• ই-পেপার

জুলাই গণঅভ্যুত্থান

বিএনপির ঋণ, বিপ্লব বিতর্ক এবং রক্তাক্ত ইতিহাস

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি ও বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান

ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বলয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দক্ষিণ এশিয়া একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মার্কিন এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এই অঞ্চল হলো ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানে গোলার্ধের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে। এখানে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি দ্রুতবর্ধনশীল। এই অঞ্চলের লাগোয়া সমুদ্রপথ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সর্বোপরি এ অঞ্চলে আছে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র; কিন্তু এরা একে অপরের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক বলয়ে ভারসাম্য, সহাবস্থান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিক তৎপরতা এবং শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত এই কারণগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন যাবৎ দক্ষিণ এশিয়াকে তার বৈশ্বিক কৌশলে একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।

দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মহাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন : পূর্ব ইওরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে) ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং সংঘর্ষের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কাছে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিকে করে তুলেছে আরো গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্রমবর্ধমান তাত্পর্যপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, সীমান্ত সংঘর্ষ, কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা, সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদির কারণে এই দুই দেশ একাধিকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা চায় এ অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত না ঘটুক। কারণ তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে ১৯৭১, ১৯৯৯, ২০১৯ এবং ২০২৫-এ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

দক্ষিণ এশিয়া জনবহুল অঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে যাতে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের আদর্শ প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের প্রতি গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর দক্ষিণ এশিয়া মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম মোকাবেলায় প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়া যাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল না হয়, তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে  মার্কিনীরা এ অঞ্চলের দেশগুলোয় বিভিন্ন প্রকার কৌশলগত সাহায্য প্রদান করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উন্নয়নে অর্থায়ন, সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ এবং সন্ত্রাস দমনে নিয়োজিত বাহিনীকে উন্নত অস্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহ।

বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্ববহ কৌশলগত লক্ষ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে চীনের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই চীনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য ওয়াশিংটন আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে ভারত মহাসাগর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পণ্য এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই পথ নিরাপদ এবং উন্মুক্ত থাকুক এবং এ কারণে ওয়াশিংটনের নীতিমালায় ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল বাজারও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি লাভজনক ক্ষেত্র। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন তার অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চায়।

বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত; এ ছাড়া বাংলাদেশের উপকূল ছুঁয়ে আছে বঙ্গোপসাগর। এই দুই অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সাম্প্রতিককালে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় ওয়াশিংটনের ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা আরো মনে করে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধিতেও মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র ঢাকাকে সমর্থন প্রদান করে। কারণ, উন্নত সংযোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ব অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি। তৈরি পোশাক শিল্প, বৃহৎ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি দৃঢ় হয়ে উঠবে।

যুক্তরাষ্ট্র আরো মনে করে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জলদস্যুতা প্রতিরোধে, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই বাংলাদেশ নৌ বাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে আর এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে। মায়ানমার থেকে বাস্তুচুত্য প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে আর এই কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক করেছে আরো জোরাল। এই মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অন্যতম বৃহৎ সহায়তাদানকারী রাষ্ট্র।

বাংলাদেশ তার নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতিমালা অনুযায়ী বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সরাসরি অবস্থান নিতে চায় না। দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। একদিকে চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে একটি এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই বাংলাদেশকে প্রায়ই এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হয়।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং সুশাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো মাঝেমধ্যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে উভয় দেশই সাধারণত পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। এ কারণে আমরা দেখতে পাই যুক্তরাষ্ট্রের জোর সমর্থনে বিগত অনেক বছর যাবত বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সিকিউরিটি কাউন্সিল, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল, পিস বিল্ডিং কমিশন, ইন্টারন্যশানাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশান, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগেনাইজেশন, ইন্টারন্যশানাল লেবার অর্গানাইজেশন ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রগতি ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যের পদে (২০২৬-২৭) বাংলাদেশ প্রার্থিতা দিলে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদে ঢাকার নির্বাচন নিশ্চিত করে। এতেই প্রতীয়মান হয়, ওপরে বর্ণিত কৌশলগত কারণগুলো বাস্তবায়নের জন্য ওয়াশিংটন ঢাকার সঙ্গে সহযোগী সম্পর্ক রাখতে বিশেষভাবে ইচ্ছুক। মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে ওই দেশের সরকার চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দেয়। এই করিডোর চীনের ইয়ুনান প্রদেশকে মায়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়কপথে সংযুক্ত করবে। এই প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে ঢাকা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সহযোগী সম্পর্কে ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে।

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর : অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশ

ড. মো. মিজানুর রহমান
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর : অর্থনীতি, ভূরাজনীতি ও বাংলাদেশ
সংগৃহীত ছবি

একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে তার কার্যকর সংযুক্তির ওপর। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশ তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পরিবহনের কেন্দ্র হিসেবে কাজে লাগাতে পেরেছে, তারাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই প্রেক্ষাপটে কানেক্টিভিটি আজ উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

প্রস্তাবিত চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর এই বাস্তবতার একটি সম্ভাবনাময় উদাহরণ। এটি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের মধ্যে স্থল ও সমুদ্র যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে রূপান্তরের সুযোগ তৈরি করবে। একই সঙ্গে এটি চীনের জন্য মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বঙ্গোপসাগরে একটি বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ পথ তৈরি করতে পারে।

চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য মূলত সমুদ্রপথনির্ভর, যার বড় অংশ মালাক্কা প্রণালি দিয়ে পরিচালিত হয়। এই পথ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ‘মালাক্কা ডিলেমা’ চীনের জন্য একটি কৌশলগত উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ কারণে বিকল্প যোগাযোগ রুট অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মায়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত সংযোগ চীনের জন্য তুলনামূলক দ্রুত ও বহুমুখী বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের জন্য এই করিডর শুধু চীনের সঙ্গে সংযোগ নয়, বরং বৃহত্তর আঞ্চলিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার একটি সুযোগ। এতে আমদানি-রপ্তানির ব্যয় ও সময় কমে শিল্প উৎপাদনের খরচ হ্রাস পাবে, ফলে তৈরি পোশাক, চামড়া, হালকা প্রকৌশল ও ওষুধ শিল্প প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে বিকশিত হতে পারে, যেখানে বন্দর সেবা, গুদামজাতকরণ ও পরিবহন খাত থেকে নতুন আয় ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও আঞ্চলিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে ভোক্তানির্ভর কাঠামো থেকে সংযোগ ও লজিস্টিকস কেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে রূপান্তরের সুযোগ দেবে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যকার একটি প্রাকৃতিক সেতুবন্ধে পরিণত করেছে। পশ্চিমে ভারত, পূর্বে মায়ানমার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর—এই তিনটি ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশকে আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের সামনে নতুন এক আঞ্চলিক ভূমিকা উন্মোচিত হতে পারে। এই করিডর শুধু চীনের সঙ্গে নয়, বরং মায়ানমারের মাধ্যমে থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং বৃহত্তর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ আরো সহজ করতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক বাণিজ্য ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়তে পারে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে BIMSTEC, BBIN এবং অন্যান্য আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোর সদস্য। কিন্তু এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকাংশেই নির্ভর করে বাস্তব যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর। নতুন করিডর এই আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে পণ্য, সেবা, মানুষ ও বিনিয়োগের প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ আরো সুদৃঢ় হবে। আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ে, তাদের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হয়। যদিও এটি সব সময় রাজনৈতিক বিরোধ দূর করে না, তবু পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থ সংলাপ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি করে।

বাংলাদেশ যদি দক্ষতার সঙ্গে এই করিডরকে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে দেশটি কেবল একটি ট্রানজিট রাষ্ট্র নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরীয় অর্থনীতির মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এই অবস্থান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করার পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করতে পারে।

ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব দেশ তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে পরিকল্পিত অবকাঠামো ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে, তারাই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে—অর্থাৎ অবস্থান নিজে সম্পদ নয়, বরং সঠিক ব্যবস্থাপনায় তা শক্তিতে রূপ নেয়। এর উদাহরণ হিসেবে মিসরের সুয়েজ খাল ও পানামা খাল বৈশ্বিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে বিপুল আয় ও কৌশলগত গুরুত্ব তৈরি করেছে। একইভাবে কাজাখস্তান বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের মাধ্যমে স্থলবেষ্টিত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে, তুরস্ক ইউরোপ-এশিয়া সংযোগকে ভিত্তি করে বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে, এবং ভিয়েতনাম উন্নত সংযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলের মাধ্যমে দ্রুত বর্ধনশীল উৎপাদন অর্থনীতিতে রূপ নিয়েছে। এসব উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে কেবল করিডর তৈরি নয়, বরং সমন্বিত শিল্পনীতি, আধুনিক বন্দর ও লজিস্টিকস, দক্ষ কাস্টমস এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রকৃত সাফল্যের চাবিকাঠি—যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য।

চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর কেবল একটি অর্থনৈতিক অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে সক্ষম একটি কৌশলগত উদ্যোগ। বর্তমান বিশ্বে বন্দর ও যোগাযোগ অবকাঠামো শুধু বাণিজ্যের মাধ্যম নয়, বরং শক্তি প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে এই করিডরকে ঘিরে চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির স্বার্থ ও প্রতিযোগিতা জড়িত থাকা স্বাভাবিক। চীনের জন্য এটি মূলত বঙ্গোপসাগরে বিকল্প প্রবেশাধিকার ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি হ্রাসের কৌশল, অন্যদিকে ভারতের জন্য এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সংযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংবেদনশীল বিষয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে মুক্ত সমুদ্রপথ ও স্থিতিশীল সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর গুরুত্ব দেয়, যা এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোকে আরও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো ভারসাম্যপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে কেন্দ্রীভূত পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

এই করিডরে বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য চীনের জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে বাংলাদেশ কেবল ট্রানজিট সুবিধা প্রদানেই সীমাবদ্ধ না থেকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার সুযোগ নিতে পারে, বিশেষ করে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তরের মাধ্যমে যাতে স্থানীয় জনশক্তি আধুনিক পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিকস খাতে সক্ষমতা অর্জন করে।

একই সঙ্গে করিডর ঘিরে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক গড়ে তোলা গেলে বিনিয়োগ উৎপাদনমুখী হবে, যা কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বাড়াবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় শিল্প ও শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, পাশাপাশি অর্থায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাবের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি। সবশেষে, এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংযোগ কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনতে পারে।
চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ করিডর যতই সম্ভাবনাময় হোক না কেন, এর সঙ্গে জড়িত ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জগুলো উপেক্ষা করা বাস্তবসম্মত হবে না। বড় ধরনের অবকাঠামো ও ভূ-রাজনৈতিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। 

এই করিডরের ক্ষেত্রে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো মায়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। দেশটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জাতিগত উত্তেজনা এবং সামরিক শাসনের ইতিহাস একটি স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কোনো অংশে অস্থিরতা দেখা দিলে পুরো করিডরের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থলপথে আন্তর্জাতিক করিডর পরিচালনার ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত অপরাধ, চোরাচালান এবং রাজনৈতিক উত্তেজনার মতো সমস্যা সব সময়ই বিদ্যমান থাকে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও দুর্গম অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনিক ও কৌশলগতভাবে চ্যালেঞ্জিং হতে পারে।

আরেকটি বড় বিষয় হলো ঋণ ও অর্থনৈতিক নির্ভরতা। এই ধরনের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে সাধারণত বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল। প্রকল্পের প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ফলাফল যদি অর্জিত না হয়, তাহলে দীর্ঘ মেয়াদে ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রকল্প শুরুর আগে ব্যয়–সুবিধা বিশ্লেষণ, বিকল্প অর্থায়ন কাঠামো এবং আর্থিক টেকসইতা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।

এ ছাড়া পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। করিডর নির্মাণের ফলে বনাঞ্চল, পাহাড়ি অঞ্চল এবং স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার, জীবিকা এবং সামাজিক কাঠামোও প্রভাবিত হতে পারে। তাই টেকসই উন্নয়নের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্প বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও এই করিডরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। চীন, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির কৌশলগত স্বার্থ এখানে একে অপরের সঙ্গে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা—উভয় ধরনের সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে হবে, যাতে কোনো একক শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব দেশের কৌশলগত স্বাধীনতাকে সীমিত না করে।

এই করিডর কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ধারণা, যা দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করার সক্ষমতা রাখে। এটি বাস্তবায়িত হলে চীনের জন্য বিকল্প বাণিজ্য ও সরবরাহ পথ তৈরি হতে পারে, মায়ানমারের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক যুগের সূচনা ঘটতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই করিডরের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো একটি ট্রানজিট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা। এর মাধ্যমে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, পর্যটন এবং আঞ্চলিক সংযোগে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব। একই সঙ্গে দেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি কৌশলগত সেতুবন্ধনে পরিণত করতে পারে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি ঝুঁকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা—সবকিছুই এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের পথে চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকবে। তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করা।

পরিশেষে বলা যায়, এই করিডর যদি সঠিক পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত বিচক্ষণতার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি নতুন অবস্থানে উন্নীত করতে সক্ষম হতে পারে। তবে সেই সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে তার ওপর।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
জগৎজুড়ে মনুষ্যত্বের সংকট

রামিসা হত্যার পরে যে প্রতিরোধের মনোভাবটি গড়ে উঠেছিল, সেটি ছিল ব্যাপক; বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কিশোরী ও কিশোরদের সেই সমাবেশটি, যেটিতে তারা বলেছিল, ‘আর না, ধর্ষণ, আর না।’ এই ‘না’ এটা অবশ্য আগেও শোনা গেছে। ধূমপানকে না বলুন, দুর্নীতিকে না বলুন নামে সমাবেশ ও শোভাযাত্রা হয়েছে। কোনো কোনো স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অসদুপায়কে ‘না’ বলার শপথ পর্যন্ত নেওয়ানো হয়েছে, শিক্ষক ও অভিভাবকদের নেতৃত্বে। কিন্তু তাতে ধূমপান, দুর্নীতি, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন, এসব যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তা নয়। রয়েই গেছে, বরং লকলকিয়ে বেড়ে উঠেছে। এক সেমিনারে সম্প্রতি বলা হয়েছে দেখলাম, অবৈধভাবে সমুদ্রযাত্রাকে ‘না’ বলুন। সে পরামর্শও কার্যকর হবে বলে মনে হয় না। দেশের সম্পদ অনবরত বাইরে পাচার হবে, আর দেশের কর্মসংস্থানবিহীন মানুষ ভাগ্যান্বেষণে বিদেশে যাওয়ার প্রাণ-বাজি-রাখা প্রচেষ্টায় ব্রতী হবে না, এমনটা আশা করাটা অসংগত বৈকি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরোধী গানগুলোর একটি ছিল, ‘আর নয় যুদ্ধ, আর নয় মায়েদের, শিশুদের কান্না।’ কিন্তু তাতে যুদ্ধ থামবার কথা নয়, থামেওনি। যুদ্ধ থেমেছে স্ট্যালিনের নেতৃত্বে রুশ বাহিনীর হাতে হিটলারের দুর্ধর্ষ বাহিনীর শোচনীয় পরাজয়ে। সমাজতান্ত্রিক শক্তি জয়ী হয়েছে, পুঁজিবাদী নাৎসিদের পরাভূত করে।

আজকের বিশ্বেও বিক্ষিপ্ত বিচ্ছিন্ন ‘না’ গুলোকে সংগঠিত করে একটি বৃহৎ ‘না’তে পরিণত করা চাই। এবং ‘না’ বলতে হবে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দেশকে নয়, গোটা বিশ্বজুড়ে পুঁজিবাদের যে ফ্যাসিবাদী নৃশংসতা চলছে, তাকেই। বাংলাদেশের দুর্গতিও বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত পুঁজিবাদী ব্যাধির কারণেই। ১৮৪৮ সালে রচিত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোতে উল্লেখ ছিল যে বিশ্বে ধনী-দরিদ্রের বিভাজন শতকরা ১০ জন বনাম ৯০ জন। সম্প্রতি নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎজ দাবি করেছেন যে বিভাজনটি বর্তমানে উন্নীত হয়েছে একজন বনাম নিরানব্বইজনে। এই বৈষম্য কোনো একটি শাসক গোষ্ঠীকে বিদায় করলেই যে বিদায় নেবে তা নয়, কারণ ফ্যাসিবাদের নৃশংসতা সৃষ্টি কোনো বিশেষ দলের ‘কৃতিত্ব’ নয়, পুঁজিবাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রটা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে বিরাজমান মারাত্মক এক ব্যাধির নাম। আর সে ব্যাধিটা হচ্ছে পুঁজিবাদী উন্নয়ন; যে উন্নয়ন মুনাফা ছাড়া অন্য কিছু চেনে না। স্থূল ভোগবাদ ভিন্ন অন্য কিছুকে মানে না। যার কাজটা হচ্ছে শোষণ ও বৈষম্যে সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের, এমনকি ব্যক্তির সঙ্গেও তার নিজের বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি করা। যেসব ঘটনার বিবরণ দিতে এবং পড়তে গিয়ে ঘৃণা ভিন্ন অন্য কিছু উৎপন্ন হয় না, সে ঘৃণাকে পরিচালনা করা দরকার গোটা ব্যবস্থা যে ‘উন্নতি’ ঘটাচ্ছে তার বিরুদ্ধে। ‘না’ বলা চাই গোটা ব্যবস্থাটাকে। পুলিশের পোশাক বদলালেই কি পুলিশি ব্যবস্থার চরিত্র বদলায়?

পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটাকে অন্য কোনো নামে চিহ্নিত করাটা বিভ্রান্তিজনক। পুঁজিবাদকে চিনে নিতে হবে পুঁজিবাদ হিসেবেই, যার কেন্দ্রে রয়েছে সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানা। ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটিয়ে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম, সেটা যেমন স্থানীয়, তেমনি আন্তর্জাতিক। তবে লড়াইটা তো করতে হবে নিজেদের ভূমিতে দাঁড়িয়েই। এ লড়াই অবশ্যই রাজনৈতিক, কিন্তু এর জন্য প্রস্তুতিটা হওয়া চাই সাংস্কৃতিক। একাত্তরে আমরা স্বাধীন হয়েছি, কিন্তু স্বাধীনতার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি যে ছিল না, সেটা একটি দুঃখজনক সত্য। ১৯৬৫-এর পাক-ভারত যুদ্ধে বাঙালি সৈন্যরা যেভাবে লড়াই করেছেন এবং প্রাণও দিয়েছেন; তার ভিতরকার জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণাটা তো ছিল পাকিস্তানকে রক্ষা করার। জনচিত্তেও পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের উদ্দীপনা জেগে উঠেছিল। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই সেই উদ্দীপনাকে হটিয়ে দিয়ে, সম্পূর্ণ বিপরীত যে চেতনাকে লালন করে আমরা একাত্তরে লড়েছি, সে চেতনাটা যে দুর্দমনীয় ছিল তা সত্য। কিন্তু চর্চা ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাকে সত্তার গভীরে নিয়ে যাওয়ার সময়টা তো পাওয়া যায়নি। যার ফলে যে মুক্ত স্বদেশের কথা আমরা ভেবেছি, সেখানে রাষ্ট্র এবং সমাজের চরিত্রটা কী দাঁড়াবে সেই ধারণাটি পরিষ্কার হয়নি। সমাজতন্ত্রের কথা আসে, না বলে উপায় ছিল না বলেই। যুদ্ধটা পরিণত হয়েছিল জনযুদ্ধে এবং যুদ্ধরত মানুষ ঔপনিবেশিক যুগের শোষণমূলক পুরোনো ব্যবস্থার অধীনেই রয়ে যেতে যে কিছুতেই রাজি হবে না, এটা ছিল সুস্পষ্ট। যুদ্ধকালে নেতৃত্ব ছিল যে আওয়ামী লীগারদের হাতে, তাঁরা মোটেই সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। উল্টো ছিলেন সমাজতন্ত্রবিরোধী। কিন্তু সমাজতন্ত্রের কথাটা তাদের বলতে হয়, নির্বাচনের সময়ে ভোট পাওয়ার জন্য। এবং যুদ্ধের সময় যুদ্ধক্ষেত্রে অনুপস্থিত থেকেও নেতৃত্বে বহাল রাখার আত্যন্তিক প্রয়োজনে। ভারতের যে সরকার মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হতে আমাদের সাহায্য করে, তারাও ছিল সমাজতন্ত্রবিরোধীই। এবং তাদের বিশেষ রকমের শত্রুতা ছিল সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গেই। যেজন্য গাত্রে সামান্য বামপন্থি গন্ধ-আছে-এমন সন্দেহভাজনদেরও তারা মুক্তিবাহিনীতে প্রবেশাধিকার দেয়নি।

কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভিতর দিয়ে উপনিবেশবাদী পুরাতন রাষ্ট্রটিকে ভেঙে প্রকৃত অর্থে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং পুরাতন সমাজকে বদলে ফেলে নতুন এক সমাজ প্রতিষ্ঠার। উপলব্ধি ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন হবে ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় সামাজিক মালিকানা কায়েমের। সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। দুটি কারণে; প্রথম কারণ পাকিস্তানি বুর্জোয়াদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে শাসনক্ষমতা উঠতি বাঙালি বুর্জোয়াদের দখলে চলে যাওয়া। দ্বিতীয় কারণ, স্বাধীনতার সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে পরিণত করার কর্তব্য পালনে সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা। ব্যর্থতার ওই ইতিহাস করুণ ও হতাশাব্যঞ্জক। জগৎজুড়ে আজ যে সংকট, সেটি সভ্যতার নয়, এমনকি মানবতারও নয়। সরাসরি মনুষ্যত্বের, এবং তার পেছনে ও সামনে রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানার নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলাটাই হচ্ছে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর উপায়। সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন ব্যাপক সাংস্কৃতিক অনুশীলনের। যে কাজটা শুধু সমাজতন্ত্রীরাই করতে পারেন। এই সত্যটা সর্বক্ষণ সামনে থাকা দরকার যে সংস্কার আবশ্যক বটে, তবে সংস্কারে কুলাবে না; প্রয়োজন হবে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের, এবং সে পরিবর্তন সম্ভব করে তোলার জন্য সমাজবিপ্লবের কোনো বিকল্প নেই।

‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাতে কর’। কারাগার ভাঙার সেই সমষ্টিগত আঘাতই এখন প্রয়োজন। নতুন কারাগার তৈরির জন্য নয়, বিশ্বকে পুঁজিবাদের পাষাণ কারাগার থেকে মুক্ত করার প্রয়োজনে।

ব্যক্তিগত মালিকানার বিপরীতে সামাজিক মালিকানা কীভাবে সফল হয়, তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র কিন্তু কৌতূহলোদ্দীপক একটি দৃষ্টান্তও পাওয়া গেছে ফরিদপুর অঞ্চলের একটি গ্রামে। সেখানে উদ্যোগী এক ব্যক্তি তাঁর পিতা ও পিতামহের কবরের পাশে তিনটি ফুলের চারা রোপণ করেছিলেন। প্রথমটি কামিনীর, দ্বিতীয়টি হাসনাহেনার, তৃতীয়টি শিউলির। একসময়ে গাছে ফুলও ফুটেছিল। কিন্তু একবার গ্রামে গিয়ে তিনি দেখেন তিনটি গাছের একটি নেই; চুরি হয়ে গেছে। তিনি চিন্তা করলেন পুনরায় গাছ লাগাবেন। কিন্তু তাদের রক্ষা করার কাজটা কঠিন তো বটেই, ব্যয়বহুলও হবে। রাত্রির অন্ধকারে ও দিবালোকে দৈনিক আট ঘণ্টা করে পাহারা দিতে তিনজন পাহারাদার, তাদের বেতন, থাকার জায়গা, তদারকির ব্যবস্থা ইত্যাদি ইত্যাদি ছাড়া চলবে না। এবং রক্ষণের ব্যবস্থাটাকে অনেক দিন ধরে চালু রাখতে হবে। বুদ্ধি খাটিয়ে তিনি এক কাজ করেন।

গ্রামের পাঁচ শ পরিবারের প্রতিটির জন্য তিনটি করে চারা বরাদ্দ দিয়ে মোট পনেরো শটি চারা বিতরণ করেন। ব্যক্তিগত মালিকানার জায়গায় বৃক্ষের সামাজিক মালিকানার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে। তাতে তাঁর খরচ কতটা কমল সে হিসাবটা বড় কথা নয়, বৃক্ষ ও ফুলে শোভিত হওয়ার সম্ভাবনায় গ্রামের মানুষ যে খুশি হলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশের যে উপকারটা ঘটল, ফুল ফোটার আগেই তার নিজের এবং গ্রামের যে সুনাম ছড়িয়ে পড়ল, এবং বাপদাদার কবরের পাশে বৃক্ষের শোভা ও সুরভি যে নিশ্চিত হলো, সেসব অর্জন মোটেই সম্ভবপর হতো না যদি পাহারাদার বসিয়ে গ্রামবাসীর ঈর্ষা উৎপাদনের এবং চৌর্যবৃত্তিতে উৎসাহীদের দমনের অনুৎপাদক কাজে নিজের উদ্ভাবনশীল বুদ্ধিমত্তাকে নিয়োজিত করতেন।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?

আহসান হাবিব বরুন
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারতের উদ্বেগের কারণ কী?
সংগৃহীত ছবি

উত্তরবঙ্গের এক কৃষক ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই আকাশের দিকে তাকান। বৃষ্টি হবে কি হবে না—এই প্রশ্নই যেন তার ভাগ্য নির্ধারণ করে। অথচ তার গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে তিস্তা নদী। বর্ষাকালে যে নদী উন্মত্ত হয়ে ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায়, সেই নদীই শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় সরু জলধারায়। নদী আছে, কিন্তু পানি নেই, সেচের জমি আছে, কিন্তু ফসল নেই, মানুষের শ্রম আছে, কিন্তু উৎপাদনের নিশ্চয়তা নেই। তিস্তার এই বৈপরীত্য আজ শুধু একটি নদীর সংকট নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, কূটনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতার মধ্যেই বাংলাদেশের তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীনের প্রকাশ্য সমর্থন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের এই প্রকল্পে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এটি কেবল একটি নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প হয়, তবে ভারত কেন উদ্বিগ্ন?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তিস্তার গুরুত্ব বুঝতে হবে। তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম আন্তঃসীমান্ত নদী। ভারতের সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একসময় এই নদী উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জীববৈচিত্র্যের প্রাণ ছিল। কিন্তু উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে নদীর প্রবাহ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। অনেক সময় তিস্তায় পানির প্রবাহ এমন পর্যায়ে নেমে আসে যে নদীর বুকে মানুষ হেঁটে পারাপার করে।

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তিস্তা অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি তিস্তার পানির ওপর নির্ভর করে। কিন্তু পানির অভাবে হাজার হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ ব্যাহত হয়। কৃষকের উৎপাদন কমে, আয় কমে, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং অনেক পরিবার দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকে পড়ে।

অন্যদিকে বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও আকস্মিক বন্যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে। অর্থাৎ তিস্তা এখন বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে খরা ও বন্যার নদী।

এই বাস্তবতা পরিবর্তনের লক্ষ্যেই তিস্তা নদীর ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের ধারণা আসে। নদী খনন, তীর সংরক্ষণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এসবই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নদীভাঙন হ্রাস এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কিন্তু প্রকল্পটি যখন চীনের সহযোগিতায় এগোতে শুরু করল, তখনই ভারতের কৌশলগত মহলে উদ্বেগ বাড়তে থাকে।

ভারতের উদ্বেগের প্রধান কারণ কেবল পানি নয়, ভূরাজনীতি। তিস্তা অববাহিকার অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডরের কাছাকাছি। এই করিডর, যা "চিকেনস নেক" নামেও পরিচিত, ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থল সংযোগ। মাত্র কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এই করিডর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতের কৌশলগত বিশ্লেষকদের একাংশের আশঙ্কা, যদি চীন তিস্তা প্রকল্পে বড় আকারে যুক্ত হয়, তবে তারা দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলে প্রযুক্তিগত, প্রকৌশলগত কিংবা অবকাঠামোগত উপস্থিতি তৈরি করতে পারে। যদিও চীন বলছে, প্রকল্পটি সম্পূর্ণ উন্নয়নমূলক এবং কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়, তবু ভারত এটিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।

এই উদ্বেগ পুরোপুরি নতুন নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ, বন্দর উন্নয়ন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ ভারতের কাছে দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত প্রতিযোগিতার বিষয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থানও স্পষ্ট। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নের জন্য যে দেশের কাছ থেকে সবচেয়ে উপযোগী সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সেই সহযোগিতা গ্রহণ করার অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে। উন্নয়ন সহযোগিতাকে কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার বলি বানানো উচিত নয়।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে যে—তিস্তার মূল সমস্যা কি অবকাঠামো, নাকি পানির ন্যায্য হিস্যা? বাস্তবতা হলো, নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প যত উন্নতই হোক না কেন, যদি শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না আসে, তবে প্রকল্পের সুফল সীমিত হয়ে যাবে। তাই তিস্তা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য অবকাঠামোর পাশাপাশি ন্যায্য পানি বণ্টন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে একটি সম্ভাব্য চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক নীতি আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এর মধ্যে রয়েছে ন্যায্য ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার, অন্য রাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করা, তথ্য বিনিময়, পূর্বপরামর্শ, এবং সমন্বিত নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা। ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের আন্তঃসীমান্ত জলপ্রবাহ বিষয়ক কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক আইন কমিশনের বিভিন্ন নীতিমালায় এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও সব দেশ এসব চুক্তির পক্ষ নয়, তবুও নীতিগুলো আন্তর্জাতিক পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়।

তিস্তার ক্ষেত্রেও এই নীতিগুলোর কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। কারণ একটি আন্তঃসীমান্ত নদীকে একতরফাভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে ভাটির দেশের কৃষি, পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ এবং মানুষের জীবন-জীবিকায় গভীর প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের জন্য তিস্তা কেবল পানির উৎস নয়; এটি খাদ্য নিরাপত্তারও একটি বড় ভিত্তি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, তখন সেচনির্ভর কৃষির গুরুত্ব আরও বাড়ছে। উত্তরাঞ্চলে পানি সংকট দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে, যা জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অভ্যন্তরীণ অভিবাসন। কৃষি থেকে আয় কমে গেলে গ্রাম ছেড়ে মানুষ শহরমুখী হয়। এতে শহরে কর্মসংস্থান, আবাসন এবং সামাজিক অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ তিস্তার পানি সংকট কেবল একটি নদীর সমস্যা নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।

চীনের অংশগ্রহণকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ তাই একদিকে যেমন নিরাপত্তাকেন্দ্রিক, অন্যদিকে বাংলাদেশের উদ্বেগ জীবিকা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই হবে কূটনীতির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশেরও উচিত বিষয়টিকে আবেগ নয়, কৌশল দিয়ে পরিচালনা করা। একদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো পক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ না হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করবে।

একই সঙ্গে তিস্তা অববাহিকায় আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির সুষম ব্যবহার, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নদীকে শুধু প্রকৌশল প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

বস্তুতপক্ষে তিস্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর—ন্যায্য পানি বণ্টন, বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং আস্থাভিত্তিক আঞ্চলিক সহযোগিতা। চীন, ভারত কিংবা অন্য যে কোনো উন্নয়ন সহযোগীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা।

বাংলাদেশের উচিত জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ন্যায্য ও টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রশ্নে গঠনমূলক সংলাপকে আরো কার্যকর করতে হবে। কারণ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পই দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না, যদি নদীতে পর্যাপ্ত পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হয়।

তিস্তার পানি কোনো দেশের একক সম্পদ নয়, এটি একটি অভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদ, যার ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক দায়িত্ব। তাই তিস্তাকে ভূরাজনীতির দাবার গুটি হিসেবে নয়, বরং মানবকল্যাণের সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। সুতরাং ভারতের উদ্বেগ এখানে মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন। 
ই-মেইল: [email protected]