• ই-পেপার

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর : অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বলয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দক্ষিণ এশিয়া একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মার্কিন এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এই অঞ্চল হলো ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানে গোলার্ধের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে। এখানে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি দ্রুতবর্ধনশীল। এই অঞ্চলের লাগোয়া সমুদ্রপথ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সর্বোপরি এ অঞ্চলে আছে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র; কিন্তু এরা একে অপরের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক বলয়ে ভারসাম্য, সহাবস্থান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিক তৎপরতা এবং শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত এই কারণগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন যাবৎ দক্ষিণ এশিয়াকে তার বৈশ্বিক কৌশলে একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মহাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন : পূর্ব ইওরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে) ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং সংঘর্ষের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কাছে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিকে করে তুলেছে আরো গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্রমবর্ধমান তাত্পর্যপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, সীমান্ত সংঘর্ষ, কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা, সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদির কারণে এই দুই দেশ একাধিকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা চায় এ অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত না ঘটুক। কারণ তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে ১৯৭১, ১৯৯৯, ২০১৯ এবং ২০২৫-এ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

দক্ষিণ এশিয়া জনবহুল অঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে যাতে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের আদর্শ প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের প্রতি গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর দক্ষিণ এশিয়া মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম মোকাবেলায় প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়া যাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল না হয়, তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে  মার্কিনীরা এ অঞ্চলের দেশগুলোয় বিভিন্ন প্রকার কৌশলগত সাহায্য প্রদান করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উন্নয়নে অর্থায়ন, সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ এবং সন্ত্রাস দমনে নিয়োজিত বাহিনীকে উন্নত অস্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহ।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্ববহ কৌশলগত লক্ষ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে চীনের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই চীনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য ওয়াশিংটন আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে ভারত মহাসাগর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পণ্য এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই পথ নিরাপদ এবং উন্মুক্ত থাকুক এবং এ কারণে ওয়াশিংটনের নীতিমালায় ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল বাজারও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি লাভজনক ক্ষেত্র। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন তার অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চায়।

বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত; এ ছাড়া বাংলাদেশের উপকূল ছুঁয়ে আছে বঙ্গোপসাগর। এই দুই অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সাম্প্রতিককালে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় ওয়াশিংটনের ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা আরো মনে করে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধিতেও মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র ঢাকাকে সমর্থন প্রদান করে। কারণ, উন্নত সংযোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ব অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি। তৈরি পোশাক শিল্প, বৃহৎ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি দৃঢ় হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্র আরো মনে করে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জলদস্যুতা প্রতিরোধে, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই বাংলাদেশ নৌ বাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে আর এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে। মায়ানমার থেকে বাস্তুচুত্য প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে আর এই কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক করেছে আরো জোরাল। এই মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অন্যতম বৃহৎ সহায়তাদানকারী রাষ্ট্র।

বাংলাদেশ তার নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতিমালা অনুযায়ী বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সরাসরি অবস্থান নিতে চায় না। দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। একদিকে চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে একটি এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই বাংলাদেশকে প্রায়ই এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হয়।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং সুশাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো মাঝেমধ্যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে উভয় দেশই সাধারণত পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। এ কারণে আমরা দেখতে পাই যুক্তরাষ্ট্রের জোর সমর্থনে বিগত অনেক বছর যাবত বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সিকিউরিটি কাউন্সিল, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল, পিস বিল্ডিং কমিশন, ইন্টারন্যশানাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশান, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগেনাইজেশন, ইন্টারন্যশানাল লেবার অর্গানাইজেশন ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রগতি ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যের পদে (২০২৬-২৭) বাংলাদেশ প্রার্থিতা দিলে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদে ঢাকার নির্বাচন নিশ্চিত করে। এতেই প্রতীয়মান হয়, ওপরে বর্ণিত কৌশলগত কারণগুলো বাস্তবায়নের জন্য ওয়াশিংটন ঢাকার সঙ্গে সহযোগী সম্পর্ক রাখতে বিশেষভাবে ইচ্ছুক। মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে ওই দেশের সরকার চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দেয়। এই করিডোর চীনের ইয়ুনান প্রদেশকে মায়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়কপথে সংযুক্ত করবে। এই প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে ঢাকা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সহযোগী সম্পর্কে ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

বিএনপির ঋণ, বিপ্লব বিতর্ক এবং রক্তাক্ত ইতিহাস

রাজু আলীম
বিএনপির ঋণ, বিপ্লব বিতর্ক এবং রক্তাক্ত ইতিহাস

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ঘিরে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই রাজপথে নয়, ইতিহাসের পাতায়। কে এই পরিবর্তনের ভিত্তি নির্মাণ করেছে— এই প্রশ্নে চলছে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা। কিন্তু ইতিহাসের একটি স্বীকৃত সত্য হলো, কোনো গণঅভ্যুত্থান হঠাৎ জন্ম নেয় না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিরোধ, রাষ্ট্রের বৈধতার সংকট এবং জনগণের জমে থাকা ক্ষোভ। ২০২৪ সালের জুলাই– আগস্টের গণঅভ্যুত্থানও তার ব্যতিক্রম নয়। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন ছিল সেই বিস্ফোরণের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ; কিন্তু বিস্ফোরণের উপাদান জমা হয়েছিল বহু বছর ধরে। সেই কারণে আজ প্রশ্নটি কেবল ছাত্র আন্দোলনের নয়; বরং দীর্ঘ বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম, বিশেষ করে বিএনপির ভূমিকা ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবর্তনের ইতিহাস লিখতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে— এই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ভিত্তি কোথায় নির্মিত হয়েছিল? কেবল জুলাইয়ের ছাত্র আন্দোলনের মধ্যেই কি তার উত্তর নিহিত, নাকি এর পেছনে দীর্ঘদিনের বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রামেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে?

রাজনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো, কোনো সরকার শুধু একটি আন্দোলনের কারণে ক্ষমতা হারায় না। একটি সরকার তখনই পতনের মুখোমুখি হয়, যখন দীর্ঘদিন ধরে তার রাজনৈতিক বৈধতা ক্ষয় হতে থাকে, জনগণের আস্থায় ফাটল ধরে এবং বিরোধী শক্তি সেই অসন্তোষকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।

২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে দাবি করে এসেছে যে দেশের গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। ২০১৪ সালের নির্বাচন, যেখানে প্রধান বিরোধী দল অংশ নেয়নি এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক— এই দুটি ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এ সময়ে বিএনপি ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন, সমাবেশ, পদযাত্রা, গণঅবস্থান, যুগপৎ কর্মসূচি এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে। দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়, বহু নেতা দীর্ঘ সময় কারাবন্দি থাকেন এবং সাংগঠনিকভাবে দলটি ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে। কিন্তু দলটি রাজপথ ছাড়েনি।

রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব থাকে। যখন একটি সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকে এবং বিরোধী দল ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন তোলে, তখন সে বিতর্ক কেবল দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে যখন নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হয় এবং একই সময়ে অর্থনৈতিক চাপ, দুর্নীতির অভিযোগ, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে, তখন বিরোধী দলের রাজনৈতিক বক্তব্য সমাজের বৃহত্তর অংশেও গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করে। এ দীর্ঘ সময়ে একটি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব গড়ে ওঠে—পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

জুলাই আন্দোলনের দ্রুত বিস্তারের পেছনে এ রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। কারণ, কোটা সংস্কারের মতো একটি নির্দিষ্ট দাবির আন্দোলন কয়েক দিনের মধ্যে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিতে রূপ নেয় না, যদি না সমাজে আগে থেকেই গভীর অসন্তোষ জমা থাকে।

জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহও সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নতুন গতি পায়। শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেন এবং দাবি আদায়ের জন্য ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং সহিংসতার অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। আন্দোলন দমনের বিভিন্ন উদ্যোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। বিভিন্ন স্থানে প্রাণহানির ঘটনা জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের ছবি ও ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষও বিষয়টিকে নিজেদের আন্দোলন হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অভিভাবক, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রকাশ্যে শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানান। একটি দাবিভিত্তিক আন্দোলন ধীরে ধীরে জনআন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে।

জুলাইয়ের তৃতীয় সপ্তাহে রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। আন্দোলন আর কেবল কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; রাষ্ট্র পরিচালনা, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার এবং সরকারের বৈধতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে চলে আসে। প্রতিদিন নতুন নতুন কর্মসূচি, সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং হতাহতের খবর রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। এই সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও বিভিন্নভাবে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকেন।

বিএনপির নেতাকর্মীদের ভূমিকা এ পর্যায়ে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। দলটির দাবি, তাদের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী আন্দোলনে অংশ নেন এবং সরকারও বিষয়টি অনুধাবন করেছিল বলে বিএনপির বহু সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির দৃষ্টিতে এটি ছিল ছাত্র আন্দোলনের সমান্তরালে দীর্ঘদিনের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা। তাদের বক্তব্য, তারা ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেনি; বরং একটি গণআন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন ও সাংগঠনিক সহায়তা দিয়েছে।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে, যেখানে আন্দোলন কার্যত সর্বজনীন চরিত্র লাভ করে। দেশের বিভিন্ন জেলায় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিতে শুরু করে। আন্দোলনের রাজনৈতিক অভিঘাত তখন আর অস্বীকার করার সুযোগ ছিল না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট, রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা এবং জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী ঘটনাপ্রবাহ একত্রিত হয়ে এমন এক বাস্তবতা তৈরি করে, যার পরিণতি আগস্টের প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটিতে গিয়ে পৌঁছায়।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত রাজনৈতিক মোড় নিতে থাকে। বিভিন্ন স্থানে জনসমাগম বাড়তে থাকে, সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরও তীব্র হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। কিন্তু সেই মুহূর্তে আরেকটি বিতর্ক সামনে আসে—এই বিজয়ের রাজনৈতিক কৃতিত্ব কার?

বাস্তবতা হলো, জুলাইয়ের আন্দোলনের নৈতিক শক্তি এসেছিল শিক্ষার্থীদের সাহস, আত্মত্যাগ এবং সাধারণ মানুষের অভূতপূর্ব অংশগ্রহণ থেকে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার আরেকটি দিকও রয়েছে। আন্দোলন কখনোই সম্পূর্ণ শূন্যতার মধ্যে জন্ম নেয় না। যে সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিরোধ নেই, বিরোধী দল নিষ্ক্রিয় এবং জনগণের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা সংগঠিত নয়, সেখানে একটি ছাত্র আন্দোলন যতই শক্তিশালী হোক, তা রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ রাজনৈতিক পটভূমি তৈরিতে বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ খুব কম।

বিএনপির প্রতিটি স্তরের নেতাকর্মী এই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন। নেপথ্যে বিএনপির সক্রিয় ভূমিকা সরকারও উপলব্ধি করেছিল বলে আন্দোলনের সময় দলটির বহু সিনিয়র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অনেক স্থানে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। বিএনপি অবশ্য শুরু থেকে দাবি করে এসেছে, তারা ছাত্রদের আন্দোলনের নেতৃত্ব নিতে চায়নি; বরং জনগণের আন্দোলনের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন এবং সাংগঠনিক সহায়তা দিয়েছে। এ অবস্থান তাদের জন্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলনের ওপর দলীয় ছাপ পড়লে তার গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা পাল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করেছে। কেউ একে একান্ত ছাত্রদের বিজয় বলেছেন, কেউ আবার নিজেদের ভূমিকাকে মুখ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাস মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তের উপস্থিতির চেয়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গত দেড় দশকে সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক, সংগঠিত এবং দেশব্যাপী আন্দোলন পরিচালনার ক্ষেত্রে বিএনপি ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি। অন্য দলগুলো বিভিন্ন সময়ে কর্মসূচি পালন করলেও তাদের সাংগঠনিক বিস্তার, আন্দোলনের স্থায়িত্ব এবং রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা একই মাত্রায় ছিল না। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরির ক্ষেত্রে বিএনপির ভূমিকাকে অস্বীকার করা যেমন বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে, তেমনি ছাত্রদের আত্মত্যাগকে আড়াল করাও সমানভাবে অন্যায় হবে।

এখানে দুটি সত্য পাশাপাশি বিদ্যমান। প্রথমত, ছাত্র-জনতার আন্দোলন ছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হতো না। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক আন্দোলন এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের প্রক্রিয়া না থাকলে সেই ছাত্র আন্দোলন এত দ্রুত সর্বজনীন রাজনৈতিক বিস্ফোরণে পরিণত হওয়ার পরিবেশও তৈরি হতো না। ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ পাঠ এই দুই বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করার মধ্যেই নিহিত।

তবে রাজনৈতিক প্রাপ্তির সঙ্গে রাজনৈতিক দায়িত্বও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি যদি মনে করে যে এই পরিবর্তনের পেছনে তাদের দীর্ঘ আন্দোলনের অবদান রয়েছে, তাহলে জনগণও স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা করবে—দলটি অতীত থেকে শিক্ষা নেবে। বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্র, অবাধ নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং জবাবদিহির যে প্রতিশ্রুতি তারা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে এসেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ এলে তার বাস্তব প্রতিফলন দেখতে চায় মানুষ। কারণ বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন নয়; নতুন হওয়া উচিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন।

দেশের মানুষ আর এমন একটি রাজনৈতিক চক্রে ফিরে যেতে চায় না, যেখানে এক দল ক্ষমতায় এসে আরেক দলের বিরুদ্ধে একই ধরনের প্রতিশোধমূলক রাজনীতি চালাবে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য তখনই নিশ্চিত হবে, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাবমুক্ত হবে, নির্বাচন জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে এবং বিরোধী মতকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে নয়, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস কেবল ছাত্রদের নয়, কেবল বিএনপিরও নয়। এটি সাহস, সাধারণ মানুষের আত্মত্যাগ, রাষ্ট্রের দীর্ঘ সংকট এবং বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতার সম্মিলিত ইতিহাস। তবে এই সামগ্রিক ইতিহাসের ভেতরে যদি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিরোধের প্রশ্নটি বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে বিএনপির ভূমিকা নিঃসন্দেহে কেন্দ্রীয় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। সেই বাস্তবতা স্বীকার করেই ইতিহাসের মূল্যায়ন করতে হবে।

কারণ ইতিহাস কেবল কে শেষ মুহূর্তে রাজপথে ছিল, তা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে কে দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলানোর জন্য সংগ্রাম করেছে, কে সেই সংগ্রামের মূল্য দিয়েছে এবং কে পরিবর্তনের পর নতুন রাষ্ট্র নির্মাণের দায়িত্ব পালন করেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিএনপির জন্য একটি রাজনৈতিক প্রাপ্তি হতে পারে, কিন্তু সেই প্রাপ্তিকে ইতিহাসে স্থায়ী মর্যাদা দিতে হলে তাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো একটি অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখা। প্রকৃত বিচার শেষ পর্যন্ত সেখানেই হবে।

লেখক: কবি, সাংবাদিক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

রামিসা হত্যার পরে যে প্রতিরোধের মনোভাবটি গড়ে উঠেছিল, সেটি ছিল ব্যাপক; বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিশোরী ও কিশোরদের সেই সমাবেশটি, যেটিতে তারা বলেছিল, ‘আর না, ধর্ষণ, আর না।’ এই ‘না’ এটা অবশ্য আগেও শোনা গেছে। ধূমপানকে না বলুন, দুর্নীতিকে না বলুন নামে সমাবেশ ও শোভাযাত্রা হয়েছে। কোনো কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অসদুপায়কে ‘না’ বলার শপথ পর্যন্ত নেওয়ানো হয়েছে, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নেতৃত্বে। কিন্তু তাতে ধূমপান, দুর্নীতি, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, এসব যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়। রয়েই গেছে, বরং লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। এক সেমিনারে সম্প্রতি বলা হয়েছে দেখলাম, অবৈধভাবে সমুদ্রযাত্রাকে ‘না’ বলুন। সে পরামর্শও কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। দেশের সম্পদ অনবরত বাইরে পাচার হবে, আর দেশের কর্মসংস্থানবিহীন মানুষ ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে যাওয়ার প্রাণ-বাজি-রাখা প্রচেষ্টায় ব্রতী হবে না, এমনটা আশা করাটা অসংগত বৈকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী গানগুলোর একটি ছিল, ‘আর নয় যুদ্ধ, আর নয় মায়েদের, শিশুদের কান্না।’ কিন্তু তাতে যুদ্ধ থামবার কথা নয়, থামেওনি। যুদ্ধ থেমেছে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রুশ বাহিনীর হাতে হিটলারের দুর্ধর্ষ বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ে। সমাজতান্ত্রিক শক্তি জয়ী হয়েছে, পুঁজিবাদী নাৎসিদের পরাভূত করে।

আজকের বিশ্বেও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ‘না’ গুলোকে সংগঠিত করে একটি বৃহৎ ‘না’তে পরিণত করা চাই। এবং ‘না’ বলতে হবে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দেশকে নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের যে ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা চলছে, তাকেই। বাংলাদেশের দুর্গতিও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিবাদী ব্যাধির কারণেই। ১৮৪৮ সালে রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ ছিল যে বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন শতকরা ১০ জন বনাম ৯০ জন। সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ দাবি করেছেন যে বিভাজনটি বর্তমানে উন্নীত হয়েছে একজন বনাম নিরানব্বইজনে। এই বৈষম্য কোনো একটি শাসক গোষ্ঠীকে বিদায় করলেই যে বিদায় নেবে তা নয়, কারণ ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা সৃষ্টি কোনো বিশেষ দলের ‘কৃতিত্ব’ নয়, পুঁজিবাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রটা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিরাজমান মারাত্মক এক ব্যাধির নাম। আর সে ব্যাধিটা হচ্ছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন; যে উন্নয়ন মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু চেনে না। স্থূল ভোগবাদ ভিন্ন অন্য কিছুকে মানে না। যার কাজটা হচ্ছে শোষণ ও বৈষম্যে সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, এমনকি ব্যক্তির সঙ্গেও তার নিজের বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি করা। যেসব ঘটনার বিবরণ দিতে এবং পড়তে গিয়ে ঘৃণা ভিন্ন অন্য কিছু উৎপন্ন হয় না, সে ঘৃণাকে পরিচালনা করা দরকার গোটা ব্যবস্থা যে ‘উন্নতি’ ঘটাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। ‘না’ বলা চাই গোটা ব্যবস্থাটাকে। পুলিশের পোশাক বদলালেই কি পুলিশি ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়?

পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে অন্য কোনো নামে চিহ্নিত করাটা বিভ্রান্তিজনক। পুঁজিবাদকে চিনে নিতে হবে পুঁজিবাদ হিসেবেই, যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম, সেটা যেমন স্থানীয়, তেমনি আন্তর্জাতিক। তবে লড়াইটা তো করতে হবে নিজেদের ভূমিতে দাঁড়িয়েই। এ লড়াই অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতিটা হওয়া চাই সাংস্কৃতিক। একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি যে ছিল না, সেটা একটি দুঃখজনক সত্য। ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে বাঙালি সৈন্যরা যেভাবে লড়াই করেছেন এবং প্রাণও দিয়েছেন; তার ভিতরকার জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণাটা তো ছিল পাকিস্তানকে রক্ষা করার। জনচিত্তেও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের উদ্দীপনা জেগে উঠেছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেই উদ্দীপনাকে হটিয়ে দিয়ে, সম্পূর্ণ বিপরীত যে চেতনাকে লালন করে আমরা একাত্তরে লড়েছি, সে চেতনাটা যে দুর্দমনীয় ছিল তা সত্য। কিন্তু চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাকে সত্তার গভীরে নিয়ে যাওয়ার সময়টা তো পাওয়া যায়নি। যার ফলে যে মুক্ত স্বদেশের কথা আমরা ভেবেছি, সেখানে রাষ্ট্র এবং সমাজের চরিত্রটা কী দাঁড়াবে সেই ধারণাটি পরিষ্কার হয়নি। সমাজতন্ত্রের কথা আসে, না বলে উপায় ছিল না বলেই। যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে এবং যুদ্ধরত মানুষ ঔপনিবেশিক যুগের শোষণমূলক পুরোনো ব্যবস্থার অধীনেই রয়ে যেতে যে কিছুতেই রাজি হবে না, এটা ছিল সুস্পষ্ট। যুদ্ধকালে নেতৃত্ব ছিল যে আওয়ামী লীগারদের হাতে, তাঁরা মোটেই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। উল্টো ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা তাদের বলতে হয়, নির্বাচনের সময়ে ভোট পাওয়ার জন্য। এবং যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকেও নেতৃত্বে বহাল রাখার আত্যন্তিক প্রয়োজনে। ভারতের যে সরকার মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে আমাদের সাহায্য করে, তারাও ছিল সমাজতন্ত্রবিরোধীই। এবং তাদের বিশেষ রকমের শত্রুতা ছিল সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গেই। যেজন্য গাত্রে সামান্য বামপন্থি গন্ধ-আছে-এমন সন্দেহভাজনদেরও তারা মুক্তিবাহিনীতে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে উপনিবেশবাদী পুরাতন রাষ্ট্রটিকে ভেঙে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং পুরাতন সমাজকে বদলে ফেলে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার। উপলব্ধি ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা কায়েমের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। দুটি কারণে; প্রথম কারণ পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে শাসনক্ষমতা উঠতি বাঙালি বুর্জোয়াদের দখলে চলে যাওয়া। দ্বিতীয় কারণ, স্বাধীনতার সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পরিণত করার কর্তব্য পালনে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা। ব্যর্থতার ওই ইতিহাস করুণ ও হতাশাব্যঞ্জক। জগৎজুড়ে আজ যে সংকট, সেটি সভ্যতার নয়, এমনকি মানবতারও নয়। সরাসরি মনুষ্যত্বের, এবং তার পেছনে ও সামনে রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানার নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই হচ্ছে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুশীলনের। যে কাজটা শুধু সমাজতন্ত্রীরাই করতে পারেন। এই সত্যটা সর্বক্ষণ সামনে থাকা দরকার যে সংস্কার আবশ্যক বটে, তবে সংস্কারে কুলাবে না; প্রয়োজন হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের, এবং সে পরিবর্তন সম্ভব করে তোলার জন্য সমাজবিপ্লবের কোনো বিকল্প নেই।

‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাতে কর’। কারাগার ভাঙার সেই সমষ্টিগত আঘাতই এখন প্রয়োজন। নতুন কারাগার তৈরির জন্য নয়, বিশ্বকে পুঁজিবাদের পাষাণ কারাগার থেকে মুক্ত করার প্রয়োজনে।

ব্যক্তিগত মালিকানার বিপরীতে সামাজিক মালিকানা কীভাবে সফল হয়, তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক একটি দৃষ্টান্তও পাওয়া গেছে ফরিদপুর অঞ্চলের একটি গ্রামে। সেখানে উদ্যোগী এক ব্যক্তি তাঁর পিতা ও পিতামহের কবরের পাশে তিনটি ফুলের চারা রোপণ করেছিলেন। প্রথমটি কামিনীর, দ্বিতীয়টি হাসনাহেনার, তৃতীয়টি শিউলির। একসময়ে গাছে ফুলও ফুটেছিল। কিন্তু একবার গ্রামে গিয়ে তিনি দেখেন তিনটি গাছের একটি নেই; চুরি হয়ে গেছে। তিনি চিন্তা করলেন পুনরায় গাছ লাগাবেন। কিন্তু তাদের রক্ষা করার কাজটা কঠিন তো বটেই, ব্যয়বহুলও হবে। রাত্রির অন্ধকারে ও দিবালোকে দৈনিক আট ঘণ্টা করে পাহারা দিতে তিনজন পাহারাদার, তাদের বেতন, থাকার জায়গা, তদারকির ব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি ছাড়া চলবে না। এবং রক্ষণের ব্যবস্থাটাকে অনেক দিন ধরে চালু রাখতে হবে। বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি এক কাজ করেন।

গ্রামের পাঁচ শ পরিবারের প্রতিটির জন্য তিনটি করে চারা বরাদ্দ দিয়ে মোট পনেরো শটি চারা বিতরণ করেন। ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় বৃক্ষের সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। তাতে তাঁর খরচ কতটা কমল সে হিসাবটা বড় কথা নয়, বৃক্ষ ও ফুলে শোভিত হওয়ার সম্ভাবনায় গ্রামের মানুষ যে খুশি হলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের যে উপকারটা ঘটল, ফুল ফোটার আগেই তার নিজের এবং গ্রামের যে সুনাম ছড়িয়ে পড়ল, এবং বাপদাদার কবরের পাশে বৃক্ষের শোভা ও সুরভি যে নিশ্চিত হলো, সেসব অর্জন মোটেই সম্ভবপর হতো না যদি পাহারাদার বসিয়ে গ্রামবাসীর ঈর্ষা উৎপাদনের এবং চৌর্যবৃত্তিতে উৎসাহীদের দমনের অনুৎপাদক কাজে নিজের উদ্ভাবনশীল বুদ্ধিমত্তাকে নিয়োজিত করতেন।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?

আহসান হাবিব বরুন
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?
সংগৃহীত ছবি

উত্তরবঙ্গের এক কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আকাশের দিকে তাকান। বৃষ্টি হবে কি হবে না—এই প্রশ্নই যেন তার ভাগ্য নির্ধারণ করে। অথচ তার গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে তিস্তা নদী। বর্ষাকালে যে নদী উন্মত্ত হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেই নদীই শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় সরু জলধারায়। নদী আছে, কিন্তু পানি নেই, সেচের জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই, মানুষের শ্রম আছে, কিন্তু উৎপাদনের নিশ্চয়তা নেই। তিস্তার এই বৈপরীত্য আজ শুধু একটি নদীর সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের প্রকাশ্য সমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এটি কেবল একটি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হয়, তবে ভারত কেন উদ্বিগ্ন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তিস্তার গুরুত্ব বুঝতে হবে। তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জীববৈচিত্র্যের প্রাণ ছিল। কিন্তু উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অনেক সময় তিস্তায় পানির প্রবাহ এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে নদীর বুকে মানুষ হেঁটে পারাপার করে।

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিস্তা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পানির অভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদন কমে, আয় কমে, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।

অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে। অর্থাৎ তিস্তা এখন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে খরা ও বন্যার নদী।

এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ধারণা আসে। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এসবই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীভাঙন হ্রাস এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু প্রকল্পটি যখন চীনের সহযোগিতায় এগোতে শুরু করল, তখনই ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ কেবল পানি নয়, ভূরাজনীতি। তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি। এই করিডর, যা "চিকেনস নেক" নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, যদি চীন তিস্তা প্রকল্পে বড় আকারে যুক্ত হয়, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত কিংবা অবকাঠামোগত উপস্থিতি তৈরি করতে পারে। যদিও চীন বলছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ উন্নয়নমূলক এবং কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তবু ভারত এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এই উদ্বেগ পুরোপুরি নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বন্দর উন্নয়ন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ভারতের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নের জন্য যে দেশের কাছ থেকে সবচেয়ে উপযোগী সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সেই সহযোগিতা গ্রহণ করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি বানানো উচিত নয়।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে যে—তিস্তার মূল সমস্যা কি অবকাঠামো, নাকি পানির ন্যায্য হিস্যা? বাস্তবতা হলো, নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প যত উন্নতই হোক না কেন, যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না আসে, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে যাবে। তাই তিস্তা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে একটি সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, অন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা, তথ্য বিনিময়, পূর্বপরামর্শ, এবং সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিভিন্ন নীতিমালায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও সব দেশ এসব চুক্তির পক্ষ নয়, তবুও নীতিগুলো আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়।

তিস্তার ক্ষেত্রেও এই নীতিগুলোর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। কারণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদীকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে ভাটির দেশের কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় গভীর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কেবল পানির উৎস নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তারও একটি বড় ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, তখন সেচনির্ভর কৃষির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। কৃষি থেকে আয় কমে গেলে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হয়। এতে শহরে কর্মসংস্থান, আবাসন এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ তিস্তার পানি সংকট কেবল একটি নদীর সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

চীনের অংশগ্রহণকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ তাই একদিকে যেমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ জীবিকা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টিকে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে পরিচালনা করা। একদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।

একই সঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নদীকে শুধু প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

বস্তুতপক্ষে তিস্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—ন্যায্য পানি বণ্টন, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আস্থাভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা। চীন, ভারত কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন সহযোগীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা।

বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গঠনমূলক সংলাপকে আরো কার্যকর করতে হবে। কারণ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না, যদি নদীতে পর্যাপ্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হয়।

তিস্তার পানি কোনো দেশের একক সম্পদ নয়, এটি একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ, যার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই তিস্তাকে ভূরাজনীতির দাবার গুটি হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। সুতরাং ভারতের উদ্বেগ এখানে মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected]