ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বলয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দক্ষিণ এশিয়া একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মার্কিন এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে কয়েকটি যৌক্তিক কারণ রয়েছে। এই অঞ্চল হলো ঘনবসতিপূর্ণ এবং এখানে গোলার্ধের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ বসবাস করে। এখানে অবস্থিত রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি দ্রুতবর্ধনশীল। এই অঞ্চলের লাগোয়া সমুদ্রপথ বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সর্বোপরি এ অঞ্চলে আছে দুটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র; কিন্তু এরা একে অপরের প্রতি বৈরী ভাবাপন্ন। ফলে আন্তর্জাতিক বলয়ে ভারসাম্য, সহাবস্থান, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনীতিক তৎপরতা এবং শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই অঞ্চলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত এই কারণগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন যাবৎ দক্ষিণ এশিয়াকে তার বৈশ্বিক কৌশলে একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করে আসছে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মহাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং বিভিন্ন অঞ্চলে (যেমন : পূর্ব ইওরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে) ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা এবং সংঘর্ষের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের কাছে ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় এ অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সমর্থনের প্রয়োজনীয়তা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতিকে করে তুলেছে আরো গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি ক্রমবর্ধমান তাত্পর্যপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। ভারত ও পাকিস্তান উভয়ই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, সীমান্ত সংঘর্ষ, কাশ্মীর অঞ্চল নিয়ে রাজনৈতিক সমস্যা, সন্ত্রাসমূলক কার্যকলাপ ইত্যাদির কারণে এই দুই দেশ একাধিকবার সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। মার্কিন নীতি-নির্ধারকরা চায় এ অঞ্চলে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাত না ঘটুক। কারণ তা বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে ১৯৭১, ১৯৯৯, ২০১৯ এবং ২০২৫-এ ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সংঘর্ষ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।
দক্ষিণ এশিয়া জনবহুল অঞ্চল এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর একাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে যাতে ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সন্ত্রাসবাদের আদর্শ প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সে জন্য যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলের প্রতি গত কয়েক দশক ধরে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর দক্ষিণ এশিয়া মার্কিন সন্ত্রাসবিরোধী নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচরণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তখন থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশসহ অন্যান্য অঞ্চলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম মোকাবেলায় প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। দক্ষিণ এশিয়া যাতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল না হয়, তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে মার্কিনীরা এ অঞ্চলের দেশগুলোয় বিভিন্ন প্রকার কৌশলগত সাহায্য প্রদান করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা উন্নয়নে অর্থায়ন, সন্ত্রাস মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ এবং সন্ত্রাস দমনে নিয়োজিত বাহিনীকে উন্নত অস্ত্র-সরঞ্জাম সরবরাহ।
বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্ববহ কৌশলগত লক্ষ্য হলো চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ভারসাম্য রক্ষা করা। চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে এই কার্যক্রম ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে চীনের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তাই চীনের প্রভাব মোকাবেলার জন্য ওয়াশিংটন আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট হচ্ছে ভারত মহাসাগর। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশের পণ্য এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র চায় এই পথ নিরাপদ এবং উন্মুক্ত থাকুক এবং এ কারণে ওয়াশিংটনের নীতিমালায় ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ ধারণাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুতবর্ধনশীল বাজারও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি লাভজনক ক্ষেত্র। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়িয়ে এ অঞ্চলে ওয়াশিংটন তার অর্থনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করতে চায়।
বাংলাদেশ ভৌগলিকভাবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত; এ ছাড়া বাংলাদেশের উপকূল ছুঁয়ে আছে বঙ্গোপসাগর। এই দুই অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বলয়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব সাম্প্রতিককালে তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ভারত মহাসাগরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় ওয়াশিংটনের ‘মুক্ত এবং উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকরা আরো মনে করে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধিতেও মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই বিভিন্ন আঞ্চলিক অবকাঠামো এবং বাণিজ্যিক উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র ঢাকাকে সমর্থন প্রদান করে। কারণ, উন্নত সংযোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ বর্তমানে দ্রুত বর্ধনশীল বিশ্ব অর্থনীতিগুলোর মধ্যে একটি। তৈরি পোশাক শিল্প, বৃহৎ শ্রমশক্তি এবং ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্যস্থল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর ওয়াশিংটনের চাপ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি পেলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি দৃঢ় হয়ে উঠবে।
যুক্তরাষ্ট্র আরো মনে করে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জলদস্যুতা প্রতিরোধে, অবৈধ মাছ ধরা বন্ধে এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারবে। তাই বাংলাদেশ নৌ বাহিনী এবং কোস্ট গার্ডের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে আর এই সামুদ্রিক নিরাপত্তা সহযোগিতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো গভীর করেছে। মায়ানমার থেকে বাস্তুচুত্য প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে আর এই কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক করেছে আরো জোরাল। এই মানবিক সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে অন্যতম বৃহৎ সহায়তাদানকারী রাষ্ট্র।
বাংলাদেশ তার নিজস্ব পররাষ্ট্র নীতিমালা অনুযায়ী বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় কোনো এক পক্ষের সঙ্গে সরাসরি অবস্থান নিতে চায় না। দেশটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করে। একদিকে চীন বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন অংশীদার এবং অবকাঠামো বিনিয়োগকারী। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজারগুলোর মধ্যে একটি এবং নিরাপত্তা ও উন্নয়ন সহযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই বাংলাদেশকে প্রায়ই এই দুই শক্তির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করতে হয়।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রম অধিকার এবং সুশাসন সম্পর্কিত বিষয়গুলো মাঝেমধ্যে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। তবে উভয় দেশই সাধারণত পারস্পরিক স্বার্থের ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে। এ কারণে আমরা দেখতে পাই যুক্তরাষ্ট্রের জোর সমর্থনে বিগত অনেক বছর যাবত বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন সিকিউরিটি কাউন্সিল, হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল, পিস বিল্ডিং কমিশন, ইন্টারন্যশানাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশান, ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগেনাইজেশন, ইন্টারন্যশানাল লেবার অর্গানাইজেশন ইত্যাদিতে প্রতিনিধিত্ব করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রগতি ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
অতি সম্প্রতি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যের পদে (২০২৬-২৭) বাংলাদেশ প্রার্থিতা দিলে ওয়াশিংটন বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদে ঢাকার নির্বাচন নিশ্চিত করে। এতেই প্রতীয়মান হয়, ওপরে বর্ণিত কৌশলগত কারণগুলো বাস্তবায়নের জন্য ওয়াশিংটন ঢাকার সঙ্গে সহযোগী সম্পর্ক রাখতে বিশেষভাবে ইচ্ছুক। মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গেলে ওই দেশের সরকার চীন-মায়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর তৈরির প্রস্তাব দেয়। এই করিডোর চীনের ইয়ুনান প্রদেশকে মায়ানমারের মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে সড়কপথে সংযুক্ত করবে। এই প্রস্তাব বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করবে কি না, তা ভবিষ্যৎ বলে দেবে। তবে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে ঢাকা এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে সহযোগী সম্পর্কে ঝামেলার সৃষ্টি হতে পারে।
লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র




