পৈশাচিক যুদ্ধ। সেই ম্যাচে ম্যারাডোনাকে ফাউল করা হয়েছিল ১২ বার... হ্যাঁ, গুনে গুনে বারো বার! প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের কাছে ডিয়েগোকে থামানোর আর কোনো উপায়ই জানা ছিল না। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি ৩-১ ব্যবধানে জিতলেও, স্কোরের চেয়ে বড় সত্য ছিল, মাঠের সবকিছুই আবর্তিত হচ্ছিল ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে। দলের তিনটি গোলের তিনটি অ্যাসিস্টই এসেছিল তার পা থেকে। এক খাঁটি মাস্টারক্লাস!
এরপর সামনে এলো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি। তাদের সেই দুর্ভেদ্য ‘কাতেনাচিও’ ডিফেন্স, কড়া ট্যাকল আর সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরা ম্যান-মার্কিং। ম্যাচে শুরুতে পিছিয়ে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু ৩৪তম মিনিটে দেখা মিললো সেই জাদুকরের। প্রায় শূন্য কোণ থেকে, কোনো ফাঁকা জায়গা না থাকা সত্ত্বেও এক অনবদ্য ভলিতে ইতালির জাল কাঁপিয়ে সমতা ফেরান ম্যারাডোনা। ওটা যেন অন্য কোনো গ্রহের গোল!
বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে আর্জেন্টিনা তাদের চেনা ছন্দ পুরোপুরি খুঁজে পায়। ডিয়েগো মাঠের ভেতর খেলছিলেন একজন অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টরের মতো, যার ইশারায় কাঁপছিল প্রতিপক্ষের রক্ষণ। ভালদানোকে দেওয়া তার এক নিখুঁত অ্যাসিস্ট ভুলবশত অফসাইডের কারণে বাতিল হলেও, একটু পরেই তিনি উপহার দেন আরেক মাস্টারপিস। তার এক চোখধাঁধানো ক্রস থেকে বুরুচাগা গোল করে দলের ২-০ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন।
শেষ ১৬-তে অপেক্ষা করছিল উরুগুয়ে। রিও দে লা প্লাতার এক ঐতিহাসিক ক্লাসিক লড়াই। বৃষ্টি, উত্তেজনা আর বুটের নিচে হাড় ভাঙা সব ট্যাকলের এক রণক্ষেত্র। এই ম্যাচেও ম্যারাডোনা হজম করলেন আরও ১০টি ফাউল। ম্যাচের একপর্যায়ে তার নেওয়া এক ফ্রি-কিক রক্ষণ দেয়াল ফাঁকি দিয়ে পোস্টের কোণায় লেগে ফিরে আসে, স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক তখন স্তব্ধ! শেষ পর্যন্ত উরুগুয়েকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোয়ার্টারে পৌঁছায় আলবিসেলেস্তেরা।
কিন্তু নিয়তি আসলে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মহাকাব্যিক আর অমর ম্যাচটির মঞ্চ তৈরি করে রেখেছিল ২২ জুনের জন্য।
২২ জুন, ১৯৮৬; এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড। ওটা স্রেফ কোনো ফুটবল ম্যাচ ছিল না। কয়েক বছর আগের ফকল্যান্ডস বা মালভিনাস যুদ্ধের ক্ষত তখনও দুই দেশের মানুষের বুকে দগদগে টাটকা, ফলে মাঠের ভেতরের বাতাসও ছিল প্রচণ্ড বারুদে ঠাসা।
ঠিক তখনই মেক্সিকোর সবুজ ঘাস নিজের নিয়ন্ত্রণে নিলেন ডিয়েগো। প্রথমে এলো সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ঈশ্বরের হাত। ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডারের পা লেগে বল যখন পেনাল্টি বক্সের ওপরে ভাসছিল, ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন ওপরে লাফিয়ে উঠলেন বল পাঞ্চ করতে। কিন্তু শিলটনকে বোকা বানিয়ে ম্যারাডোনা নিজের বাম হাত দিয়ে বল ঠেলে দিলেন জালের ভেতরে।
পুরো ইংল্যান্ড দল প্রতিবাদ করল, গ্যালারির দর্শক থেকে শুরু করে টিভির কোটি কোটি মানুষ সেই ফাউল দেখল—দেখলেন না কেবল মাঠের রেফারি! অ্যাজটেকা স্টেডিয়াম তখন উল্লাসের এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরি।
কিন্তু এর ঠিক চার মিনিট পর যা ঘটেছিল, তা সব বিতর্ককে এক নিমেষে রূপ দিল অমরত্বে!
মাঝমাঠের একটু ভেতরে বল পেলেন ম্যারাডোনা। নিজের অক্ষের ওপর ঝটকা টার্ন নিলেন, গতি বাড়ালেন এবং একে একে পাঁচজন ইংলিশ ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে বক্সে ঢুকে পড়লেন। বলের ওপর নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, অবিশ্বাস্য শারীরিক ভারসাম্য, অতিপ্রাকৃতিক গতি আর শেষে শিলটনকে ডজ দিয়ে এক ক্লিনিকাল ফিনিশ! ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ গোল বলা ছাড়া আর কোন বিশেষণে একে বন্দি করা যায় না।
সেমিফাইনালে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে স্রেফ ছেলেখেলা বানিয়েছিলেন। দলের ২-০ ব্যবধানের জয়ের দুটি গোলই এসেছিল তার একক নৈপুণ্যে। বেলজিয়ামের চারজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে করা তার দ্বিতীয় গোলটি দেখে মনে হচ্ছিল—ডিয়েগো আসলে অন্য সবার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো খেলা খেলছেন!
পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ফাইনাল ম্যাচটি ছিল চরম স্নায়ুচাপের। আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরও জার্মানরা অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-২ সমতা ফিরিয়ে আনে। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর অপেক্ষায়, তখনই আবার জ্বলে উঠলেন সেই ফুটবলের বার্তাবাহক। জার্মানির তিন ডিফেন্ডারের পায়ের ফাঁক গলে এক চিলতে আলো দেখে ম্যারাডোনা বাড়িয়ে দিলেন এক নিখুঁত থ্রু পাস। বল পেয়ে বুলেটের গতিতে বক্সে ঢুকে গোল করলেন বুরুচাগা। আর্জেন্টিনা হয়ে গেল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!
বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান ম্যারাডোনার এই রূপকথাকে এক অকাট্য সত্যে রূপ দেয়। মাত্র ৭ ম্যাচে ৫টি গোলের পাশাপাশি ৫টি অ্যাসিস্ট।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ম্যারাডোনা আজও একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি একটি একক আসরে একই সাথে ৫টি গোল এবং ৫টি অ্যাসিস্ট করার এই অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছেন। সেবার বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার করা মোট গোলের ৭১ শতাংশই গোলই এসেছিল সরাসরি ম্যারাডোনার পা থেকে অথবা তার অ্যাসিস্ট থেকে! পুরো টুর্নামেন্টে তিনি একাই প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভেঙে তৈরি করেছিলেন প্রায় ১৮টি নিশ্চিত গোলের সুযোগ।
মেক্সিকো ৮৬ স্রেফ কোনো বিশ্বকাপ ছিল না। ওটা ছিল ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো একজন একক ফুটবলারের সবচেয়ে একচ্ছত্র, প্রভাবশালী ও জাদুকরী পারফরম্যান্সের এক জীবন্ত দলিল।
ওটা ছিল ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার এক পায়ে বল, পুরো টুর্নামেন্ট এবং... শেষ পর্যন্ত ফুটবল ইতিহাসকে চিরকালের জন্য নিজের পকেটে পুরে নেওয়ার এক নান্দনিক গল্প!