স্পিকার পদটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সংবেদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ। এ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তি একইসঙ্গে সাংবিধানিক অভিভাবক, সংসদীয় বিধির ব্যাখ্যাকার এবং রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে নিরপেক্ষ বিচারক। অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রবীণ আইনজীবী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার স্পিকার নির্বাচিত হন। ওই বছরের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আইনজীবী থেকে সংসদের অভিভাবক
স্পিকার হওয়ার আগে জমির উদ্দিন সরকার দীর্ঘদিন সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৬০ সালের ২৭ মে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। সংবিধান, প্রশাসনিক আইন ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যায় তার দক্ষতা সংসদ পরিচালনায় বিশেষ সুবিধা দেয়। সংসদে কোনো বিধিগত জটিলতা দেখা দিলে তিনি প্রায়ই কার্যপ্রণালি বিধি ও সংবিধানের আলোকে সিদ্ধান্ত দিতেন। তার রুলিংগুলোতে রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে আইনি যুক্তি বেশি প্রাধান্য পেত।
সংসদ সচিবালয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি অধিবেশনের আগে আলোচ্যসূচি, বিধি এবং সম্ভাব্য আপত্তির বিষয়গুলো নিজে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি প্রস্তুত নোট নিয়ে অধিবেশন পরিচালনা করতেন।
সংসদকে কার্যকর করার চেষ্টা
অষ্টম জাতীয় সংসদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিরোধী দলের সীমিত অংশগ্রহণ। আওয়ামী লীগ বিভিন্ন সময় সংসদ বর্জনের কর্মসূচি পালন করে। ফলে সংসদে কার্যকর বিতর্ক ও জবাবদিহির পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতিতে স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার একাধিকবার সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দলকে আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
স্থায়ী কমিটিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ
জমির উদ্দিন সরকার বিশ্বাস করতেন, সংসদের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর ওপর। তার সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিকে আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা, বাজেট বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে কমিটিগুলোর ভূমিকা বাড়ানোর ওপর তিনি জোর দেন।
নিরপেক্ষতার প্রশ্ন
বাংলাদেশে স্পিকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। কারণ স্পিকার নির্বাচিত হন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের ভোটে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বারবার বলেছেন, ‘স্পিকারের আসনে বসে তার প্রথম পরিচয় দলীয় নয়, সাংবিধানিক’। যদিও বিরোধী দল বিভিন্ন সময় তার কিছু সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তবুও সংসদীয় বিধি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে তিনি আইনিভিত্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। সংসদের কার্যবিবরণীতে তার একাধিক রুলিংয়ে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং কার্যপ্রণালি বিধির নির্দিষ্ট ধারার উল্লেখ দেখা যায়।
ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়
২০০২ সালের ২১ জুন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদরুদ্দোজা চৌধুরী পদত্যাগ করলে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় আড়াই মাস তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি কোনো রাজনৈতিক বিতর্কে জড়াননি। বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন। ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে নতুন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ শপথ নেওয়ার পর তিনি পুনরায় স্পিকারের দায়িত্বে ফিরে যান। বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির।
সংসদীয় কূটনীতিতে ভূমিকা
স্পিকার হিসেবে তিনি কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংসদীয় সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এসব ফোরামে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আইনসভা শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক সংঘাত, বিরোধী দলের অনুপস্থিতি এবং তৎকালীন জাতীয় পরিস্থিতি সংসদের কার্যকারিতাকে সীমিত করেছিল। নানা প্রতিকূল বাস্তবতায়ও তিনি সংসদীয় বিধি, সাংবিধানিক রীতি এবং প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে আলোচনা হলে আজও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের নাম উচ্চারিত হয় একজন অভিজ্ঞ আইনজ্ঞ, সংবিধান-সচেতন স্পিকার এবং সংসদীয় প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ব্যক্তিত্ব হিসেবে।
তিনি ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তৎকালীন দিনাজপুর-১ আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ ও ১২ সপ্তম এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
ব্যরিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নয়াবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই তিনি ৯৪ বছর বয়সে ঢাকায় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন।