একটি চলন্ত ট্রেন। জানালার পাশে বসে কেউ প্রকৃতি দেখছেন, কেউ গল্পে মগ্ন, কেউবা দূরপাল্লার ক্লান্ত যাত্রায় একটু চোখ বুজেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে বাইরে থেকে ছুটে আসে একটি ঢিল। বিকট শব্দে ভেঙে যায় কাচ, আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন যাত্রীরা। কখনো আহত হন কেউ, কখনো অল্পের জন্য এড়ানো যায় বড় দুর্ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন রেলপথে এমন ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
শুধু ঢিল নিক্ষেপই নয়, চলন্ত ট্রেনে মোবাইল ছিনতাই, যাত্রীদের হয়রানি ও বিভিন্ন অপরাধও বাড়ছে। এসব অপরাধ রোধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি জনসচেতনতার বিকল্প নেই—এই বিশ্বাস থেকেই ব্যতিক্রমী সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখা।
সোমবার (২০ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৩টায় শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন প্ল্যাটফর্ম এলাকায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে যাত্রী, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পথচারীদের মাঝে সচেতনতামূলক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। বিশেষ করে রেললাইনের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যেন কেউ ট্রেনে ঢিল ছোড়া বা এ ধরনের অপরাধে জড়িত না হয় এবং এমন ঘটনা দেখলে দ্রুত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়।
আয়োজকরা জানান, সম্প্রতি সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের লংলা, রশিদপুর, শায়েস্তাগঞ্জ, হরষপুর, আজমপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় চলন্ত ট্রেনে ঢিল নিক্ষেপের ঘটনায় একাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই জনসচেতনতা বৃদ্ধির এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার উপদেষ্টা ও দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি মোহাম্মদ আল আমিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহাঙ্গীর আলম।
তিনি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ছিনতাই ও ট্রেনে ঢিল নিক্ষেপ প্রতিরোধে বিভিন্ন মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সভা করছি। শ্রীমঙ্গল একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন এলাকা। এখানে কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি আরো বলেন, রেলওয়ে পুলিশে জনবল সংকট থাকলেও জনগণের সহযোগীতা ও সচেতনতা থাকলে অনেক অপরাধই প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি আরো বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বক্তারা বলেন, ট্রেনে ঢিল ছোড়া কোনো দুষ্টুমি নয়; এটি একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। একটি ছোট ঢিলও একজন মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে কিংবা শতাধিক যাত্রীর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে শিশু-কিশোরদের এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে।
বসুন্ধরা শুভসংঘ শ্রীমঙ্গল উপজেলা শাখার উপদেষ্টা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ট্রেনে ঢিল ছোড়ার মতো ঘটনা শুধু অমানবিক নয়, এটি বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। জনসচেতনতার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে রেলওয়ে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর টহল আরো জোরদার করা প্রয়োজন।’
বস্ত্র ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা মো. হাফিজ আহমেদ ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং জনস্বার্থে বসুন্ধরা শুভসংঘের এ ধরনের উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের উপদেষ্টা সাংবাদিক এম এ রকিব, সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম রুম্মন এবং পুলিশ সদস্য সোহাগ আহমদ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন–রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাবিলদার মো. সাইফুর রহমান, ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার কাজল হাজরা, তপন বৈদ্য, বসুন্ধরা শুভসংঘের সমাজকল্যাণ সম্পাদক মো. ওমর ফারুক, সহসাংগঠনিক সম্পাদক গৌতম চন্দ্র, মো. শাহিনুর ইসলাম, লিটন আহমেদ, বাবুল মিয়া, শেখ ফরিদসহ সংগঠনের অন্য সদস্যরা।
মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, প্রয়োজন সামাজিক দায়িত্ববোধও। আর সেই বার্তাই রেলস্টেশন থেকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিল বসুন্ধরা শুভসংঘ। ছোট একটি সচেতনতা হয়তো ভবিষ্যতে রক্ষা করতে পারে অসংখ্য প্রাণ, ফিরিয়ে আনতে পারে রেলপথে নিরাপদ ভ্রমণের আস্থা।











